বৈদ্যুতিক তারে ঝলসে গেল শিশুর দুই হাত

দেড়শ’ পরিবারের ‘মৃত্যুকূপে’ বসবাস!

৩৩কেভি লাইনের নিচে তিনতলা ভবন

মোহাম্মদ রফিক
Electric Line_North Fatehabad (4)

তিনতলা একটি ভবন। ছাদের চার ফুট উপর দিয়ে চলে গেছে ৩৩ হাজার কিলোভোল্ট ড়্গমতার বিদ্যুতের সঞ্চালন লাইন। লাইনের তারগুলো আবরণবিহীন। তাই বিপদ ঠেকাতে সঞ্চালন লাইন ঘেঁষে চার ফুট উচ্চতার দেয়াল তুলে দিয়েছেন ভবন মালিক। এবার চিত্রটা দাঁড়াল আরও বিপজ্জনক। আট-দশ বছরের শিশুও ওই দেয়ালের পাশে দাঁড়িয়ে চাইলেই ছুঁতে পারবে মৃত্যুকে। কারণ দেয়াল থেকে সঞ্চালন লাইনের দূরত্ব এক ফুট। দেয়ালটি নির্মাণ করা হলেও এড়ানো যায়নি ভয়ঙ্কর দুর্ঘটনা।
গতকাল বেলা সাড়ে ১১টায় ছাদে খেলতে গিয়ে সঞ্চালন লাইনে হাত দিয়ে বসে এক শিশু। এরপর আর কি,যা হওয়ার তাই হলো। মুহূর্তের মধ্যে শিশুটি ছিটকে পড়লো। কিন’ ঝলসে গেল তার কোমল দুটি হাত। তার ঠাঁই হলো চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে। শিশুটি এখন যন্ত্রণায় ছটফট করছে হাসপাতালের বিছানায়। শিশুটির নাম অন’ কর্মকার। বাবার নাম রূপন কর্মকার। মায়ের নাম চম্পা কর্মকার। তার বছর খানেক ধরে ভবনটির দোতলার একটি ভাড়ায় থাকছেন। ঘটনাস’লটি হলো-হাটহাজারীর উত্তর ফতেয়াবাদ চট্টগ্রাম-নাজিরহাট মহাসড়ক ঘেঁষা জমজম ফিলিং স্টেশনের বিপরীতে ।
স’ানীয় সূত্রের দাবি, এ ভবনে একবার নয়, এর আগেও নির্ঘাত মৃত্যুর হাত থেকে ফিরেছেন কয়েকজন নির্মাণ শ্রমিক। সূত্রটি জানায়, দুই বছর আগে প্রায় ২০ শতক জায়গার উপর সেখানে ছিল বেড়ার টিনশেড ঘর। প্রায় তিন বছর আগে হারাধন দাশ নামে রাউজান উপজেলার এক ব্যবসায়ী জায়গাটি কিনে নেন। এরপর বছর দেড়েক আগে সেখানে গড়ে তোলেন তিন তলা ভবন।
অভিযোগ আছে, চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপড়্গের কাছ থেকে অনুমতি না নিয়েই ভবনটি গড়ে তোলেন হারাধন। ভবনটিতে বর্তমানে অনত্মত দেড়শ পরিবার ভাড়ায় থাকেন। আহত শিশু অন’ কর্মকারের মা চম্পা কর্মকার সুপ্রভাতকে ঘটনার বিবরণ দেন। তিনি বলেন, ‘সকাল সাড়ে ১১টার দিকে কয়েকজন শিশুর সাথে ছাদে খেলতে যায় অন’। এসময় সে বিদ্যুতের তারে হাত দেয়। সাথে সাথে চিৎকার দিয়ে জ্ঞান হারিয়ে ফেলে। তার সাথে থাকা শিশুরা খবর দিলে দৌঁড়ে ছাদে গিয়ে দেখি অন’ বেহুশ হয়ে ছাদের মেঝেতে পড়ে আছে। হাত দুটি কনুই পর্যনত্ম ঝলসে গেছে। আহত অবস’ায় তাকে দ্রম্নত চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করি।’
সরেজমিন দেখা যায়, চট্টগ্রাম-নাজিরহাট মহাসড়ক ঘেঁষে গড়ে তোলা হয়েছে তিনতলা ভবনটি। এ ভবনের সামনে (পূর্বদিকে) ছাদের একাংশের উপর দিয়ে ৩৩ হাজার কিলোভোল্ট ড়্গমতা সম্পন্ন বিদ্যুতের সঞ্চালন লাইন। সঞ্চালন লাইনের একটি খুঁটি গাড়া হয়েছে ভবনের দড়্গিণ-পূর্বে মূল দেয়ালের ভেতর।
দেখা যায়, বেলকনির লোহার রেলিং ঘেঁষে চলে গেছে ৪২০ কিলোভোল্টের আরেকটি বৈদ্যুতিক লাইন। এটির তারগুলো ঝুলে রেলিং থেকে দুই ফুট উপরে ঝুলে আছে। প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তি ছাড়াও যে কোনো শিশু অনায়াসে ছুঁতে পারবে। গতকাল বৃহস্পতিবার দুপুরে বিপজ্জনক ওই বেলকনিতে শিশুদের খেলাধূলা করতে দেখা গেছে। ‘দোতলার বেলকনিতেও যে কোনো মুহূর্তে ঘটতে পারে ভয়ঙ্কর দুর্ঘটনা’ বলেন চম্পা কর্মকার।
ভবনটির তিনতলায় উঠে দেখা গেছে, ছাদের পূর্বদিকে উত্তর-দড়্গিণ হয়ে চলে গেছে ৩৩ হাজার কিলোভোল্টের সঞ্চালন লাইন। এটিতে আছে তিনটি মোটা মোটা আবরণহীন বৈদ্যুতিক তার। পূর্বদিকে ছাদের প্রায় ৫ ফুট বাদ রেখে নির্মাণ করা হয়েছে ২০ ফুট দৈর্ঘ্যের পাকা দেয়াল। দড়্গিণ-পূর্ব কোণায় ভবনটির ছাদের অনত্মত ২-৩ ফুট ভেতরে দাঁড়িয়ে আছে বিদ্যুতের খুঁটি। হাত দিলেই ছোঁয়া যাবে বিদ্যুতের তার।
ভাড়াটিয়ারা প্রশ্ন তোলেন, শক্তিশালী বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইনের মাঝে কীভাবে এ ভবনটি গড়ে তোলা হয়েছে। এটিকে এক ‘মৃত্যুকূপ’ বলে মনত্মব্য করেন তারা। হাটহাজারী বিদ্যুৎ বিতরণ বিভাগের পদস’ এক কর্মকর্তা জানান, ভবনটি গড়ে তোলার সময় পিডিবির স’ানীয় দায়িত্বশীল কোনো কর্মকর্তা বাধা দেননি। অথচ এ ভবনের দেড়শ গজ দূরত্বেই আছে বিদ্যুৎ বিভাগের ফতেয়াবাদ সাব-স্টেশন।
এ কর্মকর্তার দাবি, ভবনটি দোতলা এবং তিনতলা নির্মাণের সময় হাটহাজারী বিদ্যুৎ বিভাগের অসাধু কিছু কর্মকর্তা ভবন মালিক হারাধন থেকে মোটা অংকের ঘুষ নিয়ে নীরব থেকেছেন। প্রতিদিন ওই ভবনের পাশ দিয়ে পিডিবির কর্মকর্তারা আসা-যাওয়া করেন। বিষয়টি তাদের চোখে পড়লেও রহস্যজনক কারণে তারা ভবনটির বিরম্নদ্ধে কোনো ব্যবস’া নিচ্ছেন না। ঘুষ নিয়ে শক্তিশালী সঞ্চালন লাইনের নিচে বিপজ্জনকভাবে মানুষকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেওয়া হয়েছে বলে মনত্মব্য করেন এ কর্মকর্তা।
এ ব্যাপারে জানতে গতকাল রাতে একাধিকবার কল করা হলেও মোবাইল ফোন রিসিভ করেননি হাটহাজারী বিদ্যুৎ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী হোসেন ইমাম। বক্তব্য নিতে হারাধনের মোবাইল নম্বর চাইলে তা দিতে অস্বীকৃতি জানান ভবনের কেয়ারটেকার স্বপন বাবু। তিনি বলেন, ‘ছাদে নিরাপত্তা ব্যবস’া হিসেবে দেয়াল তুলে দিয়েছেন ভবন মালিক। দুর্ঘটনার জন্য আমরা দায়ী নই। পিডিবির লোকজনকে টাকা দিয়ে ম্যানেজ করার অভিযোগও সত্য নয়।