দেশ ও শিক্ষার্থীর স্বার্থেই ছাত্ররাজনীতি

কাজী আবু মোহাম্মদ খালেদ নিজাম

বাংলাদেশের ছাত্ররাজনীতির একটি গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস রয়েছে। নানা আন্দোলন, সংগ্রামে ছাত্র সংগঠনগুলোর জোরালো ভূমিকা ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা রয়েছে। বর্তমানে ছাত্র সংগঠনগুলোর অবস্থা আগের যেকোন সময়ের তুলনায় নেতিবাচক অবস্থানে রয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয়, কলেজ পর্যায়ে ছাত্র সংগঠনগুলোর কর্মকাণ্ড রয়েছে। স্বাধীনতার পরবর্তী সময়েও এদেশে বিভিন্ন ছাত্রসংগঠন প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। বাংলাদেশে ছাত্রলীগ, জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল, ইসলামী ছাত্রশিবির ও বাম ঘরানার ছাত্র সংগঠনগুলি দেশের ছাত্ররাজনীতিতে ব্যাপক প্রভাব রাখছে। যদিও নানা ধরনের চাপের মুখে ছাত্রদল, শিবির ও বাম ঘরানার ছাত্র সংগঠনের তৎপরতা সীমিত হয়ে গেছে। সরকারিদলের ছাত্র সংগঠন হওয়ার সুবাদে ছাত্রলীগের তৎপরতা বেশিরভাগ ক্ষেত্রে পরিলক্ষিত হচ্ছে। যে কারণে দেশের বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে অন্য ছাত্রসংগঠন নির্জীব অবস্থায় রয়েছে। তাদের তেমন তৎপরতার সুযোগও নেই।
আমি মনে করি, ছাত্রদের কল্যাণেই ছাত্র রাজনীতি। শিক্ষাঙ্গনে ছাত্রছাত্রীদের বিভিন্ন সমস্যা সমাধানে ছাত্রসংগঠনগুলোর ভূমিকা কাম্য। দেশের বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডেও অংশ নিতে পারে। কিন্তু বর্তমান সময়ে এসে ছাত্ররাজনীতির নামে যা দেখা যাচ্ছে তা তার ঐতিহাসিক ভূমিকাকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন, ভাষা আন্দোলন, ঊনসত্তরের গণআন্দোলন, একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধ, স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে ছাত্রসংগঠনগুলোর ভূমিকা সর্বজনবিদিত।
ছাত্ররাজনীতির সেই সোনালী অতীত কোথায়? দেশের নানা সংকট ও ছাত্রদের সমস্যা সমাধানে ছাত্ররাজনীতির ভূমিকা নেই বললেই চলে। অন্তর্কোন্দল, চাঁদাবাজি, সন্ত্রাসসহ নানা অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে তারা। ছাত্রসংগঠনগুলোর অনেকগুলো হয়ে গেছে মেধাশূন্য, সন্ত্রাসনির্ভর। রাজনৈতিক দলের লেজুড়বৃত্তিতে জড়িয়ে যাচ্ছে। রাজনৈতিক দলগুলোর কর্মসূচি বাস্তবায়নেই বেশি মনোযোগী এখনকার ছাত্রসংগঠনগুলো।
শিক্ষার্থীদের সমস্যা সমাধানের পরিবর্তে বিভিন্ন সময় তাদেরকেই জিম্মি করে নিজস্ব দাবি-দাওয়া আদায়ে ব্যস্ত থাকে। এসব অপতৎপরতার কারণে বাড়ছে সহিংসতা, খুনোখুনি। খুনের শিকার হয়েছে অনেক শিক্ষার্থী।
একসময় শুধু দেশ ও দেশের মানুষের পক্ষে দাবি আদায় ও তাদের বৃহত্তর স্বার্থে অন্যান্য ন্যায্য দাবি পূরণই ছিল ছাত্ররাজনীতির উদ্দেশ্য। কিন্তু বর্তমান সময়ে এসে মেধা ও দেশপ্রেমের পরিবর্তে পেশি এবং অস্ত্র শক্তিকে প্রাধান্য দেয়া হচ্ছে।
ছাত্ররাজনীতির এ অধঃপতনের কারণে মানুষ এর প্রতি বীতশ্রদ্ধ হয়ে পড়েছে। মানুষ তাদের সন্তানদের বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজে শিক্ষাগ্রহণের জন্য পাঠাতে ভয় করছে। কখন না জানি অপছাত্ররাজীতির বলি হতে হয়!
সরকার এবং সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক দলগুলোর উচিত হবে ছাত্রসংগঠনগুলোর অন্যায় কাজকে প্রশ্রয় না দেয়া। পুরোনো ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনতে ছাত্র সংগঠনগুলোকে দেশের মানুষ ও ছাত্রদের কল্যাণে কর্মসূচি প্রণয়ন এবং তা বাস্তবায়ন করতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়, কলেজে শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন সমস্যা সমাধানে ছাত্রসংগঠনগুলোকে সোচ্চার হতে হবে। প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের ছাত্ররাজনীতিতে ভূমিকা রাখার মানসিকতা দূর করতে হবে। ছাত্র সংগঠনগুলোর ভালো উদ্যোগে সমর্থন দান এবং অন্যায় কর্মসূচির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান থাকতে হবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রশাসনকে। কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়মিত ছাত্রসংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠান না হওয়াও একটা খারাপ নজির। এ অবস্থা থেকে অবশ্যই বেরিয়ে আসতে হবে। দেশের সার্বিক কল্যাণ সাধন এবং সততা ও চরিত্র গঠন, ছাত্রদের কল্যাণে কর্মসূচি দিতে হবে ছাত্রসংগঠনগুলোকে। দেশ ও শিক্ষার্থীর স্বার্থেই হোক ছাত্র রাজনীতি।

লেখক: শিক্ষক ও প্রাবন্ধিক