দেশের সবচেয়ে বড় ভূমিকম্প

নিজস্ব প্রতিবেদক

বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের ভূমিকম্পবিদ মমিনুল ইসলাম, থাকেন ঢাকায়। এক যুগেরও বেশি সময় ধরে কাজ করছেন ভূমিকম্প নিয়ে। গতকালের ভূমিকম্প প্রসঙ্গে তার প্রতিক্রিয়া, আমার দেখা বাংলাদেশের ইতিহাসের অন্য যে কোনো ভূমিকম্পের চেয়ে গতকালের ভূমিকম্পটি ছিল সবচেয়ে বিপজ্জনক। এই ভূমিকম্পটি দেশের প্রায় সব মানুষ অনুভব করেছে এবং অনেকেই ঘুম থেকে লাফ দিয়ে জেগে উঠেছে। আর আতঙ্কের রেশ কাটতে না কাটতে কম্পন বন্ধ হয়ে গেছে।’
শুধু ঢাকা নয়, চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সদস্য (প্রশাসন ও পরিকল্পনা) জাফর আলম বসবাস করেন নাসিরাবাদ হাউজিং সোসাইটির একতলা ভবনে। তিনি গতকাল দুপুরে তার কক্ষে উপসি’ত থাকা বিভিন্ন কর্মকর্তাদের সাথে কথোপকথনের এক পর্যায়ে বলেন, ‘আমি নিজে ভূমিকম্পটি টের পেয়েছি এবং ভাল ঝাঁকুনি অনুভব করেছি। আমার মা হালিশহরে দ্বিতীয় তলায় থাকেন, তারাও অনুভব করেছেন এবং ঘর থেকে বেরিয়ে এসেছিলেন।’ এ সময় বন্দর কর্তৃপক্ষের পরিচালক (নিরাপত্তা) সহ আরও দুই কর্মকর্তাও ভূমিকম্পে তীব্র ঝাঁকুনির কথা বলেন। হালিশহর জি ব্লকের আর্টিলারি রোডের ৮ তলায় বসবাস করেন আয়েশা সিদ্দিকা। তিনি বলেন, ‘ভোর ৫টা ৫ মিনিটে ঝাঁকুনি খেয়ে ঘুম থেকে লাফ দিয়ে উঠে ঘর থেকে বাইরে বের হয়ে যাওয়ার চেষ্টা করি। এতো বেশি ঝাঁকুনি হওয়ায় খুব ভয় পেয়েছিলাম।’ শুধু হালিশহর এলাকা নয়, ফিরোজশাহ কলোনির বাসিন্দা আবদুস সাত্তার বসবাস করেন তিনতলায়। তিনিও ভূমিকম্পের ঝাঁকুনি খেয়ে পরিবারের সদস্যদের নিয়ে আতঙ্কে ঘরের বাইরে বের হয়ে আসেন। আর চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের দামপাড়া পুলিশ লাইনের ব্যারাকের এক পুলিশ সদস্য ভূমিকম্প আতঙ্কে চারতলা ভবনের উপর থেকে লাফ দিয়ে নিচে পড়ে আহত হয়েছেন।
অর্থাৎ নগরজুড়েই ছিল এই আতঙ্ক এবং গতকাল অফিস-আদালত সব কর্মস’লে মানুষের আলোচনার বিষয় ছিল ভূমিকম্প। এর আগে চট্টগ্রামবাসী বিভিন্ন মাত্রার ভূমিকম্প অনুভব করেছে। তারপরও এতো তীব্রতর ঝাঁকুনি অনুভব করেনি। চট্টগ্রাম থেকে প্রায় ৩৫৩ কিলোমিটার দূরে ৬ দশমিক ৬ রিখটার স্কেলের ভূমিকম্পটির উৎপত্তি হলেও এতে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ কম হওয়ার কারণ কি জানতে চাইলে আবহাওয়া অধিদপ্তরের ভূমিকম্পবিদ মমিনুল ইসলাম বলেন, ‘মূলত দূরত্বের কারণে ক্ষয়ক্ষতি কম হয়েছে। আর দূরত্বের পাশাপাশি রয়েছে ভূমিকম্পটির উৎপত্তি ছিল ভূ-পৃষ্ঠের অনেক গভীরে হওয়ায় ক্ষয়ক্ষতি কম হয়েছে।’
এদিকে নেপাল ভূমিকম্পের পর, আফগানিস্তানের ভূমিকম্প কিংবা চীনের ভূমিকম্পের পর এ উপমহাদেশ এলাকায় গতকালের ভূমিকম্প প্রসঙ্গে ভূমিকম্প বিষয়ে একাধিক কর্মকর্তার সাথে কথা বলে জানা যায়, গত এক বছর ধরে আমাদের উপমহাদেশের প্লেট বাউন্ডারি ও ফল্ট লাইনগুলো ভূমিকম্পে সক্রিয় হয়ে গেছে। গত এক বছর ধরে এ এলাকায় অনেকগুলো শক্তিশালী ভূমিকম্প হয়েছে এবং হয়তো আরো হবে।
এদিকে ভূমিকম্পের কারণে নগরীর রেলওয়ের কেন্দ্রীয় ভবন সিআরবি’র আগের ফাটলগুলোর ব্যপ্তি আরো বড় হয়েছে। নগরীর অনেক ভবন ফাটল দেখা যাওয়া কিংবা হেলে যাওয়ার দৃশ্য চোখে পড়েছে। ভূমিকম্পের ফলে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের আলাওল হলের বেশ কয়েকটি জায়গায় নতুন করে ফাটল দেখা দিয়েছে। এমনিতেই ২০১১ সালে হওয়া এক ভূমিকম্পে হলটির সামনের অংশের ৪৮টি পিলারে বড় ধরনের ফাটল ধরে। সবচেয়ে বড় ফাটলটি দেখা দিয়েছে হলের দ্বিতীয় তলায় ২০১ নম্বর কক্ষের সামনে ছাদের সঙ্গে লাগোয়া পিলারে। এর ফলে পিলারটি ছাদ থেকে প্রায় বিচ্ছিন্ন হওয়ার অবস’ায় চলে এসেছে। এছাড়া হলের বেশকিছু জায়গায় নতুন করে ছোট ছোট ফাটল তৈরি হয়েছে।
উল্লেখ্য, বাংলাদেশের পূর্ব পাশ দিয়ে একটি ফল্ট লাইন রয়েছে। এই ফল্ট লাইন বাংলাদেশ মিয়ানমার হয়ে আসাম মিজোরাম হয়ে হিমালয়ান অঞ্চল পর্যন্ত বিস্তৃত। এই ফল্ট লাইনের কারণে চট্টগ্রাম ও সিলেট দেশের সবচেয়ে ভূমিকম্প প্রবণ এলাকা। এছাড়া গত কয়েক বছর ধরে এই ফল্ট লাইনের আশপাশ এলাকায় ভূমিকম্প হচ্ছে। এর আগে ১৯১৮ সালের ৮ জুলাই শ্রীমঙ্গলে ৭ দশমিক ৬ রিকটার স্কেলের ভূমিকম্প হয়েছিল।
হুড়োহুড়ি, ‘আতঙ্কে’ পাঁচজনের মৃত্যু
বার্তাসংস’া বিডিনিউজ জানিয়েছে, ভূমিকম্পের ঝাঁকুনিতে ঘুম ভাঙার পর ঘর থেকে বেরিয়ে আসার চেষ্টায় হুড়োহুড়ির মধ্যে ‘আতঙ্কিত হয়ে’ ঢাকা, জামালপুর, রাজশাহী, পঞ্চগড় ও লালমনিরহাটে পাঁচজনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। সোমবার ভোর ৫টা ৫ মিনিটে ৬ দশমিক ৬ মাত্রার এই শক্তিশালী ভূমিকম্পের পর এ ধরনের ঘটনায় আহত হয়ে ২৯ জন ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে এবং ৩২ জন সিলেট মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে গেছেন।
ঢাকায় আহতদের মধ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বেশ কয়েকজন শিক্ষার্থী রয়েছেন বলে মেডিক্যাল ফাঁড়ি পুলিশের পরিদর্শক মোজাম্মেল হক জানান।
সকালে পূর্ব জুরাইনের এক বাসা থেকে দৌড়ে নামতে গিয়ে আতিকুর রহমান নামে ২৩ বছর বয়সী এক যুবকের মৃত্যু হয়। তিনি নিজে পড়ালেখা করার পাশাপাশি টিউশনি করে খরচ চালাতেন। তবে তিনি কোথায় পড়তেন তা তাৎক্ষণিকভাবে জানা যায়নি।
‘তার শরীরের কোথায় কোন জখমের চিহ্ন নেই। আতঙ্কে হৃদস্পন্দন বন্ধ হয়ে তার মৃত্যু হয়ে থাকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে,’ বলেন মোজাম্মেল।
একইভাবে মারা যান রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হলের প্রধান বাবুর্চি খলিলুর রহমান ও লালমনিরহাটের পাটগ্রাম উপজেলার ঘোনাবাড়ীর মুদি দোকানি নূর ইসলাম কদু মিয়া (৬০), জামালপুরের ইসলামপুর উপজেলার গাওকুড়া গ্রামের দর্জি সোনা মিয়া (৩৮) ও পঞ্চগড় শহরে তাহমিনা বেগম (৫৫) নামে এ নারী।
জামালপুরে ভূমিকম্পের সময় মারা যাওয়া সোনা মিয়া গাওকুড়া গ্রামের বছির শেখের ছেলে। তার বড় ভাই মৃণাল শেখ বলেন, ‘আমার ভাই মেলান্দহ উপজেলার দুরমুঠ গ্রামে শ্বশুর বাড়িতে ছিল। ভূমিকম্পের সময় ভয়ে তার হার্ট অ্যাটাক হয়। হাসপাতালে নেওয়ার আগেই মারা গেছে।’
পঞ্চগড়ে মারা যাওয়া তহমিনা বেগমের বাড়ি শহরের পূর্ব জালাশী মহল্লায় বলে জানান।
তহমিনা বেগমের ছেলে সোহেল বলেন, ‘ভূমিকম্পের সময় মা ঘরে শুয়েছিলেন। ঘরে ঝাঁকুনি হলে ভয় পেয়ে চিৎকার ও কান্নাকাটি করতে করতে তিনি মাথা ঘুরে পড়ে যান।
‘সকালে স’ানীয় এক চিকিৎসককে এনে দেখালে তিনি হাসপাতালে নেওয়ার পরামর্শ দেন। পরে হাসপাতালে নিয়ে গেলে মা মারা গেছেন বলে চিকিৎসকরা জানান।’
পঞ্চগড় সদর আধুনিক হাসপাতালের কর্তব্যরত চিকিৎসক ডা. মাহবুব-উল-আলম বলেন, আতঙ্কে অসুস’ হয়ে পড়েছিলেন তাহমিনা। হাসপাতালে আনার আগেই তার মৃত্যু হয়। ‘সম্ভবত আতঙ্কে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে তিনি মারা গেছেন।’
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় মুজিবুর রহমান হলের প্রধান বাবুর্চি খলিলুর রহমান পরিবার নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় সংলগ্ন মেহেরচণ্ডি এলাকায় থাকতেন। তার গ্রামের বাসা কুমিল্লা জেলায়।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হলের প্রাধ্যক্ষ মোহা. আশরাফ উজ জামান বলেন, সকালে ভূমিকম্পের সময় খলিল আতঙ্কিত হয়ে বাসা থেকে বেরিয়ে যান। এ সময় তিনি মেয়ে এবং কয়েকজন নিকট আত্মীয়কে টেলিফোনও করেন। ‘এর কয়েক মিনিট পর তিনি হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান।’
মতিহার থানার ওসি হুমায়ূন কবির বলেন, ভূমিকম্পের পর খলিলুর রহমানের মৃত্যুর বিষয়টি তারাও জানতে পেরেছেন।
লালমনিরহাটের পাটগ্রামের ঘোনাবাড়ী এলাকায় আতঙ্কিত হয়ে মৃত মুদি দোকানি নূর ইসলাম কদুর বাজার এলাকার নজর উদ্দিনের ছেলে।
পরিবারের সদস্যদের বরাত দিয়ে পাটগ্রাম ইউনিয়ন পরিষদের ছয় নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য শাহ জামাল বলেন, ‘ভূমিকম্পের সময় নূর ইসলাম ঘুম থেকে উঠে আতঙ্কিত হয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে যান। এক পর্যায়ে তিনি মাথা ঘুরে পড়ে যান, সেখানেই তার মৃত্যু হয়।’
আতঙ্কে লাফ, তারপর হাসপাতালে :
ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগের একজন দায়িত্বরত কর্মী জানান, সকাল থেকে যারা চিকিৎসা নিয়েছেন তাদের মধ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বেশ কয়েকজন শিক্ষার্থী রয়েছেন।
এদের মধ্যে সার্জেন্ট জহুরুল হক হলের এক শিক্ষার্থী পাঁচতলা ভবনের ছাদ থেকে লাফিয়ে পড়ে আহত হয়েছেন। এছাড়া মহসিন ও কবি জসিম উদ্দীন হলের দোতলা থেকেও পাঁচজনের লাফিয়ে পড়ে আহত হওয়ার খবর দিয়েছে কয়েকটি সংবাদমাধ্যম।
মেডিক্যাল ফাঁড়ির পরিদর্শক মোজাম্মেল বলেন, ‘কেউ দোতলা থেকে, কেউ তিনতলা থেকে লাফিয়ে, কেউবা সিঁড়ি দিয়ে দৌঁড়ে নিচে নামার চেষ্টার সময় আহত হয়েছেন।’
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর আমজাদ আলী ১৬ জনকে ঢাকা মেডিক্যালে নেওয়ার কথা জানিয়েছেন। ১২ জনকে ঢাকা মেডিক্যালে নিয়ে যায় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টরিয়াল ও মেডিক্যাল টিম। আর বাকি চারজনকে বন্ধু সহপাঠীরা হাসপাতালে নিয়ে যান।
হাসপাতালের টিকিট কাউন্টারের ইনচার্জ আবদুল বাতেন বলেন, ‘চিকিৎসা নিতে যারা এসেছেন, তাদের মধ্যে তিনজন ভর্তি আছেন। তাদের অবস’া গুরুতর।’ এরা হলেন-পুলিশ সদর দপ্তরের কনস্টেবল মো. সোহান এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই ছাত্র ইয়াসিন আরাফাত ও ইকবাল। বাতেন জানান, ভূমিকম্পের সময় আতঙ্কে দুইতলা থেকে লাফিয়ে পড়ায় কনস্টেবল সোহানের দুই পা ভেঙে গেছে। আর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্জেন্ট জহুরুল হক হলের ছাত্র ইয়াসিন আরাফাত বুকে ব্যাথা পেয়েছেন বলে জানিয়েছেন তার বন্ধু সুমন। ইয়াসিন ব্যাংকিং অ্যান্ড ইন্স্যুরেন্স বিভাগের চতুর্থ বর্ষের ছাত্র। শহিদুল্লাহ হলের আবাসিক শিক্ষার্থী ইকবালের অবস’া গুরুতর বললেও তিনি কোথায় আঘাত পেয়েছেন তা জানাতে পারেননি ঢাকা মেডিক্যালের কর্মী বাতেন। আতঙ্কে হুড়োহুড়িতে আহত হয়ে সিলেট ওসমানী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে গেছেন ৩২ জন। তাদের কারও অবস’া গুরুতর নয় বলে জানিয়েছেন মেডিক্যালের জরুরি বিভাগের চিকিৎসক দেবাশিষ সিনহা।
যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিবক জরিপ (ইউএসজিএস) দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, সকালে এই ভূমিকম্পের উপকেন্দ্র ছিল মনিপুরের ইম্ফল থেকে ২৯ কিলোমিটার পশ্চিম উত্তর-পশ্চিম এবং পূর্ব উত্তর-পূর্বে ভারত-মিয়ানমার সীমান্তের কাছাকাছি।

আপনার মন্তব্য লিখুন