দেবী ফিরলেন কৈলাসে

প্রতিমা নিরঞ্জনে শেষ হলো শারদীয় দুর্গোৎসব

রুমন ভট্টাচার্য

আনন্দ-বেদনা আর উৎসবে প্রতিমা নিরঞ্জনের মধ্য দিয়ে শেষ হলো হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের বৃহৎ ধর্মীয় উৎসব শারদীয় দুর্গোৎসব। গতকাল নিরঞ্জনের মধ্য দিয়ে বিদায় দেওয়া হলো মহিষমর্দিনী, দুর্গতিনাশিনী দেবী দুর্গাকে। দেবী দোলায় চড়ে ফিরে গিলেন কৈলাসে সঙ্গে সিদ্ধিদাতা গণেশ, বল ও বলবীর্য ও পৌরুষের কার্তিক ও ধন ও ঐশ্বর্যের প্রতীক লক্ষ্মী, জ্ঞানের প্রতীক দেবী সরস্বতীকে নিয়ে।
গত ১৫ অক্টোবর শুক্রবার ষষ্ঠী পূজার মাধ্যমে ঘোটকে চড়ে এই মর্ত্যধামে ভক্তদের মাঝে এসেছিলেন দেবী দুর্গা। এরপর সপ্তমী, অষ্টমী, নবমী ও গতকাল বিজয়া দশমীতে নিরঞ্জনে শেষ হলো পাঁচদিনব্যাপী শারদীয় দুর্গোৎসবের সকল আনুষ্ঠানিকতা।
প্রতিবারের মত এবারও উৎসবরমুখর পরিবেশে উদযাপিত হয়েছে শারদীয় দুর্গোৎসবের প্রতিটি দিন। গতকাল শুক্রবার পূজা মণ্ডপগুলোতে বিদায়লগ্নের বিষণ্নতা থাকলেও আনন্দেরও কমতি ছিল না। আগামী বছর আবার ফিরে পাওয়ার আশায় অশ্রুসিক্ত নয়নে ভক্তরা বিদায় দিয়েছেন দেবী দুর্গাকে। এ উপলক্ষে সকাল থেকেই প্রতিটি পূজামণ্ডপে ছিল বিদায়ের প্রস’তি। সকালে দশমী পূজা শেষে ভক্তদের দেওয়া হয় পুষ্পাঞ্জলি। শেষবারের মতো দেবী দুর্গাকে প্রণাম জানিয়ে পৃথিবীর সকল অশুভ শক্তি বিনাশ কামনা করা হয় ।
গতকাল সকাল ৯টা ৫৭ মিনিটের মধ্যে ঘট নিরঞ্জন শেষে অশ্রুসিক্ত নয়নে বিবাহিত নারীরা দেবী দুর্গার কপালে দেন সিঁদুর, মুখে পান, চুলে তেল ও মুখে দেন মিষ্টি। স্কুল ও কলেজ শিক্ষার্থীরা ১০৮ বার শ্রীশ্রী মা দুর্গা লেখা চিরকুট গুজে দেন দেবীর হাতে। এরপর মহিলারা একে অন্যকে তেল, সিঁদুর পরিয়ে দিয়ে মিষ্টি মুখ করান। এছাড়া পূজামণ্ডপগুলোতে দেবীর বিদায়ের স্মৃতি ধরে রাখতে তরুণ-তরুণীরা সেলফি তোলার আনন্দে মেতে উঠে।
গতকাল প্রতিমা নিরঞ্জনকে ঘিরে নগরী ছিল উৎসবমুখর। আর দিনটি ছিল শুক্রবার সরকারি ছুটি। তাই ছুটির দিনে ঘুরে বেড়ানোর পাশাপাশি বৃহৎ ধর্মীয় উৎসবের আনন্দে সামিল হতে সকাল থেকে মানুষের ঢল নামে পতেঙ্গা সমুদ্র সৈকত ও কর্ণফুলীর তীরে। সকাল গড়িয়ে দুপুর হতেই বাড়তে থাকে লোক সমাগম। পতেঙ্গা সৈকত ও কর্ণফুলী ছাড়াও পারকি, কাট্টলী ও অভয়মিত্র ঘাটে প্রতিমা নিরঞ্জনের আয়োজন করা হয়।
প্রতিমা নিরঞ্জন নির্বিঘ্নভাবে সম্পন্ন করতে বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদ চট্টগ্রাম মহানগর ও সিটি করপোরেশন যৌথ উদ্যোগ গ্রহণ করে পতেঙ্গা সৈকতে। ছিল কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস’া। সিটি করপোরেশন প্রতিবারের মতো এবারও সৈকতে প্যান্ডেল তৈরি, আলোকসজ্জা, দর্শনার্থীদের জন্য পানীয়জলের ব্যবস’া করে। দুপুর ১টা থেকে চলে মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। প্রতিমা নিরঞ্জনের যাতায়াত সুবিধার্থে প্রতিমাবাহী ট্রাকগুলো এয়ারপোর্ট রোড হয়ে পতেঙ্গা সৈকতে প্রবেশ করে এবং কাঠগড়-পতেঙ্গা পর্যন্ত সকল ধরনের যানবাহন চলাচল বন্ধ রাখা হয়। ফলে ওই রাস্তা দিয়ে শত-শত মানুষকে পাঁয়ে হেঁটে সমুদ্র সৈকতে আসতে হয়।
অন্যদিকে, কালুরঘাট কর্ণফুলী নদীর তীরে প্রতিবারের মত এবারও প্রতিমা নিরঞ্জনের আয়োজন করে চান্দগাঁও থানা পূজা উদযাপন পরিষদ। সৈকতের পাড়ে প্যান্ডেল তৈরি, আলোকসজ্জা, আলোচনা সভা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। প্রতিমা নিরঞ্জন উপলক্ষে সৈকতের আশপাশে বসে মেলা। নদীর পাড় থেকে নৌকা ও বোটে করে প্রতিমা নিরঞ্জনের ব্যবস’া করা হয়। তবে বিসর্জনের স’ানটি মেরামত না হওয়ায় বেগ পেতে হয়েছে প্রতিমা নিরঞ্জনে আসা পূজা কমিটিগুলোকে।
গতকাল শুক্রবার দুপুর ১টা থেকে প্রতিমাবাহী সারি সারি ট্রাকগুলো ঢাক-ঢোল ও সাউন্ড সিস্টেম বাজিয়ে প্রবেশ করে পতেঙ্গা সমুদ্র ও কালুরঘাটের কর্ণফুলী সৈকত এলাকায়। ঘোষণা মঞ্চ থেকে বার বার বিভিন্ন নির্দেশনা প্রদান করা হয় স্বেচ্ছাসেবক ও প্রতিমাবাহী ট্রাকগুলোর প্রতি। শৃঙ্খলা বজায় রাখতে পতেঙ্গা, ইপিজেড ও চান্দগাঁও থানা কমিটির স্বেচ্ছাসেবকরা ছিলেন তৎপর। প্রতিমার ট্রাক ঢুকতেই লিপিবদ্ধ করেন পূজামন্ডপের নাম ও গাড়ির নম্বর। এরপর ট্রাক ঢুকানো হয় ভিতরে। আবার সেখানে পুলিশ সদস্যরা পূজা মণ্ডপের নাম লিপিবদ্ধ করেন। এরপর ট্রাক থেকে প্রতিমা নামিয়ে নিয়ে রাখা হয় সৈকত পাড়ে। সেখানে উপসি’ত সনাতন নর-নারীরা মা দুর্গার পায়ে সিঁদুর, তেল, পান ও মিষ্টি দেন। পাশাপাশি গণেশ, কার্তিক, লক্ষ্মী, ও সরস্বতীর পা ছুঁয়ে প্রণাম জানান। নিরঞ্জনের সময় উলুধ্বনি, ঢাক-ঢোলের বাদ্য, জয় মা দুর্গা ধ্বনিতে মুখরিত হয়ে উঠে সৈকত এলাকা।
প্রতিমা নিরঞ্জন উপলক্ষে পূজা উদযাপন পরিষদ, চট্টগ্রাম মহানগর পতেঙ্গা সমুদ্র সৈকত এলাকায় গতকাল দুপুর ১২টা থেকে নানা কর্মসূচির আয়োজন করে। এরমধ্যে দুপুর ১২টায় শ্রীশ্রী চণ্ডীপাঠ ও প্রতিমা নিরঞ্জন। চণ্ডী পাঠ করেন শিবু বিশ্বাস। দুপুর ১টায় সঙ্গীতানুষ্ঠান, দুপুর ৩টায় আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়।
সভায় সভাপতিত্ব করেন পরিষদের সভাপতি অ্যাডভোকেট চন্দন তালুকদার। এতে প্রধান অতিথি ছিলেন সিটি মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীন। বিশেষ অতিথি ছিলেন কাউন্সিলর ছালেহ আহম্মেদ চৌধুরী, কাউন্সিলর হাজী জয়নাল আবেদীন, কাউন্সিলর জিয়াউল হক সুমন। ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন পরিষদের সাধারণ সম্পাদক শ্রীপ্রকাশ দাশ অসিত। সঞ্চালনায় ছিলেন পরিষদের সদস্য অঞ্জন দত্ত ও সহযোগিতায় ছিলেন পরিষদের সমাজ কল্যাণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট তপন কুমার দাশ।
মহানগর পূজা উদযাপন পরিষদের সভাপতি অ্যাডভোকেট চন্দন তালুকদারের মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি সুপ্রভাতকে বলেন, ‘এবার রাত ৯টার মধ্যেই আমরা প্রতিমা নিরঞ্জন সম্পন্ন করেছি। পতেঙ্গা সমুদ্র সৈকতে ১১০টি, অভয়মিত্র ঘাটে ৪৩ ও কালুরঘাটে ২০টি প্রতিমা নিরঞ্জন দেওয়া হয়েছে। এছাড়া বিচ্ছিন্নভাবে পারকি, কাট্টলীসহ অন্যান্য জায়গায় প্রতিমা নিরঞ্জন দেওয়া হয়েছে।
উল্লেখ্য, মহানগরীতে বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদ, চট্টগ্রাম মহানগর এর হিসাব অনুযায়ী ২৫৫টি মণ্ডপে শারদীয় দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হয়েছে।