দু’মহান মুজাদ্দিদের প্রতি হৃদয় নিংড়ানো শ্রদ্ধা

হাফেজ মুহাম্মদ আনিসুজ্জমান

মহান রাব্বুল আলামীন আল্লাহ্‌ তাআলার অফুরন্ত, অনন্ত হামদ ও সানা তথা সমস্ত প্রশংসা, যিনি যুগে যুগে দিক ভ্রান্তির শিকার অসহায় বান্দাদের সহায়তায় মুজাদ্দিদ প্রেরণ করেন। তাঁর যত পবিত্রতা ও কৃতজ্ঞতা জানাই। যিনি পবিত্র ও কৃতজ্ঞ বান্দাকে ভালবাসেন। আর সুপথে চালিত করেন।
আল্লাহ্‌র একত্ব বা তাওহীদের ঘোষণা দেই। কায়মনোবাক্যে স্বীকার করি যে, তিনি ছাড়া কোন উপাস্য নেই। উপাস্য হওয়ার যোগ্যও আর কেউ নেই, কিছু নেই। তাঁর কোন শরীক নেই, সমকক্ষও কিছু নেই। দুনিয়ার সকল শক্তি তাঁরই কুদরতের অধীন, তাঁরই নিয়ন্ত্রিত। আমাদের মুনিব ও কাণ্ডারী, আলোর দিশারী হযরত মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আল্লাহ্‌্‌র বান্দা ও তাঁরই রাসূল। যাঁর চেয়ে বেশি আল্লাহর নৈকট্যে কেউ পৌঁছতে পারেনি।
আল্লাহ্‌ তাআলা তাঁর বান্দার প্রতি অতিশয় দয়ালু। তাই যখনই একটু বিস্মৃতি বা স্খলনে পতিত হয় তখনই সময়োচিত তাঁর সহায়তা বান্দাকে খুঁজে নেয়। অনুশোচনাগ্রস্ত আদমকে যখন দয়ার ইচ্ছে হল তখন তাঁর পক্ষ থেকেই আদমকে তাওবার শব্দমালা শিখিয়ে দেয়া হয়। (সুরা বাকারার ৩০ নম্বর আয়াতে দ্রষ্টব্য) এভাবে হিজরতের পর নিপীড়িত মুসলমানদের তার কাছে ফরিয়াদ’র এমন বাক্য শেখালেন, যার কারণে তাঁদের সাহায্যের ঐশী নির্দেশ করা হয়। (সুরা নিসা’র ৭৫তম আয়াত দ্রষ্টব্য)
শতাব্দী পরিক্রমায় এ উম্মতের জন্য মুজাদ্দিদ’র আবির্ভাব হওয়া আল্লাহরই সাহায্য। মাহে সফরের শেষ ভাগ দু’জন মহান মুজাদ্দিদের ওফাত সংঘটিত। উভয়জনের সফল জীবনাবসানের পবিত্র স্মৃতি তাঁদের মহান কীর্তিকে আমাদের অনুভূতিতে উজ্জ্বলতর করে তোলে। এঁদের একজন হলেন হিজরী একাদশ শতাব্দীর মহান মুজাদ্দিদ ইমামে রাব্বানী মুজাদ্দিদে আলফে সানী শাইখ আহমদ সরহিন্দী ফারুকী (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু)। অপরজন হলেন হিজরী চতুর্দশ শতাব্দীর মুজাদ্দিদের আ’লা হযরত, ইমামে ইশক্‌ ও মুহাব্বত, কলম সম্রাট ইমাম আহমদ রেযা খান বেরলভী (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু)। একজন মুসলমানের ইহ জীবনের সাফল্য ঈমান সহকারে মৃত্যুর ওপর নির্ভরশীল। ঈমান-আকীদার পরিশুদ্ধি ছাড়া মুক্তির চিন্তা অবান্তর। বিশুদ্ধ ঈমান-আকীদা রক্ষার সংগ্রামে অবতীর্ণ অকুতোভয় দু’ সিপাহ্‌সালার’র ওফাত বার্ষিকীতে তাঁদের শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করা কৃতজ্ঞতারই দাবি।
মাহে সফর’র ২৫ তারিখ (১৩৪০ হি.) হুযূর আ’লা হযরত ইমাম আহমদ রেযা (রহ.)’র ওফাত। আবার এ মাসেরই ২৮ তারিখ (১০৩৪হি.) মুজাদ্দিদে আলফে সানী শাইখ আহমদ সরহিন্দী ফারুকী (রহ.) ওফাত বরণ করেন। তাঁদের কীর্তিময় পূন্য জীবন আমাদের সামনে রেখে গেছেন সঠিক আকীদাভিত্তিক মুক্তির পথনির্দেশনা। সোনালী সাফল্যের অবগাহনে বিশাল কর্মযজ্ঞ শেষে মালেকে হাকীকী রাব্বে আ’লা দয়াময় প্রভু আল্লাহ্‌র সান্নিধ্যে গমনের তারিখ অনন্য এক স্মরণীয় দিন। আল্লাহ্‌ তাআলা ইরশাদ করেন, ‘ওয়া যাক্কিরহুম বিআয়্যা-মিল্লাহ্‌’-অর্থাৎ ‘তাদেরকে আল্লাহর দিনগুলোর কথা স্মরণ করিয়ে দেন’। আল্লাহ্‌ তাআলা এ আয়াতে বনী ইসরাঈলকে আল্লাহ্‌্‌র বিশেষ দিবসসমূহের কথা স্মরণ করিয়ে দেবার নির্দেশ দিয়েছেন। সবদিনের স্রষ্টা ও মালিক আল্লাহ তাআলা। এখানে আল্লাহর দিবস বলতে কোন দিনকে বুঝানো হয়েছে, সে ব্যাপারে তাফসীরকারকগণ বিভিন্ন ব্যাখ্যা দিয়েছেন। তবে সব আলোচনার সার কথা যে বিশেষ দিনগুলোতে আল্লাহ তাআলা তাঁর অবাধ্য জনগোষ্ঠীর প্রতি ক্রোধের আযাব দিয়েছেন। আর প্রিয়ভাজনদের প্রতি কোন বিশেষ নেয়ামত দান করেছেন, সেগুলোই ‘আইয়ামুল্লাহ’ আল্লাহ্‌র বিশেষ দিবসসমূহ। মুজাদ্দিদে আলফে সানী ‘দ্বীনে ইলাহী’ নামের তাওহীদের পরিপন্থি খোদাদ্রোহী তৎপরতার অবসান ঘটিয়ে শানে উলুহিয়্যত তথা তাওহীদের মর্যাদা পুনঃ প্রতিষ্ঠা করেন। আবার তিন শতাব্দী পর আ’লা হযরত বিভিন্ন নামে গজিয়ে ওঠা বাতিল ফির্কার তৎপরতা নস্যাৎ করে শানে রেসালতে আক্রান্ত মর্যাদাকে পুনঃ প্রতিষ্ঠা দিয়ে সাহাবায়ে কেরাম থেকে চলে বিশুদ্ধ দর্শন আহলে সুন্নাত’র বিজয় ঝাণ্ডা উড়িয়েছেন। হক্বের সিপাহসালারদ্বয়ের বীরোচিত অন্তিম যাত্রার তারিখ নিঃসন্দেহে আল্লাহ্‌র বিশেষ নেয়ামত বখশিশেরই পুণ্য স্মৃতিবহ। তাঁদের রূহানী প্রেরণা আমাদেরকে সঠিক পথে প্রতিষ্ঠিত রাখবে-এ আশায় তাঁদের কিঞ্চিৎ হলেও স্মরণ প্রয়াস।
আ’লা হযরত ইমাম আহমদ রেযা (রহ.) মুসলিম মিল্লাতের কাছে এক অবিস্মরণীয় নাম। আরবীতে বহুল শ্রুত একটি বাণী আছে (যা পবিত্র হাদীসের বাণী-সমর্থিত বাক্য) তাতে বলা হয়েছে, ‘বিদ্বানের কালি শহীদের রক্তের চেয়ে পবিত্র’। সে দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে বলতে হয় বাতিল আকীদার মূলোৎপাটনে সিদ্ধহস্ত আ’লা হযরতের আপোষহীন সংগ্রামের প্রধান হাতিয়ার ছিল কলম। দুনিয়া তাঁকে স্মরণ করছে কলম সম্রাট অভিধায়। ১২৭২ হি. মোতাবেক ১৮৫৬ খ্রি. সনে ভারতের ইউপির বেরেলী শরীফে জন্ম নেয়া ক্ষণজন্মা এ মহাপুরুষের কলম যুদ্ধে অবতরণ মাত্র তের বছর দশ মাস পাঁচদিন বয়সে।
ভারতবর্ষে সাত শ’ বছরে মুসলিম শাসন বিলুপ্ত করে ইংরেজ আগ্রাসন প্রতিষ্ঠা ও বিস্তারকল্পে মর্দে মুজাহিদ মুসলিম মিল্লাতের মধ্যে ফাটল ধরাতে ইংরেজরা ইসমাঈল দেহলভী নামক এক জ্ঞানপাপী মৌলভীকে ভাড়া করে। সে আরব আগ্রাসী মুহাম্মদ বিন আব্দুল ওহাব নজদীর ‘আত্‌্‌তাওহীদ কিতাবের শানে রেসালতে কুঠারাঘাত করা ঈমান বিধ্বংসী আকীদাসমূহের উর্দুরূপ’ তাকভিয়াতুল ঈমান’ ভারতে প্রচারণা শুরু করে। অপরদিকে এ অপকর্মের দোসর কাসেম নানুতভীকে দিয়ে দেওবন্দ মাদরাসা প্রতিষ্ঠা করে এদেশে নবীদ্রোহী ওহাবী আকীদা প্রচারের কাজ প্রাতিষ্ঠানিকভাবে অগ্রসর করে। কখনো এ দেশ থেকে সুন্নী আকীদার সরলপ্রাণ মুসলমানদের হিজরত’র নামে বিতাড়নের জন্য ভারতকে দারুল হারব ঘোষণা দেয়। কখনো কট্টরপন্থী হিন্দুদের ব্রিটিশবিরোধী তৎপরতার নামে সঙ্গে রাখতে গরু যবাই বিরোধী ফতোয়া জারি করে। আবার কখনো মুসলিম মিল্লাতের চিরায়ত সুন্নী আকীদায় চিড় ধরাতে প্রিয়নবীর মানহানিকর বক্তব্য লিখে কিতাব ছাপায়। এ পরিস্থিতিতে প্রমাদ গোনে সাধারণ মুসলমানরা। আর তখনই বীরদর্পে ‘মসির অসি’ নিয়ে আবির্ভূত হন আ’লা হযরত আল্লামা আখতার আহমদ কাদেরী লিখেন, ‘আ’লা হযরত (রহ.) যে সব বিষয়ে দেড় সহস্রাধিক কিতাব লিখেন তার সংখ্যাও ৭১ এর ওপরে। (সুন্নী দুনিয়া, আগস্ট সংখ্যা ৯২ ইংরেজি বেবেলী)
ওই সময় ইংরেজদের নেপথ্য কর্মী দেওবন্দী ওহাবী মৌলভীরা শানে রেসালতে মানহানিকর মন্তব্য করে হেফযুল ঈমান, তাহযীরুন্নাস, প্রভৃতি কিতাব ছাপিয়ে নবীর শানে অবমাননার দুঃসাহস দেখায়। আ’লা হযরত একদিকে এসবের খণ্ডনে অকাট্য দলীল প্রমাণসহ মুসলিম মিল্লাতের ঈমান রক্ষার সহায়ক গ্রন্থাদি প্রণয়ন করে যান। যুগপৎ কানযুল ঈমান, ফাতাওয়া রিজভিয়া সহ বিশুদ্ধ আকীদার প্রামাণ্য দলীলাদি উপস্থাপন করেন। সাথে দ্বিজাতি তত্ত্বের ভিত্তিতে সঠিক, রাজনৈতিক দিক নির্দেশনাসহ অর্থনৈতিক ও সামাজিক প্রভূত সংস্কারে বলিষ্ঠ নেতৃত্ব দেন। তাঁরই দর্শনে উদ্বুদ্ধ ড. ইকবালসহ শীর্ষস্থানীয় মুসলিম নেতৃবৃন্দের আন্দোলনে মুসলমানদের পৃথক স্বাধীন রাষ্ট্র কায়েম হয়। আ’লা হযরতের আধ্যাত্মিক সাধনায় আসে এমন ব্যাপক সংস্কার।
এ কথা নিঃসন্দেহ যে, মুসলিম মিল্লাতের সুরক্ষা ও রাজশক্তির মোকাবিলাসহ সমাজের গভীরে প্রোথিত খোদাদ্রোহী তাগুতি শক্তির ছত্রছায়ায় পালিত কুসংস্কারের মূলোৎপাটনে ব্যাপক সংস্কারের কাজ এত সহজ নয়। এজন্য আল্লাহর সাহায্য নিয়ে আসা ধস নামানো কোন আধ্যাত্মিক শক্তির প্রয়োজন অপরিহার্য। হিজরী দ্বিতীয় সহস্রাব্দের প্রারম্ভে মুসলমানদের এক দারুণ বিপর্যয় ও ক্রান্তিকালে খোদায়ী সাহায্য হয়ে আবির্ভূত হন মহান আধ্যাত্মিক ব্যক্তিত্ব মুজাদ্দিদে আলফে সানী হযরত শাইখ আহমদ সরহিন্দী ফারুকী (রহ.)। মহামতি(?) আকবর মোঘল সম্রাটের দোর্দণ্ড প্রতাপ নিয়ে সাম্রাজ্যের বিস্তৃতি ও নিরঙ্কুশ ক্ষমতার লোভে ‘দ্বীনে ইলাহী’ নামক এক তাগুতী দ্বীনের প্রচার করেন। যা আল্লাহর ‘তাওহীদ’র সাথে ভয়ঙ্কররূপে সাংঘর্ষিক। এতদঞ্চলের নিরীহ মুসলিম জনগণের শাশ্বত বিশ্বাসের মর্মমূলে এটি এক সর্বনাশা প্রলয় রূপে দেখা দেয়। সেই কঠিন মুহূর্তে তাওহীদ’র পবিত্রতা প্রতিষ্ঠিত করবার গুরুদায়িত্ব নিয়ে ১৫৬৪ খ্রি. মোতাবেক ৯৭১ হিজরীর ১৪ শওয়াল শুভ জন্ম হয় এই মহাপুরুষের।
সম্রাট আকবর প্রথমদিকে একজন দীনদার সুন্নী মুসলমান ছিলেন। কিন্তু পরে সমসাময়িক আলেমদের হিংসা, বিদ্বেষ, পারস্পরিক কাদা ছোঁড়াছুঁড়ি, শাহী হেরমে অমুসলিম রাজপুত বিবিদের প্রভাব, রাজকীয় প্রতাপসহ বিভিন্ন কারণে ধর্মীয় অবস্থান থেকে স্খলিত হয়ে পড়েন। ধর্মের প্রতি বীতশ্রদ্ধ হওয়ার এক পর্যায়ে নিজেই দ্বীনে ইলাহী নামের ফেরআউনী প্রকৃতির এক ধর্মাচারের প্রবর্তন করেন। এতে সত্যিকার দীনদার মুসলমানরা ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন। এর বিরুদ্ধে খোদা প্রদত্ত শক্তি নিয়ে মুজাদ্দিদে আলফে সানী সোচ্চার হন। মুসলমানরা তাঁর আওয়াজে অনুপ্রাণিত হন। সম্রাট আকবরের দ্বীনে ইলাহীর সহায়তা করে বড় বড় জ্ঞানপাপী আলেমও যুক্ত হন। যেমন মোল্লা মোবারক নাগোরী, শায়খ তাজুদ্দীন প্রমুখ। তারা কুরআন হাদীসের বিকৃত ব্যাখ্যা দিয়ে এ নতুন ধর্মের সহায়তা দেন। আবুল ফযল ও ফয়েযী এ ধর্মের প্রাথমিক আহাদ নামা প্রণয়ন করেন। হজ্বের অপরিহার্যতা চ্যালেঞ্জ করে মোল্লা আব্দুল্লাহ সুলতানপুরী ফতওয়া দেন। দ্বীনে ইলাহীর তাওহীদ পরিপন্থী মৌলিক নীতিমালা যা মোল্লা আবু সাঈদ জারী করেন তা হল, বাদশাহর জন্য সিজদার প্রথা, দাঁড়ি না রাখা, কলেমার সাথে ‘আকবার খলীফাতুল্লাহ’ সংযোজন, সুদ প্রথা হালাল, আরবী পড়া নিষিদ্ধ, জিযিয়া মওকুফ, আগুন, পানি ও গাছবৃক্ষের পূজা বৈধ, গরু, মহিষ ও উট যবাই নিষিদ্ধ’। মদ-শরাব হালাল, মসজিদ ভেঙে মন্দির করার বৈধতা, রোযা ও হজ্বে নিষেধাজ্ঞা, শুকরের মাংস হালাল ইত্যাদি। জেল-জুলুম সহ্য করে এসবের বিরুদ্ধে আন্দোলন অব্যাহত রেখে মহান আধ্যাত্মিক ক্ষমতার বলে অবশেষে মুজাদ্দিদে আলফে সানীর বিজয় হয়। তাই হৃদয় খুলে শ্রদ্ধা জানাই দু’ মহান মুজাদ্দিদের প্রতি।

লেখক : আরবী প্রভাষক, জামেয়া আহমদিয়া সুন্নিয়া আলীয়া মাদ্রাসা। খতিব : হযরত খাজা গরীব উল্লাহ শাহ (র.) মাজার জামে মসজিদ।