দুই নম্বর গেইট থেকে প্রর্বত্তক মোড় বেপরোয়া ছিনতাইচক্র নির্বিকার পুলিশ

!নিজস্ব প্রতিবেদক

কখনও খবর মেলে, দুর্বৃত্তরা ‘সালাম’ দিয়ে সর্বস্ব লুটে নিয়েছে রিকশা আরোহীর। কখনও পথচারীর গতিরোধ করে মোবাইল, টাকা-পয়সা ছিনতাই করেছে। এও শোনা যায়-অস্ত্রসহ অপরাধীদের গ্রেফতার করেছে পুলিশ। এসব ক্ষেত্রে ঘটনাস’ল একই। নগরের দুইনম্বর গেইট থেকে প্রবর্তক মোড় পর্যন্ত। অপরাধীদের দৌরাত্ম্য আছে পাশের পাঁচলাইশ থানা থেকে প্রবর্তক মোড়, নাসিরাবাদ হাউজিং সোসাইটি এলাকায়ও।
ভুক্তভোগীদের ক্ষোভ, এলাকায় একের পর এক ছিনতাই, চাঁদাবাজি, ইভ টিজিংয়ের ঘটনা ঘটলেও পুলিশ নির্বিকার। গত ৭ ফেব্রুয়ারি সকাল আটটার ঘটনা। একটি আঞ্চলিক দৈনিকে কর্মরত প্রশাসনিক কর্মকর্তা রিকশায় চড়ে দুইনম্বর গেইট থেকে যাচ্ছিলেন মিমি সুপার মার্কেটের দিকে। রিকশাটি নাসিরাবাদ হাউজিং সোসাইটির ২ ও ৩ নম্বর উপসড়কের মাঝামাঝি পৌঁছলে ওই কর্মকর্তাকে অচেনা দুই ‘যুবক’ সালাম দেন। রিকশার আশপাশে ছিল আরও দুই যুবক। রিকশা ঘিরে ধরা দুই যুবক বলেন-‘আমাদের চিনছেন। আমরা মামুনের ছোটভাই। হাসপাতালে একজন রোগী আছে। অপারেশন করতে হবে। দুই হাজার টাকা দেন।’ ওই কর্মকর্তা অপরাগতা প্রকাশ করলে দুই যুবক বলেন, ‘৫০০ টাকা দেন। না থাকলে ২০০ টাকা হলেও দেন।’ এরপর ওই কর্মকর্তা পকেট থেকে মানিব্যাগ বের করলে টান মেরে নিয়ে নেন তারা। মানিব্যাগে ছিল পাঁচ হাজার টাকা। সেখান থেকে চার হাজার ৮০০ নিয়ে ওই কর্মকর্তাকে মানিব্যাগটি ফেরত দেন তারা।
এবার ওই কর্মকর্তার প্যান্টের পকেটে থাকা মোবাইল ফোন সেট চেয়ে বসে তারা। দিতে অস্বীকার করলে দু্ই যুবক বলেন, ‘মোবাইল না দিলে গুলি করব।’ ক্ষুব্ধ হয়ে ওই কর্মকর্তা বলেন, ‘গুলি করলে গুলি কর। মোবাইল দেব না।’ এরপর দ্রুত সটকে পড়ে দুই ছিনতাইকারী। ছিনতাইয়ের শিকার ওই কর্মকর্তা ঘটনার দিন বিষয়টি নগর পুলিশের উপকমিশনার (উত্তর) আবদুল ওয়ারিশকে অবহিত করেন। পরে পাঁচলাইশ থানার ওসি মহিউদ্দিন মাহমুদকেও মৌখিক অভিযোগ দেন। এর আগে ১২ ডিসেম্বর দুপুরে সিএমপির উপকমিশনার (উত্তর) কার্যালয়ের ছিনতাইয়ের শিকার হন একজন চিকিৎসক।
সেদিন দুই-তিনজন ছিনতাইকারী অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে ওই চিকিৎসকের নগদ দশ হাজার টাকা, দুটি দামি মোবাইল ফোন সেট ছিনিয়ে নেয় তারা। এ ঘটনায় ভুক্তভোগী চিকিৎসক পাঁচলাইশ থানায় একটি জিডিও করেছেন। আজ পর্যন্ত ঘটনায় জড়িতরা চিহ্নিতও হয়নি। গ্রেফতারও করতে পারেনি পুলিশ। ওসি মহিউদ্দিন মাহমুদ বললেন, জড়িতদের গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে।
নাসিরাবাদ হাউজিং সোসাইটির ৫ নম্বর রোডের ১২ থেকে ১৬ নম্বর বাড়ির সামনেও বিভিন্ন শ্রেণির অপরাধীরা ঘোরাফেরা করে। সরকারি দলের লোক পরিচয় দিয়ে তারা দিনরাত সেখানে আড্ডা দেন। এ সোসাইটিতে আছে নগর পুলিশ কমিশনারসহ বেশ কিছু ভিআইপি’র বাসভবন। আছে স্কুলও। অভিযোগ, ছাত্রীরা আসা-যাওয়ার সময় আড্ডারত যুবকেরা ইভটিজিং করে। তাদের প্রতিবাদ করার সাহস পায় না কেউ। কিছুদিন আগে চাঁদা না দেওয়ায় এক ব্যক্তির বাসার সামনে ককটেল বিস্ফোরণও ঘটান ওই যুবকেরা। সন্ধ্যা নামলে আড্ডারত যুবকেরা ছিনতাইয়ে নেমে পড়ে।
সম্প্রতি বিষয়টি পাঁচলাইশ থানার ওসিকে অবহিত করলে তিনি পুলিশের একটি টিম ঘটনাস’লে পাঠান। ঘটনাস’লে গেলেও যুবকদের দেখে কোনো অ্যাকশনে যায়নি পুলিশ। সুপ্রভাতকে এসব তথ্য দিয়েছেন ৫ নম্বর রোডের এক বাসিন্দা। মিমি সুপার মার্কেট, নাসিরাবাদ হাউজিং সোসাইটির বিভিন্ন উপসড়কের মুখে অপরাধীরা একের পরে এক অপরাধ সংঘটিত করে চলেছে অভিযোগ এলাকাবাসীর।
আমির হোসেন নামে পাঁচলাইশ এলাকার এক বাসিন্দার অভিযোগ, আসলে পুলিশের নজরদারিতে গাফিলতির সুযোগেই এমনটা ঘটে চলেছে। এ কারণে জননিরাপত্তা পরিসি’তি নিয়েও সমস্যা তৈরি হচ্ছে। যদিও নজরদারিতে গাফিলতির বিষয়টি মানছে না পুলিশ। নগর পুলিশ কর্তাদের দাবি, ওই এলাকায় ২৪ ঘণ্টা ধরে নজরদারি চলে। প্রায় এলাকায় সিসিটিভি ক্যামেরাও রয়েছে। নিয়মিত অভিযানও চালানো হয়।
এদিকে পাঁচলাইশ থানার আলোচ্য এলাকার অপরাধী সম্পর্কে সুপ্রভাতকে চাঞ্চল্যকর তথ্য দিয়েছেন সিএমপির এক কর্মকর্তা। তিনি জানান, আবুল হাসেম ওরফে হোসেন নামে এক ছিনতাইকারী ও তার কয়েকজন সহযোগী গত ৬ ফেব্রুয়ারি পূর্ব নাসিরাবাদ এলাকা থেকে মেসার্স সাহাব উদ্দিন অ্যান্ড সন্সের নামে একটি কোম্পানির তিন লাখ টাকা ছিনতাই করে পালানোর সময় এক সহযোগীসহ জনতার হাতে ধরা পড়েন হাসেম। এসময় তাকে গণপিটুনি দিয়ে পুলিশের হাতে তুলে দেয় জনতা।
৮ বছর ধরে পেশাদার ছিনতাইকারী এই হাসেম। তার গ্রামের বাড়ি নোয়াখালীর হাতিয়ায়। পরিবার নিয়ে থাকেন নগরের বায়েজিদ এলাকায়। তার দুই স্ত্রী, তিন মেয়ে ও দুই ছেলে রয়েছে। যাত্রীবেশে সহযোগীসহ অটোরিকশা নিয়ে শহরে ঘোরেন তিনি। বিশেষ করে ব্যাংকের সামনে ঘোরাঘুরি করেন বেশি। তার দলে আছে চার-পাঁচজন। অস্ত্রের মুখে পথচারী বা রিকশাযাত্রী থেকে কেড়ে নেন সর্বস্ব।
পাঁচলাইশ থানার ওসি মহিউদ্দিন মাহমুদ জানান, হাসেমের বিরুদ্ধে পাঁচলাইশ, ডবলমুরিং, বায়েজিদ বোস্তামি থানায় ১৬টি মামলা আছে। বিভিন্ন অপরাধে গ্রেফতার হয়ে এ যাবত ৯-১০ বার কারাগারেও গেছেন হাসেম। প্রতিবারই জামিনে মুক্ত হয়ে ফের জড়িয়ে পড়েন ছিনতাইয়ে। আবুল হাসেম গত বছরের এপ্রিল মাসেও কারাবন্দি হন। ছয় মাস পর সেপ্টেম্বরে জামিনে বেরিয়ে আসেন। পূর্ব নাসিরাবাদ, নাসিরবাদ হাউজিং, মিমি সুপার মার্কেট ও প্রবর্তক মোড় এলাকায় দুর্ধর্ষ ছিনতাইকারী হাসেম এবং তার দলের লোক ‘আত্মগোপনে‘ থাকে বলে জানিয়েছেন স’ানীয়রা।