দীর্ঘ প্রতীক্ষায় খুললো আমিরাতের শ্রমবাজার

জয়নাল আবেদীন, ঢাকা
2

পাঁচ বছর আট মাস আগে হঠাৎ করেই নিরাপত্তার অজুহাত দেখিয়ে বাংলাদেশি শ্রমিকদের জন্য বন্ধ করে দেয়া হয়েছিলো সংযুক্ত আরব আমিরাতের (ইউএই) দুয়ার। এরপর লাখ লাখ শ্রমিক পড়ে যান বিপাকে। দীর্ঘ আলোচনার পথ পেরিয়ে সাফল্য এলো অবশেষে। খুলে গেলো আমিরাতে বাংলাদেশি শ্রমিকদের শ্রমবাজার।
বাংলাদেশ থেকে ১৯টি ক্যাটাগরিতে কর্মী নিয়োগের বিষয়ে গতকাল বুধবার একটি সমঝোতা স্মারকে সই করেছে দুই দেশ। সই হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই এটি কার্যকর হয়েছে বলে জানা গেছে। গতকাল স’ানীয় সময় দুপুর সোয়া ১২টার দিকে দুবাইস’ সংযুক্ত আরব আমিরাতের মিনিস্ট্রি অব হিউম্যান রিসোর্সেস এন্ড এমিরেটাইজেশন-এর দপ্তরে সমঝোতা স্মারকটি সই হয়।
সংযুক্ত আরব আমিরাতের বন্ধ ভিসা চালু করতে সরকারের তৎপরতা ছিলো। এরই অংশ হিসেবে গত বছরের মে মাসে সে দেশে সফরে যান প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস’ান মন্ত্রী নুরুল ইসলাম বিএসসি। ওই সময় আমিরাতের মানবসম্পদ ও উন্নয়ন বিষয়কমন্ত্রী সাকর গোবাশ সাঈদ গোবাশের সঙ্গে বৈঠক করেন।
এরপর মাস দেড়েক আগে ঢাকায় একটি বৈঠকে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী
শাহরিয়ার আলম এ বিষয়ে আশার বাণী শুনিয়েছিলেন। শ্রমবাজার খোলার অগ্রগতির তথ্য জানিয়ে আরব আমিরাতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বাংলাদেশকে চিঠি দিয়েছেন জানিয়ে শাহরিয়ার বলেছিলেন, ইউএই কর্তৃপক্ষ তাদের শ্রমবাজার বাংলাদেশিদের জন্য ধাপে ধাপে উন্মুক্ত করবে।
জানা গেছে, দীর্ঘদিন ধরে এ বিষয়ে দুই দেশের মধ্যে আলোচনা চলছিলো। কয়েক দফায় বৈঠকও অনুষ্ঠিত হয়। চূড়ান্ত আলোচনা শেষে উভয় দেশের আগ্রহ ও সম্মতির ভিত্তিতে সমঝোতা স্মারক সই হয়। বাংলাদেশের পক্ষে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস’ান মন্ত্রণালয়ের সচিব ড. নমিতা হালদার এনডিসি এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের মিনিস্ট্রি অব হিউম্যান রিসোর্সেস এন্ড এমিরেটাইজেশন-এর আন্ডার সেক্রেটারি সাইফ আহমেদ আল সুআইদি স্ব স্ব দেশের পক্ষে সমঝোতা স্মারকটি স্বাক্ষর করেন। সমঝোতা স্মারকটি স্বাক্ষরের সাথে সাথেই তা কার্যকর হয়েছে।
এ সময় সংযুক্ত আরব আমিরাতের মিনিস্ট্রি অব হিউম্যান রিসোর্সেস এন্ড এমিরেটাইজেশন-এর দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী নাসের আল হামলি, সংযুক্ত আরব আমিরাতে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত মোহাম্মদ ইমরান, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব মোহাম্মদ আজহারুল হক, প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস’ান মন্ত্রণালয়ের যুগ্মসচিব মো. সুজায়েত উল্ল্যা, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মহাপরিচালক তারেক আহমেদ এবং স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও দুবাই-এ নিযুক্ত কনসাল জেনারেল এস. বদিরুজ্জামান উপসি’ত ছিলেন।
প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস’ান মন্ত্রণালয়ের তথ্য ও জনসংযোগ কর্মকর্তা মো. জাহাঙ্গীর আলম জানান, সমঝোতা স্মারকটিতে বাংলাদেশ থেকে ১৯টি ক্যাটাগরির কর্মী নিয়োগের বিধান, পদ্ধতি, রিক্রুটমেন্ট এজেন্সি ও উভয় দেশের সরকারের দায়িত্ব ও কর্তব্য, কর্মীদের অধিকার, সুযোগ সবিধা, এমপ্লয়ারদের দায়িত্ব ও কর্তব্য, নিয়োগ চুক্তির বিধান ও পৃথক একটি বিরোধ নিষ্পত্তির ব্যবস’া ইত্যাদি উল্লেখ রয়েছে। সংযুক্ত আরব আমিরাতে এ সকল কর্মীগণের স্বার্থ রক্ষার্থে ২০১৭ সালে কার্যকর হওয়া আইনের আলোকে সমঝোতা স্মারকটিতে শ্রমিক, মালিক ও উভয় দেশের সরকারের দায়িত্ব বর্ণিত হয়েছে। নিরাপদ, সুশৃংখল ও দায়িত্বশীল শ্রম অভিবাসনের লক্ষ্য অর্জনের বিষয়সমূহ বিবেচনায় রেখে সমঝোতা স্মারকটি স্বাক্ষর করা হয়।
সমঝোতা স্মারকটি বাস্তবায়নের জন্য উভয় দেশের কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে একটি জয়েন্ট কমিটি গঠনের বিধান রাখা হয়েছে। এ কমিটিকে কতিপয় সুনির্দিষ্ট দায়িত্ব প্রদান করা হয়েছে। এ সমঝোতা স্মারকের মাধ্যমে সংযুক্ত আরব আমিরাতে বাংলাদেশি কর্মী প্রেরণ প্রক্রিয়া পুনরায় শুরু হবে।
মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের অন্যতম শ্রমবাজার ছিলো সংযুক্ত আরব আমিরাত। কিন’ ২০১২ সালে ১২ আগস্ট নিরাপত্তার অজুহাত দেখিয়ে বাংলাদেশি কর্মীদের ভিসা দেয়া বন্ধ করে দেয় দেশটি। পরে ২০১৩ সালে ওয়ার্ল্ড এক্সপো-২০২০ নির্বাচনের সময় বাংলাদেশ দুবাইকে প্রথম দফায় ভোট না দেয়ার আরো জটিল হয়ে পড়ে আমিরাতের ভিসা। এরপর প্রায় সাড়ে চার বছরেরও বেশি সময় কেটে গেলেও নতুন করে শ্রমিক নেয়ার কোনো উদ্যোগ দেখা যায়নি।
দীর্ঘদিন দেশটির সঙ্গে উচ্চপর্যায়ের দ্বিপাক্ষিক কোনো সফরও হয়নি। দুই বছর আগে বর্তমান প্রবাসী কল্যাণমন্ত্রী নুরুল ইসলাম বিএসসি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বভার গ্রহণ করে আরব আমিরাত সফর করে এ বিষয়ে উদ্যোগ নেন। ২০১২ সালে সাময়িক ঘোষণায় আমিরাতের শ্রমবাজার বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর বাংলাদেশিরা নতুন ভিসা ইস্যু ও অভ্যন্তরীণ ট্রান্সফার সুবিধা থেকে বঞ্চিত হন। পাসপোর্ট খোয়া যাওয়া, রোহিঙ্গা ইস্যু আর সেখানে কিছু বাংলাদেশির বিরুদ্ধে অনৈতিক কর্মকাণ্ডের অভিযোগ ওঠায় এ সিদ্ধান্ত নেয় দেশটি।