প্যারেড কর্নার-চট্টেশ্বরী রোড

দিনভর জমজমাট আড্ডা বখাটেরা বেপরোয়া

ছিনতাই-ইভ টিজিং নিত্যদিনের ঘটনা

নিজস্ব প্রতিবেদক

চকবাজার প্যারেড কর্নার থেকে চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ ছাত্রাবাস ও চট্টেশ্বরীর দূরত্ব প্রায় এক কিলোমিটার। এই এক কিলোমিটার এলাকাটি এখন উঠতি বয়সী ছেলেদের জমজমাট আড্ডার কেন্দ্রস’লে পরিণত হয়েছে। বিশেষ করে বিকেল থেকে বাড়তে থাকে আড্ডার পরিধি। আড্ডাকে ঘিরে সক্রিয় একাধিক গ্রুপ। মাঝে মধ্যে গ্রুপের আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে ঘটছে সংঘর্ষ। আড্ডার কারণে এসব এলাকায় স্কুল, কলেজ ও বিভিন্ন মার্কেটে আসা নারীরা প্রতিনিয়ত শিকার হচ্ছেন ইভটিজিংয়ের। এছাড়া ছিনতাইসহ নানান অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনাও ঘটছে প্রায় প্রতিদিন। অথচ চকবাজার থানা এই দুই এলাকা থেকে বেশি দূরে নয়।

গত ২০ জুন সিএমপি সদর দপ্তরে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ক্রাইম ও অপারেশন) আমেনা বেগম জানান সন্ধ্যার পর কিশোর বা শিক্ষার্থীকে বাইরে আড্ডা দিতে দেখলে গ্রেফতার করা হবে। কিন’ এখানে সে ঘোষণা ও আইনের কোনো প্রয়োগ নেই বলে জানিয়েছেন এলাকার সংশ্লিষ্টরা। ফলে এলাকাটি এখন বখাটেদের অভয়ারণ্যে পরিণত হয়েছে। এছাড়া ফুটপাত থেকে শুরু করে এলাকার বিভিন্ন দোকান ও রেস্টুরেন্ট থেকে একাধিক গ্রুপের চাঁদা আদায় এখন নিত্যদিনের ঘটনা ।

সম্প্রতি গুলজার মোড়ের চক মালঞ্চের সামনে আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে দু’পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। এরপর থেকে উভয়পক্ষ মিছিল সহকারে শোডাউন দিচ্ছে প্রতিদিন। এতে আতঙ্ক দেখা দিয়েছে আশপাশের ব্যবসায়ী ও বাসিন্দাদের মাঝে।

জয়নগর ১ নম্বর গলির বাসিন্দা নাসরিন কাওছার জানান, ২-৩ দিন আগে এখানে ধর ধর বলে একজনকে দৌঁড়াচ্ছে কয়েকজন। সবার কাঁধে দেখা গেছে স্কুল ব্যাগ। মনে হয় সবাই স্কুল-কলেজের ছাত্র। প্রায় সময়ই এখানে এরকম ঘটনা ঘটছে। কিন’ এলাকায় আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর তেমন কোনো তৎপরতা নেই। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক চকবাজার মতি কমপ্লেক্সের এক ব্যবসায়ী নেতা বলেন, ‘আমরা সবসময় এলাকায় আতঙ্কে থাকি। কারণ কখন কি হয় বোঝা মুশকিল। এখানে মোড়ে মোড়ে, মার্কেটের সামনে উঠতি বয়সের ছেলেদের আড্ডা। তাদের কেউ কিছু বলতে পারে না। বললেই উল্টো বিপদের সম্মুখীন হতে হয়।’

গত সপ্তাহে বাদুরতলা আরাকান সোসাইটি এলাকায় আরিফ নামে একজনকে কুপিয়ে গুরুতর আহত করেছে দুর্বৃত্তরা। এ ঘটনার ভিডিও ফুটেজটিও ভাইরাল হয়েছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে।
সরেজমিন দেখা গেছে, চকবাজার প্যারেড মাঠ সংলগ্ন রসিক হাজারী লেইন ও গুলজার মোড় থেকে চট্টেশ্বরী হয়ে চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হোস্টেল সড়কে উঠতি বয়সের স্কুল ও কলেজ ছেলেদের আড্ডা খুব বেশি। তাই এসব জায়গায় প্রতিনিয়তই ঘটে নানারকম অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা। আর এসব ঘটনার মূলে রয়েছে নিজেদের গ্রুপের আধিপত্য বিস্তার। আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করেই গ্রুপগুলো সংঘর্ষে জড়ায়। তবে এসব ঘটনায় থানায় কোনো পক্ষই অভিযোগ ও মামলা করে না। ফলে থানা-পুলিশও এ অজুহাতে এড়িয়ে যান বিষয়গুলো। এ সুযোগে গ্রুপগুলো দিন দিন আরো বেপরোয়া হয়ে উঠছে।

সরেজমিন দেখা গেছে কেয়ারি ইলিশিয়াম শপিং মল এর পাশ দিয়ে রসিক হাজারী লেইন যেতেই চোখে পড়ে রাস্তা দখল করে বসা ছোট-বড় বেশ কয়েকটি ফুডভ্যান। এই ভ্যানগুলোকে কেন্দ্র করে রাস্তা ও ফুটপাত দখল করে বিকাল থেকে রাত পর্যন্ত চলে বিভিন্ন বয়সী ছেলেদের আড্ডা। ফলে গাড়ি ও পথচারী চলাচলে যেমন দুর্ভোগ পোহাতে হয় তেমনি কোচিং ও মার্কেটে আসা নারীদের শিকার হতে হয় ইভটিজিংয়ের। তবে তাদের ভয়ে কেউ থানায় গিয়ে অভিযোগ করার সাহস করে না।

এলাকার স’ানীয় বাসিন্দারা জানান, ফুডভ্যানগুলোর কারণে চলাচলে যেমন দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে তেমনি সাধারণ শিক্ষার্থীরাসহ এলাকার মানুষরা এখন নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে।
গুলজার মোড় থেকে চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ ছাত্রাবাস পর্যন্ত প্রতিদিন বিকাল থেকে রাত পর্যন্ত আড্ডা চলে বিভিন্ন এলাকা থেকে আসা কিশোর-যুবকদের। স’ানীয় ছেলেদের সাথে বহিরাগত ছেলেরাও এসে যোগ দেয় এখানে। বিশেষ করে বিকালের পর থেকে বাড়তে থাকে আড্ডার পরিধি। এই রাস্তাটি দখল করেও আশপাশে রয়েছে কিছু ফুড ভ্যান। এসব থেকে চলে নিয়মিত চাঁদা আদায়।

চকবাজার এলাকায় রয়েছে ঐতিহ্যবাহী চট্টগ্রাম কলেজ, মহসিন কলেজ, চট্টগ্রাম সরকারি স্কুল, হাজী মুহম্মদ মহসিন স্কুলসহ ডজনখানেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। এছাড়া রয়েছে প্রায় শতাধিক কোচিং সেন্টার। এসব কলেজ ও কোচিং সেন্টারে প্রতিদিনই হাজার হাজার ছাত্রছাত্রী পড়তে আসে। এছাড়া কলেজপড়-য়া অনেক শিক্ষার্থীর যাতায়াত এই এলাকা দিয়ে। কিন’ বখাটেদের ছিনতাইয়ের শিকার হচ্ছে সাধারণ শিক্ষার্থীরা। তবে ঝামেলার ভয়ে কেউ থানায় গিয়ে অভিযোগ জানাতে চান না।

ঝামেলার বিষয়ে অভিযোগ না দেওয়া প্রসঙ্গে ভুক্তভোগী জিতু চৌধুরী (ছদ্মনাম) বলেন, ‘আমি মাসখানেক আগে সন্ধ্যায় কোচিং এ পড়ে বাসায় ফেরার সময় মেডিক্যাল হোস্টেল গেইটের সামনে আসতেই আমার ব্যবহৃত মোবাইল ফোনটি কথা বলবে বলে একজন নিয়ে যায়। পরে চাইতে গেলে আরো কয়েকজন এসে আমাকে মারধর করে। জীবনের কথা চিন্তা ও ঝামেলার ভয়ে আর থানায় যায়নি।’

এসব বিষয়ে চকবাজার থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) আবুল কালাম বলেন, চকবাজার এলাকায় স্কুল, কলেজসহ অনেকগুলো কোচিং সেন্টার রয়েছে। এখানে রাত ৮টা পর্যন্ত চলে কোচিং ক্লাস। সবমিলিয়ে এখানে শিক্ষার্থীদের আনাগোনা খুব বেশি। তবে আপনার (প্রতিবেদকের) কাছ থেকে আমি যে কথাগুলো শুনলাম সেসব বিষয় আমি সিরিয়াসভাবে দেখব এবং ফুডভ্যানগুলোকে তুলে দেওয়ার ব্যবস’া নেব। আর যারা বিভিন্ন ঘটনার ভুক্তভোগী তারা কেউ আমাদের কাছে আসে না। সেজন্য আমরা আইডেন্টিফাই করে ব্যবস’া নিতে পারি না।’