তেজস্ক্রিয় বর্জ্যের যত ভয় দক্ষ জনবলে কাটবে সংশয়

মো. আবুল হাসান, খন রঞ্জন রায়

রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের মূল পর্বের কাজ বাস্তবায়নে প্রকল্প সহায়তা হিসেবে রাশিয়া ৪ শতাংশ হার সুদে ৯১ হাজার ৪০ কোটি টাকা বা ১১ দশমিক ৩৮ বিলিয়ন ডলার ঋণ দিচ্ছে। ১০ বছরের রেয়াতকালসহ ২০ বছর মেয়াদে এ ঋণ পরিশোধ করতে হবে। সরকারের নিজস্ব তহবিল থেকে জোগান দেওয়া হবে বাকি ২২ হাজার কোটি টাকা। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে গৃহীত প্রস্তাবিত এ প্রকল্পটি বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশন বাস্তবায়ন করবে। প্রকল্পটি আগামী ২০২৫ সালের মধ্যে শেষ করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। রাশিয়ার অর্থ মন্ত্রণালয় এবং বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের মধ্যে একটি ‘স্টেট এক্সপোর্ট ক্রেডিট’ চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে।
এদিকে ‘রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের মূল পর্যায়’ শীর্ষক প্রকল্পের অনুমোদন দিয়েছে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক)। দেশের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় এ প্রকল্প ব্যয় ধরা হয়েছে ১ লাখ ১৩ হাজার কোটি টাকা। পরমাণু প্রকল্পের দীর্ঘমেয়াদি রূপকল্প হিসাবে কয়েক বছর আগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে নিউক্লিয়ার ইঞ্জিনিয়ারিং নামে একটি বিভাগ খোলা হয়েছে। বিভাগটি থেকে সম্মান ও মাস্টার্স দুটোই সম্পন্ন করার সুযোগ রয়েছে।
পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করা হয় ইউরেনিয়াম-২৩৫ । পারমাণবিক চুল্লিতে এই জ্বালানি শতভাগ ব্যবহৃত হয় না। যেটুকু অবশিষ্ট থাকে, সেটাকেই বলে তেজস্ক্রিয় জ্বালানি বর্জ্য। এটি উচ্চমাত্রায় তেজস্ক্রিয়তা ছড়ায়। তাই পারমাণবিক চুল্লি থেকে তেজস্ক্রিয় জ্বালানি বর্জ্য অপসারণ করার পর তা বিশেষ ব্যবস্থায় ৩০০ দিন সংরক্ষণ করতে হয়।
রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের তেজস্ক্রিয় জ্বালানি বর্জ্য (স্পেন্ট ফুয়েল) রাশিয়ার ফেরত নেওয়া অনিশ্চিত হয়ে পড়ায় বিষয়টিতে উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে।
কারণ, পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের তেজস্ক্রিয় জ্বালানি বর্জ্য খুবই বিপজ্জনক। এর সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনা একটি উচ্চমাত্রার বিশেষায়িত বিষয়। এটা করার সামর্থ্য বাংলাদেশের নেই। যদিও ২০১১ সালে রাশিয়া ও বাংলাদেশের মধ্যে সই হওয়া সমঝোতা স্মারকে (এমওইউ) তেজস্ক্রিয় জ্বালানি বর্জ্য ফেরত নেওয়ার বিষয়টি উল্লেখ ছিল। তবে গত বছরের ২৫ ডিসেম্বর সই হওয়া চূড়ান্ত চুক্তিতে (জেনারেল কন্ট্রাক্ট) বিষয়টি সেভাবে উল্লেখ করা হয়নি বলে নানারকম কথাবার্তা হচ্ছে।
তেজস্ক্রিয় জ্বালানি বর্জ্য অত্যন্ত সুরক্ষিত ব্যবস্থায় সরংক্ষণ করতে হয়। এ জন্য এমন একটি বিচ্ছিন্ন স্থান প্রয়োজন হয়, যেখানে কখনো কোনোভাবে পানি যাবে না। সাধারণত মাটির অনেক নিচে জলাধার তৈরি করে সেখানে শক্তিশালী কংক্রিট দিয়ে ঘিরে তেজস্ক্রিয় বর্জ্য সংরক্ষণ করতে হয়।
অনেক বছর ধরে তার ধারে কাছে কোনো মানুষের আনাগোনা চলে না। যদিও একসময় এই জ্বালানি পুনরায় ব্যবহার করা যায়, কিন্তু এর সংরক্ষণব্যবস্থা গড়ে তোলা আলাদা একটি বিশেষায়িত স্থাপনা নির্মাণ ও সংরক্ষণ করার ক্ষেত্রে যেমন ব্যয় আছে, তেমনি আছে ঝুঁকি।
আমাদের পরিকল্পনার চুল্লিটি কার্যকর হবে ২০২৩ সাল নাগাদ। এ মাপের একটি স্থাপনা চালাতে হলে দক্ষ জনশক্তি প্রয়োজন। চুক্তি মোতাবেক প্রথম দিকে রুশ বিশেষজ্ঞরা সহযোগিতা করবেন। পারমাণবিক বর্জ্য উচ্চমাত্রায় রেডিও-অ্যাক্টিভ। এ বর্জ্যের সুষ্ঠু রক্ষণাবেক্ষণ একটি উচ্চস্তরের প্রযুক্তিনির্ভর কাজ। বাংলাদেশ রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র পরিকল্পনা গ্রহণের সাথে সাথে মানবসৃষ্ট দুর্যোগ সড়ক, রেল, বিমান, নৌ, ভবন ধস দুর্ঘটনার সঙ্গে নতুন করে পারমাণবিক দুর্ঘটনাভীতি সংযোগ ঘটলো।
ভূপাল, চেরনোবিল বা ফুকুশিমার মতো একটি দুর্ঘটনা যদি বাংলাদেশে ঘটে, তাহলে কী হবে? রূপপুরের অবস্থান, বাংলাদেশের আয়তন এবং ঘনবসতির কথা বিবেচনা করলে বলতে হয় অকল্পনীয় ক্ষয়ক্ষতির ভেতর আমরা পতিত হব। পারমাণবিক দুর্ঘটনার জের সহজে কাটে না। দশকের পর দশক ধরে এর প্রভাব থেকে যায়। মানবিক বিপর্যয়ের সাথে আর্থিক ক্ষতির বিষয়টিও বেশ ব্যাপক। ফোর্বসের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী জাপানের ফুকুশিমার সরাসরি ক্ষতি কাটাতে এখন পর্যন্ত ব্যয় করেছে ১৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ব্যয় মিলে সামনের বছরগুলোয় জাপানকে আরো খরচ করে যেতে হবে। মোট খরচ গিয়ে দাঁড়াতে পারে ২৫০ বিলিয়ন ডলারে। রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের সক্ষমতা বাড়ছে, কিন্তু ২৫০ বিলিয়ন ডলারের আর্থিক ধাক্কা সামলানোর ক্ষমতা পাঁচটি বাংলাদেশেরও নেই।
পরমাণু সমৃদ্ধ রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে জাপান ও জার্মানি নিঃসন্দেহে একেবারে প্রথম দিকে। ফুকুশিমা দুর্ঘটনা জাপানকে প্রবল নাড়া দিয়েছে। বাকিদেরও শংকা আশংকার দোলাচলে সময় কাটে। বাংলাদেশের বর্তমান পরিকল্পনার শুরুতে ২০০৯ সালে রূপপুর পারমাণবিক প্রকল্পের জন্য ব্যয় ধরা হয়েছিল ৪ থেকে ৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। বর্তমানে তা গিয়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ১৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে। এতোবড় একটি দেশসেরা প্রকল্প দক্ষ প্রশিক্ষিত পরিকল্পিত জনবল আর প্রয়োজনীয় দক্ষতা ছাড়াই কর্মযজ্ঞ শুরু হয়েছে। সংশয় আরো বেড়ে যায় যখন সম্ভাব্য দুর্ঘটনার কোনো দায়দায়িত্ব রাশিয়া নেবে না বলে প্রচার হয়।
নিউক্লিয়ার প্রযুক্তিতে বাংলাদেশে দক্ষ জনবল নেই, বরং রিসার্চ রি-এ্যাক্টর পরিচালনার অভিজ্ঞতাও বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশনের নেই। রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রকে ঘিরে বাংলাদেশে নিউক্লিয়ার বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে দক্ষ জনবল তৈরির এক মহাযজ্ঞ শুরুর সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। এই সম্ভাবনার যথাযথ পরিচর্যার মাধ্যমে বাংলাদেশ নিউক্লিয়ার রি-এ্যাক্টর পরিচালনার দক্ষ জনবল বিদেশে প্রেরণও করতে পারে।
ইন্টারন্যাশনাল লেবার অর্গানাইজেশন (ওখঙ) সূত্র হলো, প্রযুক্তির সকল কর্মকাণ্ড বিশেষ করে জনশক্তি পিরামিড ফর্মুলা ১:৫:১৫ আকারে সাজাতে হয়। অর্থাৎ একজন গ্র্যাজুয়েট নিয়োগ দিলে ৫ জন ডিপ্লোমা, ১৫ জন ভোকেশনাল প্রযুক্তিবিদ নিয়োগ দিতে হয়।
বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের সহযোগিতায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে নিউক্লিয়ার শিক্ষায় অনার্স, মাস্টার্স এবং ডক্টরেট ডিগ্রি কোর্স চালু করেছে।
অথচ ডিপ্লোমা আর ভোকেশনাল শিক্ষা ইনস্টিটিউট নির্মাণের ধারে কাছেও নেই। শিক্ষা মন্ত্রণালয় প্রশাসনিক বিভাগকেন্দ্রীক ডিপ্লোমা শিক্ষা বোর্ড প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে ইনস্টিটিউট অব নিউক্লিয়ার ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড টেকনোলজি প্রতিষ্ঠা করার উদ্যোগ গ্রহণ না করলে জাতিকে একদিন চরম মূল্য দিতে হবে। আমরা কী আরো কিছুকাল পরনির্ভরশীল জাতির কালিমায় আচ্ছন্ন থাকবো? শিক্ষা ব্যবস্থা পরিচালনার সাথে সংশ্লিষ্ট শিক্ষাজীবীদের এ ব্যাপারে বিবেক তাড়নার স্বরূপ উন্মেষ আকাঙ্ক্ষা করি।

লেখকদ্বয় : সংগঠক, ডিপ্লোমা শিক্ষা গবেষণা কাউন্সিল, বাংলাদেশ