তিন বন্ধুর ছাগল এক্সপেরিমেন্ট

অনিক শুভ

বিকেল ৪টা। শফিক আসবে এখন। ভাবার সাথে সাথেই বাসার নীচ থেকে শফিকের চিৎকার কানে আসে।

– রবিন, রবিন…এই রবিন।
– হুম। একটু দাঁড়া। আমি নামছি।
– আর কতক্ষণ? ৪টা বেজে গেছে। খেলা শুরু হয়ে গেছেতো।
– এইতো দেখ, তোর কথা শেষ হওয়ার আগেই আমি চলে এসেছি।
– খুব ভাল করেছিস। এখন চল।
– হুম… চল।
বিকেল ৪টা থেকে রবিনদের গ্রামের স্কুলের মাঠে ফুটবল খেলা। অনেক দিন পর খেলা হচ্ছে স্কুল মাঠে। তাই গতকালই রবিন-শফিক-পলাশ তিন বন্ধুই ঠিক করে রেখেছে খেলা দেখবে একসাথে। পলাশ আগেই বলে দিয়েছে ওর আসতে একটু দেরি হবে। বিকেলে প্রাইভেট পড়তে যাবে। ৪টায় ছুটি। স্যারের বাসা থেকে স্কুলের মাঠ কাছে। তাই ও পড়া শেষেই স্কুল মাঠে চলে আসবে। তিন জনে জায়গাও ঠিক করে রেখেছে, মাঠের কোন পাশে বসে খেলা দেখবে।
শফিক আর রবিন মাঠে গিয়ে দেখে খেলা শুরু হয়ে গেছে। খেলা হচ্ছে ‘এ গ্রাম’ আর ‘ও গ্রামের’। টানটান উত্তেজনা। ২০ মিনিটের মধ্যে দু’দলই দু’দলকে দুটি করে গোল দিয়েছে। সবাই হাত তালি দিচ্ছে। কেউ বা শিষ দিচ্ছে। এমন সময় পলাশ চলে এল।
– আসতে দেরি হয়ে গেল রে।
– খেলার কি অবস্থা রবিন?
– ০২-০২
রবিন ০২-০২ বলার সাথে সাথে ও গ্রাম আরেকটি গোল দিয়ে দিল এ গ্রাম কে। রবিন-শফিক আর পলাশ এ গ্রামেরই ছেলে। তাই চুপ করে আছে। কিছুক্ষণের মধ্যে ও গ্রাম আবার আরো একটি গোল দিয়ে দিল। পলাশ মেউ মেউ করে বলল:
– আমাদের গ্রাম ৪ গোল খেলে কি হবে। জিতব কিন্তু আমরাই।
– ‘পাগলে কি না বলে ছাগলে কি না খায়। ওদের সবাই স্ট্রং খেলোয়াড়। একেকটা কত বড় দেখছিস?’ শফিক বলল।
শফিকের কথা শুনে এইবার রবিন বলতে শুরু করল:
– আচ্ছা দোস্ত। পাগলে যে কি না বলে সেইটা তো আমরা সবাই জানি। কিন্তু ছাগল কি আসলে সব কিছু খায়? আমি কিন্তু এতদিন নিজের কানে শুনে এসেছি। কখনও দেখিনি।
– আমিও দেখিনি। শুনেছি। চল মাঠের ঐপাশে একটা ছাগল আছে। ঐটা নিয়ে এক্সপেরিমেন্ট করি?
– হুম… চল।
ওদের কথা শুনে পলাশ বলল:
– ওই, তোরা কি খেলা দেখতে এসেছিস নাকি ছাগল গবেষণা করতে?
– ‘তুই আসলে আয়, না হয় খেলা দেখ। আমরা চললাম।’ রবিন কথাটা বলে শফিকে নিয়ে হাঁটা শুরু করে দিল।
ওদের চলে যেতে দেখে পলাশও ওদের পিছুপিছু হাঁটতে শুরু করল।
তিন জনই মাঠের ওপাশের ছাগলের কাছে চলে এল। ছাগলটি তখন মাঠের তাজা সবুজ ঘাস খাচ্ছে। রবিন একটা শক্ত শুকনা পাতা কুঁড়িয়ে নিল ছাগলকে খেতে দেবে বলে। শফিক হেসে বলল:
– রবিন, পাগলামো করিস না। ছাগল লতা-পাতা সব খায় বলে কি এই রসহীন শুকনা পাতাও খাবে নাকি?
– হাসিস না শফিক। ছাগল ঠিকই খাবে। প্রবাদের কথা ভুলে যাইস না এত তাড়াতাড়ি।
রবিন শকনো পাতাটা ছাগলের মুখের সামনে নিয়ে বলল:
– খা- খা- খা…
রবিনের ‘খা-খা-খা’ বলার স্টাইল দেখে শফিক আর পলাশ হাসছে তো হাসছে। রবিন তবুও ছাগল কে বলছে খা-খা-খা।
কিছুক্ষণ পর ছাগলটা পাতাটার দিকে তাকিয়ে নাক সিটকালো। তবুও রবিনের খা-খা-খা বলা থেমে নেই। একটু পর ছাগলটা পাতাটা নাক দিয়ে কয়েকবার শুঁকে খাওয়া শুরু করে দিল।
শুকনো পাতা চিবানোর শব্দে শফিক আর পলাশের হাসি থেমে গেল। এতক্ষণ যারা ছাগলের খাওয়া নিয়ে উপহাস করছিল তারা এখন বিস্ময়ে ছাগলের খাওয়া দেখছে। রবিন এইবার বুক ফুলিয়ে বলছে:
– কিরে? ছাগল নাকি শুকনো পাতা খাবে না। এখন দেখলি তো? খাচ্ছে নাকি খাচ্ছে না।
শফিক আর পলাশ চুপ করে আছে একদম। হঠাৎ শফিক কিছু না বলেই মাঠের পাশে পড়ে থাকা একটা শক্ত কাগজ নিয়ে বলল:
– এখন দেখব ছাগলে এই শক্ত কাগজ কেমনে খায়।
– ছাগল যখন শুকনো পাতা খেয়েছে তার মানে কাগজও খাবে।
পলাশ বলল, ‘দেখা যাবে সেটা। শফিক তুই আগে ছাগলটাকে কাগজটা খেতে দে’।
শফিক যেই কাগজটা ছাগলের মুখের কাছে নিল, ছাগলটা মুখে নিয়ে চিবানো শুরু করে দিল। একপর্যায়ে পুরো কাগজটাই খেয়ে ফেলল।
তিন বন্ধুর এই ছাগল এঙপেরিমেন্টের আলাপ-আলোচনাগুলো প্রথম থেকেই পর্যবেক্ষণ করছিল এলাকার বড় ভাই রিফাত জাকির। তিনি দূর থেকেই সব দেখে যাচ্ছেন তিন বন্ধুর কাণ্ডকারখানা। শফিককে কাগজ কুঁড়িয়ে নিয়ে যেতে দেখে এবং সেই কাগজ ছাগলকে খেতে দিতে দেখে তিনি আর চুপ করে বসে রইলেন না। সোজা হাঁটা শুরু করলেন ওদের দিকে।
এক পা দু’পা করে যেই রিফাত জাকির চলে এল ছাগল এক্সপেরিমেন্টের স্পটে, উনাকে দেখে ভয় পেয়ে গেল তিন বন্ধু রবিন, শফিক আর পলাশ। রবিন নিজেকে সামলে নিয়ে বলল:
– আরে রিফাত ভাই যে। কেমন আছেন?
– হুম। ভাল। কি করছ তোমরা এইখানে?
– না মানে…
– না মানে কি?
– আসলে ভাইয়া, আমরা সব সময় শুনে এসেছি পাগলে কি না বলে ছাগলে কি না খায়। এসবতো শোনা কথা। পাগল যে কিন না বলে সেটাতো জানি। কিন্তু ছাগল যে সব কিছু খায় সেটাতো কখনো নিজের চোখে দেখিনি, তাই একটু এক্সপেরিমেন্ট করছিলাম আরকি।
– এই ব্যাপার। পাগলের কথা জানো, কিন্তু ছাগলের কথা জান না। তাহলে শোনো, ‘ছাগল খাওয়ার ক্ষেত্রে একেবারে বাছবিচার করে না। ওদের খাদ্য তালিকায় মধ্যে কাগজ থেকে শুরু করে ঘাস বা গাছের বাকল পর্যন্ত রয়েছে। ছাগলের মুখের জিহ্বা অতিরিক্ত পরিমাণ শক্ত আর খসখসে হওয়ার কারণে ছাগল খুব সহজে যে কোন জিনিস খেয়ে ফেলতে পারে’।
– ওহ… তাই বলুন। এইটা অবশ্যই জানা ছিল না।
শফিক বলল:
– আচ্ছা ভাইয়া, মাঠে গরুও ঘাস খায়, ছাগলও ঘাস খায়। কিন্তু অনেকে বলেন যে ছাগল যদি ঘেসো জমিতে মুখ দেয় তবে তা ঝলসে যায়। আর ঘাস উঠে না। কথাটা কি সঠিক?
– হুম, এক দিকে সঠিক। সন্ধ্যা হয়ে গেছে চল বাড়ি যেতে যেতে বলি। (সবাই একসাথে হাঁটতে শুরু করল)
‘গরু যখন ঘাস খায়, তখন সে মাটির উপরের ঘাসের যে অংশটুকু আছে তা কেটে খায়। এর ফলে সেখানে ঘাসের মূল থেকে যায়, যার ফলে এর থেকে পুনরায় ঘাস জন্ম নেয়। কিন্তু ছাগল যখন ঘাস খায় তখন সে ঘাসের মূলসহ উপড়ে খেয়ে নেয়। ফলে সেখানে আর নতুন ঘাস জন্মাতে পারে না। একারণে অনেকে বলেন যে, ঘেসো জমিতে ছাগল মুখ দিলে সেই জমি ঝলসে যায়।
রবিন বলল:
– আপনাকে অনেক ধন্যবাদ। আজ আপনার থেকে অনেক কিছু শিখলাম। এখন থেকে এই ব্যাপারে মানুষের ভুলগুলো ভাঙিয়ে দিতে পারব।
– হুম… তা তো অবশ্যই। তোমরা তরুণরাই পার অশিক্ষিত, সহজ-সরল লোকদের কুসংস্কারের অন্ধকারের বলয় থেকে আলোর দিকে নিয়ে আসতে।
সবাই একসাথে পাশাপাশি হাঁটছে। রাস্তার দু’পাশে হরেক রকমের গাছের সারি। গাছের নীচের কিছু অংশ চুন বা সাদা রং দিয়ে আবৃত। পলাশ রিফাত ভাইকে উদ্দেশ্য করে বলল:
– ভাইয়া এই যে দেখুন, রাস্তার দু’পাশে হরেক রকমের গাছ। একটু খেয়াল করলে দেখবেন যে গাছের নিচের কিছুটা অংশ সাদা রং বা চুন দিয়ে আবৃত করে রাখা হয়েছে। ঐ যে দেখুন আবার ঐপাশেরগুলো কিন্তু লাল রঙে আবৃত। এই ব্যাপারটা বুঝলাম না। কেন এমন কালার করা হয়?
– একদম সঠিক সময়ে সঠিক একটি প্রশ্ন করেছ পলাশ। এর কারণ হল প্রথমত গাছকে ছাগলের মুখ থেকে রক্ষা করা। কারণ গাছের বাকলের কাছাকাছি স্থানেই থাকে গাছের রস পরিবহন নালীগুলো। এই নালীগুলো দিয়ে গাছ মূল দিয়ে মাটি থেকে যে জল টেনে নেয়, তা গাছের মগডালে গিয়ে পৌঁছায়। ছাগল দুই পা তুলে যখন গাছের এই বাকল দাঁত দিয়ে খেয়ে ফেলে তখন এই নালীগুলো কেটে যায়। ফলে গাছের জন্য প্রয়োজনীয় পরিমাণ জল উপরের দিকে প্রবাহিত হতে পারে না। আর এই কারণে গাছ মারা যায়। চুন দিয়ে আটকে দেওয়ার কারণে ছাগল গাছের এই বাকল খেতে পারে না। কারণ ছাগলের জিহ্বা যতই শক্ত হোকনা কেন, চুনের কাছে একদম কাবু। চুনে ওদের জিহ্বা পুড়ে যায়। তাই গাছ বাঁচাতে এভাবে চুন দেওয়া হয়। (একটু দম নিল রিফাত। তারপর আবার বলতে শুরু করল…) তবে সব সময় এই রং কিন্তু ছাগলের মুখ থেকে গাছকে বাঁচানোর জন্য ব্যবহার করা হয় না। অনেক সময় সরকারিভাবে নানা ধরনের নির্দেশনামূলক তথ্য দেওয়া থাকে।
আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ রিফাত ভাই, সবাই একসাথে বলে উঠলো। বাড়ির কাছাকাছি চলে এসেছি ভাইয়া, আমরা তবে এখন যাই।
– হুম যাও। সবাই মন দিয়ে পড়াশুনা করবে।
– অবশ্যই ভাইয়া। দোয়া করবেন।
সবার আগে রবিনদের বাড়ি। তাই শফিক আর পলাশ রবিনকে বাড়ি পৌঁছে দিয়ে নিজেদের বাড়ির দিকে রওনা দিল। পেছন থেকে রবিন চিৎকার করে বলতে থাকল- তোরা সকালে ঠিক সময় মত চলে আসবি। না হয় ক্লাসের দেরি হয়ে যাবে।
শফিক আর পলাশ একসাথে বলে উঠলো ‘দেরি হবে না। ঠিক সময়ে চলে আসব আমরা’।