নেপথ্যে

তাপমাত্রা বাড়ছে বাড়ছে শীতও!

ভূঁইয়া নজরুল

দেশের সর্বনিম্ন তাপমাত্রার রেকর্ড হয়েছিল গত সোমবার ২ দশমিক ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস, তেতুলিয়ায়। ১৯৬৮ সালের পর দেশের ইতিহাসে এটি সর্বনিম্ন তাপমাত্রার রেকর্ড। সেদিন চট্টগ্রামের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড হয়েছিল ১০ দশমিক ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস। এরপর থেকে সারাদেশের পাশাপাশি চট্টগ্রামের তাপমাত্রার পারদও বাড়তে থাকে। এতে শীতের তীব্রতা কমার পরিবর্তে আরো বেশি অনুভূত হচ্ছে। কেন এমন ঘটছে?
আবহাওয়াবিদদের সাথে কথা বলে জানা যায়, শুধু সর্বনিম্ন তাপমাত্রাই শীতের নিয়ামক নয়। এর সাথে সর্বোচ্চ তাপমাত্রা, বাতাসের প্রবাহ ও মেঘের আধিক্য প্রধান নিয়ামক হিসেবে কাজ করে। এসবের সাথে আবহাওয়ার আরো অনেক উপাদান যুক্ত থাকলেও প্রধান ফ্যাক্টর বিবেচনা করা হয়ে থাকে তাপমাত্রা, বাতাস ও মেঘের আধিক্যকে।
তাপমাত্রার উপাত্ত বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, চট্টগ্রাম ও আশপাশের এলাকায় বছরের এই সময়ে সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড হওয়ার কথা ১৩ দশমিক ৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস ও সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ২৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস। কিন্তু গত সোমবার দেশে সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড হওয়ার দিনে চট্টগ্রামের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড হয়েছিল ১০ দশমকি ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস, সীতাকুণ্ডের ৬ দশমিক ৮ ও সন্দ্বীপের ৯ দশমিক ১ ডিগ্রি সেলসিয়াস। সেদিনের পর থেকে তাপমাত্রা ক্রমান্বয়ে বাড়তে থাকে। গতকাল শুক্রবার চট্টগ্রামে রেকর্ড হয় ১১ দশমিক ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস, সীতাকুণ্ডে ৯ দশমিক ২ ও সন্দ্বীপে ১০ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস। সর্বনিম্ন তাপমাত্রা বাড়ার পরও গত কয়েকদিন ধরে তীব্র শীত অনুভূত হওয়ার কারণ জানতে চাইলে আবহাওয়া অধিদপ্তর পতেঙ্গা কার্যালয়ের আবহাওয়াবিদ হারুন রশিদের উত্তর, ‘সর্বোচ্চ তাপমাত্রা না বাড়ার কারণে সর্বনিম্ন তাপমাত্রা বাড়লেও শীতের তীব্রতা বাড়ছে। মূলত সর্বোচ্চ তাপমাত্রা বেশি থাকলে সর্বনিম্ন তাপমাত্রা কমলেও শীত তেমন তীব্র হয় না।’
সর্বোচ্চ তাপমাত্রার উপাত্ত বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, যেদিন সর্বনিম্ন তাপমাত্রার রেকর্ড হয়েছিল সেদিন চট্টগ্রামে সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ছিল ২৪ দশমিক ১ ডিগ্রি সেলসিয়াস, সীতাকুণ্ডে ২৫ দশমিক ২ ও সন্দ্বীপে ২৩ দশমিক ৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস। কিন্তু সোমবারের পর থেকে সর্বোচ্চ এই তাপমাত্রা কমতে কমতে গতকাল চট্টগ্রামে রেকর্ড হয়েছে ২০ দশমিক ৮, সীতাকুণ্ডে ২১ দশমিক ৫ ও সন্দ্বীপে ২১ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস।
সর্বোচ্চ তাপমাত্রা কেন কমলো এর জবাব চাইলে আবহাওয়া অধিদপ্তর ঢাকা কার্যালয়ের সিনিয়র আবহাওয়াবিদ আবুল কালাম মল্লিক বলেন, ‘কয়েকদিন ধরে এক ধরনের কুয়াশা দেখা যাচ্ছে। বাস্তবে কিন্তু তা কুয়াশা নয়। এগুলো হলো ঘন মেঘ। এই ঘন মেঘ ভেদ করে সূর্যের তাপ ভূ-পৃষ্ঠে পৌঁছাতে পারে না। এতে দিনের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা কমে যায়। আর দিনের তাপমাত্রা কমে গেলে রাতের তাপমাত্রাও কমে যায়, ফলে শীতের তীব্রতা বেশি অনুভূত হয়।’
কিন্তু গত কয়েকদিন ধরে শীতের সময় বাতাসের প্রবাহ থাকলেও এখন তেমন বাতাসের প্রবাহ নেই। এই প্রশ্নের উত্তর জানতে চাইলে আবহাওয়াবিদরা জানান, বাতাস সাধারণত উচ্চচাপ অঞ্চল থেকে নিম্নচাপ অঞ্চলের দিকে প্রবাহিত হয়। এখন দিন ও রাতের তাপমাত্রারর পার্থক্য কমে যাওয়ায় উচ্চচাপ ও নিম্নচাপের পার্থক্য তেমন হচ্ছে না। আর তা না হওয়ায় বাতাসের প্রবাহও নেই।
এ বিষয়ে আবহাওয়া অধিদপ্তর পতেঙ্গা কার্যালয়ের সহকারী আবহাওয়াবিদ শেখ হারুনুর রশিদ বলেন, ‘বাতাস প্রবাহিত হলে সেই বিশেষ ধরনের মেঘ কেটে যেত। এই বিশেষ সাধারণত ভূ-পৃষ্ঠ থেকে ৮০০ থেকে ১০০০ মিটার উপরে থাকে। কিন্তু এখন তা ভূ-পৃষ্ঠে নেমে এসেছে।’
কবে নাগাদ এই মেঘ কেটে যেতে পারে জানতে চাইলে আবহাওয়া অধিদপ্তর ঢাকা কার্যালয়ের সিনিয়র আবহাওয়াবিদ আবুল কালাম মল্লিক বলেন, ‘আগামী কয়েকদিনের মধ্যে এই মেঘ কেটে যেতে পারে এবং সর্বোচ্চ ও সর্বনিম্ন তাপমাত্রার ব্যবধান বাড়বে। তাহলে সর্বনিম্ন তাপমাত্রার সাথে সাথে সর্বোচ্চ তাপমাত্রাও বাড়বে।’
এদিকে গতকাল দুপুর পর্যন্ত প্রায় সূর্যের দেখা পাওয়া যায়নি। তীব্র শীতে জনজীবন দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে। গত রোববার থেকে সারাদেশের উপর দিয়ে তীব্র, মাঝারি ও মৃদু মাত্রার শৈত্যপ্রবাহ বইছে। গতকাল দেশের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয় রাজশাহীর বাদলগাছিতে ৬ দশমিক ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস।
উল্লেখ্য, কোনো অঞ্চলের তাপমাত্রা ৮ থেকে ১০ ডিগ্রি সেলসিয়াস থাকলে মৃদু শৈত্যপ্রবাহ, ৬ থেকে ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা হলে মাঝারি শৈত্যপ্রবাহ এবং তাপমাত্রা ৪ থেকে ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস হলে তীব্র শৈত্যপ্রবাহ বয়ে যায়।