তাকওয়া : সাফল্যের সোপান

হাফেজ মুহাম্মদ আনিসুজ্জমান

মহান আলস্নাহ্্ তাআলার জন্য সমসত্ম গুণগান, প্রশংসা ও স’তি, যাঁর চেয়ে বেশি প্রশংসার হকদার আর কেউ নেই। তাঁর পবিত্রতা বর্ণনা করি, সৃষ্টিজগতের প্রত্যেক বস’ই যাঁর পবিত্রতা বর্ণনা করে। তাঁর কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করি, যিনি তাঁর অসন’ষ্টি হতে বেঁচে থাকার জন্য আমাদেরকে বারবার সতর্ক করেছেন।
আলস্নাহ্্ তাআলাই একমাত্র উপাস্য। তিনি ছাড়া উপাস্য হওয়ার যোগ্য আর কেউ নেই, কিছু নেই। তাঁর কোন শরীক নেই। আমাদের মুক্তির দিশারী, সত্যের কা-ারী শাফাআতের তাজধারী হযরত মুহাম্মদ মুসত্মফা (সালস্নালস্নাহু আলাইহি ওয়া সালস্নাম) আলস্নাহর প্রিয়তম বান্দা ও তাঁর শ্রেষ্ঠতম রাসূল।
মানবজীবনের চরম সাফল্যের জন্য যে গুণাবলি অপরিহার্য, তন্মধ্যে অন্যতম হল তাকওয়া। পবিত্র কুরআনে আলস্নাহ্ তাআলা ইরশাদ করেন, ‘যারা আলস্নাহ্্ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য করে এবং আলস্নাহকে ভয় করে ও তাঁর অসন’ষ্টি হতে বেঁচে থাকে, তারাই তো সফলকাম।’ (সুরা নূর : আয়াত-৫২) পবিত্র কুরআনের আরো বহু স’ানে তাকওয়ার প্রতি গুরম্নত্ব আরোপ করা হয়েছে। সুরা ইউনূস’র ৬২তম আয়াতে আলস্নাহ্্ তাআলা যে প্রিয় বান্দাগণের জন্য ভয়ভীতি, উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা থেকে মুক্ত থাকার ঘোষণা দিয়েছেন, তাঁদের দু’টি প্রশংসনীয় গুণের কথাও উলেস্নখ করেছেন। তা হলো, ১. আলস্নাযীনা আমানূ, ২. ওয়া কা-নূ ইয়াত্তাকূন। অর্থাৎ তাঁরা হবেন ঈমানদার এবং মুত্তাকী। ঈমান ও তাকওয়া-এ দুটি গুণ বৈশিষ্ট্য আলস্নাহর প্রিয় বান্দার মধ্যে পাওয়া যায়। পবিত্র কুরআনের প্রারম্ভে কুরআন পাক যে বান্দাদেরকে অভীষ্ট লড়্গ্যে নিয়ে যাবে, তাঁরা হলেন সেই তাকওয়াবান বান্দারাই। বলা হয়েছে ‘হুদাল লিল মুত্তাকীন’।
‘তাকওয়া’ আরবী শব্দ। ‘ওয়া+ক্বাফ+ইয়া’- এ মূল ধাতু হতে নিষ্পন্ন। শাব্দিকভাবে এর অর্থ বেঁচে থাকা, বিরত থাকা ইত্যাদি। আবার ‘ভয় করা’ অর্থেও প্রযোজ্য হয়। অর্থসমূহের মধ্যে সামঞ্জস্য অবশ্যই আছে। যে সব বিষয় থেকে বেঁচে থাকার নির্দেশ প্রদত্ত হয়েছে, সেগুলোর পরিণতি ভয় করারই বটে। বিষয়গুলো হতে বেঁচে থাকতে হবে। কারণ এগুলোর পরিণতি হচ্ছে ভয়ঙ্কর শাসিত্মই। শাসিত্ম থেকে বেঁচে থাকতে কে না চায়? তাই বেঁচে থাকা ও ভয় করার মধ্যে কারও পরিণতিগত যোগাযোগ আছে। তাকওয়াকে শরয়ী পরিভাষায় সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে এভাবে, ‘গোপনে ও প্রকাশ্যে সর্বশক্তিমান আলস্নাহ্্কে ভয় করে চলার নামই তাকওয়া।’ (বায়দ্বাভী) গভীরভাবে লড়্গ্য করলে বুঝা যাবে, গুপ্ত-ব্যক্ত অবহিত অনত্মর্যামী আলস্নাহ্কে ভয় করা, সর্বাবস’ায় তাঁর অসন’ষ্টি, অপছন্দের আচরণ ইত্যাদি থেকে বেঁচে চলা সহজ নয়। প্রকাশ্যত তাঁর নারাজির কথা-কাজকে পরিহার করা যায় বটে। কিন’ গোপনে সে সব বিষয় থেকে প্রলোভন ও কুমন্ত্রণা কাতর মানুষের দুর্বল চিত্তকে বাঁচিয়ে রাখা অতি কঠিন। অথচ আলস্নাহ্্র নির্দেশ হল, ‘হে ঈমানদার নর-নারী, তোমরা আলস্নাহ্্কে যেভাবে ভয় করা উচিত, সেভাবে ভয় করো। আর মুসলমান অবস’ায় থাকা ব্যতীত মৃত্যুবরণ করো না।’ (৪:১০২)
ঈমানদার বান্দার মানসিক অবস’া ভেদে তাকওয়া বা খোদাভীতির সত্মর তিনটি। সর্বনিম্ন সত্মর হল কুফর ও শির্ক হতে দূরে থাকা। এ সত্মর দৃষ্টে প্রত্যেক মুমিন-মুসলমান নর-নারীকে মুত্তাকী বলা যায়। যদিও সে গুনাহ্্গার হয়ে থাকে। দ্বিতীয় সত্মর হল, আলস্নাহ্্ ও রাসূলের পছন্দীয় নয়, এমন সব বিষয় থেকে বেঁচে থাকা। তাকওয়ার যে সকল ফযীলত ও মর্যাদার কথা কুরআন ও হাদীসে বর্ণিত হয়েছে, তা এ সত্মরের সাথে সংশিস্নষ্ট। আর তৃতীয় ও সর্বোচ্চ যে সত্মর তাকওয়ার রয়েছে, তা হলো বান্দার অনত্মরকে আলস্নাহ ব্যতীত সবকিছু হতে বাঁচিয়ে রাখা। এ সত্মরে উপনীত বান্দাগণ হলেন নবী রাসূলগণ (আলাইহিমুস সালাম) এবং তাঁদের যোগ্য উত্তরসূরি নৈকট্যপ্রাপ্ত আউলিয়ায়ে কেরাম। তাদের প্রসঙ্গেই বর্ণিত ‘লাহুমুল বুশরা ফিল হায়া-তিদ দুন্্ইয়া ওয়া ফিল আ-খিরাহ্’। অর্থাৎ তাঁদের জন্য রয়েছে ইহ-পরকালে পরম সুসংবাদ। (সুরা ইয়ূনূস : আয়াত-৬৪) এঁদের অনত্মর আলস্নাহর স্মরণ ও সন’ষ্টি কামনায় সবসময় সমৃদ্ধ। ‘আলস্নাহ্কে যেভাবে ভয় করা দরকার সেভাবেই ভয় করতে থাকো’ এ নির্দেশে ওই সর্বোচ্চ সত্মরের তাকওয়ার কথাই বর্ণিত হয়েছে। এখানে বলা হয়েছে, তোমরা তাকওয়ার ওই সত্মর অর্জন করো, যা তাকওয়ার হক।
তাকওয়ার হক সম্পর্কে আলস্নাহর রাসূল যে ব্যাখ্যা দিয়েছেন, তা বর্ণিত হয়েছে হযরত আব্দুলস্নাহ ইবনে মাসউদ, কাতাদাহ, হাসান বসরী (আলাইহিমুর রিদওয়ান) প্রমুখ হতে। তাকওয়ার হক হল, প্রত্যেক কাজে আলস্নাহ্র আনুগত্য করা। এর পরিপনি’ কোন কাজ না করা। সদা-সর্বদা তাঁকে স্মরণ করে চলা, কখনও তাঁর স্মরণবিমুখ না হওয়া। সর্বদা তাঁর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা, কখনও অকৃতজ্ঞতা না করা।
খোদাভীতির যে হক রয়েছে, সেভাবেই আলস্নাহ্কে ভয় করার নির্দেশ যখন (সুরা আ-লে ইমরানের ১০২ নম্বর আয়াত দ্বারা) নাযিল হয়, তখন রাসূলুলস্নাহর সাহাবাগণের অনত্মরাত্মা কেঁপে ওঠে। সর্বোচ্চ সত্মরের তাকওয়ার অধিকারী হওয়া সত্ত্বেও তাঁদের এ নির্দেশ যথাযথ পালনে আশঙ্কা জেগে ওঠল। তাঁরা আলস্নাহর রাসূলের কাছে আরয করলেন, ‘ইয়া রাসূলুলস্নাহ আমাদের মধ্যে কার এমন সাধ্য আছে যে, আলস্নাহ্্কে সেভাবেই ভয় করে, যেমনটি ভয় করা তাঁর হক? আমরা দুর্বল চিত্ত লা-চার বান্দার পড়্গে তাঁর তাকওয়ার হক আদায় করা কী করে সম্ভব? তখন তাঁদেরকে আশ্বসত্ম করে নাযিল হল, ‘অতএব, তোমরা যথাসাধ্য আলস্নাহকে ভয় করে চলো।’ (সুরা তাগা-বুল : আয়াত-১৭) এমনিতে সাধ্য ও সড়্গমতার বাইরে তিনি কাউকে বাধ্য করেন না। তবে সাধ্যের পরিধিও তাঁর অবিদিত নয়। যে অনত্মর্যামী আলস্নাহ্্ তাঁর এ বান্দাদেরকে সৃষ্টি করেছেন, তিনি তাদের ড়্গমতা ও সামর্থ সম্পর্কে নিশ্চিত জানেন। নচেৎ ‘সাধ্যমত’ বলার তাৎপর্য কী? তাকওয়া অবলম্বনে নিজ শক্তি ও প্রচেষ্টা ব্যয় করলেই উভয় আয়াতের ওপর আমল করার সামঞ্জস্য পাওয়া যাবে। এতে আলস্নাহর অত্যনত্ম দয়া ও তাঁর অনুগ্রহের বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে।
দ্বীনি শিড়্গামূলক ঘটনাবলির জনপ্রিয় সংকলক মাওলানা আবুল নূর মুহাম্মদ বশীর এক বালকের খোদাভীতির চমকপ্রদ একটি ঘটনা সংকলন করেছেন। বালকটি অজানা শঙ্কায় খুব কাঁদছিল। আরেকজন বয়স্ক বুযুর্গ লোক তাকে কান্নার কারণ জিজ্ঞাসা করল। সে বলল, ‘আজ আমি কুরআন পাকের একটি আয়াতের সবক পড়ে এসেছি। সেই থেকে আমি আলস্নাহ্র ভয়ে কেঁদে চলেছি। সেটি কোন আয়াত, যা পড়ে তুমি কাঁদছ? সে বলল, আলস্নাহ্র ফরমান, তোমরা জাহান্নামের সে আগুনকে ভয় করো, যার ইন্ধন হচ্ছে অবাধ্য নর-নারী এবং পাথর।’ লোকটি বলল, ‘আগুনের আযাব তো অবাধ্যচারী বয়ঃপ্রাপ্ত নর-নারীদের জন্য। এতে তোমার এভাবে ভয় পাওয়ার কী আছে? তুমি তো অপ্রাপ্তবয়স্ক বালক। এখনও তোমার কোন আমলের হিসাব লিখা হচ্ছে না’। বালকটি বলল, ‘আমি এ জন্যই কাঁদছি যে, আমার মা যখন আগুন জ্বালানোর জন্য বড় বড় লাকড়ি চুলার ভেতরে রাখেন, তখন ওগুলোর মধ্যে যদি আগুন না ধরে, তখন তিনি সেগুলোর নিচে ছোট ছোট কিছু শুকনো কাঠের কঞ্চি রাখেন। যাতে ছোটগুলোতে আগুন ধরে যাওয়ার পর বড় লাকড়িগুলোতেও আগুন লেগে যায়। এ ঘটনা দৃষ্টে আমার মনে ভয়ের সঞ্চার হল যে, আলস্নাহ যদি জাহান্নামে বড় বড় না ফরমানদের নিড়্গেপ করেন এবং সেগুলোতে আগুন না লাগে। তবে যদি আবার আমার মত ছোট বাচ্চাদেরও সে আগুনে ঢেলে দেন- তখন আমার পরিণতি কী হবে?
দেখুন, আযাবের ভয় একটি ছোট বালকের মনে কতখানি দাগ কেটেছে। তার ছোট্ট মনে কী পরিমাণ খোদাভীতির সঞ্চার হয়েছে, যে কারণে তার দু’ চোখের অশ্রম্নধারা প্রবাহিত হয়েছে। আর আমরা জীবনের কত পথ পাড়ি দিয়ে কতজন বার্ধক্যে উপনীত হয়েছি, অথচ আলস্নাহর প্রতাপ ভেবে তাঁর অসন’ষ্টির পরিণামে শাসিত্মর ভয়ে ক’ফোঁটা চোখের জল ফেলেছি কিংবা পাপের পথ থেকে ফিরে আসার কখনো একবার কি সংকল্পবদ্ধ হয়েছি? পারলে তা-ই হতো আলস্নাহ্্কে ভয় করার অনুশীলন। আলস্নাহ্ আমাদেরকে তাকওয়ার নেয়ামত ধন্য করম্নন, আমিন।