তাঁর সাধনা

আবু সাঈদ

উনিশ শতকের প্রথমার্ধ থেকে প্রাচ্যবিদ্যা সম্পর্কে ইউরোপীয় প্রতিষ্ঠিত ধারণা পরিবর্তন শুরু হয়। এ ধারণা পরিবর্তনে ইউরোপীয় প্রাচ্যবিদ্যা বিশারদ- উইলিয়াম জোনস (১৭৪৬-১৭৯৪), ম্যাক্সমুলার, স্যার জর্জ গ্রিয়ারসন (১৮৫১-১৯৪১) প্রমুখ ছাড়াও প্রাচ্যোর প্রাচ্যবিদ্যা বিশারদ- দীনেশচন্দ্র সেন, রামেন্দ্রসুন্দর ত্রিবেদী, মহামহোপাধ্যায় হরপ্রসাদ শাস্ত্রী প্রমুখ পণ্ডিত ব্যক্তিত্ব গুরুত্বপূর্ণ এবং অনন্য ভূমিকা পালন করেন। প্রাচ্যের প্রাচ্যবিদ্যাবিশারদ হিসেবে মুনশী আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদের (১৮৭১-১৯৫৩) অবদানও এর সঙ্গে স্মরণীয়।
আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ পটিয়ার সুচক্রদণ্ডিতে জন্মগ্রহণ করেন এবং সেখানেই বসবাস করতেন। আত্মপরিচয় দিতে গিয়ে নিজের সমপর্কে মুনশী অবাদুল করিম তিনটি বিশেষণ ব্যবহার করছেন- চট্টগ্রামবাসী, মুসলমান সাহিত্যসেবক এবং দরিদ্র। তিনটি বিশেষণই বিশেষভাবে লক্ষ্যণীয়। চট্টগ্রাম ভৌগোলিকভাবে প্রান্তিক, দ্বিতীয়টি সমপ্রদায় হিসেবে পিছিয়ে পড়া এবং তৃতীয়টিতে আর্থনৈতিকভাবে দুর্দশার কথা বলা হয়েছে। এ পরিচয় দিতে তিনি কোন রাখঢাক রাখেননি বরং সরাসরি বলেছেন, ‘‘আমি পূর্ব বাংলার একজন গ্রাম্য লোক, গেঁয়ো মানুষ, চট্টগ্রামী ভাষায় যাহাকে বলে ‘গাঁইয়া’। ……. আমি পূর্ববঙ্গের মাটির মানুষ, সেই মাটিতে যে সাহিত্যের উৎপত্তি হইয়াছে, সেই সাহিত্য সেই মাটির বাসিন্দাদের মনের আনন্দরসে হইয়াছে পুষ্ট ও যুগ যুগ ধরিয়া জোগাইয়াছে মনের খোরাক-আমি সেই সাহিত্যের অনুরক্ত পাঠক, সেই সাহিত্যের রসেই আমার মনের রসভাণ্ডার হইয়াছে পূর্ণ, আমি সেই পুঁথি সাহিত্যের রসের রসিক, তার ভাণ্ডারী ও প্রেমিক। আজীবন তিল তিল করিয়া আমি এই রস আহরণ করিয়াছি, সঞ্চয় করিয়াছি এবং সেই রসপাত্র পুঁথিসংগ্রহ আমার জীবনের ব্রত করিয়াছি।”
আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদের পেশা ছিল স্কুলের শিক্ষকতা এবং চট্টগ্রাম শহরে সরকারি শিক্ষা দপ্তরের কেরানি। তবে পেশা কেরানি হলেও তাঁর নেশা ছিল বাংলা পুঁথি সংগ্রহ। তবে তাঁর এ পুঁথি সংগ্রহকে কেবল নেশা হিসেবে দেখল ভুল হবে বরং এর সঙ্গে তাঁর দায়বোধ, সাহিত্যবোধ এবং সর্বোপরি জাতীয়তাবোধের বিষয়টিও জড়িত। সাহিত্য হিসেবে পুঁথিসাহিত্য বরাবরই অবহেলিত ছিল। এজন্য হয়ত একটি লেখায় তিনি পুঁথিকে কঙ্কাল বলে অভিহিত করেছিলেন। সেটা যদি কঙ্কাল হয় তবে তিনি এ কঙ্কালে শিরা-উপশিরা স’াপন করে তাতে রক্ত সঞ্চালন করে প্রাণ সঞ্চার করেছেন। তাঁর একক প্রচেষ্টায় প্রায় ‘পাঁচশতের অধিক হস্তলিখিত পুঁথি’ সংগৃহীত হয়। অন্যদিকে তাঁর জন্মস’ান চট্টগ্রামও প্রান্তিকে অবসি’ত বলে অবহেলিত ছিল তবে তিনি দেখিয়েছেন শিক্ষা-সাহিত্য-সংস্কৃতি চর্চায় এ অঞ্চল কোনদিনই কোনভাবে পিছিয়ে ছিল না। বাংলা সাহিত্যে এ চট্টগ্রামের অবদানও কম নয়। এ চট্টগ্রামেই সৃষ্টি হয়েছে ‘পদ্মাবতী’ ও ‘লোরচন্দ্রানী’।
প্রাচ্যবিদ্যা চর্চার ক্ষেত্রে বাংলা ভাষাটি বরাবরই উপেক্ষিত থেকেছে। আগেই বলেছি সাহিত্য হিসেবে পুঁথি সাহিত্যও অবহেলিত ছিল। এ বিষয়টি মহামহোপাধ্যায় হরপ্রসাদ শাস্ত্রী লক্ষ্য করেছেন। যদিও তিনি সংস্কৃত পুথিঁ সংগ্রহের উপর জোর দেন। তবে এর পাশাপাশি বাংলা পুঁথি সংগ্রহের উপরও গুরুত্বারোপ করেন। কিন’ আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ বাংলা পুঁথি সংগ্রহকে নিজের ব্রত হিসেবে গ্রহণ করেন। কারণ পুঁথি সংগ্রহ কেবল তাঁর কাছে শৌখিন কোন বিষয় ছিল না, এ সংগ্রহের সঙ্গে যুক্ত ছিল তাঁর দায়বোধ, যে দায়বোধটি আবার যুক্ত একটি জাতির ইতিহাস, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি, আত্মপরিচয় তথা অস্তিত্বের সঙ্গে। তিনি সামপ্রদায়িকতার ঊর্ধ্বে ছিলেন। পুঁথি সংগ্রহে তিনি জাতপাত, সামপ্রদায়িকতাকে স’ান দেননি। ‘পুঁথিও সংগ্রহ করেছেন হিন্দু-মুসলিম অভেদে তাঁর আগে এমন অসামপ্রদায়িক চেতনা নিয়ে কেউ পুঁথি সংগ্রহ করেননি’ (ড. আহমদ শরীফ)। তবে তিনি যখন পুঁথি সংগ্রহ শুরু করেন তখন বাঙালি মুসলমান-সমপ্রদায় আত্মপরিচয়জনিত অস্তিত্ব সংকটে ভুগছিল। এ অস্তিত্ব সংকটের মূল কারণ একটি ধর্মীয় অন্যটি জাতি ও ভাষাগত।
বাঙালিত্ব এবং মুসলমানত্ব- এ দুই সত্তার মধ্যে যখন বাঙালি মুসলমানরা দ্বিধান্বিত ও বিভ্রান্ত ছিল তখন আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ এই দুই সত্তার মধ্যে কোন বিরোধ দেখেননি। তিনি লক্ষ্য করেছেন মাতৃভাষা বাংলার প্রশ্নে মুসলমানদের মধ্যে যে দ্বিধা, তা এ সমপ্রদায়কে পিছিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। বাংলাকে তিনি মাতৃভাষা শুধু নয়, জাতীয়ভাষা হিসেবেও চিহ্নিত করেছেন এবং ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষ বাঙালিকে গ্রহণ করার কথা বলেছেন । তিনি বলেছেন, ‘মাতৃভাষা বাঙ্গালাকে জাতীয়ভাষারূপে বরণ করিয়া তাহার সমুচিত সমাদর ও অনুশীলন না করায় মুসলমানসমাজের যে কি অনিষ্ট হইতেছে, তাহা ভাষায় অভিব্যক্ত করা সহজ নয়।’ এ ঐতিহাসিক সত্য তিনি বুঝতে পেরেছিলেন। আর পেরেছিলেন বলে মাতৃভাষা বাংলার প্রশ্নে তিনি ছিলেন দ্বিধাহীন এবং দৃঢ়। ঐতিহাসিক এবং জন্মগতভাবে তিনি উপলব্ধি করেছিলেন যে, ‘পুরুষাণুক্রমে বাঙালি মুসলমান বাঙ্গালা ভাষাই ব্যবহার করিয়া আসিয়াছিলেন।’ সুতরাং ভাষার প্রশ্নে বাংলার যে ঐতিহাসক পারম্পর্য তা নিয়ে বিতর্ক এবং দ্বিধান্বিত হওয়ার কোন কারণ এবং অবকাশ নেই। তিনি সরাসরি বলেছেন,‘বাঙ্গালা ভাষা ভিন্ন অপর কোনও ভাষা বাঙ্গালী মুসলমানগণের মাতৃভাষা ও জাতীয়ভাষা হইতে পারে না, ইহা আমাদের পূর্বপুরুষগণ বুঝিতে পারিয়াছিলেন এবং তদনুসারে সেই কাজে ব্রতী হইয়াছিলেন।’ এবং তিনি নিজেও একাজে ব্রত হয়েছিলেন। পুঁথি সংগ্রহও এ ঐতিহাসিক এবং মহৎ কাজের অংশ। এ কাজ তিনি একক প্রচেষ্টায় শুরু করেছিলেন কিন’ তিনি তা নিজের মধ্যে সীমাবদ্ধ করে রাখতে চাননি। এ মহৎ কাজকে তিনি সামাজিক আন্দোলনে রূপ দিতে চেয়েছিলেন। এ ছিল তাঁর শুধু সাহিত্যসাধনা নয়, জীবনসাধনাও।
(নিবন্ধে উল্লেখিত উদ্ধৃতিগুলো গৌতম ভদ্রের ‘মুনশি আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ ও আত্মসত্তার রাজনীতি’ গ্রন’ এবং ‘প্রথম আলো’তে প্রকাশিত আবুল মোমেনের ‘আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ : তিমিরবিনাশী সংগ্রাহক’ নিবন্ধ থেকে নেওয়া হয়েছে।)