তাঁর আবির্ভাব নয় কোন সাদামাটা ব্যাপার

হাফেজ মুহাম্মদ আনিসুজ্জমান

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন’র জন্য সকল প্রশংসা ও গুণগান যিনি তাঁর হাবীব (সাল্লাল্লাহু আলাইওয়া সাল্লাম)’র নাম সাব্যস্থ করেছেন মুহাম্মদ বা চরম প্রশংসিত। তাঁর পবিত্রতা জ্ঞাপন করি, যিনি আমাদের জাহের ও বাতেনকে পবিত্র করার লক্ষ্যে তাঁর রাসূলকে প্রেরণ করেছেন। তাঁর কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করি, যিনি আমাদের প্রতি প্রদত্ত তাঁর নেয়ামতের শুকরিয়া জ্ঞাপনের নির্দেশ দিয়েছেন।
আল্লাহ্‌্‌ এক। তিনি ছাড়া আর কোন ইলাহ্‌ বা উপাস্য নেই। তাঁর কোন শরিক নেই। তাঁর ইবাদতে কারো অংশীদারিত্ব নেই। আমাদের কর্ণধার ও পথনির্দেশক সায়্যিদুনা হযরত মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) আল্লাহর বান্দা ও তাঁর রাসুল। যিনি হযরত ইবরাহীম খলীল (আলাইহিস সালাম)’র প্রার্থনার মূর্ত প্রকাশ।
এ মাস আমাদের প্রিয়নবী হযরত মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর শুভ আবির্ভাবের স্মৃতিধন্য মাহে রবিউল আউয়াল শরীফ। সঙ্গত কারণেই মাসব্যাপী সর্বত্র মহাসমারোহে ব্যাপকভাবে পালিত হচ্ছে সেই খুশীর ঈদ ঈদে মিলাদুন্নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)। যে নবীর আগমন বিশ্ববাসীর জন্য আল্লাহর অজস্র নেয়ামত ও অনুগ্রহরাজি লাভের এক মহান ওয়াসীলা। শেষ নবী পূর্ব প্রতিশ্রুত। সমস্ত নবী রাসূল এ নবীর শুভাগমন বার্তা নিজ নিজ উম্মতকে জানিয়ে দিয়েছেন। তিনি সমগ্র সৃষ্টিকূলের কল্যাণের নিমিত্তে সকলের আকাঙ্ক্ষিত, প্রতীক্ষিত ও প্রত্যাশিত সেই রাসূল, যাঁর আগমন প্রত্যাশা ব্যক্ত হয়েছে স্বয়ং ইবরাহীম খলীলুল্লাহ (আলাইহিস সালাত ওয়া সালাম)’র প্রার্থনার ভাষায়। যা পবিত্র কুরআনের সুরা বাকারার ১২৭ থেকে ১২৯ নং আয়াতে বর্ণিত হয়েছে। প্রথমোক্ত দু’আয়াতে তাঁর মহান কীর্তি পবিত্র কা’বা শরীফ নির্মাণকার্য কবুল হওয়ার আবেদন এবং প্রিয় বংশধরের অনাগত জীবন আল্লাহ্‌র আনুগত্যে অতিবাহিত হওয়ার প্রার্থনা রয়েছে। শেষোক্ত আয়াতে রয়েছে সেই কাঙ্ক্ষিত রাসূল প্রেরণের শ্রেষ্ঠতম প্রার্থনা। তাঁর ফরিয়াদ ছিল, ‘হে আমাদের পালনকর্তা, আপনি আমাদের বংশধরের মধ্য থেকে তাঁদের নিকট একজন রাসূল প্রেরণ করুন, যিনি তাদের কাছে আপনার আয়াতসমূহ তেলাওয়াত করবেন, তাদেরকে কিতাব ও হেকমত শিক্ষা দেবেন এবং তাদেরকে পবিত্র করবেন। নিঃসন্দেহে আপনি মহাপরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাবান।’
আল্লাহ্‌্‌ পাক অতিশয় দয়ালু, তিনি তাঁর সেই দয়ার বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়ে সেই প্রার্থিত রাসূলকে পাঠালেন আমাদেরই মাঝে। সুরা আ-লে ইমরানের ১৬৪ নং আয়াতে স্বয়ং আল্লাহরই ঘোষণা, ‘আল্লাহ্‌ মুসলমানদের প্রতি বড়ই অনুগ্রহ করেছেন। (কারণ, যেহেতু) তিনি তাদের নিকট তাদেরই মধ্য থেকে এক সম্মানিত রাসূল প্রেরণ করেছেন। তিনি তাদের নিকট তাঁর (অর্থাৎ আল্লাহ্‌র) আয়াতসমূহ তেলাওয়াত করবেন, তিনি তাদেরকে (সব ধরণের কদর্যতা থেকে) পরিশুদ্ধ করবেন আর তাদেরকে কিতাব ও হেকমত শিক্ষা দেবেন। বস্তুতঃ তারা পূর্ব থেকেই সুস্পষ্ট পথভ্রষ্টতায় নিমজ্জিত ছিল।’ বর্ণিত দুটি আয়াতে অভিন্ন প্রসঙ্গের অবতারণা দেখা যায়। প্রথমটায় ছিল ইবরাহীম (আলাইহিস সালাম)র ঐকান্তিক প্রার্থনার বিষয়বস্তু। হাজার বছর পূর্বে এ প্রার্থনা ছিল আভাস। শেষোক্ত আয়াতে এর বহিঃপ্রকাশ। আর সেই প্রার্থিত রাসূলের গুণ-বৈশিষ্ট্যও উভয় আয়াতে অভিন্ন। সেখানে বর্ণিত হয়েছে যে মহান রাসূলের শুভাগমন হবে, তিনি প্রধানত কী কী কাজ করবেন। তাঁর সেই প্রতীক্ষিত আবির্ভাব উম্মতের জন্য কী কল্যাণ ও উপকারিত। এনেছে।
প্রথমতঃ দেখা যাক, উভয় আয়াতে বর্ণিত রাসূল প্রসঙ্গে আদৌ কোন যোগসূত্রিতা পাওয়া যাচ্ছে কিনা। একবার রাসূলে করিম (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) নিজের শুভ জন্ম (অর্থাৎ নবীজির মীলাদ) বৃত্তান্ত বর্ণনা প্রসঙ্গে ইরশাদ করেন, ‘আমি আল্লাহর কাছে তখনও শেষ নবীরূপে লিখিত ছিলাম, যখন আদম (আলাইহিস সালাম) পর্যন্ত পয়দা হননি। বরং তাঁর সৃষ্টি উপাদান তৈরি হচ্ছিল মাত্র। আমি নিজের সূচনা-বৃত্তান্ত তোমাদেরকে বলছি ‘আমি হচ্ছি পিতা হযরত ইবরাহীম (আলাইহিস সালাম)র দোয়া (অর্থাৎ প্রার্থনার বিকাশ), হযরত ঈসা (আলাইহিস সালাম)র সুসংবাদ এবং স্বীয় জননী (মা আমেনা রাদিয়াল্লাহু আনহা)র সেই স্বপ্নের বাস্তবায়ন, যা তিনি আমার শুভজন্মের মুহূর্তে প্রত্যক্ষ করেছিলেন। (যে, তাঁর অস্তিত্ব মুবারক হতে বিচ্ছুরিত এক বিশেষ নূর, যাতে সিরিয়ার প্রাসাদগুলোও তাঁর চোখের সামনে উদ্ভাসিত হয়ে ওঠল।‘ বাগাভী, মুসনাদে আহমদ)
এ হাদীসে রাসূলে আকরাম (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) তিনটি ঘটনা পরম্পরার প্রতি ইঙ্গিত প্রদান করেছেন’ যাতে পর্যায়ক্রমে তাঁর আগমনী বারতা প্রদত্ত হয়েছে। প্রথমটি ইবরাহীম (আলাইহিস সালাম)র দোয়া, যা পূর্বেই উদ্ধৃত হয়েছে। দ্বিতীয়টি হল ঈসা (আলাইহিস সালাম)’র সুসংবাদ, যা সুরা সাফ’র ৬ষ্ঠ আয়াতে বর্ণিত হয়েছে। তৃতীয়তঃ মা আমেনার প্রত্যক্ষ করা রাসূলে আকরাম (সাল্লাল্লাহু আলাইহিস সালাম)’র সেই ‘নূর’র জ্যোতি, যা জননীন পবিত্র উদর হতে নির্গত। যার অলোতে মা আমেনা মক্কার পবিত্র শহরে থেকে দেখতে পাচ্ছিলেন সিরিয়ার প্রাসাদসমূহ। সুরা বাকারা ও সুরা আ-লে ইমরানে পূর্বোক্ত আয়াতদ্বয় ছাড়াও সুরা জুমুআর প্রারম্ভে প্রিয়নবীর শুভ আবির্ভাবের ঐতিহাসিক ঘটনার কথাটি প্রায় অভিন্ন শব্দমালায় বর্ণিত। আয়াতগুলোতে তাঁর আগমন সংক্রান্ত বর্ণনাদির পাশাপাশি তাঁর তিনটি লক্ষ্যও উল্লেখ করা হয়েছে। ১. মহাগ্রন্থ আলকুরআনের তেলাওয়াত, ২. আসমানী কিতাব ও হেকমতের শিক্ষাদান এবং ৩. মানুষের চরিত্রশুদ্ধি।
পবিত্র কুরআন কল্যাণমূলক সকল জ্ঞানের আধার। কুরআন প্রত্যেক বস্তুর বিবরণ। এটি লওহে মাহফুয হতে এসেছে। রাসূলের আগমন না হলে পবিত্র কুরআন পাওয়া আমাদের পক্ষে অসম্ভব ছিল। গোমরাহিতে নিমজ্জিত জাতি কুরআনের মত একটি অমূল্য গ্রন্থ না পেলে সে অন্ধকার হতে বেরিয়ে আসা তাদের পক্ষে কখনো সম্ভব হতো না। পবিত্র কুরআন আল্লাহর বাণী, সে বাণী রাসূলের নিকটই এল, আর তিনি তা মানুষকে শুনিয়ে স্রষ্টা ও সৃষ্টির মধ্যে সেতুবন্ধন রচনা করলেন। রাসূলের পবিত্র যবান থেকে উচ্চারিত হয়েছে আল্লাহ তাআলার মহাপবিত্র বাণী। পবিত্র কুরআনের ব্যতিক্রমধর্মিতা এখানেই যে অন্যগ্রন্থ শুধু উচ্চারণে কোন পূণ্য নেই। কিন্তু কুরআন মজীদের একটি শব্দ উচ্চারণে দশটি নেকী মেলে। পবিত্র এ গ্রন্থের অর্থ হৃদয়ঙ্গম করে এর বিধিবিধান পালনে ব্রতী হওয়া যেমন ফরয এবং পূণ্যময় কাজ, তেমনি এর শব্দসমূহ তেলাওয়াত বা পঠনেও আছে স্বতন্ত্র বন্দেগী ও অশেষ সওয়াব।
অসংখ্য নেয়ামতের ভাণ্ডার এ কুরআন, রাসূলে পাক (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এ কুরআন এনেছেন, আর তেলাওয়াত শুনিয়ে দিয়েই ক্ষান্ত হননি বরং এর যথাযথ প্রয়োগ বিধি তিনি তাঁর সাহাবায়ে কেরামকে ব্যবহারিক পদ্ধতিতেই শিক্ষা দিয়েছেন। কেউ কেউ বলেন, কুরআন’র নিগূঢ় তত্ত্ব ও এর আচরণগত দিক হচ্ছে রাসূলের সুন্নাহ্‌্‌ যার অপর নাম হিকমাহ্‌্‌। তিনি কল্যাণকর সবকিছু তা’লিম দিতে প্রেরিত হয়েছেন। এর সমর্থনে রাসূলের মহানবাণী আছে, ‘বুইসতু মুআল্লিমা’ অর্থাৎ আমি শিক্ষাদাতা রূপে প্রেরিত হয়েছি। (মিশকাত দ্র.)
সর্বোপরি মানবের সমাজে রাসূল আবির্ভাবের গুরুত্বপূর্ণ প্রয়োজনীয়তা এটাই যে, তিনি এক প্রকার দানবকেই মানব সম্পদে পরিণত করেছেন। তাদের পবিত্রতা বিধান করেছেন। আত্মিক ও দৈহিক সকল নাপাকী ও কদর্যতাকে তিনি দূরীভূত করে পতিত মানবজাতিকে সোনার মানুষে পরিণত করেন। মানুষ আর পশুতে যে ভেদরেখা আছে, তা সুন্দরভাবে নিরূপণ করে অন্ধকারে নিপতিত মানুষকে আশরাফুল মাখলুকাতে পরিণত করেছেন। চারিত্রিক সৌন্দর্যের মহিমায় তিনি এ জাতিকে করেছেন গৌরাবান্বিত। কাজেই তাঁর আগমন ইস্যুকে গৌণ করে দেখার যে কোন অবকাশ নেই।

লেখক : আরবী প্রভাষক,
জামেয়া আহমদিয়া সুন্নিয়া আলীয়া মাদ্রাসা।
খতিব : হযরত খাজা গরীব উল্লাহ শাহ (র.) মাজার জামে মসজিদ।