তবুও অসময়ে প্রস্থান

আবুল মোমেন

মুসত্মাফা নূরউল ইসলামের নামটি প্রথম দেখি রাজশাহী থেকে প্রকাশিত ত্রৈমাসিক সাহিত্য পত্রিকা পূর্বমেঘের মলাটে। জিলস্নুর রহমান সিদ্দিকী ও মুসত্মাফা নূরউল ইসলাম যৌথভাবে এটি সম্পাদনা করতেন। তখন তাঁরা দু’জনেই রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিড়্গক – একজন ইংরেজি সাহিত্যের আর অপর জন অর্থাৎ মুসত্মাফা নূরউল ইসলাম বাংলা সাহিত্যের। পূর্বমেঘ রম্নচিশীল ও প্রগতিশীল সাহিত্যপত্র হিসেবে তখন বিশেষ মর্যাদাপূর্ণ কাগজ। তবে এটি বেশি দিন চলেনি। স্বাধীনতার পরে দু’জনেই ঢাকায় এসে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়িয়েছেন। সম্ভবত সেখান থেকে অবসর নেওয়ার পরে দু’জনেই দুটি সাহিত্য পত্রিকা প্রকাশ করেছিলেন। জিলস্নুর রহমান সিদ্দিকী তখনকার জনপ্রিয় পত্রিকা সংবাদের পৃষ্ঠপোষকতায় প্রকাশ করেন দীপঙ্কর আর মুসত্মাফা নূরউল ইসলাম নিজের উদ্যোগে বের করেন সুন্দরম। দীপঙ্কর বেশিদিন চলেনি, কিন’ সুন্দরম প্রায় দুই দশক ধরে চলেছে। এর কারণ হয়ত সিদ্দিকী সাহেব প্রধানত সাহিত্যের রসিক ও ভাবুক আর মুসত্মাফা নূরউল ইসলাম এর সাথে সাহিত্যের সংগঠকও ছিলেন। ছিলেন সঙ্গপ্রিয় আড্ডাবাজ মানুষ।
মুসত্মাফা নূরম্নল ইসলাম অধ্যাপনা ও সাহিত্যের গ-ি ছাপিয়ে কেবল সাহিত্য পত্রিকা প্রকাশ ও সম্পাদনার কাজই করেননি, আরও সাংগঠনিক ও প্রশাসনিক কাজও করেছেন। জিলস্নুর রহমান সিদ্দিকীও মূলত কবি এবং সাহিত্যের অন্দরমহলের মানুষ হলেও উপাচার্য পদ ও তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টার পদসহ নানা প্রশাসনিক দায়িত্ব পালন করেছেন। মুসত্মাফা নূরউল ইসলাম অধ্যাপনার বাইরে বাংলা একাডেমি ও শিল্পকলা একাডেমীর পরিচালকের দায়িত্ব পালন করেছেন (তখনো সম্ভবত প্রতিষ্ঠান প্রধানের পদটি মহাপরিচালকে উন্নীত হয়নি)। এছাড়া জাতীয় জাদুঘরের ট্রাস্টি বোর্ডের সদস্য ও সভাপতির দায়িত্বও পালন করেছেন।
তবে মুসত্মাফা নূরউল ইসলাম টেলিভিশনের একজন জনপ্রিয় ব্যক্তিত্ব ছিলেন। তাঁর উপস’াপনায় রীতিমত সেমিনারও অত্যনত্ম আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছিল। তাঁর সঞ্চালনায় বিটিভির মুক্তধারা অনুষ্ঠানটি অতিথি বক্তাদের মুক্ত আলোচনায় প্রাণবনত্ম ছিল। সেই আশির দশকে শুরম্ন করে তিনি দীর্ঘদিন এক ঘণ্টার এ আলোচনা অনুষ্ঠান চালিয়ে গেছেন। তিনি নিজে সূত্রধরের কাজ করতে গিয়ে আলোচনাকে বেশ সরস ও সজীব করে রাখতেন। বাগভঙ্গির বিশিষ্টতা তাঁর ব্যক্তিত্বকে স্বাতন্ত্র্যম-িত করে দিয়েছিল। স্পষ্ট উচ্চারণে মার্জিত ভাষণে তিনি শ্রোতাদের আকৃষ্ট করতেন। এই একই আঙ্গিকে কথামালা নামে অনুষ্ঠান করে গেছেন বেসরকারি চ্যানেলে প্রায় মৃত্যুর আগে পর্যনত্ম।
মুসত্মাফা নূরউল ইসলাম ছিলেন দেশভাগের পরে অর্থাৎ সদ্য স্বাধীন পাকিসত্মানের পূর্বাংশে যে নবজাগরণের সূচনা হয়েছিল তার তরম্নণ তুর্কিদের একজন। গত শতকের পঞ্চাশের দশকে ভাষা আন্দোলনের পরে যারা বাংলাভাষা ও সাহিত্যের মাধ্যমে ধর্মীয় জাতীয়তার বিপরীতে ধর্মনিরপেড়্গ বাঙালি জাতীয়তার বীজ বুনেছিলেন তিনিও তাঁদেরই একজন ছিলেন। ১৯৫৭ সালে মওলানা ভাসানীর উদ্যোগে আয়োজিত বিখ্যাত কাগমারি সম্মেলনে তিনি একজন নিবিষ্ট কর্মী ছিলেন। প্রথম জীবনের এই বীজ তাঁর পরিণত জীবনে ভালোভাবে ফুটে উঠেছিল, বিশেষভাবে যখন বাংলাদেশ দিনে দিনে ধর্মান্ধতা ও পশ্চাৎপদ চিনত্মায় আচ্ছন্ন হয়ে পড়ছিল তখন তিনি মুক্তবুদ্ধির মশাল হাতে সামনের কাতারে অবস’ান নিয়েছিলেন।
তাঁদের পিতা সাদাত আলী আখন্দ পুলিশ বিভাগে কাজ করতেন। সেই সুবাদে বাংলার নানা শহরে তাঁর প্রথম জীবন কেটেছে। চট্টগ্রামে শৈশবের কিছুকাল কেটেছে, প্রথম তারম্নণ্যে কলকাতায় ছাত্রজীবন কাটিয়েছেন। আবার নিজের চাকুরি জীবনেও নানা জায়গার অভিজ্ঞতা হয়েছে তাঁর – করাচি-ঢাকা-রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে শিড়্গক রূপে, বাংলা একাডেমি-শিল্পকলা একাডেমির প্রধান হিসেবে। অভিজ্ঞতা তাঁর মানস ও মননকে সমৃদ্ধ করেছে, পঞ্চাশ-ষাটের দশকের নানান রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক আন্দোলন থেকে সংস্কারমুক্ত প্রগতিচেতনা প্রেরণা পেয়েছেন।
তাঁর সাথে ঘনিষ্ঠতার সুযোগ আমার হয়নি, তবে একাধিকবার তাঁর মুক্তধারা অনুষ্ঠানে অংশ নিয়েছি তাঁরই আমন্ত্রণে। কাছের স্বল্প অভিজ্ঞতা আর দূরের পর্যবেড়্গণে মনে হয় মুসত্মাফা নূরউল ইসলাম মানুষ ও মানুষের সঙ্গ ভালোবাসতেন, ভালোবাসতেন সহকর্মী ও ছাত্রদের সাথে সময় কাটাতে। তিনি বলতে যেমন ভালোবাসতেন, তেমনি অন্যের শোনাতেও আগ্রহ ছিল তাঁর। সরল সহজ বুদ্ধি ও বিবেচনায় তিনি বাংলাদেশের মূলধারায় অবস’ান করেছেন।
তবে দিনে দিনে সময় পাল্টেছে, নানাভাবে জটিল হয়েছে জীবন, দেশের ও বিশ্বের পরিসি’তি আমূল পাল্টে গেছে, জীবনে অনেক গুণগত পরিবর্তন এসেছে। এ পরিবর্তন মানুষের বাহ্য জীবনে যেমন তেমনি চিনত্মার জগতেও রূপানত্মর ঘটিয়েছে। সেকালের আদর্শ ও জীবনবোধ নিয়ে এ সময়ের সঙ্গে এঁটে ওঠা কঠিন। গত শতকের পঞ্চাশের দশকের প্রগতিচেতনা, ষাটের দশকের বাম চিনত্মাধারা বা পরবর্তীকালের আধুনিক-উত্তরাধুনিক ভাবনার জগৎকে ছাপিয়ে নতুনতর নানা মাত্রায় জীবনে অনেক জট তৈরি হয়েছে। তার সহজ সমাধান নেই। হয়ত সেই পরিসি’তিতে দীর্ঘ জীবনের দীর্ঘ গোধূলিবেলায় মুসত্মাফা নূরউল ইসলাম কথা বলাই শ্রেয় মনে করেছেন। বলেছেন নানা সময়ে বিচিত্র প্রসঙ্গে বিভিন্ন কথা, লিখেছেন কম। যেন সংস্কৃত প্রবচনটি মেনে চলেছেন তিনি – শতং বদ মা লিখ, শতবার বলবে কিন’ লিখে নয়। তিনি তো কথা বলতে জানতেন, কথার শিল্প তাঁর আয়ত্তে ছিল, কিন’ আজকাল প্রগল্‌ভতার জোয়ার এসেছে। ফলে তাঁর মৃত্যুতে রম্নচিশীল সহজাত কথকের অভাব খুব বোধ হবে। সেই শূন্যতা আরো বড় ও প্রকট হয় কথক যখন মুক্তবুদ্ধির উদার মানবতাবাদী মানুষ হন। সংবাদপত্র, টেলিভিশন পাড়া, বিশ্ববিদ্যালয়ে, বাংলা একাডেমি ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনে তাঁর অভাব বোধটা আরও তীব্র হবে কারণ এখন চিনত্মা আড়ষ্ট ও আবদ্ধ হয়ে পড়েছে, নানা সংকীর্ণতায় সমাজজীবন আচ্ছন্ন আর মানবতা নানাভাবে লাঞ্ছিত হচ্ছে। এ সময়ে তাঁর নবতিপর বয়সে প্রস’ানকেও অকাল ও অসময় মনে হচ্ছে। কারণ সত্যিই তো রম্নচি, মনন, মুক্তচিনত্মা ও সুস’ জীবনবোধের আকাল চলছে দেশে, মানবচেতনার মাপকাঠিতে সমাজে চলছে দুঃসময়।