তদন্ত নিয়ে অস্বস্তিতে পুলিশ!

মোহাম্মদ রফিক
sudipta

ছাত্রলীগ নেতা সুদীপ্ত বিশ্বাসের খুনিদের ৬ দিনেও গ্রেফতার করতে পারেনি পুলিশ। আসামি ধরতে গিয়ে এক পা এগিয়ে দুই পা পিছিয়ে যাচ্ছেন তারা। তদন্ত নিয়েও এক ধরনের অস্বস্তিতে নগর পুলিশ কর্মকর্তারা। এ নিয়ে পরস্পরবিরোধী বক্তব্য দিচ্ছেন তারা।
সিএমপির অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশন) সালেহ মো. তানভীর বলছেন, সুদীপ্ত’র খুনিরা চিহ্নিত। কিন’ মামলার তদন্ত কর্মকর্তা সদরঘাট থানার ওসি (তদন্ত) রুহুল আমীন বলছেন, ‘খুনিরা চিহ্নিত হয়নি এখনো। ঘটনাস’লের আশপাশের এলাকা থেকে সিসিটিভি’র ফুটেজ পাওয়া গেলেও তা স্পষ্ট নয়।’
অন্যদিকে সুদীপ্ত হত্যা মামলার অগ্রগতি বিষয়ে গতকাল বিকালে জানতে চাইলে অস্বস্তি প্রকাশ করেন সদরঘাট থানার ওসি মর্জিনা আকতার। এসময় খেদের সুরে উল্টো সাংবাদিকদের কাছে সুদীপ্ত খুনের তথ্য চান তিনি।
সুদীপ্ত খুনের তদন্ত নিয়ে অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার সালেহ মো. তানভীর বলেছেন, খুনিরা চিহ্নিত। তাদের গ্রেফতারে অভিযান চলছে। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা বলছেন, খুনিরা এখনো চিহ্নিত হয়নি। এরকম পরস্পর বিরোধী বক্তব্য কেন? এ প্রশ্নের
উত্তরে ওসি মর্জিনা বলেন, ‘আপনাদের (প্রতিবেদক) কাছে তথ্য থাকলে পুলিশকে দেন। আপনারা এখানে (থানায়) ১০০ জন সাংবাদিক আনেন। কেউ সত্যটা লিখতে পারবেন না। ’
গণমাধ্যমের খবর, সুদীপ্ত খুন হয়েছে লালখানবাজার ওয়ার্ডের এক আওয়ামী লীগ নেতার নির্দেশে। ওই নেতার ব্যাপারে আপনাদের অবস’ান কী? জানতে চাইলে ওসি মর্জিনা আকতার বলেন, ‘কোনো নেতা-টেতা বুঝি না। তদন্তে যারাই আসবে ছাড় দেয়া হবে না।’
এদিকে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা সদরঘাট থানার ওসি (তদন্ত) রুহুল আমীন গতকাল মঙ্গলবার সুপ্রভাতকে বলেন, ‘ঘটনাস’লের কাছে কিছু সিসিটিভির ফুটেজ পাওয়া গেছে। তবে তা স্পষ্ট নয়। খুনিদের চিহ্নিত করা যাচ্ছে না। তবে খুব শিগগির একটা ফলাফল পাব। তখন আপনাদের ডেকে এনে ব্রিফ করব।’
অনুসন্ধানে জানা গেছে, ঘটনাস’ল দক্ষিণ নালাপাড়া থেকে নিউমার্কেট মোড় পর্যন্ত সদরঘাট রোডে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের অন্তত ৮টি সিসি ক্যামেরা রয়েছে। এর মধ্যে ঘটনাস’লের একেবারে কাছে আছে ইউসিবি ব্যাংকের দুটি, স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংকের একটি, মার্কেন্টাইল ব্যাংকের একটি সিসি টিভি ক্যামেরা। এছাড়া দক্ষিণ নালাপাড়া গলি থেকে উত্তরে বিএসআরএম’র দুটি, ফার্স্ট সিকিউরিটি ব্যাংকের একটি এবং নিউমার্কেট মোড়ে র্যাংগস শো-রুমে একটি সিসি ক্যামেরা রয়েছে।
ঘটনাস’লের আশপাশে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ৮টি সিসি ক্যামেরা থাকলেও এর মধ্য থেকে কয়টি প্রতিষ্ঠানের ফুটেজ সংগ্রহ করা হয়েছে তা স্পষ্ট করে বলছেন না ওসি (তদন্ত) রুহুল আমীন। তবে সংশ্লিষ্ট একাধিক প্রতিষ্ঠানের সাথে কথা বলে জানা গেছে, ইতোমধ্যেই অধিকাংশ প্রতিষ্ঠান থেকে সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ করেছে পুলিশ।
সদরঘাট থানা পুলিশের এক কর্মকর্তার দাবি, এসব ফুটেজে কতটি সিএনজিচালিত অটোরিকশা ও বাইক নিয়ে খুনিরা ঘটনাস’লে এসেছে এবং সুদীপ্তকে পিটিয়ে নির্বিঘ্নে চলে গেছে তা স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে।
গতকাল মঙ্গলবার বিকালে কার্যালয়ে গিয়ে জানতে চাইলে ইউসিবি ব্যাংক’র ভাইস প্রেসিডেন্ট ও সদরঘাট শাখা প্রধান মো. আবদুল আহাদ সুপ্রভাতকে বলেন, ‘পুলিশ আমাদের কাছ থেকে সিসিটিভির ফুটেজ নিয়ে গেছেন এবং ওই ফুটেজ স্পষ্ট। এসময় ব্যাংকে সংরক্ষিত থাকা ৬ অক্টোবরের সিসিটিভির ফুটেজটি এ প্রতিবেদক দেখতে চাইলে অপরাগতা প্রকাশ করেন শাখা প্রধান আবদুল আহাদ। এসময় শাখা প্রধানের পাশে থাকা টিভির মনিটরে এ প্রতিবেদক লক্ষ্য করেন, ব্যাংকটির ভেতরে ও বাইরে ১২-১৩টি সিসি ক্যামেরা রয়েছে। এর মধ্যে দুটি বাইরে এবং ফুটেজগুলোও স্পষ্ট।
ঘটনাস’লের বিপরীতে মার্কেন্টাইল ব্যাংকের প্রথম সহকারী ভাইস প্রেসিডেন্ট ও শাখা প্রধান নিজাম উদ্দিন মো. মামুন বলেন, ‘ঘটনার সময় আমি ঢাকায় ছিলাম। আসার পর পুলিশ মৌখিকভাবে ব্যাংকের সিসিটিভির ফুটেজ চেয়েছে। ফুটেজ চেয়ে পুলিশ যথাযথ পদ্ধতিকে আমাদের কাছে আবেদন করলে আমরা কর্তৃপক্ষের অনুমতি নিয়ে তা সরবরাহ করব।’
অন্যদিকে স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংকের এক কর্মকর্তা জানান, ঘটনাস’লের আশপাশে স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংকেরসহ নিউমার্কেট পর্যন্ত বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে লাগানো সিসিটিভি ফুটেজ পুলিশ সংগ্রহ করেছে। তবে এ কথা অস্বীকার করছেন সিএমপির কর্মকর্তারা। পুলিশ সূত্র জানায়, সুদীপ্ত খুনের ঘটনায় অংশ নেন ৭-৮ জন। ঘটনার সময় আরো ৩০-৩৫ জন যুবক নিউমার্কেট মোড় ও সিটি কলেজ সংলগ্ন কালীবাড়ি মন্দির মোড়ে অবস’ান করছিলেন। সুদীপ্তকে পিটিয়ে চলে আসার সময় তিনটি ফাঁকা গুলি করেন তারা।
গত ৬ অক্টোবর সকাল সাড়ে ৭টার দিকে দুই যুবক বাসায় এসে সুদীপ্তকে জানান, এক বন্ধুর বাবা মারা গেছেন। খবরটি শুনেই তাদের সঙ্গে বেরিয়ে যান সুদীপ্ত। এর ১০ মিনিট পর চিৎকার শুনে তার মা বাসা থেকে বেরিয়ে গলির মুখে যান। বাসা থেকে ওই পথের দূরত্ব প্রায় ১০০ ফুট। সেখানে রাস্তার পাশে ছেলেকে অচেতন অবস’ায় পড়ে থাকতে দেখেন তিনি। পরে তাকে উদ্ধার করে চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখানে বেলা সাড়ে ১১টায় মারা যান সুদীপ্ত।