‘বিজ্ঞাপন নীতিমালা’ মন্ত্রণালয় কর্তৃক অনুমোদন হয়নি এখনো

ডিজিটাল বিলবোর্ড বসছে জামালখানে!

মোহাম্মদ আলী

সাধারণ বিলবোর্ডের উচ্ছেদের পর একটি ডিজিটাল বিলবোর্ড নগরীর জামালখান মোড়ে বসানো হচ্ছে। এটাকে অনুমোদনও দিয়েছে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন (চসিক)। চসিকের কর্মকর্তারা এটাকে বলছেন ডিসপ্লে বোর্ড। আর স্থানীয় কাউন্সিলর এটাকে টিভি বলে অভিহিত করছেন। ডিজিটাল বিলবোর্ড বা ডিসপ্লে বোর্ড বা টিভি যায়ই হোক না কেন, তা নগরীর সৌন্দর্যকে গ্রাস করবে বলে নগর পরিকল্পনাবিদরা মনে করছেন। এছাড়াও নতুন ‘বিজ্ঞাপন নীতিমালা’ চসিকের সাধারণ সভায় এবং স্থানীয় সরকার কর্তৃক অনুমোদন না হওয়া সত্ত্বেও এ ধরনের ডিজিটাল বিলবোর্ড স্থাপন বিলবোর্ড অপসারণের মাধ্যমে মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীনের অর্জিত সুনাম প্রশ্নবিদ্ধ হবে বলেও সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
উল্লেখ্য, পেস্টিং পদ্ধতির পরিবর্তে ইলেকট্রনিক পদ্ধতিতে তৈরি করা হলে তাকে ডিজিটাল বিলবোর্ড বলা হয়।
জানা গেছে, ইতিমধ্যে এ ডিজিটাল বিলবোর্ড স্থাপনের জন্য জামালখান মোড়ে দুটি পিলার (খাম্বা) বসানো হয়েছে। তৈরি করা হয়েছে বক্স। আগামী কয়েক দিনের মধ্যে চায়না থেকে বাকি উপকরণও চলে আসবে। ডিসেম্বরের মধ্যেই জামালখান মোড়ে এ ডিজিটাল বিলবোর্ডটি স্থাপনের কাজ শেষ হবে। ঢাকার একটি কোম্পানি এটি স্থাপনের কাজ করছে। বিদেশ থেকে আসার পর জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহে সিটি মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীন এটি উদ্বোধন করবেন বলে কথা রয়েছে। চসিকের আহ্বান করা দরপত্রের মাধ্যমে ৩৫ লাখ টাকার ডিজিটাল বিলবোর্ডটি স্থাপনের কাজ পেয়েছে স্ট্রিচ টোন নামের একটি প্রতিষ্ঠান। এই প্রতিষ্ঠানটির মালিক জামালখান ওয়ার্ডের কাউন্সিলর শৈবাল দাশ সুমন বলে জানা গেছে। ১৬২ বর্গফুটের এ বিলবোর্ডের দৈর্ঘ্য ১৮ ফুট এবং প্রস্থ ৯ ফুট। এ বিলবোর্ড থেকে পর্দার আকার অনুসারে প্রতি মাসে প্রায় এক থেকে দেড় লাখ টাকা ট্যাক্স পাবে সিটি করপোরেশন।
ব্যবসায়ীক উদ্দেশ্যে নয়, বরং সৌন্দর্য বর্ধন এবং পুরো ওয়ার্ডকে ডিজিটাল করার জন্যই এ টিভিটি (ডিজিটাল বিলবোর্ড) স্থাপনের কাজ করছেন বলে জানান জামালখান ওয়ার্ডের কাউন্সিলর শৈবাল দাশ সুমন। তিনি গতকাল শনিবার সুপ্রভাতকে বলেন, ‘এটাকে ডিজিটাল বিলবোর্ড বলা যেতে পারে। আমরা নীতিমালার বাইরে কিছু করিনি। শুধু ফুল দিয়ে একটি ওয়ার্ডকে সৌন্দর্যের আওতায় আনা যায় না। আইল্যান্ড, টেরাকোটা, যাত্রী ছাউনি, টাইলসের ফুটপাত, বাগান, বার্ডজোন, একোরিয়াম ইত্যাদির সাথে এরকম একটি টিভি প্রয়োজন-যদি ওয়ার্ডটিকে ডিজিটাল ওয়ার্ড বানাতে চাই। এ প্রকল্পের চসিককে বড় ধরনের ট্যাক্স দিতে হবে। তাই এটি একটি অলাভজনক প্রজেক্ট। শুধুমাত্র অর্থ উপার্জনের জন্য এটি স্থাপন করা হচ্ছে না। ব্যবসায়িক উদ্দেশ্য থাকলে এটি আমরা রাস্তার মাঝঝানে বসাতাম। আমাদের উদ্দেশ্য শতভাগ সৎ। ফুটপাতের পাশে এটি বসানো হচ্ছে। এটি আকাশ ঢাকবে না।’
তিনি জানান, এ টিভি প্রতিদিন সন্ধ্যা ছয়টা থেকে রাত দশটা পর্যন্ত চালানো হবে। এতে সিটি করপোরেশনের উন্নয়ন কাজ, জামালখান ওয়ার্ডের উন্নয়ন কাজ, জিওগ্রাফি চ্যানেল, খেলাধুলা, শিক্ষণীয় বিষয়, জাতীয় দিবসগুলোতে সিনেমা, গান, প্রামাণ্য চিত্র দেখানো হবে। এর মাঝে-মাঝে বিজ্ঞাপন দেখানো হবে। এ ধরনের কাজে কেউ বিরোধিতা করলে উদ্যোক্তারা আশাহত হবেন।’
উল্লেখ্য, ‘বিলবোর্ড স্থাপনের ‘ধারা’ থাকায় ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়ে গত ২০ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত ২৬তম সাধারণ সভায় অনুমোদিত হয় নি চসিকের বিজ্ঞাপন নীতিমালা। বিষয়টি সুপ্রভাতকে চসিকের একাধিক কাউন্সিলর নিশ্চিত করেছিলেন। তারা বলেছিলেন, ‘বিলবোর্ড’ অংশের ধারা সংশোধন করে পরবর্তীতে এই নীতিমালা আবারো সাধারণ সভায় উত্থাপিত হওয়ার কথা’।
বিজ্ঞাপন নীতিমালা সাধারণ সভায় পাশ হওয়া না হওয়া কোন ব্যাপার নয় বলে চসিকের রাজস্ব বিভাগের এক কর্মকর্তা সুপ্রভাতকে জানান। নাম প্রকাশ না করার শর্তে তিনি বলেন, ‘যে কেউ প্রস্তাব দিলে গেজেট অনুসারে দরপত্রের মাধ্যমে এ ধরনের ডিজিটাল বিলবোর্ড স্থাপন করতে পারে।’
এছাড়া চসিকের বিজ্ঞাপন নীতিমালা এখনো মন্ত্রণালয় অনুমোদন করেনি বলেও জানান তিনি।
তবে বিজ্ঞাপন ‘নীতিমালা’ সাধারণ সভায় পাশ হয়েছে বলে দাবি করেছেন চসিকের প্রধান নগর পরিকল্পনাবিধ একেএম রেজাউল করিম। তিনি গতকাল শনিবার রাতে সুপ্রভাতকে বলেন, ‘বিজ্ঞাপন নীতিমালা তৈরি করে আমরা ইতিমধ্যে মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়ে দিয়েছি। তবে এ বিজ্ঞাপন নীতিমালায় বিলবোর্ড বলতে কোন শব্দ নেই। নগরীতে কোন বিলবোর্ড হবে না। নতুন বিজ্ঞাপন নীতিমালায় ডিসপ্লে বোর্ডের কথা বলা হয়েছে।’
বিচ্ছিন্নভাবে এ ধরনের ডিজিটাল বিলবোর্ড স্থাপনের অনুমতি দিলে তাতে বুমেরাং হতে পারে বলে মনে করেন ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন চট্টগ্রামের সাবেক সভাপতি প্রকৌশলী দেলোয়ার মজুমদার। তিনি বলেন, ‘এটাও এক ধরনের বিলবোর্ড। বিলবোর্ড স্থাপন একটি সিস্টেমের মধ্যে থাকা উচিত। না হলে তা আবার আগের মতে শহর ছেয়ে যেতে পারে। মেয়র মহোদয় নিশ্চয়ই বিবেচনা করেই অনুমোদন দিয়েছেন। এ ধরনের বিলবোর্ডগুলো যাতে আকাশ ডেকে না দেয়, পাহাড় ডেকে না দেয়, প্রকৃতি ডেকে না দেয়, তা নিশ্চিত করতে হব। অন্যথায় বিলবোর্ড অপসারণে মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীনের উদ্যোগ ভূলণ্ঠিত হতে পারে।’
উল্লেখ্য, দায়িত্ব গ্রহণের পর চট্টগ্রাম শহরকে বিলবোর্ড মুক্ত করে প্রধানমন্ত্রীসহ নগরবাসীর ব্যাপক প্রশংসা কুড়ান মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীন। বিলবোর্ড অপসারণকে নাছির উদ্দীনের বড় সাফল্য বলে মনে করা হয়। নগরীতে নতুন করে কোন বিলবোর্ড স্থাপনের অনুমতি দেওয়া হবে না মর্মে একাধিকবার সুপ্রভাতকে নিশ্চিত করেছিলেন আ জ ম নাছির উদ্দীন।