ডাইনোসর ও মানুষের গল্প

নুরুল ইসলাম বাবুল
trex-2-copy

বিজ্ঞান ক্লাসটা আজ জমে উঠেছিল। প্রতিদিনের মতোই সাইদুল স্যার পড়াচ্ছিলেন। ক্লাস শুরু হওয়ার একটু পরেই আরও একজন যোগ দিলেন। তিনি আমাদের স্বাস্থ্য ম্যাডাম। আমাদের সপ্তম শ্রেণিতে তাঁর কোন ক্লাস নেই। মাঝে মধ্যে আসেন। ক্লাসে ঢুকেই গল্প জুড়ে দেন। ঠিক গল্প বলেন না। গল্পের ছলে আমাদের নানা বিষয়ে শিক্ষা দেন। স্বাস্থ্য ম্যাডামের শরীরটা বেশ বড়। গল্পে গল্পে স্বাস্থ্য সচেতনতা নিয়ে কথা বলেন। তাই আমরা তাঁর নাম দিয়েছি স্বাস্থ্য ম্যাডাম। আসলে স্বাস্থ্য ম্যাডাম ক্লাসে ঢুকলেই আমরা চাঙা হয়ে উঠি। কোন কঠিন বিষয়কেও তিনি গল্পের ঢঙে তুলে ধরেন। ক্লাসের ছেলে-মেয়েরা নীরবে সেই গল্প শোনে।
আজ তড়িঘড়ি করে ক্লাসে ঢুকলেন স্বাস্থ্য ম্যাডাম। সাইদুল স্যার তখন ব্ল্যাকবোর্ডে হাত দিয়েছিলেন। ম্যাডাম স্যারকে কিছু না বলে দু’চোখ গোল করে তাকালেন। চোখ ঘুরালেন সমস্ত ক্লাসের দিকে। যেন কাউকে খুঁজছেন তিনি। মূহূর্তে আমার দিকে তাকিয়ে একগাল হাসি ছড়িয়ে দিলেন। তারপর বললেন, ‘নওশিন, তুই দাঁড়া।’ আমি নির্ভয়ে দাঁড়ালাম।
স্বাস্থ্য ম্যাডাম হাসির সেই রেশ টেনেই বললেন, ‘সাইদুল স্যার তোদের কী পড়াচ্ছেন?’ আমি জবাব দিলাম, ‘জলবায়ু পরিবর্তন সম্পর্কে পড়ানো শুরু করেছেন।’
ম্যাডাম দু’চোখ গোল করে আরও একবার সমস্ত ক্লাস দেখে নিলেন। তারপর সাইদুল স্যারের দিকে লক্ষ্য করে চেয়ারটা এগিয়ে দিয়ে বললেন, ‘স্যার একটু বসুন, আমি দেখছি।’ ম্যাডাম একটু পেছনে সরে গেলেন। তারপর এগিয়ে এলেন। শুরু করলেন গল্প-
‘বহু বছর আগের কথা। তখনও পৃথিবী ছিল। সূর্য ছিল। চাঁদ ছিল। এই পৃথিবীতে বাস করতো বিশাল বিশাল প্রাণী। সারা পৃথিবী চষে বেড়াত তারা। সেই প্রাণীর নাম ডাইনোসর। পৃথিবীতে খুব মজা করে বসবাস করতো। কতো বড় পৃথিবী। কত্তো খাবার। সব ছিল তাদের দখলে। কোন অশান্তি ছিল না। কোন অভাবও ছিল না। হাসি আর আনন্দে ভরা ছিল ডাইনোসরদের জীবন। দিনের পর দিন। মাসের পর মাস। বছরের পর বছর কাটতে লাগল। হঠাৎ কী যেন হতে লাগল এই পৃথিবীর!’ এটুকু বলে একটু থামলেন ম্যাডাম।
এই ফাঁকে পেছন বেঞ্চের রকি জিজ্ঞেস করল, ‘ম্যাডাম কী হতে লাগল?’ স্বাস্থ্য ম্যাডাম হাতের ইশারায় রকিকে বসতে বলে জবাব দিলেন, সব বলবো।’ রকি বসে পড়ল। যেন হঠাৎ মনে পড়েছে এমন ভঙ্গিতে ম্যাডাম বলতে শুরু করলেন, ‘হ্যাঁ, পৃথিবীর আবহাওয়ার পরিবর্তন হতে লাগল। এই পরিবর্তন ছিল অস্বাভাবিক। পুরো পৃথিবী গরম হতে শুরু করল। বিজ্ঞানীদের ধারণা প্রায় বিশ লক্ষ বছর ধরে এই ভাবে গরম হতে থাকে। এতো-এতো বছর! আবহাওয়ার এই পরিবর্তনে পৃথিবীর জলবায়ুরও পরিবর্তন ঘটে। আর তাতে ভীষণভাবে বদলে যায় এই সুন্দর পৃথিবী। বদলে যায় প্রকৃতি ও পরিবেশ। অতি তাপমাত্রায় মেরু অঞ্চলের বরফ গলে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বেড়ে যায়। ডুবে যেতে থাকে পৃথিবীর স্থলভাগ। কমে যায় বনভূমি। সেই সাথে ভয়ানক ব্যাপার ঘটতে থাকে। কমতে থাকে খাদ্য উৎপাদন। চারিদিকে অভাব। খাবার নাই। না খেতে খেতে হাড্ডিসার হয়ে যায় ডাইনোসররা। শক্তিশালী প্রাণী দুর্বল হয়ে পড়ে। না খেয়ে থাকতে থাকতে মরতে শুরু করে প্রাণীগুলো। একে একে মরে যায় সব ডাইনোসর। আজ সারা পৃথিবী খুঁজে একটা ডাইনোসরও পাওয়া যাবে না। হঠাৎ হঠাৎ মাটি খুঁড়ে পাওয়া যায় তাদের হাড়। পাওয়া যায় কঙ্কাল।’ থামলেন ম্যাডাম। আমরাও চুপ করে বসে থাকলাম। ডাইনোসরদের করুণ পরিণতির কথা শুনে সত্যি ব্যথিত হলাম। পর মূহূর্তেই আতংকিত হয়ে উঠলাম, যখন স্বাস্থ্য ম্যাডাম বলে উঠলেন, ‘আমাদেরও এমন অবস্থা হতে চলেছে।’
ম্যাডামের এই কথায় পুরো ক্লাস যেন ‘থ’ হয়ে গেল। আমরা ঝিম মেরে বসে রইলাম। আমাদের বান্ধবী রিতু জিজ্ঞেস করলো, ম্যাডাম কেন এমনটা হয়?’ ম্যাডাম বলতে শুরু করলেন, ‘সেই কথাই বলছি এখন। ডাইনোসররা জানতো না কী কারণে আবহাওয়ার অস্বাভাবিক পরির্বতন ঘটছে। তারা জানতো না কিভাবে এটা রোধ করা যায়। আমরা মানুষ। আমরা জানি এবং বুঝি।’ মাঝখান থেকে শাকিল বলে উঠল, ‘ম্যাডাম বলেন তাহলে।’ ম্যাডাম বলতে লাগলেন, ‘কার্বন ডাইঅক্সাইড, মিথেন, নাইট্রাস অক্সাইড, ক্লোরো-ফ্লোরো কার্বন প্রভুতি গ্যাসকেই ‘গ্রিনহাউস গ্যাস’ বলে। এই গ্যাস পৃথিবীর জলবায়ু পরিবর্তনের অন্যতম কারণ। আর জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে কী কী হয় জানো ?’
আমরা ক্লাসের ছেলে-মেয়েরা একবাক্যে বলে উঠলাম, ‘কী কী হয় ম্যাডাম?’ এবার ম্যাডাম দ্রুত গতিতে বললেন,‘ঝড়-জলোচ্ছ্বাস-বন্যা-নদীভাঙন-খরা-অতিবৃষ্টি-শৈত্যপ্রবাহ-র্টনেডো সব হয়। স্বাস্থ্য ম্যাডাম একদমে কথাগুলো বলে থামলেন। তারপর একটু দম নিয়ে ভয়ার্ত কণ্ঠে বললেন, ‘আমাদের সামনে বিপদ ঘনিয়ে আসছে। কেননা আগের তুলনায় বায়ুমণ্ডলে গ্রিনহাউস গ্যাসের সঞ্চার বেড়ে গেছে। আর মানুষই এর জন্যে বেশি দায়ী।’ ম্যাডামের এ কথায় আমরা সজাগ হয়ে উঠলাম। আমি সবিনয়ে জিজ্ঞেস করলাম, ‘ম্যাডাম মানুষ কেন বেশি দায়ী?’ স্বাস্থ্য ম্যাডাম দু’চোখ গোল আমার দিকে তাকালেন। কিছুক্ষণ তাকিয়েই থাকলেন। আমার কেমন যেন বিব্রত বোধ হতে লাগল। মনে মনে ভাবলাম আমি কি ভুল কিছু বলেছি। না, ভুল কিছু বলি নি। বুঝতে পারলাম ম্যাডামের জবাব শুনেই। ম্যাডাম জবাব দিলেন,‘এই যে গ্রিনহাউস গ্যাস। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি রয়েছে কার্বন ডাইঅক্সাইড। যানবাহন-কারখানা-ইটভাটার কালো ধোঁয়ায় তৈরি হচ্ছে কার্বন ডাইঅক্সাইড। এসব তো মানুষই করছে, তাই না?’
আমরা সমস্বরে জবাব দিলাম, ‘জ্বী ম্যাডাম।’ ম্যাডাম বলতে শুরু করলেন,‘পৃথিবীর তাপমাত্রা বেড়ে যাওয়ার প্রধান কারণ এই কার্বন ডাই অক্সাইড। এটাই হলো বৈশ্বিক উষ্ণায়ন। অতিকায় প্রাণী ডাইনোসর এতো কিছু বুঝতে পারতো না। আমরা মানুষ। আমরা বুঝি। আর তাই আমরাই পারব এটা রোধ করতে।’ আমরা আবারও একসাথে বলে উঠলাম,‘ম্যাডাম কিভাবে?’
ম্যাডাম কিছু সময় নিয়ে সবার দিকে তাকালেন। হয়তো আমাদের আগ্রহ আর উদ্দীপনা দেখে নিলেন।
হাসিমাখা মুখে বললেন,‘জলবায়ু পরিবর্তনের কারণ যেমন একাধিক, তেমনি রোধ করার উপায়ও অনেক। তোমরা শিশু-কিশোর। একটা কাজ তোমাদের করতে হবে।’
আমরা হৈহৈ করে বললাম, ‘কী কাজ ম্যাডাম?’ ম্যাডাম হেসে হেসেই বললেন, ‘প্রত্যেকে যার যার বাড়িতে খোলা জায়গায় গাছ লাগাবে। গাছ খাদ্য তৈরির সময় কার্বন ডাইঅক্সাইড গ্রহণ করে। তাই পৃথিবীতে যত বেশি গাছ হবে কার্বন ডাইঅক্সাইড তত কমে যাবে। এভাবেও রোধ করা যায় জলবায়ুর অস্বাভাবিক পরিবর্তন।’ ম্যাডাম থামলেন। এবার সাইদুল স্যার উঠে দাঁড়ালেন।
খুব কঠিন শপথ করার মতো করে বললেন, ‘আমাদের পৃথিবীকে আমাদেরই রক্ষা করতে হবে। প্রকৃতি ও পরিবেশ ঠিক থাকলে তবেই টিকে থাকবে মানুষ। তা না হলে পরিণতি হবে বহুকাল আগের ডাইনোসরের মতো।

আপনার মন্তব্য লিখুন