ট্রেন

সৈয়দ ইবনুজ্জামান
steam-train-at-garsdale--cumbria-john-cooke

ব্যস্ত যাত্রীরা ট্রেনের সিট ধরার জন্য যেন বাঁচা মরার যুদ্ধে নেমেছে। যারা দরজা দিয়ে ভিড়ের কারণে ঢুকতে পারছে না তারা জানালা দিয়েই ঢুকে পড়ছে। কেউ কেউ আবার ভিড়ের চাপে অর্ধমৃত প্রায়। তবুও একটা সিট চাই এমন ভাবনা নিয়ে ভিড়কে আরো বাড়াতে কিছু যাত্রী যোগ হলো একটু আগেই এক মহিলা ভিড়ে ধাক্কায় ট্রেনের দরজা থেকে নিচে পড়ে, ও মাগো! বলে চিৎকার দিলেও সে নিজে আবার নতুন উদ্যমে ভিড় ঠেলে ভেতরে ঢোকার চেষ্টা করছেন। অনেকে ভেতরে ঢুকল তবে আসন পেল না। কেউ কেউ আবার গামছা দিয়ে কিংবা ব্যাগ রেখে আসন দখল করেছে। এটা নিয়ে যাত্রীদের মধ্যে বেশ যুদ্ধ বেধেছে। এই যুদ্ধে যারা নিরীহ তাদের মুখ আছে তবে কথা নেই। তাদের কেউ কেউ মেঝেতেই বসে পড়ল। এটা কোন আন্তঃনগর ট্রেন নয় যে, টিকেট কেটেই যে কেউ আসনে বসে পড়বে। এটা লোকাল ট্রেন এখানে টিকেটের শক্তি গৌণ, শারীরিক শক্তিটাই মুখ্য। ট্রেনের দরজায় এখনো বেশ ভিড়। আসন আর খালি নেই জেনেও সবার যেন কত তাড়াহুড়ো। জামান সাহেব ভিড়ের পেছনে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে এসব দেখছেন আর বেশ মজা পাচ্ছেন আবার ভাবছেনও ট্রেনে আসন পাওয়াটা যদি এত কঠিন হয় তবে জীবনে বেঁচে থাকাটা আরো বেশি কঠিন। যদিও জীবন সবার এক নয় তবুও দিন শেষে সবার একটাই চাওয়া, সেটা হলো সুখ। জামান সাহেব এবার নিজেকে নিজে প্রশ্ন ছুঁড়লেন, তিনি কি সুখী? এসব প্রশ্ন নিয়ে মাথা ঘামানোর যথেষ্ট সময় এখন তার রয়েছে। কেননা তিনি এই ট্রেনের প্রধান চালক। তার আসন সংরক্ষিত আছে। তার সহকারী আসাদ তার পাশেই দাঁড়ানো সে অবশ্য বেশ বিরক্ত তার মতে এই ভিড় দেখার থেকে ট্রেনের চাকা দেখা ঢের ভালো। আসাদের আজ কর্মজীবনের প্রথম দিন। ট্রেনের ইঞ্জিনে উঠার জন্য সে বেশ উত্তেজিত। তবে ওস্তাদ না উঠলে সেতো উঠতে পারে না। তাই ওস্তাদের পাশেই বিরক্তিকর ভিড়ে সে খানিকটা বৃথা বিনোদন খোঁজার চেষ্টায় লিপ্ত। জামান সাহেবের বয়স পঞ্চাশ আর আসাদ পঁচিশ কিংবা ছাব্বিশ তারপরও জামান সাহেব তার সাথে ঘনিষ্ঠ হতে চাইছেন। জামান সাহেব মুখ ভর্তি সিগারেটের ধোঁয়া বাইরে বের করলেন।
আসাদ, সিগারেট খাবে?
জ্বী না ওস্তাদ, আমি এসব খাই না।
অর্ধেক শেষ হওয়া সিগারেটটা জামান সাহেব নিচে ফেলে পা দিয়ে পিষলো
ভালো, খুব ভালো, চল ইঞ্জিনে উঠবো, ট্রেন ছাড়ার সময় হয়েছে।
আসাদ সাথে সাথেই জামান সাহেবের পা ছুঁয়ে সালাম করল।
বাবা, মাকে সালাম করে এসেছ?
আসাদ এবার একদম চুপ হয়ে গেল। অনেক কিছুই সে বলতে চাইছে কিন’ কিছুই যেন মুখ থেকে বেরুচ্ছে না। তার চোখ তখন উত্তরটা জামান সাহেবকে বলে দিল।
আসাদ তোমার আজ প্রথম দিন তুমিই আজ প্রথম ইঞ্জিনে উঠবে।
আসাদ ইঞ্জিনটাকে সালাম করে নিল এরপর সে সহকারী চালকের আসনে বসলো। জামান সাহেবও প্রস’ত ট্রেন ছাড়ার জন্য। সহকারী ড্রাইভারের বিশেষ কোন কাজ নেই তবুও সে বেশ উত্তেজিত। রাত ১১ টায় হুইসেল দিয়ে ট্রেনটা ছেড়ে দিল। যারা ট্রেনের ভেতরে ঢুকতে পারেনি তারা ছাদে জায়গা নিয়েছে। রাতের বুক চিড়ে ট্রেনটা ছুটে চলেছে। জামান সাহেব ইঞ্জিনের জানালা দিয়ে বাইরে লক্ষ্য করলেন ঘুটঘুটে অন্ধকার। দুদিক দিয়েই গাছ আর গাছ। এমন দৃশ্যে জামান সাহেব অভ্যস্ত থাকলেও আসাদ নয়।
ওস্তাদ দেখেছেন? শুধু গাছ আর গাছ!
কেন তুমি কি পাখি না বাঁদর?
এমন প্রশ্নে যে কেউই রেগে যাবে কিন’ আসাদ রাগলো না।
পাখি হলে অনেক সমস্যা, বাঁদর হলে কোন সমস্যা নেই
জামান সাহেব এমন উত্তর আশা করেননি, কত কবি-সাহিত্যিকরা পাখি হতে চায়। পাখি নিয়ে অনেক গানও হয়েছে। কিন’ বাঁদরতো কেউ হতে চায়নি। ঘন অন্ধকার তাদের আষ্টেপৃষ্ঠে ধরতে চায় কিন’ হেডলাইটের আলোয় তা যেন অক্ষম।
পাখি হলে মানুষ খাঁচায় ঢুকিয়ে দেবে, নয়তো রেঁধে ভুনা করে খাবে। বাঁদর হলে এসবের ভয় থাকে না।
ভাল বলেছ।
আসলে ওস্তাদ, মানুষ পাখিকে ভালোবাসে। ভালবাসাকে সবাই নিজের দখলে রাখতে চায়, মুক্তি দিতে চায় না।
হঠাৎ একটা ঝোঁপে কিছু জোনাক জোনাকি আসাদের নজর কাড়লো। আসাদ ভাবল, ইশ! যদি ট্রেনটা এখানে থামতো তবে সে সারা রাত ধরে জোনাক আর জোনাকিদের সাথে নিজের গল্পটা বলতো। তার মায়ের গল্প, বাবার গল্প আর ছোট বোনটার গল্প। ট্রেনটা এবার লোকালয়ে আসল, রেল লাইনের সাথে ধান ক্ষেত। আর একটু দুরে মানুষের বসতি। মানুষের বসতিতে এখন বিদ্যুতের আলোয় আলোকিত। তাই দূর থেকেও তা বোঝা যায়। জামান সাহেবের ছেলেবেলার কথা মনে পড়ে। সেদিন বাজারে মা তাকে হাঁসের ডিম বেচে তা দিয়ে কেরোসিন কিনে আনতে বলে। সে তা বেচে কেরোসিন না কিনে লোভ সামলাতে না পেরে বাজার থেকে বেশ রসগোল্লা কিনে খায় এরপর তা হজম করার ঔষধ স্বরূপ মায়ের হাতে মার খায়। সেদিন সারারাত তাদের অন্ধকারে কাটাতে হয়। এখন রসগোল্লা খাওয়ার মত টাকা তার কাছে আছে তবে চাইলেও সে তা খেতে পারে না। ডাক্তারের কড়া নির্দেশ মিষ্টি জাতীয় কিছুই খাওয়া চলবে না। ট্রেনটা একটা স্টেশনে এসে থামল, রাত তখন দু’টা বাজে। স্টেশনের প্রায় দোকান বন্ধ থাকলেও একটু এগুলেই একটা ছোট ঝুপড়ি হোটেল আছে। জামান সাহেব সেটা চেনেন। আসাদকে নিয়ে সেখানেই গেলেন। দোকানদার জামান সাহেবকে চেনেন অনেক আগে থেকেই। এই স্টেশনে ট্রেন থামালেই তিনি এই দোকানে আসেন।
আস্সালামুআলাইকুম, ড্রাইভার সাব, আছেন কেমন? লগে এইডা কে?
আসাদ কে তা তো তার ইউনিফর্ম দেখেই চেনার কথা। দোকানদার তা চিনেও যে শুধু শুধু প্রশ্নটা করল তাতে আসাদ কিঞ্চিৎ বিরক্তই হলো। লোকে কথা খুঁজে না পেলে ছুতো ধরে কথা বলে এই যেমন কেউ যদি বাজারের ব্যাগ নিয়ে রাস্তা দিয়ে হেঁটে যায় লোকে তখন হাতে বাজারের ব্যাগ দেখা সত্ত্বেও জিজ্ঞেস করবে, ভাই কি বাজারে যাচ্ছেন? এ দোকানে রুটি আর ডিম ভাজি ছাড়া আর কিছুই নেই। জামান সাহেবকে একটা রুটি আর একটা ডিম ভাজি আর আসাদকে ৬টা রুটি আর দুটা ডিমভাজি দেওয়া হল। আসাদ যে খাবার দেখে অবাক হল তা সে বুঝতে পারল।
আমার ছেলে দুটো ডিম ভাজি আর ৬টা রুটি ছাড়া কখনো নাস্তা করে না। আর তুমি তো আমার ছেলের মত।।
আসাদের এখন জানতে ইচ্ছে করছে তার ছেলে সর্বোচ্চ কয়টা রুটি ও ডিম ভাজি খেতে পারে। ভদ্রতার খাতিরে তা সে চেপে যায়।
বাবা, মা মারা গেল কি করে?
আসাদ একটু চুপ থাকলেও পরে জবাব দেয়,
বাবা ছোটবেলায় কেমন করে মারা গিয়েছিল তা মনে নেই। তবে শুনেছিলাম যক্ষ্মা হয়েছিল। তারপর ছোট বোনটা মারা গেলে মা আরেকজনকে বিয়ে করে নেয়। প্রথমে সৎবাবার কাছে থাকলেও যখন বুঝতে পারি উনি আমায় সহ্য করতে পারেন না তখন চাচার কাছে চলে আসি। ওখানেই মানুষ। চোখটা একটু ভিজে গিয়েছে তার। একটা রুটি আর একটা ডিমের বেশি সে খেতে পারল না। জামান সাহেব বাকি খাবারটা প্যাকেটে ভরে ইঞ্জিনে উঠল। ট্রেনটা আবারো দ্রুতবেগে ছুটে চলছে। সামনে আখাউরা এলেই তাদের গন্তব্য শেষ। আসাদ বারবার পানি খাচ্ছে। জামান সাহেব তার কাছে থাকা সেই রুটি আর ডিম ভাজি তাকে খেতে বললেন প্রচণ্ড খিদেতে এক কথায় সে তা খেয়ে নিল। খাওয়ার পর জামান সাহেবের ছেলের নাশতার তালিকা শুনে সে মনে মনে দৈত্যের একটা আকার এঁকে নিল।
ওস্তাদ আপনার ছেলের নাম কি? কি করে সে?
প্রশ্নটা সাধারণ হলেও জামান সাহেব তার দিকে সাধারণ দৃষ্টিতে তাকালেন না। খানিকটা ক্ষোভ আর খানিকটা অশ্রু তার চোখে মুখে ভেসেছিল এ যেন খানিকটা রৌদ্রের মাঝে একটু বৃষ্টি। আসাদ খানিকটা ভয় পেল। তবে কি তার ওস্তাদ বুঝে গিয়েছে তার মনে আঁকা তার ছেলের দৈত্য আকৃতির আকার।
আসাদ তুমি আমার সিটে এসে ট্রেনটা চালাতে পারবে?
উত্তেজিত আসাদ বলে উঠলো, জ্বী ওস্তাদ একশবার পারব!
জামান সাহেব আসাদের সিটে বসে সিগারেট খাচ্ছেন আর তার ধোঁয়া বাইরে ছাড়তেই তা বাতাসে কোথায় যেন উড়ে যাচ্ছে।
বিয়ে করেছ?
না ওস্তাদ।
মুচকি হেসে জামান সাহেব বললেন, মেয়ে দেখবো নাকি?
পুরো পৃথিবীর লাজুক মেঘ যেন তখন তার মুখে আশ্রয় নিয়েছে। ক্ষীণ স্বরে সে বলল, একজনকে ভালো লাগে। আসাদ সাহেব এবার জোরে হেসে বললেন, শুধু ভালো লাগা না ভালোবাসা? ট্রেনের হেডলাইটের আলোয় একটু দূরেই একজনকে দেখা যাচ্ছে। যে রেল লাইনের উপরে বসে আছে। আসাদ বারবার হুইসেল দিচ্ছে। কিন’ সে সরছে না। তার ওস্তাদ আরেকটা সিগারেট ধরাতে ধরাতে বললেন, মেরে দাও! তিনি মোবাইলে গান বাজিয়ে চোখ বন্ধ করে তা শুনছিলেন আর কিছুক্ষণ পরপর মুখভর্তি ধোঁয়া ছাড়ছেন।
না ওস্তাদ আমি পারব না!
চোখে মুখে রক্ত জাগিয়ে চিৎকার করে বললেন, মেরে দাও। মুহূর্তেই ট্রেনটা মানুষটাকে কেটে চলে গেল। জামান সাহেব এর আগে এমন অনেক মানুষ কেটেছেন।
নাও, সিগারেট টানো।
সিগারেটটা মুখে দিতেই আসাদ জানালা দিয়ে বমি করে দিল। আসাদকে তার সিটে বসিয়ে জামান সাহেব নিজেই ট্রেনটা চালিয়ে আখাউড়া পর্যন্ত নিয়ে গেল। তাদের গন্তব্যস’লে তারা পৌঁছে গিয়েছে। আসাদ কেমন যেন হয়ে গিয়েছে। তাকে জামান সাহেব বোঝাতে চেষ্টা করছেন ট্রেন চালাতে গেলে এমনটা হবেই। কিন’ সে কিছুতেই মানছে না। ঘটনাটা লাকসামের দিকে ঘটেছিল। তাহলে লাশ নিশ্চয় লাকসাম স্টেশনের নিরাপত্তা বাহিনীর ফাঁড়িতেই থাকবে। এমনটা ভেবে সে তার ওস্তাদকে তার সাথে লাকসাম যাওয়ার জন্য অনুরোধ করে। আসাদের এমন অবস’া দেখে সে এক কথাতেই রাজি হয়ে যায়। বাসে চড়ে তারা ভোর ভোর থাকতেই লাকসাম স্টেশনে পৌঁছে গেল। সত্যি সত্যি লাশটা নিরাপত্তা বাহিনীর ফাঁড়িতেই পড়ে আছে। মুখটাসহ পুরো শরীর থেতলে গিয়েছে চেনার কোন উপায় নেই। আসাদ আরো ভেঙে পড়েছে লাশ দেখে। জামান সাহেব বেশ বিরক্ত এই ছেলের আচরণে যেন তার আত্মীয়কে সে মেরেছে। হাবিলদার একজন এসে লাশের পেছনে লাথি মেরে বলল, শালা, মরণের আর জায়গা পাইলি না! সবার অগোচরে জামান সাহেবের চোখ লাশের পাশে পড়ে থাকা একটা মানিব্যাগের দিকে পড়ল। হাবিলদারের লাথিতেই লাশের প্যান্ট থেকে মানিব্যাগটা পড়েছে। কেন জানি জামান সাহেব মানিব্যাগটা তুলে নিয়ে ভেতরটা দেখতে লাগলেন, ভেতরে একটা ফটো যেখানে সে, তার স্ত্রী, আর তার ছেলে একসাথে সোফার উপর বসে আছে। ফটোতে জামান সাহেবের মুখটা কাল বল পয়েন্টের কালি দিয়ে কাটা। জামান সাহেব মুঠোফোনের মাধ্যমে তার স্ত্রীকে পেতে চেষ্টা করছেন, খানিকবাদে পেয়েও গেল। তার কণ্ঠ কাতর হয়ে আসছিল নিজেকে সামলে নিল সে।
তোমার ছেলের এই বদ অভ্যাসটা এখনো গেলো না। ভোর পেরিয়েছে তবুও লাটসাহেব এখনো ঘুমোচ্ছে। আমার উপর রাগ করে বাড়ি থেকে বেরিয়ে গিয়েছিল। আজকে হাতে নাতে পেয়েছি, তবে আমার ডাকে ও উঠবে না হয়ত আমার উপর রাগ এখনো কমেনি।
এর বেশি কথা বলার শক্তি জামান সাহেবের আর নেই। জামান সাহেব ছেলের লাশের কাছে গিয়ে নিজেকে সামলানোর চেষ্টা করছেন। তবুও টপটপ করে চোখ বেয়ে নোনা পানি ছেলের লাশের উপর পড়ছে। এ দৃশ্য আসাদের চোখ এড়াতে পারল না।
ওস্তাদ, আপনি একে চেনেন?