ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা নগরে সড়কে ফেরেনি শৃঙ্খলা

মোহাম্মদ রফিক

নিরাপদ সড়কের দাবিতে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের সময় চট্টগ্রামসহ সারাদেশে চালকের মধ্যে ট্রাফিক আইন মেনে চলার প্রবণতা দেখা গিয়েছিল। সরকার দাবি মেনে নেয়ায় ইতোমধ্যে শিক্ষার্থীরা ক্লাসেও ফিরে গেছে। কিন’ শৃঙ্খলা ফিরেনি নগরের সড়কে। চলছে সেই আগের নৈরাজ্যকর পরিসি’তি। যত্রতত্র যাত্রী উঠানামা। উল্টো পথে গাড়ি চালানো। যাত্রী তোলার জন্য গাড়ির প্রতিযোগিতা। গাড়ি চালানোর

সময় মোবাইল ফোনে চালকের কথা বলা। কিছু পুলিশ সার্জেন্ট ও টিআই কাগজপত্র মেয়াদোত্তীর্ণ হওয়া সত্ত্বেও বেশকিছু সিএনজি অটোরিকশা মাসিক ‘চুক্তিতে’ নগরে চালাতে সহযোগিতা করার অভিযোগও উঠেছে।

গতকাল বেলা ১টা থেকে বিকাল সাড়ে তিনটা পর্যন্ত নগরের অক্সিজেন, আতুরার ডিপো, মুরাদপুর, বহদ্দারহাট, আখতারুজ্জামান ফ্লাইওভার, জিইসি ও ওয়াসা মোড় এলাকায় সরেজমিন পর্যবেক্ষণ করে সড়কে নৈরাজ্য পরিসি’তির চিত্র দেখতে পান এ প্রতিবেদক। বৃহস্পতিবার (৯ আগস্ট)। বেলা ১টা ৪৩ মিনিট। অক্সিজেন মোড়। একটি অটোরিকশা (চট্টগ্রাম-থ-১২-৯৪৮৬) যাত্রীর জন্য দাঁড়িয়ে আছে রাস্তার মাঝখানে। এসময় অটোরিকশাটির পেছনে আরও ছয়টি অটোরিকশা রাস্তায় দাঁড়িয়ে সেগুলোর চালক ‘হাটহাজারী, ফটিকছড়ি’ বলে যাত্রীদের ডাকছেন। অথচ কাছেই দায়িত্ব পালন করছেন কালাম, আশরাফুল ও নাজিম নামে তিন ট্রাফিক পুলিশ কনস্টেবল। মোড়ে যানজট লেগে গেলেও সেদিকে খেয়ালই নেই ট্রাফিক পুলিশের।
যাত্রীর জন্য রাস্তার মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা ঠিক কিনা প্রশ্ন করলে সিএনজি অটোরিকশা (চট্টগ্রাম-থ-১১-৬২২০) আমীন বলেন, ‘এটা অবৈধ।’ তাহলে কেন দাঁড়ালেন জানতে চাইলে নীরব থাকেন আমীন। ১টা ৪৮ মিনিটে দেখা গেছে, অক্সিজেন মোড়ে রাস্তার মাঝখানে দাঁড়িয়ে যাত্রী উঠানামা করছিল চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়গামী বিআরটিসির’র দ্বিতল বাস (ঢাকামেট্রো-ব-১১-৬০৯৮)। নিয়ম না মেনে যাত্রী উঠানামা করছেন কেন জানতে চাইলে চালক উত্তর না দিয়ে বাস টান মেরে চলে যান। এসময় এ মোড়ে তিন পুলিশ কনস্টেবল কতর্ব্য পালন করলেও রাস্তায় দেখা যায়নি কোনো পুলিশ সার্জেন্ট। অটোরিকশা ও বাস সড়কের মাঝখানে দাঁড়িয়ে যাত্রী তোলা প্রসঙ্গে ট্রাফিক পুলিশ কনস্টেবল কালাম বলেন, ‘ভাই যতক্ষণ বারণ করি ততক্ষণ। সরে গেলে আবার একই অবস’া।’
বেলা ২টা ৩ মিনিট। আতুরার ডিপো এলাকা। চট্টমেট্রে প-০৫-০৯১৬ নম্বরের একটি টেম্পু যাত্রীর জন্য ঠাঁই দাঁড়িয়ে আছে সড়কের মাঝখানে। টেম্পুটি প্রায় ৩ মিনিট রাস্তায় দাঁড়িয়ে মুরাদপুরগামী যাত্রীদের ডাকছে চালকের কিশোর বয়সের এক সহকারী। এসময় পেছন থেকে একটি পণ্যবাহী মিনিট্রাক হর্ন বাজিয়ে গেলেও সেদিকে ভ্রক্ষেপ নেই টেম্পু চালকের। একইভাবে ২টা ৬ মিনিটে যাত্রীর জন্য রাস্তার মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকে চট্টমেট্রো-প-০৫-৫৯২ নম্বরের আরেকটি টেম্পু। স’ানীয় দোকানদার বেলায়েত হোসেন জানান, প্রতিদিন বিভিন্ন পেশা ও শ্রমজীবী মানুষ, শিক্ষার্থীরা অফিস-স্কুল-কলেজে যাওয়া আসার সময় তিন-চারটি টেম্পু অহেতুক রাস্তার মাঝখানে দাঁড়িয়ে যাত্রী উঠানামা করে। এসময় হাটহাজারী সড়কে প্রচণ্ড যানজট সৃষ্টি হয়। এখানে কোনো ট্রাফিক পুলিশও নেই।
বেলা ২টা ১৬ মিনিটে মুরাদপুর মোড়ে দেখা যায়, যানবাহনে চলাচলে কোনো শৃঙ্খলা নেই। মোড়ে যাত্রীর জন্য এলোমেলোভাবে দাঁড়িয়ে আছে ২০-২৫টি রিকশা। সড়কের মাঝখানে দাঁড়িয়ে যাত্রী উঠানামা করছে চট্টমেট্রো-জ-১১-১৯৭৬ ও চট্টমেট্রো-জ-১১-১৮৬১ নম্বরের দুটি সিটি বাস। থেমে নেই উল্টোপথে গাড়ি চালনা।
২টা ২০ মিনিটে চট্টমেট্রো-হ-১৩-৩৯৭৩ নম্বরের একটি মোটরসাইকেল উল্টোপথে মুরাদপুরের দিকে যেতে দেখা যায়। এসময় সেখানে ইউছুপ নামে এক ট্রাফিক পুলিশ কনস্টেবলকে দায়িত্বপালন করতে দেখা গেলেও কোনো সার্জেন্টকে দেখা যায়নি। কনস্টেবল ইউছুপ বলেন, ‘লাঠি হাতে নিয়ে গাড়ি চালকদের যতক্ষণ তাড়া করি ততক্ষণ। আইন মানার প্রবণতা কারোরই নেই।’ চলমান ট্রাফিক সপ্তাহে মোটরসাইকেলে তিনজন দেখলেই ব্যবস’া নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছিল সিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার কুসুম দেওয়ান। কিন’ মাঠ পর্যায়ে সেই নির্দেশনা শতভাগ কার্যকর হয়নি। ২টা ৩০ মিনিটে তিনজন আরোহী একটি মোটরসাইকেলে (কক্সবাজার-হ-১১-৫০৭৯) চড়ে বহদ্দারহাট মোড়ের দিকে যেতে দেখা গেছে।
২টা ৪০ মিনিটে বহদ্দারহাট দায়িত্ব পালন করছিলেন ট্রাফিক পুলিশ কনস্টেবল আলাউদ্দিন ও সাগর। সড়কের শৃঙ্খলা নিয়ে এ দুজনের সঙ্গে কথা বলার সময় সেখানে হাজির হন ট্রাফিক পুলিশ সার্জেন্ট রনি। এসময় লক্কর-ঝক্কর মার্কা দশ নম্বর রুটের একটি বাস (চট্টমেট্রো- ছ-১১-০৪৯৫) সামনে দিয়ে অতিক্রম করলেও ওই বাসের বিরুদ্ধে পুলিশ সার্জেন্ট রনিকে কোনো ব্যবস’া নিতে দেখা যায়নি। একই সময় সড়কের মাঝে দাঁড়িয়ে যাত্রী উঠানামা করলেও চট্টমেট্রো-জ-১১-১৬৫৪ নম্বরের বাসের বিরুদ্ধেও কোনো মামলা দেননি সার্জেন্ট রনি। নীরব থাকলেন কেন প্রশ্ন করলে উত্তর দেননি সার্জেন্ট রনি। বেলা ২টা ৫০ মিনিট থেকে ৩টা ১০ মিনিট পর্যন্ত উল্টোপথে গাড়ি চালানোর ‘উৎসব’ দেখা গেছে আখতারুজ্জামান ফ্লাইওভারে। জিইসি মোড়ের দিকে যাওয়ার লুপে ২০ মিনিট অবস’ান করেন এ প্রতিবেদক। এ ২০ মিনিটে অন্তত ১৫-১৬টি মোটরসাইকেল জিইসি মোড়ের দিক থেকে উল্টোপথে ষোলশহর বেবিসুপার মার্কেটের দিকে যেতে দেখা গেছে। ২টা ৫৩ মিনিটে উল্টোপথে চট্টমেট্রো-ল-১৪-৪৪৬৫ এবং ২টা ৫৫ মিনিটে চট্টমেট্রো-হ -১২-৩৩১৪ নম্বরের দুটি মোটরসাইকেল ষোলশহরের দিকে দেখা গেছে। এসময় ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান ম্যাক্স‘র শ্রমিক মো. সুমন আলী সুপ্রভাতকে বলেন, ‘শুধু মোটরসাইকেল নয়, উল্টোপথে প্রতিদিন লুপ দিয়ে সিএনজি অটোরিকশাসহ বিভিন্ন ছোটখাট যানবাহন চলাচল করছে। এতে অনেক সময় গাড়ি আটকে যায়।’
সুমন জানান, ষোলশহরের দিকে যাওয়ার লুপটি শুরু হয়েছে ওআর নিজাম আবাসিক এলাকার চার নম্বর রোডের মাথায়। ওই জায়গায় কোনো ট্রাফিক পুলিশ থাকে না। তাই বিনা বাধায় মোটরসাইকেল কিংবা অন্যান্য যানবাহন লুপের উল্টোপথ দিয়ে চলাচল করছে। এতে যে কোনো সময় দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। বেলা ৩টায় জিইসি মোড় এবং বেলা ৩টা দশ মিনিটে ওয়াসা মোড়ে গিয়ে বিশৃঙ্খল অবস’ায় যানবাহন চলতে দেখতে পান এ প্রতিবেদক।
বেলা ৩টা ১১ মিনিটে ওয়াসা মোড়ে দায়িত্ব পালন করছিলেন ট্রাফিক পুলিশ কনস্টেবল আপন। এসময় তাকে পুলিশ সার্জেন্ট কোথায় জিজ্ঞেস করলে ওয়াসা ভবনের পাশে পুলিশ বক্স দেখিয়ে দেন তিনি। সেখানে গিয়ে দেখা যায়, পুলিশ বক্সটির ভেতরে সিএনজি অটোরিকশার (চট্টমেট্রো-থ-১১-৩৫১০) বিরুদ্ধে মামলা লিখছেন সার্জেন্ট মঈনুল। পুলিশ বক্স ঘেঁষে ৩-৪ মিনিট দাঁড়িয়ে দেখা গেল, সার্জেন্ট মঈনুল একটি কেইস স্লিপ ওই অটোরিকশা চালকের হাতে ধরিয়ে দেন। একই সময় কড়কড়ে কিছু টাকার নোট সার্জেন্টের হাতে গুজে দেন চালক। এরপর অটোরিকশাটি (চট্টমেট্রো-থ-১১-৩৫১০) স্টার্ট দিয়ে আলমাস সিনেমা হলের দিকে চলে যাওয়ার সময় এ প্রতিবেদক চালককে বলেন, ‘কি ভাই মামলাও খেলেন আবার টাকাও দিলেন।’ উত্তরে অটোরিকশা চালক বলেন, ‘ভাই এক মাসের কন্ট্রাক করেছি। গাড়ির কাগজপত্র ফেল তাই।
আরেক প্রশ্নের উত্তরে ওই চালক বলেন,‘মামলা খেয়ে গতকাল (৮ আগস্ট) ৭ হাজার টাকা দিয়ে গাড়ি ছাড়িয়ে এনেছি। ১২’শ টাকা ওই সার্জেন্টকে দিয়ে কেইস একটি স্লিপ নিয়েছি। আরও ৫০০ টাকা সার্জেন্টকে দিতে হবে। আপাতত একমাস কোনো সার্জেন্ট রাস্তায় ডিস্টার্ব করবে না।’ তবে সার্জেন্ট মঈনুলের এবং নিজের নাম প্রকাশ করতে অনীহা প্রকাশ করেন অটোরিকশা চালক। এ প্রসঙ্গে নগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার (ট্রাফিক) কুসুম দেওয়ান বলেন, ‘সড়কে নৈরাজ্য ঠেকাতে এবং শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে ট্রাফিক পুলিশ কাজ করে যাচ্ছে। প্রতিদিন অসংখ্য মামলা দেওয়া হচ্ছে। গতকাল বেলা ১টা থেকে বিকাল সাড়ে তিনটা পর্যন্ত কিছু মোড়ে পুলিশ সার্জেন্টদের দেখা না পাওয়ার বিষয়ে সিএমপি কর্মকর্তা কুসুম দেওয়ান বলেন, ‘এক নাগাড়ে ৮ ঘণ্টা ডিউটি করে সড়কে দাঁড়িয়ে থাকা সম্ভব হয়ে উঠে না।’ সার্জেন্ট মঈনুলের বিরুদ্ধে ব্যবস’া নেওয়ার কথাও জানান এ কর্মকর্তা।