টেকনাফে পাহাড়ধসের ঝুঁকিতে ২ লক্ষ মানুষ

জিয়াবুল হক, টেকনাফ
Teknaf

একদিকে প্রবল বর্ষণ। তার মধ্যে টেকনাফ উপজেলায় দুই লক্ষ মানুষ পাহাড়ে এবং পাহাড়ের পাদদেশে ঝুঁকিপূর্ণ অবস’ায় বসবাস করছে। গত কয়েক বছর ধরে টেকনাফ উপজেলায় পাহাড়ধসে প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে। বারবার প্রাণহানি এবং প্রশাসনের সতর্কতা সত্ত্বেও পাহাড়ের পাদদেশের ঝুঁকিপূর্ণ স’ানে বসবাসকারীদের সরিয়ে আনা যাচ্ছে না। বর্তমানে টেকনাফের ১৩টি ও মিয়ানমার থেকে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গারা পাহাড়ে কয়েক হাজার পরিবার মৃত্যুঝুঁকি নিয়ে বসবাস করছে। চলতি বর্ষা মৌসুমে পাহাড়ধসের আশঙ্কায় বনবিভাগ পৌরসভা এবং উপজেলা প্রশাসনের উদ্যোগে ঝুঁকিপূর্ণ স’ানে বসবাসকারীদের নিরাপদ এলাকায় সরে যেতে বলা হলেও কেউই শুনছে না প্রশাসনের সতর্কবাণী। গত কয়েকদিন ধরে টানা প্রবল বর্ষণে টেকনাফ উপজেলার অধিকাংশ এলাকা পানিতে তলিয়ে গেছে। পাশাপাশি পাহাড়ের বিভিন্ন জায়গায় ফাটল ধরার আশংকা দেখা দিয়েছে। ঝুঁকিপূর্ণভাবে বসবাসকারী সরানোর কোন ব্যবস’া হয়নি। প্রশাসনের সঠিক নজরদারির অভাবে মিয়ানমার থেকে পালিয়ে আশ্রয় নেওয়ারোহিঙ্গাদের বেশির ভাগকে পাহাড় কেটে তাতে ঝুপড়িঘর তৈরি করে দিয়েছে স’ানীয় ভূমিদস্যু ও দখলদাররাই। এদের আশ্রয় দিয়ে তারা রোহিঙ্গাদের কাছ থেকে মাসোহারা নিচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। প্রতিবছর বন বিভাগ ও সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক কর্মকর্তারা লোক দেখানো অভিযান ও অবৈধ উচ্ছেদ পরিচালনা করলেও পরবর্তী সময়ে আবারো স’ানীয় ভূমিদস্যুরা বন বিভাগের অসাধু কিছু কর্মকর্তার সাথে আঁতাত করে পাহাড়ে ঘর বানিয়ে দিয়ে রোহিঙ্গাদের বসতি করার সুযোগ করে দেয়। এমনকি পাহাড়ি এলাকাগুলোতে বিদ্যুৎ সুবিধা পর্যন্ত দেওয়া হয়েছে। এ নিয়ে স’ানীয়দের মাঝে চরম ক্ষোভ দেখা দিয়েছে। তাছাড়া কিছু অসাধু স’ানীয়দের সহায়তায় রোহিঙ্গারা দীর্ঘদিন ধরে পাহাড়ের পাদদেশে রীতিমত সমাজগঠন করে বসবাস করে আসছে।
উপজেলা প্রশাসন সূত্রে জানা যায়, পাহাড়ধসের আশঙ্কা থাকায় চলতি বর্ষা মৌসুমের শুরুতেই স’ানীয় প্রশাসন পাহাড়ের ঢালুতে বসবাসরত এসব পরিবারকে অন্যত্র সরিয়ে নিতে সংশ্লিষ্ট এলাকার জনপ্রতিনিধিদের নির্দেশ দিয়েছেন। বেশি ঝুঁকিতে থাকা পরিবারগুলোকে প্রয়োজনে স’ানীয় সাইক্লোন শেল্টার ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে স’ান করে দেয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। পরিবেশ অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, ১৯৯৫ ও সংশোধিত ২০১০ পরিবেশ সংরক্ষণ আঅইনের ৪ নম্বর ধারায় বলা হয়েছে, কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান কর্তৃক সরকারি, আধা সরকারি বা স্বায়ত্বশাসিত প্রতিষ্ঠানের মালিকানাধীন দখলীয় অথবা ব্যক্তি মালিকানাধীন পাহাড় ও টিলা কর্তন-মোচন করা যাবে না। এ আইনে পাহাড়কাটার অপরাধে সর্বোচ্চ দুবছরের জেল ও ৫ লাখ টাকার জরিমানা বিধান থাকলেও পরিবেশ অধিদপ্তর ও বন বিভাগ পাহাড়কাটার অপরাধে এ পর্যন্ত কাউকেই জরিমানা বা শাস্তির আওতায় আনতে পারেনি। যে কারণে টেকনাফ উপজেলায় পাহাড় দখল, কর্তন, স’াপনা তৈরি ও অবৈধ বসবাস অব্যাহত রয়েছে। এর আগে চিহ্নিত ২০টি ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ে অবৈধভাবে বসবাসরত বাসিন্দাদের উচ্ছেদে অভিযান চালানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছিল উপজেলা প্রশাসন। কিন’ তা যথাযথভাবে কার্যকর হয়নি। বর্ষা এলেই টেকনাফে পাহাড়ে বসবাসকারী মানুষেরা মৃত্যুঝুঁকিতে পড়ে। তারপরও সব জেনে-শুনেও দুই লক্ষ মানুষ পাহাড়ের পাদদেশে বসবাস করছে। কয়েকদিনের টানা বর্ষণে টেকনাফে পাহাড়ধস নিয়ে বাড়ছে আতংক। সূত্রে জানা যায়, টেকনাফ বন বিভাগের হোয়াইক্যং, টেকনাফ ও শীলখালী রেঞ্জের আওতায় টেকনাফ পৌরসভা, সদর, হ্নীলা ও বাহারছড়া ইউনিয়নে ১২ হাজার ৬২.১৬ হেক্টর পাহাড় রয়েছে। পাহাড়ে বসবাসকারীদের সঠিক হিসেব সংশ্লিষ্ট বন বিভাগে নেই। তবে গত বছর পাহাড়সমূহে বসবাসরত ঝুঁকিপূর্ণ পরিবারের তালিকা উপজেলা প্রশাসনে প্রেরণ করা হয় এবং চলতি বছরও তালিকা প্রস’ত করা হয়েছে। সমপ্রতি প্রকাশিত দুর্যোগ মন্ত্রণালয়ের কম্প্রিহেনসিভ ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্ট পারফরমেন্সের (সিডিএমপি) এক সমীক্ষায় বলা হয়েছে, শুধু বর্ষণের কারণে নয়, ভূমিকম্পেও পাহাড়ধসের ব্যাপক জানমাল ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে। রিপোর্টে বলা হয়, টেকনাফে পাহাড়গুলোর মধ্যে ১৩টি পাহাড়ের ওপর রোহিঙ্গাদের ঝুপড়ি ঘরগুলো সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ। আর যেসব পাহাড়ে ঝুঁকিপূর্ণ বসবাস রয়েছে সেগুলো হচ্ছে : টেকনাফ পৌরসভার পুরাতন পল্লানপাড়া, ফকিরামুরা, কাদিরঘোনা, নাইট্যংপাড়া, শিয়াইল ঘোনা, চাইল্লাতলী, বরইতলী উঠনি, সদর ইউনিয়নের বরইতলী, কেরুনতলী, নতুন পল্লানপাড়া, মাঠপাড়া, জাহালিয়াপাড়া, চন্দরকিল্লা, রাজারছড়া, হাবিরছড়া, মিঠাপানিরছড়া, হ্নীলা ইউনিয়নের দমদমিয়া, জাদিমুরা, রঙ্গিখালী, মুরাপাড়া, পশ্চিম সিকদারপাড়া, মইন্যার ঝুম, ঘোনাপাড়া, পশ্চিম পানখালী, হোয়াইক্যং ইউনিয়নের দৈংগাকাটা, লাতুরীখোলা, হরিখোলা, রইক্ষ্যং, নয়াপাড়া, কম্বনিয়াপাড়া, কাঞ্জরপাড়া ও পশ্চিম কুতুবদিয়াপাড়া, আমতলী ইত্যাদি। এসব পাহাড়ে বালির পরিমাণ বেশি। বৃষ্টির সময় বালিতে পানি ঢুকে নরম হওয়ার পর তা ধসে পড়ে। বৃষ্টি ছাড়া ভূমিকম্পেও যেকোনো মুহূর্তে পাহাড়গুলো ধসে পড়তে পারে।
বন বিভাগ সূত্রে জানা যায়, ২০১০ সালের ১৫ জুন কঙবাজারের টেকনাফসহ বিভিন্ন স’ানে পাহাড়ধসে ৫৮ জনের মৃত্যু হয়। এর মধ্যে টেকনাফেই মারা যায় ৩৪ জন। ২০০৮ সালের ৪ ও ৬ জুলাই টেকনাফের ফকিরামোরা ও টুইন্যার পাহাড়ধসে একই পরিবারের চারজনসহ ১৩ জন মারা যায়। এসময় ভারীবর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে অর্ধশতাধিক বসতবাড়িসহ শতাধিক নারী-পুরুষ ও শিশু আহত হয়েছিল। প্রতিবছর বর্ষায় প্রবল বর্ষণে টেকনাফ উপজেলায় পাহাড়ধসে নিহতের ঘটনা ঘটলেও এখন পর্যন্ত পাহাড় থেকে ঝুঁকিপূর্ণ বসবাসকারীদের সরানো হয়নি। এত মৃত্যুর পরও এখনো হাজারো পরিবার জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বসতি করছে পাহাড়ের পাদদেশে। উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে এ করুণ ট্র্যাজেডি ঘটার পরেও পাহাড়ের পাদদেশে বসবাসকারীদের সচেতন করার জন্য কোনো ধরনের কর্মসূচি নেয়া হচ্ছে না। এমনিতে টেকনাফ প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা। এ সংকটাপন্ন এলাকায় অবাধে টিলা, গাছকর্তন, বন্যপ্রাণী শিকার ও পাহাড় কেটে বিরানভূমিতে পরিণত করার ফলে প্রাকৃতিক পরিবেশ নষ্ট হয়ে ঘন ঘন দুর্যোগ হচ্ছে। পাহাড়ে ঝুঁকিপূর্ণ বসবাসকারীদের অধিকাশংই রোহিঙ্গা।