টুপুরের পয়লা বৈশাখ

মোহছেনা ঝর্ণা

টুপুর, টুপুরের বাবা-মাকে বলেছে এবার পয়লা বৈশাখে সে শাড়ি পরে ডিসি হিলে যাবে।
ওর মা বলেছে, তুমি শাড়ি পরে হাঁটতে পারবে?
টুপুর বলেছে পারব। আমি লাল শাড়ি পরব।
টুপুর ক্লাস টু তে পড়ে।
পয়লা বৈশাখের আগেই টুপুরের মা টুপুরের জন্য লাল-শাড়ি, ব্লাউজ, চুড়ি, টিপ সব কিনে রেখেছে।
পয়লা বৈশাখের দিন টুপুরের মা টুপুরকে শাড়ি পরিয়ে, কপালে টিপ লাগিয়ে, হাতে চুড়ি দিয়ে এবং চুলে ফুল দিয়ে সাজিয়ে দিল। লাল শাড়ি পরা টুপুরকে দেখে টুপুরের বাবা বলেছে, এই লাল পরিটা কে রে? আমি তো এই লাল পরিটাকে চিনতেই পারছি না।
বাবার কথা শুনে টুপুর মিষ্টি করে হাসল।
টুপুরের মাও একটা লাল-সাদা রঙের শাড়ি পরেছে। টুপুরের বাবা একটা লাল রঙের পাঞ্জাবি পরেছে। লাভ লেইনের মোড়ে টুপুররা সিএনজি থেকে নেমে গেছে। পুরো শহরটা যেন বৈশাখী উৎসবের রঙে রঙিন হয়ে উঠেছে। লাভ লেইন থেকে হেঁটে ওরা ডিসি হিলের দিকে যাচ্ছে। পুরো রাস্তায় মানুষ আর মানুষ। ছোট, বড়, ছেলে, মেয়ে সব বয়সী মানুষ।
ডিসি হিলে ঢুকার পথে বেশ ক’জন ভাইয়া আর আপু রঙ তুলি নিয়ে টুপুরদের কাছে এসে বলল, মুখে এসো হে বৈশাখ এঁকে দেই?
টুপুরের মুখে একটা আপু একতারা আর এসো হে বৈশাখ এঁকে দিয়েছে।
ডিসি হিলে শিল্পীরা নানা ধরনের গানে গানে বর্ষবরণ করে নিচ্ছে। এসো হে বৈশাখ এসো হে, একি অপরূপ,রূপে মা তোমার হেরিনু পল্লী জননী, সাম্পানওয়ালা, আগে কি সুন্দর দিন কাটাইতাম এরকম আরো অনেক গান। টুপুর, টুপুরের বাবা-মায়ের সাথে কিছুক্ষণ গান শুনল। তারপর হেঁটে হেঁটে তারা বাংলাদেশ নার্সারীর সামনে এসে একটা পাকা বেঞ্চে বসে একটু জিরিয়ে নিচ্ছিল। প্রচণ্ড গরম। তাই ফেরিওয়ালার কাছ থেকে টুপুরের বাবা তিনটা হাত পাখা কিনল।
ডিসি হিল, বৌদ্ধ মন্দিরের রাস্তা, মোমিন রোড সব জায়গায় অনেক ফেরিওয়ালা বসেছে। কেউ বসেছে আংগুলি, বাতাসা, তিলের খাজা নিয়ে, নারকেলের চিড়া, কেউ বসেছে মাটির জিনিসপত্র নিয়ে, মাটির জিনিসপত্রের মধ্যে আছে মাটির হাতি, ঘোড়া, পালকি, হাড়ি-পাতিল,ফুলদানি। টুপুর বাবাকে নিয়ে একটা মাটির হাতি আর একটা ঘোড়া কিনেছে।
টুপুররা যখন মাটির জিনিসপত্র কিনছিল তখন পাশ দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিল টুপুরের বন্ধু সামাইরা, আর সামাইরার বাবা-মা। সামাইরা টুপুরকে দেখে চিৎকার করে ডাকল, টুপুর।
টুপুর তাকিয়ে সামাইরার কাছে এসে বলল, শুভ নববর্ষ। সামাইরাও বলল, শুভ নববর্ষ। এরপর টুপুরের বাবা-মা, আর সামাইরার বাবা-মাও একে অন্যদের শুভ নববর্ষ বলল।
সামাইরা টুপুরকে বলল, তোমাকে তো লাল পরি মনে হচ্ছে টুপুর। তোমাকে লাল শাড়ি কে কিনে দিয়েছে?
টুপুর বলল, মা।
সামাইরা বলল, সামনের বার পয়লা বৈশাখে একই শাড়ি পরব ,ঠিক আছে?
টুপুর বলল, আচ্ছা।
টুপুরের বাবা সামাইরা আর টুপুরকে বেলুন কিনে দিয়েছে।
ডিসি হিল থেকে টুপুররা সিআরবিতে যাওয়ার জন্য রওনা দিল। সি আরবি’র শিরীষ তলায় পয়লা বৈশাখের অনুষ্ঠান হয়। এখানেও শিল্পীরা গান করে, কবিতা আবৃত্তি করে,নাচ করে। ছোট ছোট বাচ্চারাও কি সুন্দর নাচ করে!
সিআরবিতে সাতটা রাস্তার মোড় আছে। আছে পাহাড়, ঢালু পথ আর বড় বড় শিরীষ গাছ, বট গাছ, আর পাহাড়ি বুনো ফুল গাছ। সিআরবিতেও মানুষের ভিড়! যেন সব মানুষ উৎসব উদযাপন করতে পথে নেমে গেছে।
টুপুর সিআরবিতে ঢুকেই দেখে একটা পাখিওয়ালার কাছে অনেক পাখি। মুনিয়া পাখি, কোয়েল পাখি, টিয়া পাখিৃ। টুপুর, টুপুরের বাবাকে বলল, বাবা আমি পাখি কিনব।
টুপুরের বাবা বলল, যাওয়ার সময় কিনে দিব। ঠিক এসময় টুপুর দেখে পাপিয়া খালামনি টুপুরের দিকে হেঁটে আসছে। টুপুর বলল, শুভ নববর্ষ পাপিয়া খালামনি। পাপিয়া খালামনি বলল, শুভ নববর্ষ টুপুর সোনা। আমার টুপুর পাখি তো একটা লাল পরি হয়ে গেছে। খুব সুন্দর লাগছে আমার ছোট্ট পাখিটাকে।
পাপিয়া খালামনির কথা শুনে টুপুর হাসল। পরে টুপুরের মায়ের সাথে পাপিয়া খালামনি গল্প করা শুরু করেছে। পাপিয়া খালামনির ছেলে আরিশ খুব সুন্দর একটা লাল পাঞ্জাবি পরেছে। খালিদ মামাও একটা লাল-সাদা ফতুয়া পরেছে।
পাপিয়া খালামনির সাথে টুপুরের মা গল্প করতে করতে ফেরিওয়ালাদের কাছ থেকে ঘরের জন্য কিছু টুকিটাকি জিনিসপত্র কিনে নিচ্ছিল। এর ফাঁকে ফাঁকে চলছিল মোবাইল ক্যামেরায় ছবি তোলা। ক্লিক,ক্লিক,ক্লিকৃ। সেলফিও তোলা হচ্ছিল সবার। আবার সঙ্গে সঙ্গেই চলছিল ফেসবুকে আপলোড।
কিছুক্ষণ পর টুপুর দেখে পূর্ণতা এসেছে শিবু কাকা আর প্রিয়াংকা কাকিমার সাথে। পূর্ণতা টুপুরকে জড়িয়ে ধরে বলে শুভ নববর্ষ। টুপুরের বাবা-মাও শিবু কাকা আর প্রিয়াংকা কাকিমার সাথে গল্প শুরু করে দেয়।
টুপুররা কিছুক্ষণ একটা গাছের নিচে বসে জিরিয়ে নেয়। এরপর টুপুরের বাবা আর শিবু কাকা টুপুর আর পূর্ণতাকে নিয়ে আবার হাঁটা শুরু করে। টুপুরের মা আর প্রিয়াংকা কাকিমা বসে বসে গল্প করছিল আর গান শুনছিল। মাইকে বৈশাখের গানগুলো অনেক দূর থেকেও শোনা যাচ্ছিল।
হাতে একতারা, হারিকেন, ডুগডুগি আর ঢোল নিয়ে হাসি হাসি মুখ করে টুপুর আর পূর্ণতা একটু পরেই মার কাছে ফিরে আসে। টুপুরের মা আর প্রিয়াংকা কাকিমা এগুলো দেখে বলে বাহ! খুব সুন্দর। এমন সময় কোথা থেকে দৌড় দিয়ে অথৈ আসে। সাথে অথৈ’র বাবা। টুপুরের শুভ্র কাকা। এরপর টুপুরের বাবা, শুভ্র কাকা আর শিবু কাকা মিলে অনেকক্ষণ গল্প করে। গল্পের ফাঁকে সবাই আবার আইসক্রীম খায়। এত বেশি গরম পড়ছে গলা যেন শুকিয়ে যাচ্ছে।
এসময় হঠাৎ করে টুপুরদের পাশ দিয়ে বিকট শব্দে অনেকে ভুভুজেলা বাজিয়ে যাচ্ছিল। টুপুরের মা বলল, ভুভুজেলা না এবার নিষিদ্ধ করল, তারপরও এরা পেল কোথায়? তখন টুপুরের বাবা বলল, নিষিদ্ধ করার কারণেই তো এতক্ষণ পরে শব্দ পাওয়া গেছে তা না হলে তো এতক্ষণ এখানে বসে থাকাই দায় হয়ে যেত।
এরপর আরো কিছুক্ষণ সময় গল্প করার পর টুপুররা বাসায় আসার জন্য রওনা দিল। কিন’ বের হতে গিয়ে দেখে মানুষের উপচে পড়া ভিড়। তখন যেন মানুষ আরো ঝাঁকে ঝাঁকে ঢুকছিল।
সিআরবি থেকে অনেক কষ্টে ভিড় ঠেলে বের হওয়ার পর টুপুর বলল, বাবা পাখি তো কেনা হয়নি। টুপুরের মা বলল, এখন তো বের হয়ে গিয়েছি, পরে কিনে দিব।
টুপুর চুপ করে ছিল দেখে টুপুরের বাবা বলল, মা তোমার কি মন খারাপ হয়েছে?
টুপুর একটা হাসি দিয়ে বলল, না বাবা, আজ পয়লা বৈশাখ না, আজ মন খারাপ করলে প্রতিদিন মন খারাপ হয়ে যাবে। তাই মন খারাপ করিনি।
টুপুরের কথা শুনে টুপুরের বাবা-মা একসাথে হেসে দিল।