টানাপোড়েনে নতুন মাত্রা

নিজস্ব প্রতিবেদক

জলাবদ্ধতা প্রকল্প নিয়ে চলছে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ) ও চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের মধ্যে রশি টানাটানি। এই বিরোধের মধ্যে আরো একটি উপাদান যুক্ত হতে যাচ্ছে। সেটি হলো ফ্লাইওভারের নিচে ও উপরে সৌন্দর্য বর্ধনের কাজ। ফ্লাইওভারের নিচে ও উপরে সৌন্দর্য বর্ধন শেষে এর নিয়ন্ত্রণ কার কাছে থাকবে? আইনত উন্নয়ন সংস’া হিসেবে সিডিএ রাস্তা-ঘাট এবং নালা নর্দমা নির্মাণ শেষে তা সিটি কর্পোরেশনের কাছে হস্তান্তর করে থাকে। তবে শুধু সৌন্দর্যবর্ধন প্রকল্প নয়, নগরীতে নির্মিত কোনো ফ্লাইওভার বা নির্মাণ হতে যাওয়া এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে সিটি কর্পোরেশনকে হস্তান্তর করবে না সিডিএ।
সিডিএ চেয়ারম্যান আবদুচ ছালাম বলেন, ‘শুধু আখতারুজ্জামান ফ্লাইওভার নয়, নগরীতে নির্মিত সব ফ্লাইওভারের নিচে ও উপরে সৌন্দর্য বর্ধন প্রকল্প নেয়া হয়েছে। এমনকি আগামীতে এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়েতে সৌন্দর্য বর্ধনের প্রকল্প থাকবে। আর সব ফ্লাইওভারের নিচে ও উপরের সৌন্দর্য বর্ধন শেষে দেখভালের জন্য তা সিটি কর্পোরেশনের কাছে হস্তান্তর করা হবে না সিটি কর্পোরেশন অ্যাক্ট অনুযায়ী, উন্নয়ন সংস’া হিসেবে সিডিএ রাস্তাঘাট নির্মাণ শেষে তা সিটি কর্পোরেশনকে হস্তান্তর করে থাকে। সেই হিসেবে প্রধান সড়কের উপরে নির্মিত ফ্লাইওভারের নিচে ও উপরের সৌন্দর্য বর্ধন প্রকল্পও সিটি কর্পোরেশনকে হস্তান্তর করার কথা। এ বিষয়ে সিডিএ চেয়ারম্যান আবদুচ ছালাম বলেন, ‘গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রীর ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেনের সভাপতিত্বে স’ানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধিদের উপসি’তিতে গত ১২ নভেম্বর অনুষ্ঠিত সভায় সিটি কর্পোরেশনকে হস্তান্তর না করার বিষয়ে সিদ্ধান্ত হয়।’
এদিকে ১২ নভেম্বর গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের সভাপক্ষে অনুষ্ঠিত সভার কার্যবিবরণীর ২ এর ৪ ধারায় ফ্লাইওভার বা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের রক্ষণাবেক্ষণ ও মেরামতের বিষয়ে সিডিএ অর্ডিনেন্সে কী বলা হয়েছে জানতে চাইলে হলে সিডিএ চেয়ারম্যান আবদুচ ছালাম বলেন, ‘সিডিএ অর্ডিনেন্সে সিডিএ কর্তৃক নির্মিত রাস্তা ও ভবনসমূহ চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন কর্তৃক মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণের বিষয়ে উল্লেখ রয়েছে। তবে এতে ফ্লাইওভার ও এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণের বিষয়ে কোনো কিছু বলা নেই। সুতরাং, এ বিষয়ে কোনো আইনগত সমস্যা নেই। সভায় উপসি’ত থাকা স’ানীয় সরকার বিভাগের প্রতিনিধিও এ বিষয়ে বলেছেন, সিডিএ’র প্রস্তাবটি যুগোপযোগী ও চমৎকার। এক্ষেত্রে আইনগত কোন সমস্যা না থাকায় সিডিএ নির্মিত ও নির্মাণাধীন ফ্লাইওভার ও এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের উপরে ও নিচে সৌন্দর্যবর্ধন, মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণের বিষয়ে বেসরকারি প্রতিষ্ঠান নিয়োগের প্রয়োজনীয় ব্যবস’া গ্রহণ করতে পারে।’
গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেনের স্বাক্ষরিত সেই কার্যবিবরণীতে সিদ্ধান্তের কলামেও সিডিএ বেসরকারি প্রতিষ্ঠান নিয়োগের মাধ্যমে নির্মাণাধীন ফ্লাইওভার ও এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণ করতে পারবে বলা হয়েছে। তবে এক্ষেত্রে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানসমূহকে সিডিএ’র অনুমোদিত নকশা ও পরিকল্পনা অনুযায়ী নির্ধারিত কার্যক্রম পরিচালনা করতে হবে।
শুধু সৌন্দর্যবর্ধন প্রকল্প নয়, ফ্লাইওভার সংক্রান্ত কিছুই সিটি কর্পোরেশনকে হস্তান্তর করা হবে না জানিয়ে আখতারুজ্জামান ফ্লাইওভার প্রকল্পের পরিচালক ও সিডিএ’র নির্বাহি প্রকৌশলী (প্রকল্প) মাহফুজুর রহমান বলেন, আমরা বহদ্দারহাট ফ্লাইওভার, দেওয়ানহাট ওভারপাস ও কদমতলী ফ্লাইওভারের নির্মাণকাজ শেষ হওয়ার পরও কিন’ এখনো সিটি কর্পোরেশনকে হস্তান্তর করিনি। এগুলোর মেরামত আমরা করছি। একইভাবে নগরীর সব ফ্লাইওভার ও নির্মাণ হতে যাওয়া এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়েও হস্তান্তর করা হবে না।
সিডিএ সরাসরি এগুলো মেরামত করবে কী-না এমন প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, ‘ফ্লাইওভারের নিচে ঝুলন্ত কিছু দোকান নির্মাণ করা হবে। এগুলো বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে বরাদ্দ দেয়া হবে। এসব প্রতিষ্ঠান ফ্লাইওভারের রক্ষণাবেক্ষণ, সংস্কার এবং বিদ্যুৎ বিল পরিশোধ করবে। আর এর পুরো নজরদারি থাকবে সিডিএ’র। কারণ সিডিএ অর্ডিন্যান্সে কোথাও ফ্লাইওভার বা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে সিটি কর্পোরেশনকে হস্তান্তরের বিষয়ে কিছু বলা হয়নি।’
এদিকে ফ্লাইওভার সৌন্দর্যবর্ধন প্রকল্পের আওতায়, ফ্লাইওভারের পিলারগুলোতে চীন থেকে আনা সবুজ সিনথেটিক টার্ফ বসানোর কাজ শুরু হয়েছে। ডিভাইডারের মধ্যে লাগানো হবে ফুলের গাছ, থাকবে হাঁটার জন্য ওয়াকওয়ে ও বসার জন্য বেঞ্চ।
সিডিএ’র এই সিদ্ধান্ত প্রসঙ্গে জানতে চাইলে সিটি কর্পোরেশনের প্রধান নির্বাহি মোহাম্মদ সামসুদ্দোহা বলেন, ‘বিধি অনুযায়ী আমরা জানি উন্নয়ন সংস’া উন্নয়ন শেষে সেবা সংস’া হিসেবে সিটি কর্পোরেশনের কাছে তা হস্তান্তর করবে। কিন’ এখন কোন আইনে তা হস্তান্তর করা হবে না তা এখন বলা যাচ্ছে না।’
গণপূর্ত মন্ত্রীর সভাপতিত্বে স’ানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধির উপসি’তিতে এরূপ সিদ্ধান্ত হয়েছে জানিয়ে প্রশ্ন করা হলে মোহাম্মদ সামসুদ্দোহা বলেন, ‘সেই সভায় নিশ্চয়ই চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের কোনো প্রতিনিধি উপসি’ত ছিল না।’
উল্লেখ্য, নগরীরর ৩৬টি খাল খনন ও সংস্কারের মাধ্যমে জলাবদ্ধতা নিরসনের জন্য প্রায় সাড়ে ৫ হাজার কোটি টাকার প্রকল্প নিয়ে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন ও সিডিএ’র মধ্যে বিরোধ চলছে। প্রকল্পটি মাঠ পর্যায়ে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী বাস্তবায়ন করবে।