টাইগার পাসে এখনো হাঁটে টাইগার

নিজস্ব প্রতিবেদক
‘বিস্তার : চিটাগং আর্টস কমপ্লেক্সে’ ‘টাইগারস্‌ স্টিল পাস অ্যাট টাইগার পাস’ সামাজিক শিল্পকর্ম প্রদর্শনীর উদ্বোধনের পর ঘুরে দেখছেন অতিথিবৃন্দ-সুপ্রভাত
‘বিস্তার : চিটাগং আর্টস কমপ্লেক্সে’ ‘টাইগারস্‌ স্টিল পাস অ্যাট টাইগার পাস’ সামাজিক শিল্পকর্ম প্রদর্শনীর উদ্বোধনের পর ঘুরে দেখছেন অতিথিবৃন্দ-সুপ্রভাত

টাইগার পাস। বাঘেদের রাজত্বের কারণেই এই নাম। কিন’ একদিন টাইগার পাসের একটি পাহাড়ের চূড়া থেকে নিচে তাকিয়ে একটি বাঘ দেখে, সেখানে শুধু মানুষই চলাচল করছে। এ দৃশ্য দেখে তার চোখ বেয়ে পানি গড়িয়ে পড়ে। একসময় এই পাহাড়ি এলাকা দিয়ে শুধু বাঘের যাতায়াত দেখা যেত। আজ সে পাহাড় কেটে রাস্তা তৈরি করে যাতায়াত করছে মানুষ।
এখন শোনাবো আরেকটি গল্প। এক বাঘ খাঁচায় আছে বহুদিন ধরে। মানুষ তার যত্নআত্তি করছে। নিয়মিত খাবার এনে দিচ্ছে। বাঘ ভাবলো, মানুষগুলো তো আমাকে অনেক কিছুই দিলো। কিন’ আমি তাদের কিছু দিতে পারলাম না। কী দেওয়া যায় -ভাবতে ভাবতে বাঘের মনে হলো, তার গায়ের লোমই তো মানুষের সবচেয়ে বেশি পছন্দের। ডোরাকাটা দাগ, রঙ আর ধরনের জন্যই তো তার এত কদর। বাঘটা একসময় তার সবকিছু পুরো খাঁচায় পরিণত করে ফেলে। বাঘের পা হয়ে যায় খাঁচার পায়া, তার লোমভর্তি হাড়গুলো খাঁচার শিকে পরিণত হয়। এভাবে হারিয়ে যায় বাঘটি।
গল্পের এই খাঁচা যদি দেখতে চান, তাহলে চলে আসতে পারেন ‘বিস্তার : চিটাগং আর্টস কমপ্লেক্সে’। কারণ, এখানে চলছে ‘টাইগারস্ স্টিল পাস অ্যাট টাইগার পাস’ নামক একটি সামাজিক শিল্পকর্ম প্রদর্শনী। যেখানে বাঘেদের হারিয়ে যাওয়া এবং একসময় মানুষের ঘরের আসবাবে পরিণত হয়ে যাওয়ার মত কাহিনী দেখতে পাবেন। সৈয়দ মো. সোহরাব জাহানের একক এই প্রদর্শনীতে উঠে এসেছে প্রকৃতির সাথে বাস্তবতার বৈপরীত্য।
চট্টগ্রাম তো একটি ক্ষুদ্র শহর। সারা বাংলাদেশে বাঘ এখন আর কোথায় পাবেন আপনি? বাঘেদের বিলুপ্তি ঘটে চলেছে প্রতিনিয়ত। বিস্তারের রিসোর্স সেন্টারে একটি বাঘ দেখলে হঠাৎ চমকে উঠবেন। বাঘ তো নয়, আস্ত একটি টেবিল। যার কোনো মাথা নেই। হ্যাঁ, এই বাঘ এখন টেবিলের মতো আসবাবে পরিণত হয়েছে। পাশের কক্ষেই আছে বাঘের লোম দিয়ে তৈরি চেয়ার টেবিল।
ভাস্কর সোহরাব জাহান সুপ্রভাতকে বলেন, ‘বাঘ এখন তার স্বত্তা হারিয়ে আমাদের গৃহের আসবাবে পরিণত হয়ে গেছে। আমরা গৃহের টেবিলের ওপর স্যুভেনির হিসেবে বাঘ সাজিয়ে রাখি। টেবিল হিসেবে ব্যবহার করছি। আমি প্রকৃতির সাথে এক প্রকার মজা করেই সমকালীন ধারার শিল্পকর্ম, অঙ্কনচিত্র ভাস্কর্য দিয়ে এই প্রদর্শনী সাজিয়েছি।’
গতকাল ‘বিস্তার : চিটাগং আর্টস কমপ্লেক্সে’ প্রদর্শনীটির উদ্বোধন করেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য প্রফেসর ড. ইফতেখার উদ্দিন চৌধুরী। প্রদর্শনীতে বাঘ বিলুপ্তি, গৃহপালিত প্রাণি থেকে আসবাবে পরিণত হওয়ার মতো ভাস্কর্য আর চিত্র দেখে তার প্রশংসা করেন তিনি। বললেন, ‘টাইগার পাস চট্টগ্রামের একটি ঐতিহ্যের প্রতীক। এই প্রদর্শনীর ভাস্কর্যগুলোর মধ্যে জীববৈচিত্র্য রক্ষার প্রণোদনা আছে।’ প্রদর্শনীটি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে আয়োজন করার জন্যেও আগ্রহ প্রকাশ করেন চবি উপাচার্য।
৩০ বছরের এক তরুণের এমন ব্যতিক্রমী ও বহুমাত্রিক প্রদর্শনীর প্রশংসা করেন আয়োজক ‘বিস্তার : আর্টস কমপ্লেক্সের’ পরিচালক ও অনুবাদক আলম খোরশেদ। সুপ্রভাতকে তিনি বলেন, ‘প্রদর্শনীটি খুবই ব্যতিক্রমী, নিরীক্ষামূলক এবং বহুমাত্রিক একটি প্রদর্শনী। এখানে অনেকগুলো মাধ্যমের সমন্বয় ঘটেছে। সমকালীন চিত্র ধরার চেষ্টা করেছেন সোহরাব জাহান। ভিন্নভাবে এর চিত্রকলার বহিঃপ্রকাশের দিক থেকে প্রদর্শনীটি সফল হয়েছে বলেই আমার কাছে মনে হয়।’
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি ছিলেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও শিল্পী ঢালী আল মামুন, চারুকলা ইনস্টিটিউটের পরিচালক ও শিল্পী নাসিমা মাসুদ, গ্রন’বিপণি বাতিঘরের প্রতিষ্ঠাতা দীপঙ্কর দাশ, বন্দরের সাবেক চেয়ারম্যান ক্যাপ্টেন জাকারিয়া, চট্টগ্রাম গবেষক ড. শামসুল হোসাইন, ডিজাইনার রওশন আরা চৌধুরী, চবি চারুকলা ইনস্টিটিউটের শিক্ষক জাহিদ আলী যুবরাজ, শায়লা শারমীন সাথী, জিহান করীম, শিল্পী কিংশুক দাশ, ভাস্কর সামিনা করিম, সঙ্গীতশিল্পী ও ডিজাইনার সুব্রত বড়-য়া রনি প্রমুখ।
নগরীর মেহেদীবাগে অবসি’ত ‘বিস্তার : চিটাগং আর্টস কমপ্লেক্সে’ এই প্রদর্শনী চলবে ৫ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত। প্রতিদিন বিকাল ৩টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত প্রদর্শনী দেখতে পারবেন দর্শণার্থীরা। আর ‘টাইগারস্ স্টিল পাস অ্যাট টাইগার পাস’ নামের এই প্রদর্শনীটি সকলের জন্য উন্মুক্ত থাকছে।

আপনার মন্তব্য লিখুন