জয় বাংলা

উৎপলকান্তি বড়ুয়া
mukti-joddha

বাবুকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। সেই দু’দিন আগে থেকেই। কোথাও পাওয়া যাচ্ছে না। কোথায় গেলো? -সবার একই প্রশ্ন।
সময়টা মোটেও ভালো না। ছেলেটা যে কোথায় যেতে পারে। তবে সে খুব সাহসী। দুঃসাহসীও বটে। মনু কাকা বলেন- বিবিরহাটে পাকিস্তানি সৈন্য -রাজাকাররা হয়তো বেঁধে রেখেছে-দেখো গিয়ে।
দিপুদা, মনু কাকার মুখ থেকে কথা কেড়ে নিয়ে বললো- হতেই পারে। দেখতে ছোটখাটো হলেও, খুব ছটফটে সে। নানা ফাই-ফরমাস খাটানোর জন্যে হয়তো ভয় টয় দেখিয়ে ধরে বেঁধে রেখেছে। বিচিত্র নয়। কাকার কথাই হয়তো ঠিক।
চারপাশে পাকিস্তানি সৈন্যের যত্রতত্র আনাগোনা। রাজাকার কমান্ডার মাতবর সুরত আলীর সাথে তার বাহিনীতো আছেই। সবাই যে যার মতো সারাক্ষণ অতি সাবধানে কথা-বার্তা, চলাফেরা করছে।
-জানোই তো, সুরত মাতবরের ছেলেটার সাথে তার তো আবার মহা ভাব। সকাল নেই বিকেল নেই- ওখানেই ওদের আঙিনায় মাতবরের ছেলেটার সাথে খেলায় মজে থাকে সারাদিন। -বাবুলদা তার কথায় আরো যোগ করে- নাকি মাতবরের ছেলেটার সাথে কোথাও গেছে টেছে- এটা কি জানা গেছে?
বড় রাস্তা ঘেঁষে পূব পাড়ে মাতবরের বাড়ি। পশ্চিম পাড়ে বাবুদের বাড়ি। বাবুদের বাড়ি মানে-বাবুর মামার বাড়ি। বাবুর তিন কূলে কেউ নেই। বাবুর কোল বয়সেই গাড়ি দুর্ঘটনায় বাবা-মা মারা যায়। সেই থেকে মামার বাড়িতে বাবু তার জীবনের দশটি বছর পার করেছে। পড়ালেখায়ও বাবু বরাবরই ভালো।
-তোমরা ওর জন্যে চিন্তা করো না। দেখবে ঠিকই বাবু চলে আসবে। ও যেমন সাহসী, তেমনি চালাকও- বলে ডাক্তার মামা স্টেথিসকোপ গলার দু’পাশে ঝুলিয়ে তার ডাক্তারি ব্যাগ হাতে প্রতিদিনের মতো ডিসপেনসারির উদ্দেশ্যে রওনা হয়ে যান।
মনুকাকা, দিপু দা, বাবুল দা সহ উঠোনে এক বাড়ির মানুষ সবাই এসে জড়ো হয়েছে এতক্ষণে। বড় জেঠিমা বলেন- অই দেখো- কী নিশ্চিন্তে প্রবোধ ডাক্তার কথাটা বলে হন হন করে চলে গেলো। বড় জেঠিমা এ বাড়ির সকলের বড়জন। বড় কাকা মেঝ কাকা ছোট কাকা, ডাক্তার মামা থেকে সকলকে বড় জেঠিমা নাম ধরে ডাকেন।
-পরের ছেলে বলে হয়তো টান, মায়া দয়া নেই। নিজের ছেলেপেলে হলে বুঝতে তখন। জলজ্যান্ত একটা ছেলে- গত দু’দিন যে কোথায় গেলো -কোনো খবর নেই- বলতে বলতে উঠোন থেকে বড় জেঠিমা তার ঘরে ঢুকে যান।
উত্তর দিক রামগড় হতে সেই সকাল থেকেই বড় রাস্তা ধরে শত শত পাকিস্তানি সৈন্য দক্ষিণে বিবিরহাটের দিকে ফিরে আসছে। মধ্য ডিসেম্বরের ঝলমলে রোদ মাখা শীতের দিন। আর্মির বিভিন্ন গাড়িতে ছাড়াও পাকিস্তানি সৈন্যরা অনেকেই হেঁটে হেঁটেও ফিরছে দলে দলে। দুপুর গড়িয়ে বিকেল প্রায়। এ সময় উত্তর দিক হতে হঠাৎ থেকে থেকে প্রচণ্ড গুলির আওয়াজ কানে ভেসে আসে। ক্রমান্বয়ে আওয়াজের প্রচণ্ড শব্দের সাথে ‘জয় বাংলা’–‘জয় বাংলা’ ‘আমার দেশ তোমার দেশ’ বাংলাদেশ, বাংলাদেশ!– শ্লোগান ধ্বনি। সবাই ঘর থেকে উঠোনে বেরিয়ে পড়ে। মনু কাকা, বাবুলদা, দীপুদাতো প্রায় একসাথেই চিৎকার করে বলে ওঠে- জয় বাংলা! জয় বাংলা! আমরা স্বাধীন হয়েছি। দেশ স্বাধীন হয়েছে। আমাদের দেশ স্বাধীন হয়েছে। কেউ কেউ ছুটলো বড় রাস্তার দিকে। এ সময় ডাক্তার মামা, বাবু এবং গ্রামের-এলাকার বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ সত্তরোর্ধ্ব প্রাক্তন প্রধান শিক্ষক শুভময় দাদুকে নিয়ে হাজির। সবাই বাবুকে দেখতে পেয়ে নানা প্রশ্ন করে। কোথায় গিয়েছিলে তুমি? এ দু’দিন কোথায় ছিলে বাবু? কাউকে বলে যাওনি কেনো, ইত্যাদি নানা প্রশ্ন!
ডাক্তার মামা সবাইকে থামিয়ে দিয়ে বলেন- সবাই শোনো। আমাদের এই এলাকা শত্রুমুক্ত হয়েছে। আমরা স্বাধীন হতে চলেছি। শান্ত হও, শোনো। বাবু এ দু’দিন কোথায় ছিল জানতে চেয়েছিলে তো? বলছি। আমি তাকে কাজে পাঠিয়েছিলাম। বড় জেঠিমা বললেন- প্রবোধ, তুমি কাজে পাঠিয়েছো বাবুকে? কোথায়? কেন? কই, আজ সকালে বলোনিতো!
-সে কথাই বলছি শোনো। জানো, বাবুর কারণেই কিন্তু আমাদের শুভময় কাকা বেঁচে আছেন আজ। এই বাবুই শুভময় কাকাকে বাঁচিয়েছেন।
মনু কাকা উপস্থিত অন্যান্যদের মতো আশ্চর্য হয়ে জানতে চান- কি করে? কেমন করে?
-সেটাই বলছি। শোনো তা হলে। বাবু সম্পর্কে আমাদের সবার ভালো ধারণা আছে। সে চালাক এবং সাহসী। আমি তার সাহস এবং চালাকিটাকে ভরসা করি। রাজাকার কমান্ডার সুরত আলী মাতবরের প্রত্যেকদিনের কর্মকাণ্ড, নানা চক্রান্তের খবর জানার জন্যে বাবুকে নিয়োজিত করি। রাজাকার সুরত আলীর বাবুর বয়েসী ছেলেটাকে বাবুর সাথে বন্ধুত্ব গড়তে বলি। সে কাজে সে সফল হয়। সুরত আলীর ছেলের সাথে খেলার ছলে প্রতিদিন বাবুর মাধ্যমে রাজাকার সুরত আলীর কাচারির বৈঠকখানায় নানান আলাপ-কর্মকাণ্ড-চক্রান্তের খবর পাই। নোয়াহাটে আমার ডিসপেনসারিতে প্রায় প্রতি গভীর রাতে মুক্তিবাহিনীর লোকজন আসেন। আমি তাদেরকে নানা সতর্কতা, খবরা-খবর দেই। সর্বশেষ গত তিনদিন আগে, যেদিন থেকে বাবু নিখোঁজ- এর আগের দিন বাবুর কাছে জানতে পারি-আমাদের শুভময় কাকাকে ফুঁসলিয়ে বা ছলে বলে ওরা তুলে নিয়ে যাবে আগামীকাল যে কোনো মুহূর্তেই। রাজাকার কমান্ডার সুরত আলী আমাদের সকলের প্রাণপ্রিয় কাকা শিক্ষাবিদ শুভময় কাকাকে নিয়ে মিলিটারির হাতে তুলে দিয়ে মেরে ফেলার চক্রান্ত করেছিল। বাবুর কাছে খবর পেয়েই গত পরশু শুভময় কাকাকে সরিয়ে নেয়ার ব্যবস্থা করলাম। শুভময় কাকার হাঁটতে কষ্ট হয়, তোমরা সকলেই জানো। বাবুকে দিয়েই পরশু খুব ভোরে সবার অগোচরে আমার দোকানের জমিদার পুটু সাহেবের বাড়িতে শুভময় কাকাকে পাঠিয়ে দেই। পুটু সাহেবের বাড়ি হারুয়ালছড়ির ওদিকটায় মোটামুটি কিছুটা হলেও নিরাপদ। শুভময় কাকা ভয়ে খুব ঘাবড়ে গেছেন। বাবুকে কাকার সাথে থাকতে বললাম-অন্তত একজন সঙ্গী এবং কাকার ভয় কিছুটা হলেও কেটে যাওয়া পর্যন্ত। যে জন্য বাবুকে গত দুু’দিন পর্যন্ত খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিলো না। ভেবে দেখো তো, আমাদের বাবু কত মহৎ কাজটাই না করেছে! আমাদের প্রাণপ্রিয় শুভময় কাকার জন্যে কষ্ট করেছে, প্রাণ রক্ষা করেছে।
বড় জেঠিমা বাবুকে মুহূর্তেই বুকে টেনে নিয়ে যার পর নেই আদর করলেন। উঠোনের উপস্থিত বেশ কয়েকজন একসাথে পাজাকোলা করে উপরে শূন্যে ছুঁড়ে দিয়ে বাবুকে নিয়ে গর্বে আনন্দে উল্লাসে ফেটে পড়ে।
বাড়ির পাশে বড় রাস্তায় তখন মিত্রবাহিনীর সাথে মুক্তিবাহিনী এবং সমবেত চলমান জনগোষ্ঠীর উচ্ছসিত শ্লোগান ধ্বনি- জয় বাংলা! -জয় শেখ মুজিব! -জয় বাংলা! -জয় শেখ মুজিব। আমার দেশ তোমার দেশ! বাংলাদেশ, বাংলাদেশ!
সবার হাতে হাতে উত্তীর্ণ সবুজের বুকে রক্ত খচিত লাল বৃত্তে হলুদ মানচিত্রের বাংলাদেশের পতাকা উড়ছে পত পত করে।

আপনার মন্তব্য লিখুন