‘জয় বাংলা’ বাঙালি জাতির প্রেরণা ও ঐক্যবদ্ধ হওয়ার স্লোগান

মো. লোকমানুল আলম

ডিসেম্বর মাস বিজয়ের মাস। বিজয়ের মাস এবং ১৬ ডিসেম্বর সমাগত হলে ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ হতে ১৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত দীর্ঘ নয় মাসের রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধে স্বজন হারানো ব্যাথা বেদনা আমাদের আবেগাপ্লুত করে তোলে। ১৬ ডিসেম্বর বিকেল সাড়ে চারটায় যখন সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে হানাদার বাহিনী তাদের অত্যাধুনিক সমরাস্ত্রগুলো মিত্র বাহিনী ও মুক্তিবাহিনীর পায়ের নীচে স্তূপাকারে রেখে আত্মসমর্পণ করে সেদিনের সেই বিজয়ের দৃশ্য দেখে দীর্ঘ নয় মাসের স্বজন হারানো ব্যাথা বেদনাগুলো নিমিষেই কর্পুরের মত উবে যায়। চারদিকে ‘জয় বাংলা’ স্লোগানে স্লোগানে বিজয়োল্লাসের ধ্বনি পুরো দেশকে মুখরিত করে তোলার যে অপূর্ব চিত্র জাতির কাছে ভেসে উঠে তা কি এত বছর পর ‘জয় বাংলা’ স্লোগান কেন জাতীয় স্লোগান হবে না মর্মে আদালত কর্তৃক জারি করা রুলের সাথে মেলে?
‘জয় বাংলা’ স্লোগান কিভাবে বাঙালিদের প্রাণের স্লোগান হল সেই বিষয়ে একটু পিছনে ফিরে তাকালে আমরা দেখতে পাই ‘১৯৬৯ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর শিক্ষা দিবস উপলক্ষে কেন্দ্রীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ ১৫ থেকে ১৭ সেপ্টেম্বর তিন দিনব্যাপী কর্মসূচি ঘোষণা করে। কর্মসূচির অংশ হিসেবে প্রথম দিন অর্থাৎ ১৫ সেপ্টেম্বর ঢাবি ক্যাম্পাসের মধুর ক্যান্টিনে ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের একটা সাধারণ ছাত্রসভা ডাকা হয়। সভা চলাকালীন অনেকটা আচমকা সবাইকে চমকে দিয়ে চিৎকার করে “জয় বাংলা” স্লোগান দিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র জিন্নাহ হলের (বর্তমান সূর্যসেন হল) ছাত্রলীগের আফতাব উদ্দিন আহমেদ, পরক্ষণেই সেই স্লোগানের রিপ্লাই দিলেন ছাত্রলীগ কেন্দ্রীয় কমিটির সহ সম্পাদক চিশতী শাহ হেলালুর রহমান। এরপরে কিছুক্ষণ ঐ স্লোগান চললো। সেটাই এই বাংলার বুকে প্রথম “জয় বাংলা” স্লোগান উচ্চারণ করা। এই দুই ছাত্রনেতাই ছিলেন নিউক্লিয়াস সদস্য। যদিও এর আগে “স্বাধীন বাংলা বিপ্লবী পরিষদ” হাতে লেখা তিন পাতার একটি পত্রিকায় কয়েকটি সংখ্যা প্রকাশ করে, যার নাম ছিল “জয় বাংলা”। পরের বছর ৪ জানুয়ারি ছাত্রলীগের প্রতিষ্ঠা বার্ষিকীর অনুষ্ঠানেও ‘জয় বাংলা’ স্লোগান উচ্চারিত হয়েছে।
পাকিস্তানীরা ধর্মের নাম দিয়ে জিন্দাবাদ শব্দ বন্ধটিকে ধর্মীয় লেবাস পরিয়ে এবং ব্যবহার করে যেভাবে বাঙালিদের মনস্তত্বে দোলা দিতে ছেয়েছিল তার পরিবর্তে জিন্দাবাদ শব্দটি চিরতরে মুছে দিতে তরুণ ছাত্র নেতৃবৃন্দ ‘জয় বাংলা’ শব্দবন্ধটি কে বাঙলার মানুষের আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলন সংগ্রাম ও জাতীয়তাবাদী চেতনার স্ফূরণ ঘটাতে চেয়েছিলেন। ১৯৬৯ সালে উদ্ভাবিত জয় বাংলা শব্দটি পরবর্তীতে পূর্ব বাংলার মানুষের স্বাধিকার আদায়ের প্রতিটি ক্ষেত্রে স্ফূলিঙ্গের মত কাজ করেছিল, প্রতিটি মানুষকে জাতীয়তাবাদী চেতনায় উজ্জীবিত করেছিল। পরবর্তী ঘটনাগুলো লক্ষ্য করলে দেখা যায় সেই সময়কার তরুণ ছাত্র নেতাদের উদ্ভাবন ও উদ্দেশ্য অনেকটা সফলও হয়েছিল।
১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনের পর বিজয়ী দল আওয়ামী লীগের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তরে যখন পাকিস্তানীরা প্রাসাদ ষড়যন্ত্রে লিপ্ত তখন বাংলার অবিসংবাদিত নেতা জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ঢাকার ঐতিহাসিক রেসকোর্স ময়দানে ১৯৭১ সালের ৭ই মার্চ বাঙালি জাতিকে মুক্তি ও স্বাধীনতার দিক নির্দেশনা দিয়ে বজ্রকন্ঠে ঐতিহাসিক ভাষণের সমাপ্তি টেনেছিলেন – “এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম, জয় বাংলা” উচ্চারণের মধ্য দিয়ে। জয় বাংলা স্লোগান এতদিন সীমিত পরিসরে ব্যবহার হলেও জাতির জনকের ভাষণের পর থেকে বাংলার মানুষের মুখে মুখে হয় এবং এই স্লোগান বাঙালির আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকারও ঔপনিবেশিকতার শৃংখল থেকে মুক্ত হওয়ার মূল স্লোগান হিসেবে পুরো জাতি ধারণ করে।
গত ৩০ অক্টোবর জাতিসংঘের ইউনেস্কো কর্তৃক জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এর ঐতিহাসিক ৭ই মার্চের ভাষণকে ‘মেমোরি অব দ্যা ওয়ার্ল্ড’ রেজিস্ট্রারে অন্তর্ভুক্ত করার মাধ্যমে স্বীকৃতি দিয়েছে এবং এই ডিসেম্বর মাসে পুরো জাতি যখন বিজয়ের ৪৭তম দিবসটি উদযাপনের কাছাকাছি ঠিক তখন একজন দেশপ্রেমিক নাগরিকের হয়ত ক্ষোভে দু:খে ‘জয় বাংলা’কে জাতীয় স্লোগান হিসেবে আইনগতভাবে স্বীকৃতি দেয়ার জন্য রিট আবেদন করেছেন। ১৯৪৭ সালের পাকিস্তানের স্বাধীনতার পরপরই তৎকালীন পাকিস্তানের ৫৬শতাংশ জনগণের মায়ের ভাষা ‘বাংলা’ কে উপেক্ষা করে ‘উর্দু’ কে রাষ্ট্রভাষা করার ষড়যন্ত্র করে পাকিস্তানীরা। সেই ষড়যন্ত্রের ১৯৫২ সালে মায়ের ভাষার জন্য আত্মাহুতি দিয়েছিল কয়েকজন, জ্বলে উঠেছিল পুরো জাতি। তাঁদের ত্যাগের আবেদন ছিল যুগান্তকারী এবং সেদিনের সেই আত্মদান ছিল সঠিক গন্তব্যের দিকে এগিয়ে যেতে বাঙালি জাতির জন্য মাইল ফলক।
১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ থেকে ১৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত হানাদার বাহিনী এদেশের ত্রিশ লক্ষ মানুষকে হত্যা করেছে। প্রায় তিন লক্ষ মা-বোনের ইজ্জত লুঠেছে। ঘর-বাড়ি, ব্রীজ, রাস্তা-ঘাট, কল-কারখানা প্রভৃতি ধ্বংস করেছে। নির্যাতন নিপীড়ন আর অত্যাচারের স্টিম রোলার চালিয়েছে বাঙালিদের ওপর। হানাদার বাহিনীর ‘পোড়া মাটি নীতি’র কবলে পড়ে বাংলাদেশ ছিন্ন বিচ্ছিন্ন হয়ে ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। বাঙলার অকুতোভয় দামাল ছেলেরা মেয়েরা তবু হার মানেনি। ‘জয় বাংলা’ স্লোগান দিয়ে রণাঙ্গনের মুক্তিযোদ্ধারা শত্রুদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়তে কসুর করেনি বিন্দুমাত্রও।
হানাদার বাহিনী কর্তৃক মুক্তিযোদ্ধা, নিরীহ নারী, পুরুষকে ধরে এনে যখন তাদের টর্চার সেলে চরম নির্যাতন চালিয়েছে তখনও ‘জয় বাংলা’ স্লোগান দিয়ে মৃত্যুকে শ্রেয় মনে করে বীরের মত মৃত্যুকে আলিঙ্গন করেছে, তবু হানাদার বাহিনীর কাছে মাথা নোয়ায়নি। প্রতিবছর বিজয়ের মাস সমাগত হলে আমরা যখন হিসেব নিকেষ করতে বসি আমাদের উন্নতি সমৃদ্ধি অর্জন ইত্যাদি নিয়ে তখন আমরা কেউ কি ভেবে দেখেছি আমাদের আজকের অর্জন, বিশ্বব্যাপী বঙালি ও বাংলাদেশের অবস্থান যে উচ্চতায় পৌঁছেছে তার নেপথ্যে ‘জয় বাংলা’ স্লোগানের কি অতুলনীয় অবদান।
বিশ্বের প্রায় অর্ধশতাধিক দেশে নিজেদের গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায়ের ঘটনাবলী এবং নিজেদের ইতিহাস ঐতিহ্য ও কৃষ্টি এবং সংস্কৃতি নতুন প্রজন্মের হৃদয়ে সঞ্চারিত করার লক্ষে নিজস্ব জাতীয় স্লোগান ব্যবহার করে থাকে। যে জয় বাংলা স্লোগান আমাদের জাতীয় প্রেরণার প্রতীক হয়ে পুরো জাতিকে অদম্য সাহস আর প্রেরণা যুগিয়েছিল এবং উজ্জীবিত করেছিল ১৯৭১ সালের যুগসন্ধিক্ষণে সেই ‘জয় বাংলা’কে কেন ঐক্যবদ্ধভাবে সকল বিতর্কের উর্ধ্বে উঠে জাতীয় স্লোগান হিসেবে গ্রহন করতে বার বার ব্যর্থ হচ্ছি।
জাতীয় দিবসসমূহকে আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড এবং সকল শ্রেণি পেশার মানুষকে সম্পৃক্ত করে ছড়িয়ে দিয়ে ‘জয় বাংলা’ কে দ্বিধাহীন চিত্তে জাতীয় প্রেরণার প্রতীক হিসেবে গ্রহণ করা গেলে অনেক বড় বড় জাতীয় সমস্যার সমাধান যেমন সক্ষম হত, তেমনি পুরো জাতি ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় পুনর্গঠিত হয়ে ঐক্যবদ্ধভাবে কাঙ্খিত লক্ষে পৌঁছতেও সহজ হতো।
তাই ১৯৬৯, ১৯৭০ ও ১৯৭১ সালের সেদিনের হৃদয়কাঁপানো ও মর্মস্পর্শী ‘জয় বাংলা বাংলার জয়’ গান গেয়ে ও শুনে শুনে যেমনি সকলে ঐক্যবদ্ধ হয়ে শত্রু নিধনে ঝাঁপিয়ে পড়ে দেশমাতৃকাকে শত্রু মুক্ত করে স্বাধীনতা অর্জন করেছিল ঠিক তেমনিভাবে সেই পথ ধরে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় জাতীয় সংহতি দৃঢ় ও মজবুত করার শপথ নিয়ে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য স্বদেশ গড়ার অঙ্গীকার করতে হবে।
লেখক : প্রাবন্ধিক