জয়তু শওকত ওসমান

মফিদুল হক

৩১ মার্চ, ১৯৪০। কলকাতায় বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য পরিষদ আয়োজিত ইকবাল দিবসের অনুষ্ঠান। অনুষ্ঠানের সভাপতি আবদুর রহমান সিদ্দিকী বাংলায় বক্তৃতাদান নিয়ে কটাক্ষ করলে শ্রোতাদের মধ্যে উত্তেজনার সঞ্চার হয়। এক পর্যায়ে উর্দু সমর্থকরা চড়াও হয় শ্রোতাদের ওপর। সেই বিবাদের সময় বাংলা ভাষার পক্ষে সোচ্চার তরুণ এক সাহিত্যকর্মী মাথায় আঘাতপ্রাপ্ত হন। কপাল ফেটে রক্ত বের হওয়া এই তরুণের নাম শওকত ওসমান। আজ তাঁর জন্মশতবার্ষিকী উদযাপনকালে যৌবনের এই ঘটনা স্মরণ করে আমরা বিস্মিত বোধ না করে পারি না। অনুধাবন করা যায় বিদ্রোহী প্রতিবাদী চেতনা ছিল তাঁর মজ্জাগত এবং বাংলা ও বাঙালির পক্ষে তাঁর যে দৃঢ় অবস্থান সেটা ছিল তাঁর মর্মগত। সুদূর যৌবন থেকে মননের যে জোর ও অঙ্গীকার ছিল তাঁর মধ্যে তা আজীবন বহন করেছেন শওকত ওসমান, সর্বদা দৃঢ় অবস্থান নিয়েছেন মৌলবাদ, ধর্মান্ধতা ও সামপ্রদায়িকতার বিরুদ্ধে এবং উদার চেতনায় সমাজকে স্নাত করতে ছিলেন চিরসংগ্রামী।
দেশভাগের পর তিনি পূর্ববাংলায় এসে চট্টগ্রামে স্থিত হন, অধ্যাপনা শুরু করেন চট্টগ্রাম কলেজে। পঞ্চাশের দশকের গোড়ায়, পাকিস্তানি তমসার ক্রমবিস্তারের মুখে চট্টগ্রামে যে সাহিত্যিক-সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড বিকশিত হয় সেখানে কলিম শরাফী, কবীর চৌধুরীর সঙ্গে মিলে শওকত ওসমানেরও ছিল বিশেষ ভূমিকা। পরে তিনি ঢাকা কলেজে অধ্যাপনায় যোগ দেন এবং সাহিত্যিক হিসেবে দাগ কাটতে শুরু করেন। শওকত ওসমানের সাহিত্যজীবন ও কর্মজীবন নিয়ে অনেক কথা বলার থাকে। জন্মশতবর্ষ সেই কাজের স্ফুরণ ঘটাবে বলে প্রত্যাশা করা যায়। বহুবর্ণিল সৃষ্টিশীল এই মানুষটির অবদান আজ যেভাবে প্রাসঙ্গিক হয়ে আছে তার অধ্যয়ন সবার জন্য হতে পারে প্রেরণাদায়ক।
শওকত ওসমানের সৃষ্টিশীলতার সঙ্গে তাঁর জীবনচেতনার যোগ এমন নিবিড় যে একের ছাড়া অপরের তাৎপর্য বোঝা সম্ভব নয়। তিনি সবসময়ে টগবগে তারুণ্যে ভরপুর থেকেছেন, এমন কি জীবনের প্রান্তসীমায় উপনীত হয়েও তাঁর তারুণ্যে কোনো ভাটা পড়েনি। মুক্তিযুদ্ধকালে তিনি চিনা নেতা চৌ এন লাইয়ের কাছে লিখেছিলেন অসাধারণ এক খোলা চিঠি। নীরদ চৌধুরী বাঙালির মুক্তিসংগ্রাম নিয়ে কটাক্ষ করলে প্রতিবাদী পত্র দাখিল করেন শওকত ওসমান।
১৯৭৫-এ বঙ্গবন্ধু হত্যায় ব্যথিত বিপর্যস্ত শওকত ওসমান অবসর-জীবন উপভোগের সুযোগ বিসর্জন দিয়ে আবার দেশান্তরী হন কলকাতায়। গৃহচ্যুত প্রবাসী তরুণের মতোই ছিল তাঁর নির্বাসিত জীবন, যার কিঞ্চিৎ পরিচয় মেলে রোজনামচার আকারে লেখা উত্তরখণ্ড : মুজিবনগর গ্রন্থে। স্বদেশে প্রত্যাবর্তনের পর একইভাবে সজাগ ও সজীব থেকেছেন শওকত ওসমান। চিন্তার সঙ্কীর্ণতা ও মৌলবাদের বিরুদ্ধে বরাবরের মতোই খড়্‌গহস্ত। তিনিই তো লিখেছিলেন, “ধর্মের অপর নাম কল্যাণ/ বাকি সব শয়তানের গান।”
মুক্তিযুদ্ধকালে প্রবাসজীবনে দ্রুতহাতে শওকত ওসমান লিখেছিলেন ‘জাহান্নাম হইতে বিদায়’। নামেই বোঝা যায় পাকিস্তানকে কোন্‌ দৃষ্টিতে দেখেছিলেন লেখক। বাংলাদেশের অভ্যুদয় তাঁর কাছে তাই আলোকিত উদার-অভ্যুদয় হিসেবে প্রতিভাত হয়েছিল। আজকে পাকিস্তান যখন ব্যর্থরাষ্ট্র ও সন্ত্রাসী রাষ্ট্র হিসেবে গণ্য হচ্ছে, তখন শওকত ওসমান ইতিহাসের গতিধারার সমর্থন নিশ্চিতভাবে এখানে খুঁজে পেতেন। মনে পড়ে তাঁর সতীর্থ বন্ধু নাজমুদ্দীন হাশেম পাকিস্তানের ক্যাম্পের বন্দিদশা থেকে মুক্ত হয়ে বাংলাদেশে ফিরেছিলেন এবং বন্দিজীবনের রোজনামচা প্রকাশে উদ্যোগী হয়েছিলেন। প্রকাশিতব্য সেই গ্রন্থের নাম কি দেয়া যায় সেজন্য শরণ নিয়েছিলেন শওকত ওসমানের। তিনি নাম দিয়েছিলেন ‘বন্দিশালা পাকিস্তান’। মনে হতে পারে সাদামাটা সাধারণ নাম, কিঞ্চিৎ হেসে স্যার আমাকে জানিয়েছিলেন যে, গ্রন্থনাম পড়ার সময় পাঠক অন্তত পাকিস্তানকে একবার ‘শালা’ সম্বোধন করবে, নামকরণের সার্থকতা এখানেই।
আজ মৌলবাদের কালো থাবা ছারখার করে দিচ্ছে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠতা-সম্পন্ন ঐতিহ্যবাহী বিভিন্ন দেশ। ইরাক, লিবিয়া, সিরিয়া, ইয়েমেন, আফগানিস্তান জুড়ে ঘটছে নিরন্তর রক্তক্ষরণ, ভেঙে পড়ছে সামাজিক সংহতি ও বুনন। বাংলাদেশেও মৌলবাদের সমর্থনপুষ্ট জঙ্গিবাদ দেশে রক্তাক্ত অনেক অধ্যায় রচনা করেছে, মধ্যযুগীয় অন্ধতার দিকে ঠেলে দিতে চাইছে সমাজকে। এমন পটভূমিকায় শওকত ওসমানকে স্মরণ করে আমরা নানাভাবে জীবনের পথচলার পাথেয় সঞ্চয় করতে পারি। তাঁর বলিষ্ঠ কলম ও নিবিড় উপলব্ধি আমাদের জন্য অনিঃশেষ প্রেরণার উৎস, আজকের দিনে বিপুলভাবে প্রাসঙ্গিক। জয় হোক শওকত ওসমানের।

আপনার মন্তব্য লিখুন