জীবন থাকলেও ছাই হলো রুমার জীবনের সঞ্চয়

নিজস্ব প্রতিবেদক

জীবন থাকলেও জীবনের জন্য জমানো সব সঞ্চয় শেষ হয়ে গেল রুমা আকতারের (৩৫)। ছোটকাল থেকেই সংগ্রাম করে বেড়ে উঠে যে সঞ্চয় করেছেন পরিবারের জন্য সে সঞ্চয় আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে গেল। সেই সাথে ধূলিসাৎ হয়ে গেছে তার জীবনের স্বপ্ন। গতকাল রোববার চাক্তাই বেড়া মার্কেট এলাকায় বস্তিতে আগুনে পুড়ে নিঃস্ব হয়ে গেলেন রুমা।
গভীর রাত। ঘুমে আচ্ছন্ন সবাই। ভোরে উঠার তাড়া, সাথে নতুন বাসা খোঁজার ক্লান্তি। সব মিলিয়ে এক দুশ্চিন্তায় দিন পেরিয়ে রাতে বাসায় এসে প্রশান্তির ঘুমে সবাই। কে জানতো এই ঘুম হবে শেষ ঘুম।
গত শনিবার দিবাগত রাত সাড়ে তিনটার দিকে কলোনির প্রথম ঘরে আগুন লাগে। আগুনের লেলিন শিখায় ঘুম ভাঙে রহিমা বেগমের। চোখ মুছতে মুছতে গলা ছেড়ে ডাকছেন পাশের বাসার রুমা আকতারসহ সবাইকে। সবাইকে জীবন বাঁচাতে ডাকতে গিয়ে সর্বনাশা আগুন তখন নিজ বাসায়। দৌঁড়ে চলে গেলেন ভিতরে, কিন’ ভাগ্যের নির্মম পরিহাস তিন ছেলে মেয়ে নিয়ে আর বের হতে পারেননি এতোগুলো মানুষকে বাঁচানো রহিমা। নিজ বাসায় আগুনে দগ্ধ হয়ে যান তিন সন্তান নিয়ে।
কথাগুলো বলছেন রুমা আকতার (৩৫)। তিনি বলেন রাতে আগুন লাগার পর রহিমা আপা সবাইকে বাঁচাতে ছুটে গেলেও নিজে বাঁচতে পারেননি। সন্তানদের বের করতে গিয়ে বাসায় টিনে চাপা পড়ে আর বের হতে পারেননি। রহিমা যদি আমাদের না ডাকতো হয়তো আরো অনেক পরিবার হারাতো আপন মানুষগুলোকে।
রুমা আকতার ৭ বছর বয়স থেকে চাক্তাই বেড়া মার্কেটের এ কলোনিতে একশ টাকা ভাড়া দিয়ে মায়ের সাথে বসবাস করছেন। গ্রামের বাড়ি পটিয়া উপজেলার শান্তির হাট কানু চেয়ারম্যানের বাড়িতে। ছোট থাকতে বাবার সাথে মায়ের ছাড়াছাড়ি হওয়ার কারণে শহরে এসে বাসা ভাড়া থাকতো তারা। মায়ের সাথে সেই থেকে এ কলোনিতে কাজ করে দিন যাপন করে আসছে। কলোনির পুরাতন ভাড়াটিয়া হিসাবে সবাই চিনে তাকে। বিয়েও হয়েছে বাহাদুর নামে একজনের সঙ্গে। তিন ছেলে ও এক মেয়ের সংসারে স্বামী স্ত্রী দু’জনই মাছের ব্যবসা করতেন। নগরীর ফিশারিঘাট মাছের গদি থেকে মাছ ক্রয় করে বাহাদুরকে দিতেন, সারাদিন মাছ বিক্রি করে পরের দিন আবার মাছ নিয়ে বাজার ও মহল্লায় গিয়ে সেগুলো বিক্রি করতেন।
ব্যবসা করে দেড় লক্ষ টাকা, একটি মাত্র মেয়েকে বিয়ে দেওয়ার জন্য স্বর্ণসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রী নিয়ে রেখেছেন বাসায়। রোববার সকালে মাছের গদিতে গিয়ে এক/দেড় লাখ টাকা দেওয়ার কথা ছিল। কিন’ সব টাকা ও স্বর্ণ পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। সারা বছরের সঞ্চয় চোখের সামনে পুড়তে দেখেও কিছু করতে পারেননি রুমা।
রুমা বলেন, বস্তি উচ্ছেদ করা হবে এমন খবরে সবাই বাসা ছাড়ছে। কিন’ আমি থাকার কারণে অনেকে যায়নি। আমি এখানে সেই ছোটকাল থেকে। এখান থেকে চলে গেলে থাকবো কোথায়। তাই ভেবেছিলাম মেয়েটাকে বিয়ে দিয়ে ব্রিজের নিচে ঘর করে থাকবো। সঞ্চয় যা ছিল সব তো পুড়ে শেষ হয়ে গেছে। এখন কি করব, কিভাবে মেয়ের বিয়ে দেবো? ভবিষ্যৎ অন্ধকার দেখছি।