জীবন-জিজ্ঞাসু

কাজী আবদুল ওদুদ

মোতাহের হোসেন চৌধুরীর সঙ্গে আমার পরিচয় হয় ত্রিশ বৎসর পূর্বে (১৯২৬)। প্রায় সেকাল থেকেই তাঁকে জেনে আসছি পরমপ্রিয় অনুজপ্রতিম সাহিত্যিক সহব্রতী বলে- যদিও দেশ বিভাগের পরে বছরের পর বছর তাঁর সঙ্গে দেখা হযনি, পত্র বিনিময়ও হয়েছে দীর্ঘদিন পর পর। জীবনে সুন্দরের সাধনা ছিল তাঁর; অল্প বয়সেই তাঁকে দেখা দেয় সাহিত্যিক প্রবণতা। বোধ হয সতেরো আঠারো বৎসর বয়সেই তাঁর কবিতা মাসিকপত্রে বের হয় ছদ্মনামে। কিন্তু সাহিত্যিকরূপে তাঁর প্রতিষ্ঠা লাভ হয় ঢাকার ‘মুসলিম সাহিত্য-সমাজে’র বার্ষিক অধিবেশনগুলোয়- এর প্রথম বার্ষিক অধিবেশনে তিনি যোগ দেন তেইশ-চব্বিশ বৎসর বয়সে।
স্বভাবত : তিনি ছিলেন কবিপ্রাণ- সৌন্দর্যের প্রতি গভীরভাবে আকৃষ্ট। নব- যৌবনেই তিনি কবিতা লিখতে আরম্ভ করেন। কিন্তু সেই সঙ্গেই তিনি ছিলেন বিচারশীল- তাঁর সৌন্দর্যবোধ আর বিচারশীলতা তুল্যরূপে বিকশিত হয়ে চলে। তার ফলে কিছু ভালো কবিতা লেখা তাঁর পক্ষে সম্ভব হলেও শেষ পর্যন্ত তাঁর প্রতিষ্ঠা দাঁড়ায় জীবন জিজ্ঞাসু প্রাবন্ধিক রূপেই। তাঁর সে জীবন জিজ্ঞাসার মর্যাদা নিরূপণের চেষ্টা পরবর্তীদের বিশেষভাবে করতে হবে- এমনি করেই উন্নীত হয সাহিত্যিক ও সাংস্কৃতিক মান- আর সে চেষ্টায় প্রবৃত্ত হলে তাঁরা হয়ত বিস্মিত হয়ে দেখবেন, যে সমাজে ও কালে মোতাহের হোসেন চৌধুরীর জন্ম হয়েছিল সে দুয়েরই অবিকাশ তাঁতে বেজেছিল। সেই বেদনার রসায়নে তাঁর সৌন্দর্যপূজা হয়ে ওঠে জীবন জিজ্ঞাসা।
তাঁর রচনার পরিমাণ বেশি নয়। এর একটি কারণ চিন্তায় ও রচনায় শিথিলতার প্রশ্রয় তিনি দিতে চাইতেন না। কিন্তু হয়ত তার চাইতেও বড় কারণ যে- সমাজে তাঁর জন্ম হয়েছিল উদার মানবিক চিন্তাধারার প্রতি সে সমাজের সুস্পষ্ট বিতৃষ্ণা। তিনি বিশেষ ভদ্র প্রকৃতির লোক ছিলেন, অপ্রিয় বাদবিতণ্ডা যথাসম্ভব এড়াতেই তিনি চাইতেন।
পরিমাণে অল্প হলেও তাঁর রচনা যে বিশিষ্ট হয়েছে, এতেই তাঁর সাহিত্য সাধনা সার্থক হয়েছে। সাধারণত সব দেশেই প্রচলিত সাহিত্যে শিথিল চিন্তা, ভাববিলাসিতা, এসবের স্থান অনেকখানি। কিন্তু সত্যিকার সাহিত্য এসব থেকে ভিন্ন ধরনের বস্তু। কেননা, অকৃত্রিম দুঃখ- বেদনা ও আনন্দবোধ থেকেই তার উদ্ভব, ভাববিলাসিতা থেকে নয়। মোতাহের হোসেন চৌধুরীর রচনা সত্যিকার সাহিত্যিক মর্যাদা লাভ করেছে। যে সমাজে ও কালে তাঁর জন্ম তার অসম্পূর্ণতা, অযৌক্তিতা আর বিকৃতি সম্বন্ধে তাঁর তীক্ষ্ণ চেতনার স্বাক্ষর তাতে রয়েছে।
বাঙালী- সুলভ শিথিলতা যে কখনো প্রশ্রয পায়নি তাঁর অনুভবে বা বাণীতে, তারও মূলে এ তীব্র বেদনা বোধ। তাঁর এ মানসিক সচেতনতা এক নতুন ঋদ্ধি ও শ্রী
২।
১৯২৬ খ্রিস্টাব্দের প্রারম্ভে ঢাকা শহরের রমনা অঞ্চলে দেখা দেয় সুবিখ্যাত ‘মুসলিম সাহিত্য-সমাজ’ তার বুদ্ধির মুক্তি আদর্শ নিয়ে। এ প্রতিষ্ঠানটি একালের বাংলার মুসলমানদের জীবনে এক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা গ্রহণ করেছে। কেননা, এটি সেদিনেই যে বহু শিক্ষিত মুসলমানের উপরে উদার মানবিক প্রভাব বিস্তার করেছিল তাই নয়, নানা ঘাত-প্রতিঘাতের দিকেই পা বাড়িয়েছে। আর তাই স্বাভাবিক। ইসলাম প্রতিষ্ঠা অর্জন করেছিল দুঃস্থ ও বঞ্চিতদের অধিকার দাতারূপে। দার্শনিক দল আর সুফী-সাধক দল উদার মানবিক সাধনার জন্যই জগতে সমাদৃত হয়েছিলেন। তাই মুসলমান আবার যদি জাগতে চায় তবে উদার মানবিক রূপেই সে যে জাগবে এই প্রত্যাশিত। ‘মুসলিম সাহিত্য-সমাজ’ প্রায় বারো বৎসর স্থায়ীত্ব হয়েছিল। এর দশম অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন শরৎচন্দ্র। এর বহু বার্ষিক অধিবেশনেই মোতাহের হোসেন যোগদান করেছিলেন আর সুচিন্তিত ও সুলিখিত প্রবন্ধ পাঠ করে উদার মানবিক গৌরব বাড়িয়েছিলেন।
১৩৬১ সালের সংকল্প-এ তাঁর কয়েকটি প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়েছিল, বিশেষ করে উক্ত পত্রের শেষ দুই সংখ্যা প্রকাশিত তাঁর ‘সংস্কৃত-কথা’ আর ‘অহমিকা-সৌন্দর্যচেতনা-রবীন্দ্রনাথ’ পশ্চিমবঙ্গের কয়েকজন সমঝদারের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিল। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের সাহিত্যিক ও পাঠক সমাজের সঙ্গে তাঁর ব্যাপক পরিচিতি যে ঘটেনি তা যথার্থ। কিন্তু বাস্তবিকই তিনি ছিলেন একজন সত্যিকার সাহিত্যিক। একালের বাংলা সাহিত্যে তাঁর নাম স্মরণীয় হবে- এই আশা আমরা পোষণ করি।
সুন্দরের অনির্বাণ সাধনা ছিল মোতাহের হোসেনের মনে, সেই সঙ্গে ছিল তাঁর বাঁচার সাধনা। এ দুটি ছিল তাঁর জন্য সমার্থক- সুন্দর হবার অর্থ ছিল যোগ্যভাবে বাঁচা, বাঁচার অর্থ ছিল সুন্দর হওয়া। মানুষ মরণশীল, কিন্তু তার সাধনা মরণজয়ী হতে পারে। মোতাহের হোসেনের সুন্দরের সাধনা আর বাঁচার সাধনা মরণজয়ী হোক।

সাইফুল ইসলাম সম্পাদিত ‘সংস্কৃতি-সাধক মোতাহের হোসেন চৌধুরী থেকে