জাহাজ নির্মাণে এগিয়ে ওয়েস্টার্ন মেরিন

পাঁচ বছরে ২৫টি রপ্তানি, নির্মাণের আদেশ রয়েছে ৩১টির

মোহাম্মদ আলী
কর্ণফুলী এক নম্বর ঘাটে ওয়েস্টার্ন মেরিন শিপইয়ার্ডের নির্মাণকৃত জাহাজ ‘দরিয়া’ হস্তান্তর অনুষ্ঠানের উদ্বোধন করছেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আব্দুল মুহিত-
কর্ণফুলী এক নম্বর ঘাটে ওয়েস্টার্ন মেরিন শিপইয়ার্ডের নির্মাণকৃত জাহাজ ‘দরিয়া’ হস্তান্তর অনুষ্ঠানের উদ্বোধন করছেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আব্দুল মুহিত-

দেশের দ্রুত বর্ধনশীল শিল্প খাতগুলোর মধ্যে অন্যতম জাহাজ নির্মাণশিল্প। দেশীয় চাহিদা মিটিয়ে বিদেশেও রফতানি হয় এখানকার তৈরি জাহাজ। নানা প্রতিবন্ধকতা সত্ত্বেও নির্মাতা প্রতিষ্ঠানগুলো জাহাজ নির্মাণে চেষ্টার কমতি রাখছে না। এক্ষেত্রে অগ্রগামী ওয়েস্টার্ন মেরিন শিপইয়ার্ড।
প্রতিষ্ঠানটি যাত্রা শুরু করেছিল ২০০০ সালের ১১ জুলাই। ইতোমধ্যে আন্তর্জাতিক বাজারে বেশ সুনাম কুড়িয়েছে। বিগত বছরগুলোয় ১৪০টি জাহাজ নির্মাণ করেছে ওয়েস্টার্ন মেরিন। এর মধ্যে ১১৫টি জাহাজ দেশের অবকাঠামোগত উন্নয়নে ব্যবহূত হচ্ছে। তাদের তৈরি সব জাহাজই বিশ্বমানের, পরিবেশবান্ধব ও নিরাপদ। বর্তমানে প্রাইভেট এই প্রতিষ্ঠানটি নরওয়ে, ইউএই, ডেনমার্ক, ইংল্যান্ডের জন্য জাহাজ নির্মাণ করছে।
ওয়েস্টার্ন মেরিনের সহকারী ব্যবস’াপনা পরিচালক মোহাম্মদ আবদুল মবিন বলেন, ‘বাংলাদেশে সর্বপ্রথম উচ্চ প্রযুক্তির অফশোর পেট্রোল ভেসেল নির্মাণ করে ওয়েস্টার্ন মেরিন ইতিহাস রচনা করেছে। ওয়েস্টার্ন মেরিন এখন সারা বিশ্বে জাহাজ নির্মাণে একটি আস’া ও বিশ্বাসের নাম।’
তিনি জানান, ওয়েস্টার্ন মেরিন এ পর্যন্ত ১৪০টি জাহাজ সরবরাহ করেছে। এতে আয় হয়েছে প্রায় ২ হাজার ১০০ কোটি টাকা। এর মধ্যে দেশের বাইরে রপ্তানি করা হয়েছে ২৫টি। এই ২৫টি জাহাজ যদি বিদেশ থেকে আমদানি করা হতো, তাহলে বাংলাদেশের রিজার্ভ থেকে প্রায় ৩৭৫ কোটি টাকা খরচ হতো। বাকি ১১৫টি জাহাজ দেশের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের জন্য সরবরাহ করা হয়েছে।
আব্দুল মবিন আরো জানান, বর্তমানে আরো ৩১টি জাহাজ নির্মাণের জন্য আদেশ রয়েছে। এসব জাহাজের মধ্যে দেশের প্রাইভেট কোম্পানির জন্য ২০টি, নরওয়ের জন্য ১টি, চট্টগ্রাম বন্দরের জন্য ১টি, পায়রা বন্দরের জন্য ১টি, বিআইডব্লিউটিসি’র জন্য ২টি, বাংলাদেশ আর্মির জন্য ১টি এবং ৪টি কনটেইনার জাহাজ বাংলাদেশের প্রাইভেট সেক্টরের জন্য নির্মাণ করা হবে।
ওয়েস্টার্ন মেরিনের ব্যবস’াপনা পরিচালক সাখাওয়াত হোসেন বলেন, ‘ওয়েস্টার্ন মেরিন অতি অল্প সময়ে বিশ্ব বাজারে ব্যাপক সুনাম অর্জন করেছে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে গুণগতমান সম্পন্ন জাহাজ রপ্তানির মাধ্যমে গত পাঁচ বছরে বাংলাদেশের শিপবিল্ডিং ইন্ডাস্ট্রি মোট ৪০টি জাহাজ রপ্তানির মাধ্যমে ১৫০ কোটি মার্কিন ডলার আয় করেছে। যার মধ্যে ওয়েস্টার্ন মেরিন এককভাবে রপ্তানি করেছে ২৫টি জাহাজ।’
তিনি আরো বলেন, ‘গত ৪-৫ বছরে বিশ্বের জাহাজ নির্মাণ শিল্পের মন্দাভাব কাটিয়ে বর্তমানে এই শিল্পে আশানুরূপ উন্নতি হচ্ছে। কিন’ এই শিল্পের এখন সবচেয়ে বড় এবং একমাত্র চ্যালেঞ্জ হচ্ছে, অবকাঠামোগত বিনিয়োগের দায়ভার বহন। জাহাজ নির্মাণশিল্পে যারা অবকাঠামোগত বিনিয়োগ করেছেন, তারা সবাই এখন এই সমস্যায় রয়েছেন। এই শিল্পের অবকাঠামোগত বিনিয়োগের ক্ষেত্রে ব্যাংক ঋণের সুদের হার ৩-৪ শতাংশে এবং ২০ বছর মেয়াদে দেওয়া হলে এ শিল্প ঘুরে দাঁড়াতে পারবে।’
সাখাওয়াত হোসেন জানান, বিশ্বের অন্যান্য দেশে যেমন চীন, কোরিয়া, ভারত ইত্যাদি দেশে জাহাজ নির্মাতারা তাদের মূলধন বিনিয়োগে সরকারের কাছ থেকে অত্যন্ত স্বল্প সুদের হারে (১-২ শতাংশ) ঋণ সুবিধা, ভর্তুকি ও বিশেষ রপ্তানি সহায়তা লাভ করে থাকে। যেমন জাপান, কোরিয়া, চীনে প্রায় ২৫ বছর মেয়াদে ঋণ সুবিধা দেওয়া হয় এবং ভারতে ১০ বছর মেয়াদে ২০ শতাংশ সাবসিডি প্রদান করছে। এ ব্যাপারে তিনি সরকারের সুদৃষ্টি কামনা করেন।
এ সেক্টরের ব্যবসায়ীদের সাথে কথা বলে জানা যায়, বিভিন্ন সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও অপেক্ষাকৃত কম মূল্যে মানসম্পন্ন জাহাজ নির্মাণের কারণে বিদেশি ক্রেতারা বাংলাদেশে তৈরি জাহাজের দিকে ঝুঁকছেন। এ ক্ষেত্রে জাহাজ নির্মাণে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের অবস’ান সন্তোষজনক। শিল্পোন্নত জাহাজ নির্মাতা দেশগুলোয় খরচ বেড়ে যাওয়ায় নিজ দেশে জাহাজ নির্মাণ না করে সস্তা শ্রমের দেশে নির্মাণের কার্যাদেশ দিচ্ছে তারা। বিশ্বের জাহাজ নির্মাণকারী দেশগুলো যেমন জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, চীন, ভিয়েতনাম ও সিঙ্গাপুর এত বেশি জাহাজ তৈরির কার্যাদেশ পেয়েছে যে, তারা আর নতুন করে কার্যাদেশ নিতে ইচ্ছুক নয়। এ অবস’ায় বিশ্বব্যাপী জাহাজ ক্রেতারা বিকল্প হিসেবে বাংলাদেশের মতো দেশগুলোয় কার্যাদেশ দিচ্ছে। এ সম্ভাবনাকে কাজে লাগিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে পুঁজিবাজারের তালিকাভুক্ত প্রতিষ্ঠান ওয়েস্টার্ন মেরিন শিপইয়ার্ড।
কার ফেরি, যাত্রীবাহী জাহাজ, মাছ ধরার নৌকা, ট্রলার, বার্জ, টাগবোট তৈরিতে দক্ষতা ও সুনাম রয়েছে তাদের। ফরাসী ক্লাসিফিকেশন সোসাইটি ব্যুরো ভারিটাস বা বিভি থেকে আইএসও এবং ওএইচএসএএস সনদ অর্জন করেছে ওয়েস্টার্ন মেরিন শিপইয়ার্ড। দেশের জাহাজ নির্মাতা প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে ওয়েস্টার্ন মেরিনই সর্বপ্রথম এ ধরনের সার্টিফিকেট অর্জন করেছে। এতে ইয়ার্ডে ইন্টিগ্রেটেড ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম বা আইএমএস নিশ্চিত হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি জাতীয় রপ্তানি ট্রফি পেয়েছে। নৌ পরিবহন মন্ত্রণালয়ের ন্যাশনাল মেরিটাইম অ্যাওয়ার্ডসহ দেশি-বিদেশি নানা পুরস্কার ও সনদে পূর্ণ তাদের ঝুলি। এ শিপইয়ার্ডটি চট্টগ্রাম জেলার পটিয়াতে অবসি’ত।