জাফর ইকবালের ওপর কার এত আক্রোশ?

জয়নাল আবেদীন, ঢাকা

বাংলাদেশে বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনী লেখা এবং এ সংক্রান্ত লেখাকে জনপ্রিয়করণের পথিকৃৎ ড. মুহম্মদ জাফর ইকবালকে হত্যার সর্বশেষ চেষ্টাটি হয়ে গেলো গতকাল বিকেলে। দেশের প্রখ্যাত এই পদার্থবিদ এ যাত্রায়ও রক্ষা পেলেন। এর আগেও একাধিকবার তিনি হামলার শিকার এবং হত্যার হুমকি পেয়েছেন। গতকালের হামলার পর আবারও প্রশ্ন উঠলো- কার এত আক্রোশ জনপ্রিয় বিজ্ঞানমনস্ক লেখকের ওপর।
দেশের কিশোর-কিশোরীদের কাছে জনপ্রিয়তার শীর্ষে অবস’ানকারী লেখক জাফর ইকবাল সিলেটের শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করেন। এখানকার কম্পিউটার বিজ্ঞান ও প্রকৌশল বিভাগের অধ্যাপক এবং তড়িৎ কৌশল বিভাগের প্রধান হিসেবে কর্মরত তিনি। গতকাল শনিবার বিশ্ববিদ্যালয়ের মুক্তমঞ্চে ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিক্স ইঞ্জিনিয়ারিং (ইইই) উৎসবের সমাপনী অনুষ্ঠান চলাকালে তাঁর ওপর ছুরি নিয়ে হামলা করে এক যুবক। আক্রমণকারীকে তাৎক্ষণিকভাবে ধরে পিটুনি দেন প্রত্যক্ষদর্শী শিক্ষার্থীরা। এরপর তাকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে সোপর্দ করা হলেও তার মুখ থেকে কোনো কথা বের করতে পারেনি পুলিশ।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ড. জাফর ইকবালের প্রতি সবচেয়ে বেশি আক্রোশ নিষিদ্ধ ঘোষিত জঙ্গি সংগঠন আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের। একাধিকবার এই শিক্ষককে হত্যার হুমকি দেয় সংগঠনটি। সর্বশেষ ২০১৬ সালের ১৩ অক্টোবর জাফর ইকবাল এবং তাঁর স্ত্রীকে হত্যার হুমকি দিয়ে মুঠোফোনে খুদে বার্তা পাঠানো হয়।
জাফর ইকবালের মুঠোফোনে পাঠানো খুদেবার্তায় ইংরেজিতে লেখা ছিলো- হাই আনবিলিভার! উই উইল স্ট্যাঙ্গুলেট ইউ সুন।’ তাঁর স্ত্রীকে হুমকি দিয়ে পাঠানো বার্তাটি ছিলো- ‘ওয়েলকাম টু আওয়ার নিউ টপ লিস্ট! ইওর ব্রেথ মে স্টপ এট এনিটাইম-এবিটি’। আনসারুল্লাহ বাংলা টিম নিজেদের যে কোনো তৎপরতায় সংগঠনকে ‘এবিটি’ হিসেবে উল্লেখ করে থাকে।
আনসারুল্লাহ বাংলা টিম এর আগেও হুমকি দিয়েছিলো জাফর ইকবালকে। সেটি ছিলো ২০১৫ সালের ২১ মে’র ঘটনা। ওই সময় শুধু জাফর ইকবালকে নয়, একসঙ্গে ১০ জনকে হুমকি দেয়া হয়েছিলো। ওই খুদেবার্তায় হুমকি ছিলো এরকম- ‘মাস্ট ইউ উইল প্রিপেয়ার ফর ডেড’।
একাত্তরে মহান মুক্তিযুদ্ধের মানবতাবিরোধী অপরাধী জামায়াত নেতা কাদের মোল্লার সর্বোচ্চ সাজার দাবিতে রাজধানীর শাহবাগে গণজাগরণ সৃষ্টি হয়েছিলো ২০১৩ সালে। সেই সময় নেতৃত্বের অগ্রভাগে ছিলেন ড. মুহম্মদ জাফর ইকবালও। ওই আন্দোলনের ফসল হিসেবে কাদের মোল্লার সর্বোচ্চ সাজা মৃত্যুদণ্ড হয়েছিলো এবং একপর্যায়ে সেই দণ্ড কার্যকরও হয়। এরপর থেকে গণজাগরণ মঞ্চ এবং এ সংগঠনের নেতৃস’ানীয়দের নিয়ে শুরু হয় তুমুল বিতর্ক। বিশেষ করে ‘আস্তিক-নাস্তিক’ প্রসঙ্গ উঠে আসে আলোচনা-সমালোচনায়। এরপর একে একে অনেক লেখক, ব্লগার, প্রকাশককে খুন হতে হয়। সেই বিতর্কের ঘেরাটোপে পড়ে যান লেখক জাফর ইকবালও। সেই থেকে তাঁকে উপর্যুপুরি হত্যার হুমকি দিয়ে আসছিলো জঙ্গি সংগঠন এবং দৃর্বৃত্তরা। তাঁর নিরাপত্তায় কয়েকজন সশস্ত্র পুলিশও নিযুক্ত করা হয়। গত বছর আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের দেওয়া হুমকির পর এই লেখকের অবস’ানগত এলাকার সামগ্রিক নিরাপত্তাব্যবস’াও জোরদার করে প্রশাসন। এমনকি গতকাল যখন হামলা হয়, তখনও জাফর ইকবালের সঙ্গে পুলিশি নিরাপত্তা ছিলো।
এদিকে, জঙ্গি সংগঠন আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের পাশাপাশি গতকাল রাতে আলোচনায় এসেছে ছাত্রলীগের নামও। ২০১৫ সালের সেপ্টেম্বরে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের ওপর ছাত্রলীগের হামলার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানিয়েছিলেন জাফর ইকবাল। গত আগস্ট মাসেও এক বক্তব্যে জাফর ইকবাল বলেছিলেন, ‘আওয়ামী লীগ হারলে কারণ হবে ছাত্রলীগ’। এসব কারণে জাফর ইকবালের ওপর ছাত্রলীগের একটি অংশ ক্ষুব্ধ বলে জানা গেছে। ছাত্রলীগ নেতারা বিভিন্ন সময়ে এই লেখকের বিরুদ্ধে উষ্মা প্রকাশ করেছেন। গতকালের হামলার আসল কারণ উদ্ঘাটনের আগে তাই এই ছাত্র সংগঠনটির প্রতি দৃষ্টি রাখছেন জাফর ইকবালের ভক্তরা।
এ ছাড়া জাফর ইকবালের প্রতি ক্ষোভ ছিলো কয়েকটি ইসলামী দলেরও। আওয়ামী ওলামালীগ এবং সমমনা ১৩টি দল ২০১৫ সালের ২১ জুন জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে এক মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করে। ড. জাফর ইকবালের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিতেই ছিলো ওই কর্মসূচি। সেই কর্মসূচিতে বলা হয়, ‘এদেশে প্রগতিশীল, বুদ্ধিজীবী ও মুক্তমনার লেবেলে নাস্তিক্যবাদকে ব্যাপক পৃষ্ঠপোষকতা দেয়া হচ্ছে। নাস্তিকরা অনলাইনসহ সব জায়গায় প্রকাশ্যে ইসলাম ধর্মের বিরুদ্ধে কুৎসা রটাচ্ছে।’
আরও খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, জাফর ইকবালের বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রকাশ করে বক্তব্য দিয়েছিলেন সিলেট-৩ আসনের সংসদ সদস্য মাহমুদ সামাদ চৌধুরী। শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সিলেটি শিক্ষার্থীদের ভর্তির সুযোগ বন্ধ করে দিতে আইনকানুন করা হয়েছে অভিযোগ করে এক সভায় তিনি বলেছিলেন, ‘আমি যদি বড় কিছু হতাম, তাহলে জাফর ইকবালকে কোর্ট পয়েটে ধরে এনে চাবুক মারতাম।’
গত কয়েক বছরে দেশের বিভিন্ন স’ানে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা-হামলার বিষয়েও জোরালো অবস’ান ছিলো জাফর ইকবালের। হিন্দু ধর্মের নাগরিকদের ওপর হামলার বিরুদ্ধে তিনি কঠোর বক্তব্য দিয়েছিলেন। এসব কারণেও একটি পক্ষ ক্ষুব্ধ ছিলো তার প্রতি। গতকালের হামলা সেই ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ কি-না, তাও খতিয়ে দেখার দাবি জাফর ইকবালের ভক্তদের।
তবে ঠিক কোন কারণে গতকাল জাফর ইকবালকে হত্যার চেষ্টা হয়, সেটি এখনও অনুদ্ঘাটিত। হামলাকারী যুবককে সঙ্গে সঙ্গে ধরে ফেলা হলেও তার মুখ থেকে কোনো তথ্য বের করতে পারেনি পুলিশ। হামলাকারীর ছবি প্রকাশ হলে তাকে বহিরাগত বলেই ধারণা করে শাবিপ্রবির শিক্ষার্থীরা।