জাতীয় শিক্ষক দিবসের প্রত্যাশা : বঙ্গবন্ধু’র স্বপ্নের বৈষম্যহীন শিক্ষাব্যবস্থা

শাহাবউদ্দিন মাহমুদ

শিক্ষা মানুষের আচরণে কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন ঘটিয়ে মনুষ্যত্বের বিকাশ ঘটায়। মানুষ সারা জীবনই শিক্ষা অর্জন করে থাকে এবং তা করে নানাভাবে, নানা উপায়ে অভিজ্ঞতা অর্জনের মধ্যে দিয়ে। হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্বাধীনতা পূর্ব সত্তরের নির্বাচনী ভাষণে বলেছিলেন সুষ্ঠু সমাজ ব্যবস্থা গড়ে তোলার জন্য শিক্ষাখাতে পুঁজি বিনিয়োগের চাইতে উৎকৃষ্ট বিনিয়োগ আর হতে পারে না।
জ্ঞানপিপাসু বঙ্গবন্ধু দেখেছিলেন পশ্চিম পাকিস্তানিরা বাঙালিদের কীভাবে জ্ঞানের আলো থেকে বঞ্চিত করে অন্ধকারে নিমজ্জিত রাখার পাঁয়তারা করেছিল। শিক্ষা বিনিয়োগ, শিক্ষা মৌলিক অধিকার। তাইতো জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে ১৯৭২ সালে প্রণীত স্বাধীন বাংলাদেশের সংবিধানের পনেরো এবং সতেরো নম্বর অনুচ্ছেদে শিক্ষাকে বাংলাদেশের নাগরিকদের মৌলিক অধিকার হিসেবে স্বীকার করা হয়েছে। আগামীকাল ‘জাতীয় শিক্ষক দিবস’। ২০০৩ সালের ১৯ জানুয়ারি বাংলাদেশের শিক্ষক সমাজকে যথাযোগ্য মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত করার অঙ্গীকার নিয়ে তৎকালীন সরকার এ দিবসটি চালু করে।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের শিক্ষা এবং শিক্ষকদের প্রতি সর্বোচ্চ সম্মান ও অনুরাগের চেতনার উন্মেষ ঘটেছিল শৈশব থেকেই। সদ্যস্বাধীন দেশটির সরকার পরিচালনা করতে গিয়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান যেসব বিষয়ে অগ্রাধিকার দিয়েছিলেন তার মধ্যে ছিল শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও কৃষিখাত। এর একটি কারণ ছিল বাংলাদেশের স্বাধীনতার পটভূমি সৃষ্টি সর্বোপরি এ মহান সংগ্রামে ছাত্রছাত্রী ও শিক্ষকদের গৌরবময় ভূমিকা।
২৫ মার্চ কাল রাতে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর প্র্রথম আক্রমণের লক্ষ্যস্থলের মধ্যে ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জগন্নাথ হল ও সার্জেন্ট জহুরুল হক হল এবং কয়েকজন বরেণ্য শিক্ষকের বাসভবন। পরবর্তী মাসগুলোতে অগণিত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ক্যাম্প স্থাপন করা হয়। বিপুল সংখ্যক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান তাদের হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়। অনেক প্‌্রতিষ্ঠান তারা জ্বালিয়ে দেয়। এসব বিষয় বঙ্গবন্ধুকে আলোড়িত করে তুলেছিল। তাই তিনি শিক্ষা ব্যবস্থার উন্নয়ন সাধনে বিশেষভাবে নজর দিয়েছিলেন এবং শিক্ষামন্ত্রীর দায়িত্ব অর্পণ করেছিলেন একজন শিক্ষকের হাতে। বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ অধ্যাপক কবীর চৌধুরীকে নিয়োগ দিয়েছিলেন শিক্ষা সচিব হিসেবে।
১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু দেশের শাসনভার গ্রহণ করে ক্ষতিগ্রস্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর সংস্কার ও মেরামতের জন্য বিশেষ বরাদ্দ প্রদান করেন। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো পুনর্গঠনের জন্য ১৯৭২ সালের ২০ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু কর্তৃক নির্দেশিত হয়ে একান্ন কোটি টাকা বরাদ্দের ঘোষণা দেন তৎকালীন শিক্ষামন্ত্রী ইউসুফ আলী। বাংলাদেশের প্রথম বাজেটে প্রতিরক্ষাখাতের চেয়ে তিন কোটি বাহাত্তর লাখ টাকা বেশি বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল শিক্ষাখাতে। গণশিক্ষার প্রসারে অর্থাৎ নিরক্ষরতা দূরীকরণের জন্য জরুরি ভিত্তিতে বঙ্গবন্ধু বরাদ্দ করেছিলেন আড়াই কোটি টাকা। অষ্টম শ্‌্েরণি পর্যন্ত ছাত্রীদের বিনা বেতনে পড়ার সুযোগ করে দিয়েছিলেন তিনি, যা ছিল নারী শিক্ষা অগ্রযাত্রায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।
জাতির জনক শেখ মুজিবুর রহমান উপলব্ধি করেছিলেন যে, প্রাথমিক শিক্ষাই শিক্ষার মূলভিত্তি নির্ধারণ করে দেয়। এটা করার জন্য যেমন উপযুক্ত অবকাঠামো প্‌্রয়োজন, তেমনি চাই যোগ্য শিক্ষক। মেধাবীদের শিক্ষকতায় আকৃষ্ট করার জন্য তাদের বেতন ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা বাড়ানোর প্রতিও তিনি মনোযোগ দিয়েছিলেন। যুদ্ধবিধ্বস্ত সদ্য স্বাধীন দেশে তার দুঃসাহসী ও চ্যালেঞ্জিং পদক্ষেপ ছিল ৩৬,১৬৫টি প্রাথমিক বিদ্যালয়কে জাতীয়করণ করা। সেটা তিনি বেশ সাফল্যের সঙ্গেই সম্পন্ন করতে পেরেছিলেন। তিনি প্রাথমিক শিক্ষাকে সর্বজনীন অবৈতনিক এবং বাধ্যতামূলক করেছিলেন। যুগযুগ ধরে অবহেলিত ও বঞ্চিত শিক্ষকদের ভাগ্যোন্নয়নের জন্য গ্রহণ করেছিলেন বৈপ্লবিক পদক্ষেপ। সীমিত সামর্থের মধ্যেই তিনি শিক্ষকদের জন্য মোটামুটি সম্মানজনক বেতন-ভাতা নিশ্চিত করেছিলেন। দেশের সর্বত্র ছড়িয়ে থাকা হাজার হাজার প্রাথমিক শিক্ষক এভাবে পেয়েছিলেন নতুন মর্যাদা।
শিক্ষা নিয়ে বঙ্গবন্ধুর ভাবনা, দর্শন এবং শিক্ষার উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডের প্রতিচ্ছবি প্রতিবিম্বিত হয়েছে তাঁর নির্দেশে প্রণীত কুদরত-ই-খুদা শিক্ষা কমিশন রিপোর্টে। শুধু প্রাথমিক শিক্ষা নয়, বঙ্গবন্ধুর গভীর মনোযোগ ছিল মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষার প্রতিও। তিনি জানতেন, মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো থেকেই দক্ষ ও চৌকস মানবসম্পদ সৃষ্টি হতে পারে। একীভূত বিজ্ঞানসম্মত ও আধুনিক শিক্ষানীতি প্রণয়নের লক্ষ্যে খ্যাতিমান শিক্ষাবিদ ও বিজ্ঞানী ড. কুদরত-এ খুদাকে প্রধান করে সেরা শিক্ষক ও শিক্ষা বিষয়ে বিশেষজ্ঞ ,শিক্ষক সংগঠনের প্রতিনিধিদের নিয়ে জাতীয় শিক্ষানীতি প্রণয়ন কমিশন গঠন করা হয়েছিল।
এ কমিশন যথাসময়ে তাদের প্রতিবেদন পেশ করেছিল এবং তা সর্বমহলে সমাদৃত হয়েছিল। স্বাধীন বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় মূলনীতি বাঙালি জাতীয়তাবাদ, ধর্মনিরপেক্ষতা, গণতন্ত্র ও সমাজতন্ত্র এই চারটি মূলনীতি গ্রহণ করে বাংলাদেশ যাত্রা শুরু করে ভবিষ্যতের দিকে। ১৯৭২ সালের কুদরাত-এ খুদা শিক্ষা কমিশন রিপোর্টও এই চারটি মূলনীতির আলোকে তৈরি। ১৯৭২ সালে গঠিত শিক্ষা কমিশন শিক্ষার ক্ষেত্রে বৈষম্য দূরীকরণের ওপর জোর দিয়েছিলেন। কমিশন শিক্ষাখাতে পর্যাপ্ত বাজেট বরাদ্দ, যেমন- মোট জাতীয় আয়ের সাতভাগ শিক্ষাখাতে ব্যয় করা, বৃত্তিমূলক শিক্ষার প্রসার, পাঁচ বছরের মধ্যে সাড়ে তিন কোটি নিরক্ষরকে অক্ষরজ্ঞান সম্পন্ন করা, শিক্ষকের মর্যাদা ও আর্থিক সুবিধা বৃদ্ধি, সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ের শিক্ষকদের বৈষম্য দূর করে শিক্ষাকে রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থায় আনয়ন। রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থায় প্রত্যেক নাগরিকের মেধা ও প্রবণতা অনুযায়ী শিক্ষা প্রদানের নিশ্চয়তা বিধান, এই লক্ষ্যে কমিশন ধাপে ধাপে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোকে সরকারের আওতায় নিয়ে আসার প্‌্রস্তাব দিয়েছিল।
স্বাধীনতার পর আজ সাড়ে চার দশকেরও বেশি সময় অতিক্রান্ত হলেও এই ‘বিশাল বৈষম্য কমিয়ে আনার ক্ষেত্রে বিপ্লবী কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়নি। অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় পরবর্তী পরিস্থিতিতে একটি গণমুখী প্রযুক্তি অনুগামী বৈষম্যহীন শিক্ষা ব্যবস্থা প্রবর্তনের পরিকল্পনা ভেস্তে গিয়েছিল। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের অভিপ্রায় অনুযায়ী সমগ্র শিক্ষা ব্যবস্থা রাষ্ট্রায়ত্তকরণের মাধ্যমে সবার জন্য শিক্ষার সমান সুযোগ সৃষ্টির স্বপ্ন স্বাধীনতা পরবর্তী ৪৭ বছরেও বাস্তবায়িত হয়নি! যা জাতির জন্য দুর্ভাগ্যের ।
১৯৭৮ সাল থেকে ২০১০ সালের মধ্যে সাতটি শিক্ষা কমিশন গঠন করা হয়েছিল। বিভিন্ন সরকারের আমলে যে সব শিক্ষা কমিশন গঠিত হয় তাদের প্রতিটি প্রতিবেদনেই ড. কুদরাত এ খুদা শিক্ষা কমিশনের সুপারিশগুলো বিশেষ বিবেচনায় নেওয়ার কথা বলা হয়েছিল। বর্তমান সরকার ভিশন-২০২১ কে সামনে রেখে শিক্ষাক্ষেত্রে শৃঙ্খলা আনয়নের লক্ষ্যে সুশিক্ষিত ও দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তোলার জন্য শিক্ষাকে দারিদ্র্যমুক্ত বাংলাদেশ গড়ার প্রধান হাতিয়ার হিসেবে বিবেচনায় নিয়ে ২০১০ সালে সমাজের সব পর্যায়ের মানুষের মতামত, সুপারিশ ও পরামর্শ বিবেচনায় নিয়ে জাতীয় শিক্ষানীতি প্রণয়ন করেন। জাতীয় শিক্ষানীতি-২০১০ প্রণীত হওয়ার পর দেশের সার্বিক শিক্ষা ব্যবস্থায় প্রাণচাঞ্চল্যের সৃষ্টি হলেও গত ৮ বছরে বাস্তবায়ন না হওয়ায় শিক্ষাবিদ, শিক্ষক, শিক্ষার্থী, গবেষক, অভিভাবকদের মাঝে হতাশা ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।
শিক্ষা নিয়ে বঙ্গবন্ধুর ছিল বাস্তবমুখী সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা। সেই কাজটিই স্বাধীনতার পর পরই অগ্রাধিকার দিয়ে শুরু করতে চেয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু। স্বাধীনতার পর মাত্র সাড়ে তিন বছর সময় পেলেও লক্ষ্য বাস্তবায়নে এগিয়ে ছিলেন বহুদূর। সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশ আকৃতিতে খুবই ছোট। সম্পদ সীমিত। অর্থনীতি নাজুক। কিন্তু, জনসংখ্যাও অনেক। চাহিদাও ছিল সীমাহীন। এমন কঠিন বাস্তবতায় বঙ্গবন্ধু উপলব্ধি করেছিলেন শিক্ষাই সম্পদ। তাই সংবিধানে শিক্ষাকে মৌলিক অধিকারে স্থান দেন বঙ্গবন্ধু। ধনী দরিদ্র নির্বিশেষে সবার জন্য বাস্তবমুখী শিক্ষা দিয়ে বিপুল জনগোষ্ঠীকে সম্পদে পরিণত করা ছিলো বঙ্গবন্ধুর শিক্ষার মূল দর্শন। তাঁর শিক্ষা দর্শনের আলোকে অবৈতনিক, সমতাভিত্তিক এবং মানসম্মত প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা, মানসম্মত প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষা, মানসম্পন্ন শিক্ষা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে সমগ্র শিক্ষা ব্যবস্থায় রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগ বৃদ্ধির মাধ্যমে বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের ক্ষুধা দারিদ্র্যমুক্ত, অসামপ্রদায়িক সোনার বাংলাদেশ বিনির্মাণ সম্ভব ।

লেখক : শিক্ষক, কলামিস্ট