‘জাতীয় মৎস্য সপ্তাহ’ ২০১৮ রূপালী শস্যের সুদিন ফিরে এসেছে

সম্পাদকীয়

‘জাতীয় মৎস্য সপ্তাহ’২০১৮ শুরু হয়েছে গতকাল থেকে। জাতীয় ক্ষেত্রে নানাবিধ সাফল্যের মধ্যে মৎস্য খাতের রয়েছে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা। বলা যেতে পারে আমাদের রূপালী শস্যের সুদিন ফিরে এসেছে। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি বিষয়ক সংস’া এফএওর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রাকৃতিক উৎস থেকে মাছ উৎপাদনে বিশ্বে তৃতীয় স’ানে উঠে এসেছে বাংলাদেশ। প্রথম ও দ্বিতীয় স’ানে রয়েছে চীন ও ভারত। চাষ ও প্রাকৃতিক উৎস মিলিয়ে মৎস্য সম্পদে বিশ্বে বাংলাদেশের অবস’ান চতুর্থ। বাংলাদেশ নদীমাতৃক দেশ, পৃথিবীর বৃহত্তম বদ্বীপ অঞ্চল। দেশের জনসংখ্যার শতকরা ১২ ভাগ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে মৎস্য আহরণ,

বাজারজাতকরণ ও ব্যবসায়ের সাথে যুক্ত। জিডিপিতে মৎস্য খাতের অবদান ৩ দশমিক ৬১ শতাংশ এবং কৃষিজ জিডিপিতে ২৪ দশমিক ৪১ শতাংশ। এফএওর হিসাব অনুযায়ী ২০০৪ থেকে ২০১৭ সালের মধ্যে মাছের উৎপাদন বেড়েছে ৫৭ শতাংশ। মাথাপিছু মাছ খাওয়ার পরিমাণও বেড়েছে।

মাছের উৎপাদনে এই সাফল্যের পেছনে মাছচাষি ও মৎস্যবিজ্ঞানীদের অবদান রয়েছে। মাছ চাষের উৎপাদন বৃদ্ধি পাওয়ার মূলে রয়েছে ইলিশের উৎপাদন বৃদ্ধি। জাটকা মাছ নিধন বন্ধ ও নানা পদক্ষেপ নেয়ায় ইলিশের উৎপাদন হয়েছে প্রায় ৫ লাখ টন। গত ৩ বছরে ইলিশের উৎপাদন বেড়েছে দেড় লাখ টন। বাংলাদেশের মৎস্যবিজ্ঞানীরা বিলুপ্তপ্রায় মৎস্য প্রজাতির বেশ কটির পোনা উৎপাদন করেছেন। এখন বিদেশেও মাছ রপ্তানি হচ্ছে বিশেষ করে চিংড়ি ও ইলিশ।
তবে মৎস্য বিচরণ ক্ষেত্র কমে যাচ্ছে; নদীনালা, খালবিল ভরাট করে বাড়িঘর, স’াপনা নির্মাণ এর অন্যতম কারণ। নদীতে চর পড়ায় মাছের বিচরণ ক্ষেত্র সংকুচিত হচ্ছে। জমিতে কীটনাশকের ব্যবহার, ডিমওয়ালা ও পোনা মাছ নিধনের ফলে মাছ কম পাওয়া যাচ্ছে। শিল্প কারখানার বর্জ্য পদার্থের মাধ্যমে পানি দূষিত হওয়ায় মাছ মারা যাচ্ছে। তদুপরি সংরক্ষণ ও বাজারজাতকরণে অসুবিধার কারণে প্রচুর মাছ পচে নষ্ট হয়ে যায়। মাছচাষীরা সরকারের কাছ থেকে সাহায্য সহযোগিতা আশানুরূপ পায় না, আর্থিক প্রণোদনা পায় রফতানিকারকরা।

বিশ্বে মাছ চাষে আমাদের অবস’ান ধরে রাখা ও এর উন্নতিকল্পে সরকারি ও বেসরকারিভাবে প্রচেষ্টা নিতে হবে। এখন বদ্ধ জলাশয়ে মাছের উৎপাদনে আগ্রহী হচ্ছেন চাষী ও ব্যবসায়ীরা; তবে মাছের খাবার ও সেচসহ অন্যান্য খাতে মূল্য সহনীয় হওয়া প্রয়োজন, এক্ষেত্রে ভর্তুকি দেওয়া আবশ্যক। মাছ সংরক্ষণে হিমাগার তৈরি করা প্রয়োজন।

চট্টগ্রামের হালদা নদী দেশের কার্প মাছের বড়ো প্রয়োজন মেটায় অথচ নানা-কারণে আগের মতো মা-মাছ ডিম পাড়ে না, দূষণে জর্জরিত হালদা। মাছ চাষ বাড়াতে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে মাছের অভয়ারণ্য গড়ে তুলতে হবে। জেলেদের জীবনমান উন্নয়নে বিশেষ দৃষ্টি দেওয়া চাই। আমাদের সমুদ্র এলাকা বেড়েছে। সমুদ্রে মৎস্য সম্পদ আহরণে প্রচেষ্টা নিতে হবে। জেলেদের সহজ শর্তে ঋণ এবং তাদের বেকার সময়ে সরকারিভাবে সাহায্য দেয়া প্রয়োজন। হাওড়-বাঁওড়, খাল বিল মৎস্য সমিতির মাধ্যমে জেলেদের কাছে বন্দোবস্ত দিতে হবে।

‘মাছে ভাতে বাঙালি’-বর্তমান মৎস্য সম্পদে সাফল্যের কারণে এই প্রবাদের যথার্থতা আবার ফিরে এসেছে। জাতীয় পুষ্টি চাহিদা মেটাতে মৎস্য সম্পদ বাড়াতেই হবে।