জাতি সংগঠনে আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ

সাইফুল ইসলাম

আজকের দিনে আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদের মূল্য বোঝা সম্ভব কিনা জানি না। কেননা তাঁর কালে জাতি গঠন বলতে যা বোঝানো হয়েছিল, সেটা আজ আর নেই। সে কালে তাঁরা জাতি সংগঠন বুঝতেন জীবনের মহত্তম উপকরণের অনুসন্ধান, গবেষণা ও সৃষ্টি। আবদুল করিমের পুরো জীবন ব্যয় হয়েছে অনুসন্ধান ও গবেষণার কাজে। তাঁর রচনা প্রধানত গবেষণালব্ধ তথ্যের সমষ্টি, নতুন সৃষ্ট শিল্পকর্ম নয়। বিশিষ্ট চিন্তক ও সাহিত্যিক আবদুল হক আবদুল করিম সম্পর্কে ঠিক বলেছিলেন, ‘সার যেমন নিজে ফসল নয়, জমিতে মিশে গিয়ে জমিকে উর্বর করে এবং সমৃদ্ধ ফসল উৎপাদনে সহায়তা করে, সাহিত্যবিশারদ সাহেবের রচনাসমূহ তেমনি বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসকে তথ্যসমৃদ্ধ এবং সম্পূর্ণাঙ্গ হতে সহায়তা করেছে, এবং বিশেষভাবে মুসলিম সমাজ-মানসকে উত্তরাধিকার সচেতন করে তুলেছে।’

আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ ছিলেন সেই শ্রেণীর মানুষ যাঁরা কোদাল-খন্তা নিয়ে চাষের জমি প্রস’ত করেন। এ কাজে তাঁর আত্মনিবেদন অতুল্য। আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে সীমাহীন পরিশ্রম তাঁর জীবনের লক্ষ্যভেদী ব্রত ছিল। মুসলিম সমাজ, সাহিত্য, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের অনুসন্ধান ও গবেষণায় তিনি ছিলেন ক্লান্তিহীন এক পরিব্রাজক। রবীন্দ্রনাথ এক চিঠিতে আবুল ফজলকে লিখেছিলেন, ‘চাঁদের এক পৃষ্ঠায় আলো পড়ে না সে আমাদের অগোচর, তেমনি দুর্দৈবক্রমে বাংলাদেশের আধখানায় সাহিতের আলো যদি না পড়ে তা হলে আমরা বাংলাদেশকে চিনতে পারব না, না পারলে তার সঙ্গে ব্যবহারে ভুল ঘটতে থাকবে।’ কথাটার অর্থ ছিল গভীর ও ব্যাপক।
মুসলিম সমাজ ছিল পিছিয়ে। হিন্দু সমাজ জ্ঞানের নানা বৈচিত্র্যে ছিল এগিয়ে। অথচ দুটি সম্প্রদায় পাশাপাশি বাস করে এসেছে শতাব্দীর পরে শতাব্দী। এই দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে চেনাশোনা থাকলেও মন জানাজানি ছিল না। তারা একে অপরকে চিনেছিল ধর্মের পরিচয়ে, মানুষের সত্য পরিচয়ে ঘনিষ্ঠতা ছিল না। সাহিত্যের দিক থেকে, জ্ঞানের গভীর ব্যাপকতার দিক থেকে মুসলমান সমাজ নিজেদের পরিচয় তখনো বড় করে দেখতে ও দেখাতে শেখেনি। রবীন্দ্রনাথ সেইদিকে মুসলিম সম্প্রদায়ের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিলেন। আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ চাঁদের সেই অন্ধকার পৃষ্ঠায় আলো ফেলাবার দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছিলেন।

আবদুল করিম নিজের পরিচয় ও তাঁর কাজের পরিধির কথায় উল্লেখ করেছিলেন, ‘আমি পূর্ব-বঙ্গের মাটির মানুষ, সেই মাটিতে যে সাহিত্যের উৎপত্তি হইয়াছে, সেই সাহিত্য সেই মাটির বাসিন্দাদের মনের আনন্দরসে হইয়াছে পুষ্ট ও যুগ যুগ ধরিয়া জোগাইয়াছে তাহাদের মনের খোরাক–আমি সেই সাহিত্যের অনুরক্ত পাঠক, সেই সাহিত্যের রসেই আমার মনের রস-ভাণ্ডার হইয়াছে পূর্ণ, আমি সেই পুঁথি-সাহিত্য রসের রসিক, তার ভাণ্ডারী ও তার প্রেমিক। আজীবন তিল তিল করিয়া আমি এই রস আহরণ করিয়াছি, সঞ্চয় করিয়াছি এবং সেই রস-পাত্র পুঁথি সংগ্রহ আমার জীবনের ব্রত করিয়াছি। তাই যখন আমার মত প্রাচীন পুঁথি-পাঠক ও পুঁথি প্রেমিকের আধুনিক শ্রোতৃমণ্ডলীর সামনে কিছু বলিবার জন্য ডাক পড়ে তখন আমি সঙ্কোচ বোধ না করিয়া পারি না। কারণ এইসব পুঁথি সাহিত্যের খবর দেশের শিক্ষিতমণ্ডলী অনেকে রাখেন না, অনেকেই এই সব পুঁথির প্রতি তাকাইয়া থাকেন অনেকটা অবজ্ঞা মিশ্রিত করুণার দৃষ্টিতে এবং কেহ কেহ এইগুলিকে মনে করেন সাহিত্যের আবর্জনা।’

আবদুল বাঙালি মুসলিম সম্প্রদায়ের ভিত্তি অনুসন্ধানে প্রবৃত্ত হয়েছিলেন। কেননা আত্মপরিচয় না জানলে আত্মনিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। আর নিজের সাংস্কৃতিক ভিত্তির প্রতি সজ্ঞান না হলে সমস্ত রকম স্বাতন্ত্র্য মূল্যহীন হয়ে পড়ে। আবদুল করিমের মধ্যে প্রবলভাবে দেখা গিয়েছে এই রকম অসামান্য কাণ্ডজ্ঞান। তাঁর কালে মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে একটা ভিন্ন মানসিকতার পরিচয় পাওয়া গিয়েছিল। সেখানে মনে করা হতো ভারতবর্ষ তথা বাংলা মুসলমানদের মাতৃভূমি নয়। বাঙালি মুসলমান সম্প্রদায় এসেছে আরব ও ইরান থেকে। এখানে তাঁরা প্রবাসী মাত্র। এই প্রবাসী মানসিকতার ঘোর বিরুদ্ধ সমালোচক ছিলেন আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ। সেজন্যে তিনি অনায়াসে বলেছেন, ‘বাঙালী মুসলমানের একটা নিজস্ব সংস্কৃতি-জীবনের প্রতিফলন তাঁর রচিত এই সাহিত্য। বাংলাদেশের সংস্কৃতি এককভাবে হিন্দু সংস্কৃতি এটা একটা বিভ্রান্তিকর কিংবদন্তী মাত্র। এই সংস্কৃতির সন্ধান ও স্বীকৃতি ব্যতীত বাংলাদেশের, পাকিস্তানের, এই উপমহাদেশের অথবা মুসলিম জগতের সংস্কৃতির ইতিহাস অসম্পূর্ণ।’

বাংলা, বাঙালি ও বাংলা ভাষার উন্নতি ছিল আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদের প্রধান সাধনার বস’। ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ তাঁকে মধ্যযুগের মুসলমান সাহিত্য সম্বন্ধে ‘অদ্বিতীয় বিশেষজ্ঞ’ বলে অভিহিত করেছিলেন। বাঙালি মুসলমানের ইতিহাস ও ঐতিহ্যের ভিত্তি যে মধ্যযুগে পোঁতা হয়েছিল, এ কথা সাহিত্যবিশারদ অত্যন্ত বিচক্ষণতার সঙ্গে বার বার স্মরণ করিয়ে দিয়েছিলেন। এ বিষয়ে তিনি সারা জীবন কাজ করে গিয়েছেন। সেই কাজের মূল্যায়ন করতে গিয়ে হরপ্রসাদ শাস্ত্রী উল্লেখ করেছিলেন, সাহিত্যবিশারদ ‘যেরূপ পরিশ্রম, যেরূপ কৌশল যেরূপ সহৃদয়তা ও যেরূপ সূক্ষ্মদর্শিতা প্রদর্শন করিয়াছেন, তাহা সমস্ত বাংলায় কেন, সমস্ত ভারতেও বোধ হয় সচরাচর মিলে না।’ এমন মানুষকে বলা হয়েছে জাতি সংগঠক ও জাতি নির্মাতা। বলা ভুল হবে না যে, আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ ছিলেন বাঙালি মুসলিম সমাজের প্রথম ভিত্তি নির্মাতাদের অন্যতম।