জাতিসংঘে নিন্দা প্রস্তাব এনে ব্যর্থ রাশিয়া

সুপ্রভাত বহির্বিশ্ব ডেস্ক

সিরিয়ার দৌমায় সরকারি বাহিনীর সন্দেহভাজন রাসায়নিক হামলার প্রতিক্রিয়ায় যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্সের একযোগে চালানো বিমান হামলার নিন্দা জানিয়ে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে আনা রাশিয়ার প্রস্তাব খারিজ হয়ে গেছে। শনিবার মস্কোর আনা এ নিন্দা প্রস্তাবের পক্ষে ১৫ সদস্যের নিরাপত্তা পরিষদে বলিভিয়া ও চীন ছাড়া আর কেউ ভোট দেয়নি বলে জানিয়েছে বার্তা সংস’া রয়টার্স। খবর বিডিনিউজের।
পেরু, কাজাখস্তান, ইথিওপিয়া ও একোয়াটোরিয়াল গিনি ভোটদানে বিরত ছিল; অপরদিকে তিন স’ায়ী সদস্য রাষ্ট্র যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্সসহ আট সদস্য বিপক্ষে ভোট দিয়েছে। দৌমায় সিরীয় বাহিনীর বিষাক্ত গ্যাস হামলার অভিযোগ ওঠার পর গত এক সপ্তাহে এ নিয়ে পাঁচবার নিরাপত্তা পরিষদ একত্রিত হল। সিরিয়ার রাসায়নিক অস্ত্র কর্মসূচি লক্ষ্য করে ইঙ্গ-মার্কিন-ফরাসী বাহিনীর ১০৫টি ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপের প্রতিক্রিয়ায় রাশিয়া এদিন বৈঠক ডেকেছিল। ‘যে তদন্তের আহ্বান জানিয়েছিলেন, তার ফলের জন্য কেন আপনারা অপেক্ষা করলেন না,’ প্রস্তাব খারিজ হয়ে যাওয়ার পর পরিষদের স’ায়ী তিন সদস্যের প্রতি প্রশ্ন ছুড়ে দেন জাতিসংঘে রাশিয়ার রাষ্ট্রদূত ভাসেলি নেবেনজিয়া। সিরিয়ায় হামলা চালিয়ে যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্স ও যুক্তরাজ্য ‘আন্তর্জাতিক আইনের প্রতি বৃদ্ধাঙ্গুলি প্রদর্শন’ করেছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি। ‘উত্তেজিত মাথাগুলো ঠাণ্ডা হয়ে আসবে বলে আশাবাদী আমি, সেটাই হওয়া উচিত,’ সাংবাদিকদের বলেন নেবেনজিয়া। দৌমায় কোনো বিষাক্ত গ্যাস ব্যবহৃত হয়েছে কি-না তা খতিয়ে দেখতে অর্গানাইজেশন ফর প্রোহিবিশন অব কেমিকাল উইপনের (ওপিসিডাব্লিও)তদন্ত কর্মকর্তারা সিরিয়ায় পৌঁছেছেন; শনিবার থেকেই দলটির কাজ শুরু করার কথা। পশ্চিমা দেশ ও বিভিন্ন সংস’া বিদ্রোহীদের ওপর রাসায়নিক হামলার জন্য আসাদবাহিনীকে দায়ী করলেও সিরিয়া ও তাদের মিত্র রাশিয়া বলছে, দৌমায় বিষাক্ত গ্যাস ব্যবহারের কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। শনিবার নিরাপত্তা পরিষদের বৈঠকে ফ্রান্স, যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্য তাদের সামরিক হামলাকে ‘বৈধ’ অ্যাখ্যা দিয়ে এর পক্ষে অবস’ান নেয়। ‘সিরিয়ার রাসায়নিক অস্ত্র কর্মসূচিকে পঙ্গু বানিয়ে দেয়া গেছে বলে আত্মবিশ্বাসী আমরা। সিরিয়ার শাসন ব্যবস’া যদি আমাদের ইচ্ছার পরীক্ষা নেওয়ার মত বোকা হয়, তাহলে এই চাপ অব্যাহত রাখতেও প্রস’ত আমরা,’ বলেন জাতিসংঘে যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত নিকি হ্যালি। সিরিয়া নতুন করে বিষাক্ত গ্যাস হামলা চালালে যুক্তরাষ্ট্র ফের হামলায় ‘প্রস’ত’ বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
সিরিয়ার রাসায়নিক অস্ত্র কর্মসূচির লাগাম টানতে, সন্ত্রাসীদের নিশ্চিহ্ন করতে, সিরিয়াজুড়ে যুদ্ধবিরতি কার্যকর ও সংঘাতের রাজনৈতিক সমাধান নিশ্চিতে ইঙ্গ-মার্কিন-ফরাসী জোট নিরাপত্তা পরিষদে নতুন একটি প্রস্তাব নিয়ে কাজ করছে বলে শনিবার জাতিসংঘে ফ্রান্সের রাষ্ট্রদূত ফ্রাঙ্কো দেলাত্রে জানিয়েছেন। জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তনিও গুতেরেস সব পক্ষকে সংযম প্রদর্শনের অনুরোধ জানিয়েছেন। নিরাপত্তা পরিষদে দেওয়া এক বক্তব্যে তিনি সিরিয়ার জনগণের দুর্ভোগ বাড়ে এমন কোনো পদক্ষেপ না নিতে সদস্য রাষ্ট্রগুলোর প্রতি আহ্বান জানান। স’ায়ী পাঁচ সদস্য রাষ্ট্রের ভিটো ছাড়াই কোনো প্রস্তাব পাসের ক্ষেত্রে নিরাপত্তা পরিষদের অন্তত নয়টি দেশের সমর্থন লাগে।
এর আগে মঙ্গলবারও সিরিয়ায় রাসায়নিক হামলার ব্যাপারে তিনটি প্রস্তাব নিরাপত্তা পরিষদে খারিজ হয়ে গিয়েছিল। এর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তাবটি রাশিয়া ভিটোতে অকার্যকর হয়, প্রয়োজনীয় ৯ ভোট পেতে ব্যর্থ হয় রাশিয়ার করা বাকি দুটি খসড়া।
ক্ষেপণাস্ত্র হামলা সিরিয়ার রাসায়নিক অস্ত্র কর্মসূচির প্রাণকেন্দ্রে আঘাত হেনেছে বলে দাবি পশ্চিমা তিন শক্তিধর রাষ্ট্রের। যুক্তরাষ্ট্র বলছে, তাদের বিমান হামলা দামেস্কের রাসায়নিক কর্মসূচিকে পঙ্গু করে দিয়েছে। কিন’ হামলাটি সিরিয়ার গৃহযুদ্ধে প্রেসিডেন্ট বাশার আল আসাদের অগ্রযাত্রা থামাতে পারবে না বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা। সপ্তাহখানেক আগে পূর্ব ঘৌটার দৌমা শহরে বিদ্রোহীদের ওপর আসাদবাহিনীর সন্দেহভাজন বিষাক্ত গ্যাস হামলার প্রতিক্রিয়ায় শনিবার প্রথম প্রহরে যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্স ও যুক্তরাজ্য সিরিয়ায় ১০৫টি ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করে। পেন্টাগন বলছে, দামেস্কের বারজাহ জেলার একটি রাসায়নিক গবেষণাগারসহ মোট তিনটি রাসায়ানিক অস্ত্রাগারে এ বিমান হামলা চালানো হয়। বাকি দুটি স’াপনার অবস’ান হোমসের কাছে।
এ ক্ষেপণাস্ত্র হামলাকে সামপ্রতিক সময়ে আসাদ ও তার শক্তিধর মিত্র রাশিয়ার বিরুদ্ধে পশ্চিমা রাষ্ট্রগুলোর সবচেয়ে বড় হস্তক্ষেপ বলে ধারণা করা হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্স বলছে, আসাদকে উৎখাত কিংবা চলমান যুদ্ধে হস্তেক্ষেপ করতে নয়, সিরিয়ার রাসায়নিক সক্ষমতা কমাতেই সীমিত এ হামলাটি চালানো হয়েছে। বিমান হামলাকে ‘অবৈধ আগ্রাসন’ অ্যাখ্যা দিয়েছে দামেস্ক ও এর মিত্ররা। তবে স্বল্প সময়ের এ হামলা বহুপক্ষীয় সিরীয় যুদ্ধের গতিপথ বদলাবে না বলেই মনে করা হচ্ছে। দেশটিতে সাত বছর ধরে চলা এ যু্দে্ধ এর মধ্যেই অন্তত পাঁচ লাখ লোকের মৃত্যু হয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প শুক্রবারের অভিযানকে ‘সফল’ অ্যাখ্যা দিয়েছেন। টুইটারে তিনি লিখেছেন ‘কার্যোদ্ধার’; তার এ টুইটকে ২০০৩ সালে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশের ইরাকে চালানো অভিযানের পর দেওয়া ঘোষণার প্রতিধ্বনি হিসেবে দেখা হচ্ছে। পেন্টাগনে এক সংবাদ সম্মেলনে মার্কিন লেফটেনেন্ট জেনারেল কেনেথ ম্যাকেঞ্জি বলেছেন, ‘বারজাহ আক্রমণের মাধ্যমে সিরিয়ার অস্ত্র কর্মসূচির প্রাণকেন্দ্রে আঘাত হানতে পেরেছি বলে আমাদের বিশ্বাস।’ এরপরও সিরিয়ার রাসায়নিক কর্মসূচি বন্ধ হয়নি বলে ধারণা ম্যাকেঞ্জির; ভবিষ্যতে দেশটি আর রাসায়নিক হামলা চালাবে না, এ বিষয়েও নিশ্চয়তা দিতে পারেননি তিনি। জাতিসংঘে নিরাপত্তা পরিষদের এক জরুরি বৈঠকে যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত নিকি হ্যালি বলেছেন, সিরিয়া আবার কখনো বিষাক্ত গ্যাস হামলা চালালে যুক্তরাষ্ট্র এর ‘প্রত্যুত্তর দিতে প্রস’ত’ বলে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তাকে নিশ্চিত করেছেন।
পশ্চিমা দেশগুলো বলছে, দৌমায় গত ৭ এপ্রিল সন্দেহভাজন রাসায়নিক হামলার পর এ ধরণের আরও হামলা রুখতেই তারা বিমান হামলা চালিয়েছে। দৌমায় হামলার জন্য আসাদ সরকারকে দায়ী করে আসছে তারা।শনিবার ওয়াশিংটনে ট্রাম্প প্রশাসনের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানান, ৭ এপ্রিলের হামলায় বিস্তৃত আকারে ক্লোরিন গ্যাস ব্যবহৃত হয়েছিল বলে জেনেছেন তারা। ‘সেখানে সারিন গ্যাসও ব্যবহৃত হতে পারে বলে অনেকগুলো তথ্যে ইঙ্গিত মিলেছে.’ মন্তব্য তার। পেরুতে অনুষ্ঠিত আমেরিকান সামিটে যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট মাইক পেন্সও বলেছেন, সিরিয়ায় ক্লোরিনের সঙ্গে বিষাক্ত সারিন গ্যাসও ব্যবহৃত হয়েছে কি-না ওয়াশিংটন তা খতিয়ে দেখছে।