জাতির ভবিষ্যৎ কি ভ্রান্তির মধ্যে নিক্ষিপ্ত হবে

লীনা পারভীন

করপোরেট জগতে ‘মাল্টিটাস্কিং’ শব্দটা বেশ জনপ্রিয়। বলা হয় একজন কর্মী যখন একই সঙ্গে সমান গুরুত্ব দিয়ে অনেক কাজ একটি নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে শেষ করার মতো ক্ষমতা রাখেন তাকে ‘মাল্টিটাস্কার’ বলা হয়। প্রতিযোগিতামূলক জগতে এই মাল্টি-টাস্কারদের অনেক কদর। কারণ এখন আর কেবল একটি বিষয় নিয়ে দিন পার করার মতো সুযোগ কম। সময় খুব দ্রুত এগিয়ে চলেছে। সেই সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে নিজেকে এগিয়ে নিতে না পারলে সে ছিটকে পড়ে স্রোতের বাইরে। যদিও আমরা জানি এক সঙ্গে অনেক বিষয়ে সমপরিমাণ মনোযোগ দেওয়াটা খুব কম মানুষের পক্ষেই সম্ভব হয়। তারপরও আমরা চেষ্টা করে যাই আর সে জন্য সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন হয় সঠিক পরিকল্পনা এবং সময়ের সঠিক ব্যবহার।
অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে আমাদের সরকারের মধ্যেও মাল্টিটাস্কিং হওয়ার এক ধরনের প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। অগ্রসরমান পৃথিবীর সঙ্গে তাল মেলাতে গিয়ে তারা একই সঙ্গে অনেক বিষয়ে মনোযোগ দিতে চেষ্টা করছে। চেষ্টা করে যাচ্ছে একই সঙ্গে হাজারও সমস্যার সমাধান করে যেতে। যেহেতু এক সঙ্গে হাজারও সমস্যার সমাধান করাটা হচ্ছে তাদের টার্গেট, সেহেতু কেবল সংখ্যার অর্থে ফলাফল অর্জনের দিকেই সরকারের মনোযোগ বেশি। আর এই কাজটি করতে গিয়ে তারা বেছে নিয়েছে কম সময়ে সফলতা অর্জনের পথকে। কিন্তু বাস্তবে কম সময়ের মধ্যে যে সফলতা আসে সেটা কি গুণগতভাবে প্রত্যাশিত ফলাফল নিয়ে আসতে পারে?
এই ‘শর্টকাট’ সফলতার একটি জ্বলন্ত উদাহরণ হচ্ছে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা।
শিক্ষাক্ষেত্রে সর্বোচ্চ সফলতা লাভের আশায় সরকারের টার্গেট ছিল পাসের হার বাড়ানো। তার জন্য যা যা করা দরকার সরকার সেগুলো করার জন্য প্রস্তুত ছিল। প্রয়োজনে শিক্ষাক্রমকে সহজ করা, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ছাত্রদের উপস্থিতি বাড়ানোর জন্য বিভিন্ন রকম প্রণোদনামূলক কার্যক্রম চালু করা, প্রশ্নপত্র সহজ করার মতো বিভিন্ন পলিসিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছিলো সরকার। ফলাফল হিসাবে পাসের হার বেড়েছে। কিন্তু এই পাসের হারের মধ্যে কতটা মেধার বিচার ছিল সেটা কিন্তু একটা বড় প্রশ্ন হয়ে থেকেছে আজও।
কেবল পাস করলেই কেউ ভালো ছাত্র হয়ে যায় না। প্রকৃত শিক্ষা হচ্ছে একজন ছাত্র তার পাঠ্যসূচির মধ্যে কতটুকু নিজের মধ্যে ধারণ করতে পেরেছে যা তাকে তার ভবিষ্যৎ পথ চলার ক্ষেত্রে সক্ষম করে তুলবে। জাতি গঠনের অন্যতম একটি বড় শর্ত হচ্ছে একটি শিক্ষিত জাতি। আর সে শিক্ষিত মানে কেবল পাসের হার দিয়েই গড়ে তোলা যায় এই বিশ্বাস করে যদি সরকার এগিয়ে চলার শপথ নেয় তবে সেটাই হবে সবচেয়ে বড় ভুল। শিক্ষিত জাতি গঠনের পূর্বশর্ত হচ্ছে একটি সুসংগঠিত শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলা। সেই ব্যবস্থা গড়ে তোলার জন্য দরকার একটি আধুনিক, বাস্তবমুখী এবং বৈজ্ঞানিক গবেষণার ভিত্তিতে গড়ে তোলা শিক্ষানীতি। যে নীতির ওপর ভর করে দাঁড়াবে একটি বাস্তবায়ন পরিকল্পনা।আমাদের দেশ স্বাধীন হয়েছে ১৯৭১ সালে। একটি সদ্য স্বাধীনতাপ্রাপ্ত দেশে প্রশাসনিক কাঠামো গড়ে তোলার কাজটি খুব সহজ ছিল না। সে সময়কার সরকারের জন্য ছিল একটি বিশাল চ্যালেঞ্জ। প্রকৃত দেশপ্রেমিকদের জন্য সামনে আসা ছিল আরেকটি যুদ্ধের মতোই কঠিন। একে একে খুব পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছে জাতির পিতাসহ জাতীয় চার নেতাকে। পরবর্তীতে হত্যা করা হয়েছে সেনাবাহিনী সহ বিভিন্ন সেক্টরে থাকা দেশপ্রেমিক মানুষদেরকে। দেশের ক্ষমতায় এসেছে দেশবিরোধী শক্তি আর তারা কেবল ক্ষমতাই দখল করেনি, যাওয়ার সময় রেখে গেছে তাদের সুযোগ্য প্রতিনিধিদের যারা আজও রয়ে গেছে প্রশাসনের বিভিন্ন পর্যায়ে। এমনকি সরকারের মধ্যে থাকা সবাই যে একশভাগ বাংলাদেশপ্রেমিক বা দেশের জন্য কাজ করছে তারও কোন গ্যারান্টি আমরা পাইনা। আজকে শিক্ষাব্যবস্থায় যে অরাজকতা দেখছি এসব তারই ফলাফল। শেখ হাসিনার সরকার ক্ষমতায় এসেছে কিন্তু প্রশাসনের ভেতরে থাকা সেইসব শত্রুদের চিহ্নিত করতে পেরেছে কি? পারলেও তাদের হাত থেকে কি মুক্ত করতে পেরেছে আমাদের প্রশাসনকে?
এই যে পাঠ্যসূচিতে সমন্বয়হীনতার অবস্থা এইসব তারই প্রতিফলন। আমি বলবো সেই মন্ত্রণালয়ে থাকা যথাযথ কর্তৃপক্ষের অবহেলার ফলাফল বা সুপরিকল্পিত কর্মের ফল। মন্ত্রী তার কেপিআই অর্জনে ব্যস্ত। কী ছিল তার কেপিআই? হয়তো কেবল পাসের হার বাড়ানোই ছিল তার একমাত্র কেপিআই। কেপিআই মানে হচ্ছে কবু চবৎভড়ৎসধহপব ওহফরপধঃড়ৎ (কচও), পারফরমেন্স মাপার জন্য কিছু অবজেকটিভ নির্ধারিত থাকে যেগুলোকে মাপার একটি উপায়কে বলা হয় কেপিআই। এগুলো অর্জনের মাধ্যমেই নির্ধারিত হয় আপনি সফল না বিফল। মন্ত্রীকে কি তবে এই একটি অবজেকটিভই দেওয়া হয়েছিলো সরকারের পক্ষ থেকে? তবে তিনি কেন মনোযোগ দেননি তার মন্ত্রণালয়ে দক্ষ লোক নিয়োগের দিকে? কেন তিনি মনোযোগ দেননি পাঠ্যক্রমে কী কী পরিবর্তন আসবে?
প্রাথমিক পর্যায়ের পাঠ্যক্রমের এই বেহাল অবস্থা নিয়ে যখন সারাদেশ তোলপাড় তখন আমরা মাননীয় মন্ত্রী বা ঊর্ধ্বতন মহলের কোনও ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ এখনও শুনিনি। তারা কি এর জন্য অনুতপ্ত নাকি জেনেশুনেই এই ভুল? আমরা আশা করে আছি সরকারের পক্ষ থেকে এই বিষয়টি খুব গুরুত্বের সঙ্গে নিয়ে একটি যথাযথ তদন্তের ব্যবস্থা অবশ্যই তারা নেবেন।
সরকার কি আদৌ ভাবছে যে এখনও সবকিছু নষ্টদের দখলে চলে যাওয়ার আগেই সাবধান হতে হবে? বাংলাদেশের বর্তমান বাস্তবতায় আমরা এখনও শেখ হাসিনার সরকারের দিকেই তাকিয়ে থাকি। এ জাতিকে টেনে তোলার আর কেউ নাই। তার মানে এই না যে পাঠ্যবইয়ের পেছনে লেখা থাকবে ‘শেখ হাসিনার বাংলাদেশ’। এই দেশ কোনও ব্যক্তির নয়। এই দেশকে স্বাধীন করার জন্য জীবন দিয়েছে সমাজের সব স্তরের জনগণ। আমি বিশ্বাস করি, শেখ হাসিনাও বিশ্বাস করেন এই দেশ তার একার নয়। তবে কারা করছে এই কাজ? এর পেছনে কাদের ষড়যন্ত্র লুকিয়ে আছে?
জানি, সরকারের সামনে সমস্যা হাজারও কিন্তু সময় কম আর কাজ করার লোক আছে হাতে গোনা। আর সেজন্যই আগে নির্ধারণ করতে হবে তারা কোন দিকে বেশি মনোযোগ দেবেন। সমস্যার প্রায়োরিটি নির্ধারণ করে তাদেরকে সমাধানের জন্য সঠিক পরিকল্পনা করে এগুতে না পারলে এরকম অবস্থা ভবিষ্যতে আরও আসবে আর এর ফলাফল ভোগ করবে গোটা জাতি।
সমাজের কোনায় কোনায় লুকিয়ে আছে মৌলবাদীদের কালো হাত। তারা কিন্তু বসে নেই। আমরাও পরিবর্তন চাই তবে সেটা হতে হবে গুণগতভাবে গ্রহণযোগ্য। দেশে শিক্ষা নিয়ে কাজ করার অনেক যোগ্য লোক আছেন, তাদেরকে খুঁজে বের করে কাজে লাগানোটাও মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব। হতাশার মাঝেও আশা করে থাকি সরকার মনোযোগ দেবে সঠিক সমস্যার যোগ্য সমাধানের দিকে।
লেখক : সাবেক ছাত্রনেতা, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

আপনার মন্তব্য লিখুন