জাতির পিতা

এমরান চৌধুরী

.জাতির পিতা শব্দ দুটো বহুল পরিচিত ও আদুরে। পৃথিবীর স্বাধীন জাতি মাত্রই এ শব্দ দুটোর কাছে শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার অবিমিশ্র ছোঁয়ায় পুলকিত ও উজ্জীবিত। মর্যাদা, অহংকার আর আত্মগৌরবের এ শব্দ দুটো একটি জাতির স্বকীয়তার পরিচায়ক। তাইতো পৃথিবীর দেশে দেশে এ অভীধায় অভিষিক্ত মানুষগুলো কালকে অতিক্রম করে মহাকালের মহানায়কে পরিণত হয়েছেন। যেমন হয়েছেন চীনের মাও সেতুং, ইন্দোনেশিয়ার সুকর্ণ, ভারতের মহাত্মা গান্ধী, ঘানার পেট্রিস লুমুম্বা, আফ্রিকার নেলসন ম্যান্ডেলা, সোভিয়েত ইউনিয়নের মহামতি লেনিন, যুক্তরাষ্ট্রের জর্জ ওয়াশিংটন- এমন আরো কিছু নামের পাশে জ্বলনত্ম একটি নাম বাঙালি জাতির অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।
মানব শিশু পৃথিবীর মুখ দর্শনের পূর্বে অবস’ান করে মায়ের গর্ভে। এক বিন্দু রক্ত থেকে একটি সুশৃঙ্খল অথচ অবিরাম প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে ঐ রক্তের বিন্দুটি পরিণত হয় মানব শিশুতে। মানব শিশুর আবির্ভাবের এ প্রক্রিয়া থেকে আমরা বুঝতে পারি, কোনো মানুষ ইচ্ছে করলে মানব শিশুতো দূরের কথা কোনো যাদুশিল্পীর যাদুর ছোঁয়ায় সাদা পায়রাও জন্ম দিতে পারেন না। এর জন্য প্রয়োজন একটি প্রক্রিয়া অনুসরণ, একটি নির্দিষ্ট সময় আর সুনিবিড় পরিচর্যা। এই তিনের সুসমন্বয়ে প্রাণিমাত্রই প্রাণির জন্ম দিতে পারে।
সোনার বাংলার কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বৃড়্গকে মৃত্তিকার বীর সনত্মান বলেছেন। তাঁর এ বিশেষণের পেছনে রয়েছে বৃড়্গের নিরবচ্ছিন্ন সংগ্রামের ইঙ্গিত। মাটির নীচে বীজ বপন করলেই তা মাটি ফুঁড়ে মাথা তুলে দাঁড়াবে তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। এ জন্য বীজের যেমন মাটি ফুঁড়ে ওঠার শক্তির দরকার, তেমনি প্রয়োজন অনুকূল পরিবেশ-আলো, পানি, বাতাস। এই তিনের যে কোনো একটির অভাব এবং বীজের অনত্মর্নিহিত শক্তির ঘাটতি হলে বীজ কখনো কঠিন আবরণ ভেদ করে মাথা তুলে দাঁড়াতে পারে না। তাহলে বীজকে মাথা তুলে দাঁড়াতেও দরকার সাধনা আর সংগ্রাম। এ সংগ্রামে জয়ী হয়ে বৃড়্গ মাথা তুলে দাঁড়াতে পারে বলেই বৃড়্গ মৃত্তিকার বীর সনত্মান।
মানব শিশু ও বৃড়্গ আমাদের একটাই শিড়্গা দেয় সব কিছুর একটা প্রেড়্গাপট থাকে, থাকে সাধনা আর সংগ্রামের ইতিহাস। থাকে দুঃখ বেদনা, ত্যাগ আর চড়াই উৎরাই এর ইতিহাস। থাকা চাই স্বপ্ন আর সাধনার নিরনত্মর প্রয়াস। এ প্রয়াস ছাড়া পরাধীনতার শৃংখল ছিঁড়ে বিশ্ব মানচিত্রে কোনো জাতি বা রাষ্ট্রের উদ্ভব সম্ভব নয়। এর জন্য বহুকাল ধরে সংগ্রাম করতে হয়, বহু নারী পুরম্নষকে স্বপ্রণোদিত হয়ে তাতে অংশগ্রহণ করতে হয়। নানা প্রকার নির্যাতন সহ্য করতে হয়, আত্মাহুতি দিতে হয় অগণিত মানুষকে। এ সব ঘটনা প্রবাহের বাঁকে বাঁকে অনেক মানুষই নেতৃত্বের ভূমিকায় আসেন। আবার অনেকেই ঐ সন্ধিড়্গণ পেরিয়ে গেলে গৌণ হয়ে যেতে পারেন, উঠে আসতে পারে নতুন মুখ।
ক্রমাগত পাড় ভাঙনের মুখে ইতিহাসের কোনো কোনো পর্বে কোনো একক ব্যক্তি যখন বিশাল জনপ্রিয়তা নিয়ে জাতির কাছে অদ্বিতীয় ও সর্বপস্নাবী ভূমিকা নিয়ে আবির্ভূত হন এবং তাঁর কর্মকা- যখন আমজনতার কাছে বিনাবাক্য ব্যয়ে সমাদৃত ও গ্রহণীয় হয় তখন দেশের মানুষ স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে তাঁর মাথায় পরিয়ে দেয় জাতির পিতার শিরোপা। উক্ত প্রেড়্গাপটে বাংলাদেশে স্বাধীকার আন্দোলন, স্বাধীনতা সংগ্রাম সর্বোপরি নতুন দেশের অভ্যুদয়কে অবশ্যম্ভাবী ও অপ্রতিরোধ্য করে তুলতে পেরেছিলেন যে মানুষটি তাঁর নাম বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তাই তিনি আমাদের জাতির পিতা।
১৯৪৭ থেকে ১৯৭১ এর মুক্তিযুদ্ধ শুরম্নর আগ পর্যনত্ম প্রথমে স্বায়ত্বশাসন ও স্বাধিকার এবং শেষে স্বাধীনতা অর্জনের লড়্গে পরিচালিত বাঙালির সকল তৎপরতায় শেখ মুজিবুর রহমানের ভূমিকা ক্রমেই আলোচিত হয়ে ওঠে। তিনি বাঙালি জাতীয়তাবাদ, ধর্ম নিরপেড়্গতা, গণতন্ত্র আর সমাজতান্ত্রিক মূল্যবোধে নিজেকে সম্পৃক্ত করেন। তাঁর এ বিকাশে তিনি অন্য নেতা থেকে হয়ে উঠেন স্বতন্ত্র ও মর্যাদাবান। বিশেষ করে ষাটের দশকে তাঁর প্রণিত ছয় দফা এবং তা বাসত্মবায়নের আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়ে তিনি বাঙালি জাতীয়তাবাদী চেতনাকে যেভাবে সংহত করেন তা যুগপৎ অভাবিত ও বিস্ময়কর। এ ছয় দফা যেমন ছিল একটি যুগানত্মকারী ঘোষণা, তেমনি এতে নিহিত ছিল বাংলাদেশের স্বাধীনতার বীজ।
ঊনসত্তরের অভ্যুত্থান এবং সত্তরের গণ আন্দোলনকে সঠিক পথে পরিচালনা করে শেখ মুজিবুর রহমান যেভাবে দুর্বার জাতীয় ঐক্য গড়ে তোলেন এবং দেশবাসীর মনে স্বাধীনতার আকাঙড়্গাকে তুঙ্গে নিয়ে যান তার কোনো তুলনা নেই। ১৯৭১ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ২৫ মার্চের মধ্যরাত তথা গ্রেফতার হওয়ার আগ মুহূর্ত পর্যনত্ম এ অঞ্চল হয়ে উঠেছিল স্বাধীন বাংলাদেশ এবং বঙ্গবন্ধু হয়ে উঠেছিলেন সেই বাংলাদেশের মহানায়ক। তাঁর নেতৃত্বে পাকিসত্মানিদের সঙ্গে এক অসাধারণ অসহযোগ আন্দোলন পরিচালিত হয়, যা ব্যাপ্তিতে, শানিত্মপূর্ণ প্রয়োগে, দৃঢতায় এবং সর্বাত্মক সাফল্যে বিশ্ব ইতিহাসে এক অভূতপূর্ব সাফল্য অর্জন করেছে।
শুধু তাই নয়, তাঁর অনুপসি’তিতেই সমগ্র মুক্তিযুদ্ধ পরিচালিত হয়েছে তাঁরই নামে। মুক্তিপাগল বাঙালি জনতা তাঁর দৃপ্ত মুখম-ল হ্নদয়ে ধারণ করে সামনের দিকে এগিয়ে বুক পেতে দিয়েছে। ‘জয় বাংলা’ সেস্নাগানকে কণ্ঠে ধারণ করে দেশমাতৃকার মুক্তির জন্য লড়াই করেছে। তিনি বেঁচে আছেন না নিহত হয়েছেন তা ভাববার অবকাশ না রেখেই তাঁকে বসিয়েছেন রাষ্টপতির আসনে। যিনি দেশে নেই, জীবিত কি মৃত তাও জানা নেই, তবু রাষ্টপতি-বাঙালির পরম আত্মবিশ্বাসের স’ানে যাঁর অবস’ান এমনই হিমালয় সদৃশ মানুষ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, তিনি জাতির পিতা না হয়ে আর কেই বা হতে পারেন।