জসীম উদ্‌দীনের কাব্যভাষা

মোহাম্মদ আজম

আবু হেনা মোস্তফা কামাল জসীম উদ্‌দীনের গদ্যশৈলীর বৈশিষ্ট্যগুলোকে সাজিয়েছেন এইভাবে : এক. তা আপাতদৃষ্টিতে সাধুরীতি আশ্রিত হলেও মেজাজে সম্পূর্ণতই কথ্যরীতি নির্ভর; দুই. কবিতার মতো তাঁর গদ্যও প্রধানত বর্ণনাধর্মী ও চিত্রগুণসম্পন্ন; এবং তিন. তাঁর গদ্যরচনার নেপথ্যে অধুনালুপ্ত গ্রামীণ কথকতার ভঙ্গি। এই কথ্যরীতি-নির্ভরতা, চিত্রাত্মক বর্ণনাধর্মিতা আর কথকতার ভঙ্গি – এই তিনটি তাঁর কাব্যভাষারও মূল।
বাংলার চলমান কাব্যধারা ও গানে কথকতার যে ভঙ্গিটি নিজস্ব ঘরানার কেজো উচ্চারণে বিকশিত হয়েছে, জসীম উদ্‌দীন তাকেই মান্য করেছেন। রূপক ও অতিশায়ন প্রাচীন ও মধ্যযুগের বাংলা কাব্য এবং উপনিবেশ আমলের ‘প্রান্তীয়’ কবিতা-গানে খুবই সুলভ। জসীম উদ্‌দীন সেই ধারাতেই চলেছেন। ফলে তাঁর কবিতায় অবিরল উৎসারিত হয় রূপকের পর রূপক, আর গ্রাম্য মেয়ে সাজু অবলীলায় হয়ে ওঠে ‘হল্‌দে পাখির ছা’। বাউল গানের ভাবে-রূপে তাঁর নিবিড় যোগ, বৈষ্ণব কবিতার রসপ্রবাহেও তিনি গা ভাসিয়েছেন; কিন্তু তাঁর আত্মীয়তা মৈমনসিংহ গীতিকার মতো লোকগাথা কিংবা মঙ্গলকাব্যের মতো জীবনগাথার সাথেই বেশি। আরেকটি রচনাধারাকে তিনি নিজের সম্পদ গণ্য করেছেন – ভাটিয়ালি-মুর্শিদি-ভাওয়াইয়া গানের বহমান স্রোতধারা।
অন্যদিকে উপনিবেশ আমলের প্রধান কবিদের ভাষা ও অলঙ্কার যেসব নয়া ছাঁদ আয় করে নিয়েছে, জসীম উদ্‌দীন তাতেও ভাগ বসিয়েছেন। তাঁর কবিতায় ‘মুখখানি তার নতুন চরের মতো’ কিংবা ‘মন সে ত নহে কুমড়ার ফালি, যাহারে তাহারে/ কাটিয়া বিলান যায়’ প্রভৃতি অপূর্ব অর্থালঙ্কারের সুচারু বিন্যাস ‘আধুনিক’ কবিতার পাঠকদেরও মন কাড়ে। তবে এই অলঙ্কার-চঞ্চল কবি মূলত প্রচলিত ও ব্যবহৃত অলঙ্কারের প্রতাপেই গড়েছেন তাঁর কাব্যসৌধ। তাঁর কবিতা বর্ণনাত্মক আর সরল, এবং এর জন্য দরকার ছিল এমন বর্ণনাভঙ্গি, যা বাংলা কবিতার অতীত অভ্যস্ততা ও সতেজ সরলতাকে মান্য করে রূপ নেবে স্বভাবোক্তির। নমুদের মেয়ে দুলীর রূপবর্ণন খণ্ডটি এই সহজিয়া কবিত্বের এক স্মরণীয় দৃষ্টান্ত :
ধানের আগায় ধানের ছড়া, তাহার পরে টিয়া
নমুর মেয়ের গায়ের ঝলক সেইনা রঙ নিয়া।
দূর্বাবনে রাখলে তারে দূর্বাতে যায় মিশে,
মেঘের খাটে শুইয়ে দিলে খুঁজে না পাই দিশে। (সোজন বাদিয়ার ঘাট, এক)
এখানে গ্রামবাংলার সুপরিচিত উপাদানগুলোতে কবি দুলীকে সাজিয়েছেন। সহজলভ্য অথচ আকর্ষণীয় উপকরণের সাথে মিলিয়ে দুলীকে উপস্থাপন করতে গিয়ে অতিশয়োক্তির আশ্রয় নিয়েছেন তিনি। কিন্তু বাংলা কবিতার অতীত চর্চার সাপেক্ষে এ উল্লেখ একদিকে যেমন স্বাভাবিক, অন্যদিকে তেমনি গ্রামীণ ঘর-গেরস্থালির অতি আপন। অন্যত্র, রূপাইয়ের কালো রঙের মহিমা বোঝাতে কবি নিজেকে সঁপে দিয়েছেন বৈষ্ণব পদাবলির প্রতিষ্ঠিত ছকে :

কালো চোখের তারা দিয়েই সকল ধরা দেখি,
কালো দাতের কালি দিয়েই কেতাব কোরাণ লিখি।
জনম কালো, মরণ কালো, কালো ভুবনময়;
চাষীদের ওই কালো ছেলে সব করেছে জয়। (নক্সী কাঁথার মাঠ, দুই)
এই বর্ণনাটি বৈষ্ণব ঘরানার কালা-বন্দনার স্মৃতি-সূত্রে একটা প্রসারিত আলাদা তাৎপর্য পায়।
অর্থাৎ, যে কোনো চরিত্রবান ও প্রত্যয়ী কবির মতো জসীম উদ্‌দীনের কবিতায়ও আছে ভাব ও রূপের অচ্ছেদ্য বন্ধন। তাতে পুনরাবৃত্তি আছে, প্রথানুগত্যও আছে; কিন্তু সমর্থ কবির বাকচাতুরি আর নতুনতারও কমতি নাই। নমুনা হিসাবে তাঁর কবিতার অতি পরিচিত দুটি অংশ উপস্থিত করা যাক। নক্সী কাঁথার মাঠ কাব্যে রূপাইয়ের রূপবর্ণনার দুটি ছত্র নিম্নরূপ :
জালি লাউয়ের ডগার মত বাহু দুখান সরু,
গা খানি তার শাঙন মাসের যেমন তমাল তরু।
এ দুই চরণে যে উপমা দুটি রূপাইকে দৃশ্যমান করার জন্য ব্যবহৃত হল, তাদের সাদৃশ্যের প্রকৃতি কী? ‘জালি লাউয়ের ডগা’ ও ‘বাহু’র মিলের কারণটি এখানে উপস্থিত। কিন্তু রূপাইয়ের কর্মতৎপরতা ও পেটানো শরীরের যে বর্ণনা পরের অংশে আছে, তার সাপেক্ষে ‘সরু’ বিশেষণটি নিতান্তই বিসদৃশ এবং যুক্তিহীন। ফলে সাধারণ ধর্মবাচক বিশেষণটির আভিধানিক অর্থ ভুলে যাওয়া বা পাশ কাটানো ছাড়া উপায় থাকে না।
আমরা অনুভব করি, শব্দটি সম্ভবত সজীবতা, লকলকিয়ে বেড়ে ওঠা বা এমন আরো অনেক বিশেষণের গোপন প্রতিনিধি। প্রতিনিধিত্ব অনির্দিষ্ট বলেই বেশি আকর্ষণীয়। ‘আধুনিক’ জামানার অনেক কবি মিলবাচক শব্দকে গরহাজির রেখে কিংবা উপমান-উপমেয়ের আপাত অমিলকে জোরালো করে পাঠককে আমন্ত্রণ জানায় গভীরতর মিল আবিষ্কারে। কিন্তু জসীম উদ্‌দীন – সম্ভবত বস্তুকে দৃষ্টিগোচর করে হাজির করার স্বভাবের কারণেই – রেখেছেন একটি নিরীহ বা বহু-অর্থক বিশেষণ, আর এভাবেই তৈরি করতে পেরেছেন অধিকতর কাব্যিক সৌন্দর্য। দ্বিতীয় চরণে আছে শ্রাবণ মাসের তমাল তরুর সাথে গায়ের তুলনা। এই তমাল তরু কি বৃষ্টি-ভেজা ? এ কি কালো রঙের ? তাতে কি মেঘের ছায়া পড়েছে ? বর্ষার পানি পেয়ে এই বৃক্ষ কি সুঠাম হয়ে উঠেছে ? না কি এ তমাল তরু এসেছে পুরানা গল্পের স্মৃতি হয়ে ? রূপাইয়ের গা ঠিক কোন অর্থে তমাল তরুর মতো, তা এক কথায় বুঝে ওঠা প্রায় অসম্ভব। অথচ এই বুঝের অভাব চরণগুলোর সঞ্চারিত হওয়াও ঠেকাচ্ছে না। কবিতার চেনা বা আধ-চেনা যে কোনো সংজ্ঞাতেই এগুলো খাঁটি কবিত্বের নমুনা।
‘রাখাল ছেলে’ কবিতার দুটি চরণ এরূপ :
সরষে বালা নুইয়ে গলা হল্‌েদ হাওয়ার সুখে
মটর বোনের ঘোমটা খুলে চুম দিয়ে যায় মুখে !
এখানে একটি নজরকাড়া চিত্র আছে। সে চিত্রের ভিতরে সূক্ষ্মতা, অতিশায়ন এবং রূপকের কারসাজি একত্রে কাজ করে গেছে। কিন্তু প্রথম চরণে ‘হাওয়া’র বিশেষণ হিসাবে ‘হল্‌দে’ শব্দটি খানিকটা বাড়তি কিছু হয়ে আমাদের নজর কাড়ে।
বিস্তৃত মাঠে সরষে ফুলের বিপুল সম্ভার সহসা চোখে যে প্রতাপ তৈরি করে, তার ইফেক্ট আনতেই বোধ করি কবি রঙহীন বাতাসে হলুদকে চারিয়ে দিয়েছেন। আসল কথা, জসীম উদ্‌দীন ভঙ্গিসর্বস্ব তো ননই, ভঙ্গিপ্রধানও নন। তাঁর বলবার কথা আছে। মানানসই ভাষা ও কারিগরিতে তিনি সেই কথা বলে গেছেন।
তাঁর অলঙ্কার যে কাজ করেছে লক্ষ্যের অনুকূলে, তার উত্তম নজির পাওয়া যাবে সমাসোক্তি অলঙ্কার পরীক্ষা করলে। এই অলঙ্কারটি নিজেই কাব্যিক, আর অন্য অনেকের তুলনায় জসীম উদ্‌দীনের কবিতায় এর ব্যবহার বেশি। কিন্তু অলঙ্কারটি তাঁর কবিতায় আরো একটি নতুন মাত্রা পেয়েছে। এখানে এটি কেবল ব্যক্তির মনোভাব বা আচরণে বস্তুকে দেখা নয়, বরং গ্রামীণ জীবন ও জনপদকে একটি একীভূত জীবন্ত সত্তা হিসাবে দেখানোর কৌশলও বটে। নক্সী কাঁথার মাঠ কাব্যে বিলের দুপাশের দুটি গ্রাম ‘ব্যক্তিত্ব-আরোপ’ কৌশলেই হয়ে উঠেছে এক প্রাণবন্ত সমগ্র। এ কৌশলের সবচেয়ে শিল্প-সুন্দর ও অন্তরঙ্গ ফসল ফলেছে বালুচর কাব্যের ‘উড়ানীর চর’ কবিতায়। এখানে চরের বিভিন্ন উপাদান একেকটি প্রাণবন্ত সত্তা হিসাবে শোভমান হয়েছে, সেই সাথে সমগ্র চরের জীবিতপ্রায় অস্তিত্বের সাথে নিটোল ঐক্যে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়েছে।

আপনার মন্তব্য লিখুন