জব্বার সওদাগর ও তাঁর বলীখেলা

কামরুল হাসান বাদল
PBG000003

প্রাচীন খেলাসমূহের মধ্যে বলীখেলা, যা মূলত মল্লযুদ্ধ, অন্যতম। শুধু বাংলাদেশ বা ভারত উপমহাদেশে নয়, বিশ্বের সব দেশেই খেলা হিসেবে মল্লযুদ্ধ ছিল খুব জনপ্রিয়।
ব্যক্তিতে ব্যক্তিতে কিংবা গোত্রে গোত্রে প্রাধান্য বিস্তার ও বীরত্ব প্রদর্শনের জন্যও মল্লযুদ্ধ সংঘটিত হতো। অনেক সময় রাজা-বাদশাহ বা সম্রাটদের মনোরঞ্জনের জন্যও মল্লযুদ্ধের ব্যবস্থা করা হতো। ভয়াবহ ও নিষ্ঠুরতম মল্লযুদ্ধের কারণে ইতালির রাজধানী রোম নগরীর কলোসিয়াম ইতিহাসে কুখ্যাত হয়ে আছে। রোমান সম্রাটদের বিনোদনের জন্য কলোসিয়ামে আয়োজিত হতো যুদ্ধবন্দিদের মধ্যে মরণপণ লড়াই। এই মল্লযুদ্ধে একজনের মৃত্যু নিশ্চিত না হলে অপরজন বিজয়ী হতেন না। ৬৪ খ্রিস্টাব্দে ব্রুটাস ভ্রাতৃদ্বয় ‘গ্লাডিয়াস লড়াই’ শুরু করেন। খাটো তরবারির এই লড়াইয়ে লড়াইকারীদের বলা হতো গ্লাডিয়েটর।
ইতিহাসে রোমান সম্রাটদের নিষ্ঠুরতম এই খেলা কালো অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত হলেও উপমহাদেশে বিশেষ করে বাংলাদেশে বলীখেলা অনুষ্ঠিত হতো ভিন্ন অর্থে ও প্রয়োজনে। কৃষি প্রধান দেশ হিসেবে সে সময়ে বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের বিনোদনের মাধ্যম ছিল পুঁথিপাঠ, কবিগান ইত্যাদির সাথে সাথে মোরগ লড়াই, গরুর লড়াই ও বলীখেলা অন্যতম। স্রেফ বিনোদন ও নিজেদের বীরত্ব প্রদর্শনের জন্যই বলীখেলা অনুষ্ঠিত হতো। কালের বিবর্তনে বলীখেলার জনপ্রিয়তা কমে গেলেও এখনও চট্টগ্রামের বিভিন্ন স্থানে বলীখেলা অনুষ্ঠিত হয়। এর মধ্যে চট্টগ্রাম শহরের জব্বারের বলীখেলা অন্যতম।
এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, এসব বলীখেলা সংগঠনে সমাজের বিত্তশালী বিশেষ করে ব্যবসায়ীরা অধিক উৎসাহ দেখাতেন। জব্বারের বলীখেলার বিষয়টি তদ্রুপ। সে সময়ের জনপ্রিয় বলীখেলাকে আরও সুসংগঠিত করা এবং সেসাথে যুব সমাজকে দেশপ্রেমে উজ্জীবিত করার লক্ষ নিয়ে আবদুল জব্বার সওদাগর লালদীঘি মাঠে ১৯০৯ সালে বলীখেলার আয়োজন করেন। পরে তার নামেই ‘জব্বারের বলীখেলা’ হিসেবে তা জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। এবং ক্রমে ক্রমে তা চট্টগ্রামবাসীর সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের অংশও হয়ে ওঠে। বলীখেলাকে কেন্দ্র করে যে মেলার আয়োজন হয়ে থাকে তা আয়তন, লোক সমাগম, রকমারী পণ্যের বিপণন ও প্রাচীনত্বের দিক থেকে ব্যাপক ও অনন্য এক আয়োজন। এই মেলায় পাওয়া যায় না এমন বস্তু মেলা ভার। বিশেষ করে নানা প্রকার খাদ্য, গৃহস্থালী প্রয়োজনীয় পণ্যের সবগুলোই এ মেলায় পাওয়া যায়। চট্টগ্রাম জেলা ছাড়াও পার্বত্য তিন জেলা, কক্সবাজার হতেও প্রচুর লোক মেলায় আসেন বলীখেলা দেখতে এবং মেলা থেকে সাংবাৎসরিক পণ্য কিনে নিয়ে যেতে। আর মেলায় বিক্রয়ের জন্য সারা বাংলাদেশ থেকেই বিক্রেতারা এ মেলায় আসেন। দা, বটি, ছুরি, মাদুর, পাটি, ঝাড়ু, ঝাঁটা ইত্যাদি পণ্য মেলা থেকেই কিনবেন বলে বছর ধরে অপেক্ষা করেন ক্রেতারা। বিক্রেতারাও তাদের উৎপাদিত বিভিন্ন পণ্য এ মেলাতেই বিক্রিকরবেন বলে আগে থেকেই স্থির করে রাখেন। শহরের পূর্বাংশের অধিবাসী যেমন, বদরপাতি, কোরবানিগঞ্জ, খাতুনগঞ্জ, চাক্তাই, আছাদগঞ্জ, পাথরঘাটা, ফিরিঙ্গি বাজার, বাকলিয়ার পরিবারগুলোতে এই মেলা একটি উৎসব হিসেবে আসে।
এসব এলাকার পুরাতন ও আদি অধিবাসীরা তাদের কন্যাদের শ্বশুরবাড়ি থেকে মেলা উপলক্ষে নাইওর আনতেন। মেলা উপলক্ষে কেনাকাটার জন্য বয়স্করা ছোটদের বকশিস দিতেন। অনেক পরিবার মেলা থেকে খরিদ করা নানা প্রকার খাবার, ফলমূল ও গৃহস্থালী পণ্য মেয়ের শ্বশুড়বাড়ি পাঠাতেন। চট্টগ্রামের একটি রেওয়াজ হলো বিয়ের পর প্রতিবছর মেয়ের শ্বশুরবাড়িতে আম-কাঁঠাল অর্থাৎ মৌসুমী ফল, কোরবানির জন্য গরু বা ছাগল দেওয়া, শীতের সময় পিঠাপুলি, মহররমে দুরুছ পাঠানো। এর সঙ্গে জব্বারের বলীখেলার মেলা থেকে জিনিসপত্র পাঠানোও কিন্তু এলাকার রেওয়াজ হিসেবে প্রচলিত আছে। আবদুল জব্বার সওদাগরের পিতা হাজি গোলাম রসুলও ছিলেন তৎকালে ধনাঢ্য ব্যক্তি। তাঁর প্রথম স্ত্রীর চার পুত্র সন্তানের মধ্যে আবদুল জব্বার ছিলেন সবার বড়। তিনি দ্বিতীয় বিয়ে করেছিলেন। জীবনের শেষে এসে তাদের নিয়ে ফিরিঙ্গি বাজার এলাকায় থাকতেন। চট্টগ্রাম নগরীর তিন পুলের মাথায় বর্তমান গোলাম রসুল মার্কেট তাঁর সম্পত্তি। তিনি এখানে একটি মসজিদ স্থাপন করেছিলেন এবং সে সাথে একটি পুকুরও খনন করেছিলেন। এই বিশাল জায়গা তিনি ওয়াকফ্‌ করে গিয়েছিলেন। ১০৭ বছরের প্রাচীন এই মেলা পেরিয়ে এসেছে দু’দুটি বিশ্বযুদ্ধ ও ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ। এই পর্যন্ত যতটুকু তথ্য-উপাত্ত পাওয়া গেছে তাতে দেখা যায় যুদ্ধকালীনও এ মেলার আয়োজন ব্যাহত হয়নি। অর্থাৎ এই মেলা শুরুর পর থেকে নিরবচ্ছিন্নভাবে চলে এসেছে।
বাণিজ্যিক নগরী হিসেবে চট্টগ্রাম অনেক প্রাচীন একটি নগরী। বন্দরের কল্যাণে বিশ্বের অনেক দেশ থেকে বণিকগণ বাণিজ্যের লক্ষে এখানে এসেছেন। বাণিজ্যকে কেন্দ্র করে এখানে গড়ে উঠেছে একটি ব্যবসায়ী গোষ্ঠী। চট্টগ্রামের ভাষায় যাদের সওদাগর বলা হয়ে থাকে। এই সওদাগরদের মধ্যে অনেকেই ছিলেন বিশাল ব্যবসা ও সম্পত্তির অধিকারী। এঁদের মধ্যে অনেকেই ছিলেন দানশীল, সমাজহিতৈষী। সমাজের জন্য, সাধারণ মানুষের জন্য অনেক কল্যাণকর কাজ করে গেছেন তাঁরা। কালের পরিক্রমায় এমন অনেকের নাম বিস্মৃতির অতলে হারিয়ে গেছে। আবদুল জব্বার সওদাগরের মতো অনেকের নাম আজও অক্ষয় রয়ে গেছে অনন্য ও ব্যতিক্রমী উদ্যোগের কারণে।
লেখক : কবি ও সাংবাদিক