জনক ও জননীর গল্প

মিলন বনিক

মোহরআলীর স্বভাবটা জেদী, একরোখা।
খেটে খাওয়া মানুষদের অহংকার বেশি। ভাঙবে তবু মচকাবে না। শত অভাব অনটনেও মাথা নোয়াবে না।
পাশ থেকে রইছুদ্দিন খিস্তি কাটে, ‘যুদ্ধ কইরিছিস তো কী হইছে? এখন তো বাঁচতি হইবি। বলি, চেয়ারম্যানরে গিয়া ক, তা ক’বি না। চেয়ারম্যান চাইলে অনেক কিছু দিবার পারে’।
মোহরআলী চোখ বড় করে তাকায় রইছুদ্দিনের দিকে। চোখ দু’টো যেন বলছে, ‘রাজাকারের ছাওয়াল চেয়ারম্যান হইছে তো কী হইছে, হেতে আমার বাল ফালাইবো’। মোহরআলীর চোখের দিকে আর তাকাতে পারে না রইছুদ্দিন। চোখের চাহনিতে আগুন আছে। গনগনে আগুনের তেজ। বেশিক্ষণ তাকানো যায় না। রইছুদ্দিনের পেটের কথা পেটে থেকে যায়। ভয়ে মুখ পানসে হয়ে আসে।
সোজাসাপ্টা মানুষ মোহরআলী। কারও সাতেও নাই, পাঁচেও নাই। লেখাপড়া বেশি না জানলেও ইদানিং প্রায়ই সভা সমিতিতে যাওয়া হয়। অতিথি হিসাবে বক্তৃতা দেয়। মোহরআলী লক্ষ্য করেছে, শেখের বেটি ক্ষমতায় আসার পর তার কদরও বাড়ছে।
এখন দিন বদলের পালা শুরু হয়েছে। মুন্নুজানের হয়ে মোহরআলী সভা সমিতিতে কথা বলে। মানুষ মুগ্ধ হয়ে শুনে। একেবারে জীবনের সত্য কথাগুলো অকপটে গ্রামের সহজ সরল ভাষায় বলে ফেলে মোহরআলী। কোনো রাখঢাক রাখে না। খুব সহজ সরলভাবে বলে যায় অতীতের কথাগুলো। প্রথম প্রথম লজ্জা হতো। ভয় লাগতো। গা কাঁপতো। এখন জীবনে ঘটে যাওয়া কথার ঝুড়ি নিয়ে যখন মাইকের সামনে দাঁড়ায়, তার শরীরের প্রতিটি শিরা উপশিরা উত্তেজিত হয়ে উঠে। দর্শক সারি থেকে ফিসফিস শব্দ ভেসে আসে। ‘আহারে, দেশটার জন্য কত কষ্ট করেছে বেচারা! সবিই হারাইলো’।
বিজয়ের পর শেখ সাহেব যেদিন দৃপ্তকণ্ঠে ঘোষণা করলেন, মুক্তিযুদ্ধে আমাদের দেশের জন্য যে সকল মা বোনেরা নির্যাতিতা হয়েছেন, সম্ভ্রম হারিয়েছেন তারা সবাই আমার মেয়ে, আমার বোন, আমার মা। তাদেরকে কেউ অবহেলা করবা না, অবজ্ঞা করবা না। মনে রাখবা, ত্রিশ লক্ষ শহিদ আর দু’লক্ষ মা-বোনের ইজ্জতের বিনিময়ে আজকের এই স্বাধীনতা। সেদিন মোহরআলীর বুকটা গর্বে ভরে উঠেছিলো। নিজেকে এদেশের একজন সেরা সূর্যসন্তান ভেবে গর্ববোধ করেছে। আজো করছে। দেশের জন্য এই আত্মত্যাগ অত্যন্ত গৌরবের, অত্যন্ত গর্বের।
জাতীয় দিবসগুলোতে এখন প্রায়ই মোহরআলীকে উপস্থিত থাকতে হয়। বক্তৃতা শেষে সাংবাদিকরা নানান প্রশ্ন করে। মুন্নুজানকে নিয়ে প্রশ্ন করে। মোহরআলী সগর্বে সেই এক কথাই বলে,
‘দেশের জন্য কতজন কতকিছুই তো দিছে। আমি না হয় আমার যা ছিলো তাই দিলাম।’
‘কষ্ট হয় না?’
‘না, গর্ব হয়।’
‘এখন মুন্নুজানকে কীভাবে দেখেন?’
‘দেশকে যে জন্ম দিয়েছে সে তো জননী। স্বামী হিসাবে আমি তার গর্বিত জনক।’
‘সরকারের কাছে আপনার কী চাওয়ার আছে?’
‘কিছুই চাওয়ার নাই।’
‘কেন?’
‘কোনো মা বাবা তার সন্তানের কাছে কিছু চায় না। শুধু কামনা করে, তার সন্তান যেন থাকে দুধে ভাতে।’
‘সন্তান বলতে কি বাংলাদেশকে বুঝাচ্ছেন?’
‘আগেই বলেছি, আমাদের কোনো সন্তান নাই। এ দেশটাই আমাদের সন্তান।’
বিশেষ দিনে এই সম্মানটুকু মোহরআলীর কাছে খুব মেকি মনে হয়। প্রশ্ন জাগে, বঙ্গবন্ধুর ডাকে সত্যিকারের যে দেশপ্রেম নিয়ে নয়টা মাস যুদ্ধ করেছি, সেই দেশপ্রেম কি এখন আছে? বঙ্গবন্ধুর শাহাদাৎ বার্ষিকীতে যখন বিরানীর প্যাকেটে বঙ্গবন্ধুর ছবি সেঁটে দেওয়া হয়, তখন মোহর আলী অবাক না হয়ে পারে না। বঙ্গবন্ধু কী এতই ঠুনকো? সাংবাদিকদের অহেতুক প্রশ্নগুলো এড়িয়ে চলতে ইচ্ছে করে। এই বয়সে মোহরআলীর ভাবনায় ছেদ পড়ে। একটা প্রশ্ন বার বার ঘুরপাক খায়। কী লাভ? কী হবে? তার চেয়ে যে ক’দিন বেঁচে আছি যেভাবে আছি, বেশ আছি। ভালোই আছি।
সারাবছর পরনে শার্ট থাকে না। ছেঁড়া তালি দেওয়া দু’টো লুঙ্গি। মুন্নুজানকে বছরে দু’টো ভালো সুতি শাড়ি কিনে দিতে পারে না। অনুষ্ঠানের দিন আয়োজকরা নতুন জামা কাপড় দিয়ে বলে, এগুলো পরে আসবেন।
মুন্নুজানের জন্যও একটা দু’টো সুতি শাড়ি বরাদ্দ থাকে। তাতে কোনোরকম চলে যায়। মোহরআলী হাত পেতে নেয়। ফিরিয়ে দিতে পারে না। ফিরিয়ে দেবার সেই শক্তিও মোহরআলীর নেই। আয়োজকরা ভালোবেসে দিচ্ছে। মানুষকে সত্যিকারের ইতিহাস জানানো দরকার। জানাতে হলে সভা সমিতিতে যেতে হবে। সভা সমিতিতে গেলে একটু ভালো কাপড় চোপড় দরকার। তাই মোহর আলী মেনে নেয়, ‘ভিক্ষার চাউল যেমনিই হোক, বাছ বিচার থাকতে নেই’।
পঁয়তাল্লিশ বছর পর মুন্নুজান প্রাণ খুলো হাসলো। খুব ভালো লাগছে। শরীরের চিনচিনে ব্যথাটা আর লাগছে না। বসন্তের বিকেল। ছনের চালের দাওয়ায় বসে ভাবছে মুন্নুজান। বিগত পঁয়তাল্লিশটা বসন্তের কথা। মনে করতে পারছিল না। প্রতি বছর বসন্ত আসলে মুন্নুজানের তলপেটের ব্যথাটা চিনচিন করে ওঠে। মুন্নুজান টের পায়। তলপেটে হাত বোলায়। ঠিক পঁয়তাল্লিশ বছর আগে কোন এক বসন্তে মুন্নুজান হারিয়ে গিয়েছিলো। কারা যেন মুন্নুজানকে ধরে নিয়ে গিয়েছিলো। ঠিক কত সময় লুকিয়ে রেখেছিলো তার ঠিক ঠিক দিন তারিখ সময় কিছুই মনে নাই। মনে করার চেষ্টাও করে না।
শুধু মনে পড়ছে, একদল পাষণ্ড নরপশু। গায়ে খাকী পোষাক। যখন তখন এসে মুন্নুজানের সাথে জোড় করে যা খুশি তাই করতো। এক একবার, একজন দু’জন নয়। বারে বারে কয়েকজন। মুন্নুজানের কিছুই বলার ছিলো না। ওখান থেকে পালিয়ে বাঁচারও কোনো পথ নেই।
গ্রামের রজবআলীকে দেখা যেতো মাঝে মধ্যে। গালভর্তি চকচকে মোলায়েম দাঁড়িতে হাত বুলিয়ে বলতো, ‘এবার বোঝ ঠ্যালা। মায়া মাইনষের দেমাগ কয়দিন থাকে? এ্যাঁ্ত্ত-। এই সোন্দর মুখখান তো বরবাদ হইলো। অহন সমাজে মুখ দেখাবি ক্যামনে? ছিঃ্ত-ছিঃ্ত্তছিঃ।’
মুন্নুজান নিজের খালি বুকটা দুই হাতে ঢেকে ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে থাকতো রজবআলীর দিকে। রজবআলী ঘাড় বাঁকিয়ে আবার বলতো, ‘ভুলেও বাড়ি যাইস না। বাড়ি গেলে শিয়াল কুকুরে খাইবো। বাঁইচা থাকনের চাইতে মইরা যাওন ভালা। তর স্বামীও মরবো। বাইচা গেলেও তরে ঘরে রাখবো না। তালাক দিবো’।
তারপর লোভী মাংসাশি কুকুরের মতো জিহ্বাটা বের করে চুক চুক করে নারী মাংসের স্বাদ নেয় রজবআলী। খালি গায়ে বসে থাকা মুন্নুজানের শুকিয়ে যাওয়া গালে একটা টোকা দিয়ে বলে, ‘আমার পেয়ারের পাকি দোস্তরা সুখ পাইলেই আমি সুখি। বাসি তরকারি আমি একদম পছন্দ করি না’।
মুন্নুজানের চোখ দু’টো নেতিয়ে আসছিল। শরীরে শক্তি নেই। চন্দ্র সূর্য কখন ওঠে, কখন ডুবে তাও জানে না। দিন রাত্রির কোনো ফারাক বুঝতে পারে না মুন্নুজান। কেবল মনে হতো ‘কতকাল আমি এই ঘরে বন্দি। এই ঘরে কোনো আলো নেই। শুধুই অন্ধকার’। মাঝে মাঝে পাশের ঘর থেকেও অনেক পুরুষ মহিলার কান্নার আওয়াজ শোনা যেতো। যন্ত্রণায় কাতরানোর শব্দ। গোঙানির শব্দ। পাশাপাশি শোনা যেতো একদল নরপশুদের আনন্দ উল্লাস।
সদ্য বিবাহিতা মুন্নুজানের একমাত্র অপরাধ তার স্বামী মুক্তিযোদ্ধা। একজন মুক্তিযোদ্ধার স্ত্রী হিসাবে মুন্নুজানেরও গর্ব কম ছিলো না। মোহরআলী যেদিন যুদ্ধে যাবার সিদ্ধান্ত নিলো সেদিন মুন্নুজানের ভিতরটাও এক অজানা আশংকায় বার বার কেঁপে উঠেছিলো। সদ্য বিবাহিতা স্ত্রী। একা রেখে যাওয়াটা ঠিক হবে না। তাই সিদ্ধান্ত নিলো, মুন্নু বাপের বাড়িতেই থাকবে। পাশের গ্রামেই মুন্নুর বাপের বাড়ি। কোনো অসুবিধা হবে না। মুন্নুজানও তাই মেনে নিলো। মুন্নুজানের ভিতরের কান্নাটা মোহরআলীকে দেখাতে না পারলেও মুখে হাসির রেখা টেনে বলেছিলো,
‘তোমার কষ্ট হইবো না? ’
‘তা তো হইবোই। দ্যাশের জন্য এইটুকুন কষ্ট তো আমাদের করতেই হইবো। কি কও বউ?’
মুন্নুজান সাহস দিয়ে বললো,
‘সবাই হাত পাও গুটাইয়া ঘরে বইসা থাকলে দ্যাশ স্বাধীন হইবো ক্যামনে? কাউরে না কাউরে তো এই দায়িত্ব নিতে হইবো।’
নিজের বুকে হাত রেখে মোহরআলী প্রতিজ্ঞা করলো-
‘বউ, আমাগো নেতা শেখ মুজিব ডাক দিছে, আর কি ঘরে বইসা থাকন যায়? তুমি কও।’
‘না।’
দৃঢ় কণ্ঠে মুন্নুজান জবাব দিল। কিছুক্ষণ থেমে আবার বললো,
‘তুমি যুদ্ধে যাও।’
‘তুমি হাঁছা কইতাছ বউ?’
‘হ, হাঁছা কইতাছি। ঐ পাকিস্তানি হারামির বাইচ্চাগুলারে তুমি নিজের হাতে মারবা।’
‘বউ ঠিক কইছো। দ্যাশের এই দুর্দিনে এইটুকুন যদি করতে না পারি, তাইলে জনম সার্থক হইবো ক্যামনে?’
যেদিন মোহরআলী রাতের আঁধারে ঘর থেকে বের হয়ে যাচ্ছিলো সেদিন আকাশে চমৎকার জ্যোৎস্না ছিলো। চাঁদের আলোয় সারা পৃথিবী আলোকিত। ভরা পূর্ণিমার গোল চাঁদটার দিকে অনেক্ষণ তাকিয়েছিলো মোহরআলী। দেশটাকে বড়ই সোন্দর লাগছিলো মোহরআলীর। এমন দ্যাশ আর কোথায় পাবে? পাশে মুন্নুজান স্বামীকে বিদায় জানানোর জন্য দাঁড়িয়ে আছে। চোখে জল নাই। মনে বুক ভরা সাহস। শুধু ভেতরের কষ্টটা স্বামীর সামনে প্রকাশ করতে পারছে না। ঘরের ভেতর থেকে মতলব হুজুরের তাবিজটা মোহরআলীর গলায় বেঁধে দিয়ে বললো,
‘এবার বাইর হইয়া যাও। আর দেরি করন ঠিক হইবো না।’
‘আমি তোমার কথাই ভাবতাছি। নতুন বউ। এই কয়দিন তোমার খুব কষ্ট হইবো।’
‘আমার জন্য ভাবতে হইবো না। আমি তোমার অপেক্ষায় থাকুম। তুমি দ্যাশ স্বাধীন কইরা ফিরে আসবা।’
মোহরআলী আর কোনো কথা বলেনি। ‘জয় বাংলা’ বলে ঘর থেকে বের হয়ে গেলো।
একের পর এক যুদ্ধ জয়ের গল্প শুনতে শুনতে গর্বে বুক ভরে উঠতো মুন্নুজানের। মনে হতো এসবই তার স্বামী মোহরআলীর কাজ। স্বামীর প্রতি দরদ অনুভব করতো আরও বেশি। মুক্তি পাগল স্বামীর জন্য যত কষ্টই হোক, সবকিছুই সহ্য করতে রাজি। এক বিকেলে শান্তি কমিটির চেয়ারম্যান রজবআলী এসে জিজ্ঞাসা করলো, ‘মোহর আলী কই? হুনছি হে নাকি মুক্তিবাহিনীর কমান্ডার হইছে?’
রজবআলীর চোখ দু’টো তীক্ষ্ণ। অসভ্য বর্বরের মতো লোলুপ দৃষ্টি। মুন্নুজান সদ্য বিবাহিতা। সমস্ত সৌন্দর্য শরৎ পূর্ণিমার মতো সারা অঙ্গে উপছে পড়চে। সেই ভরা যৌবনে রজবআলীর তৃষ্ণার্ত লোলুপ দৃষ্টির সামনে মুন্নুজান কিছুই বলতে পারলো না। চুপ করে থাকলো।
মোহরআলীর উপর রজবআলীর ক্ষোভটাও বেশি। রজবআলী বয়সে বড় হলেও বন্ধুর মতো। সময়ে অসময়ে নানা অপকর্মে মোহরআলীর সমর্থন চাইতো। মোহরআলী স্বাধীনচেতা মানুষ। অর্থবিত্তের বালাই নেই। সম্বল শুধু আত্মবিশ্বাস। শক্ত পোক্ত হাত পা, চোখ কান সবিই ভালো আছে। তার দৃঢ় বিশ্বাস, ‘আল্লাহর রহমতে যেখানে যে অবস্থায় হোক, খাওন পিন্দনের ব্যবস্থা কইরা নিতে পারবো। শুধু আল্লাহ সহায় থাকলে হইলো। আল্লাহর দেওয়া এতবড় সম্বল থাকতে আকামের ভাগীদার হতে যামু কোন দুঃখে।’
রজবআলীর সাথে মোহরআলীর অমিলটা এখানেই। সেই ছোটবেলা থেকে রজবআলী মানুষকে ঠকানোর বিদ্যাটা ভালোই রপ্ত করেছে। এতসব অন্যায় অপরাধে পার পেয়ে যাবার কৌশলটাও শিখে ফেলেছে। মুরুব্বীদের কীভাবে ম্যানেজ করতে হয় তাও জানে। ফলে অপরাধীর সাজা না হয়ে উল্টা নির্যাতীতের উপর শাস্তির খড়গ নেমে আসে। একবার শুধু ঘড়ির কাঁটা সোজা ঘুরেছিলো। তাও এই মোহরআলীর জন্য।
মজু ঘরামির মেয়ের ব্যপারটা নিয়ে মোহরআলী বেশি বাড়বাড়ি করে ফেলেছিলো। সেবার হাতে নাতে ধরা পরার পর পঞ্চাশটা জুতার বাড়ি আর কানে ধরে পঞ্চাশবার উঠবস করতে হয়েছিলো রজবআলীকে। তাতে কী? রজবআলীর ভাবখানা এমন যেন, মানি লোকের কয়েক লাথিতে ইজ্জত যায় না। ইজ্জত কি এতই সোজা? পরে হাসতে হাসতে আবার সেই পুরানো কাইচলৎ-এ ফিরে এসেছে। বিন্দুমাত্র পরিবর্তন হয়নি। মানুষজন বলাবলি করছে, ‘লোকটা কেমুন বেহায়া? আবার হাসে। হে কি জানোয়ার না মানুষ? তাওতো বুঝবার পারতাছি না’।
লোকজন বেহায়া বেজন্মা বলে গালি দিলেও তাতে রজবআলীর কিছু আসে যায় না। কালে কালে রজবআলীর ঔদ্ধত্য বাড়ে। কথায় কথায় উষ্মা প্রকাশ করে বলে, ‘কাম করছি তো কী হইছে? কোন হালায় আমার ছ্যাঁডের বাল ছিড়বো? আইতে কও। হেরে আমি কাঁচা চিবাইয়া খামু’। কেউ কিচ্ছু বলে না।
প্রতিবাদ করলো মোহরআলী।
মজু ঘরামির মেয়ে লাকির জন্যে যে জুতার বাড়িগুলো খাইলো তার প্রতিশোধ নিলো আরও একবছর পর। লাকির বিবস্ত্র অচেতন দেহটা পাওয়া গেলো বাড়ির পশ্চিমের ধানক্ষেতে। ওরা ভাবছিলো, লাকি মইরা গেছে। লাকির জ্ঞান ফেরার পর তার শরীরটা শুধু কাঁপছিলো। শরীরের উপর জঘন্য অত্যাচার করা হয়েছে। লাকি যে বেঁচে আসবে তা কেউ ঘুণাক্ষরেও ভাবেনি। কথায় আছে, ‘রাখে আল্লাহ মারে কে?’
সদর হাসপাতালে চিকিৎসা হলো। ডাক্তারি পরীক্ষা হলো। থানায় মামলা হলো। লাকি কিছুতেই আসামির নাম বলতে সাহস পাচ্ছে না। লাকি নিশ্চয় চেনে। ভয়ে বলতে পারছে না। বললে হয়তো সবাইকে মেরে ফেলবে। সে সব পারে। এগিয়ে এলো মোহরআলী। সাহস দিয়ে বললো,
‘আমি আছি তোর সাথে। তোর ডর কিসের? সবকিছু খুইলা বল।’
লাকি নিশ্চুপ। সামনে পুলিশ। দারোগা সাহেব বলছেন,
‘আসামির নাম না বললে আমাদের কী করার আছে?’
মোহরআলী এবার রেগে আগুন। বললো-
‘তুই কি চাস, তর মতো আরো অনেকের ইজ্জত এভাবে নষ্ট হোক?’
‘না।’
‘তুই কি চাস আসামি বিনা বিচারে খালাস পাইয়া যাক?’
‘না।’
‘তয় ডরাস ক্যান? আমরা সবাই তর লগে আছি।’
মজু ঘরামি হাতের কাঁচিটা উঁচিয়ে বললো,
‘মরলে মরুম। বাঁচলে বাঘের মতো বাঁচুম। কুকুরের মতো বাইচা কোনো লাভ নাই। তুই বইলে দে মা। বইলে দে। অনেক সহ্য করছি। আর না।’

এবার দুই হাতে চোখ মুখ চেপে ধরে কান্নায় ভেঙে পড়লো লাকি। তারপর আস্তে আস্তে পরিষ্কারভাবে বললো, ‘ঐ রজব আলী আমার সর্বনাশ করেছে। ঐ রজব আলী’। দারোগা ষ্পষ্ট শুনলেন। নোট করে নিলেন। কোর্টে দাঁড়িয়েও তাই বললো লাকি। এক নম্বর সাক্ষী হিসাবে আছে মোহরআলী। তিন বছরের জেল হলো রজবআলীর। যুদ্ধের কয়েকমাস আগে ছাড়া পায় রজবআলী। সমস্ত প্রতিশোধের আগুন গিয়ে পড়লো মোহরআলীর উপর।
এখন তার চেয়েও বড় অপরাধ মোহরআলী পাকিস্তানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করছে। মুক্তিবাহিনীর কমান্ডার হয়েছে। যারা মুক্তিযুদ্ধ করছে তারা শয়তান। কাফের। মোনাফেক। তারা ইসলামের শত্রু। পাকিস্তানের শত্রু। তারা রাজাকার আলবদরদের দুশমন। এমন বেয়াদপি রজবআলীর পক্ষে কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। যেভাবে হোক এর একটা বিহীত করতে হবে।
যতদিন জেলে ছিলো ততদিন কালসাপের বিষের মতো কষ্টটা বার বার উথলে উঠতো রজবআলীর। আর প্রতিবারই মোহরআলীর মুখটা চোখের সামনে ভেসে উঠতো। শেষমেষ মোহরআলীর বিবি মুন্নুজানকে দিয়ে সেই পুরানো বিষকাঁটা তোলার ফন্দি করলো। পেয়ারের পাকিস্তানি সৈন্যদের বুঝিয়েছে যে, মুন্নুজানের স্বামি মোহরআলী মুক্তির দলের কমাণ্ডার। মুন্নুজান খুব সুরত আদমি স্যার। লেকিন দেমাগ আছে। আমাদের সব প্লান প্রোগাম মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে পাচার করে। এ জন্যেই আমরা কোন অপারেশনে সফল হতে পারছি না স্যার। বহুত হারামি আছে স্যার ঐ মুন্নুজান।
যুদ্ধের খবরের চেয়ে মুন্নুজানের রূপের বর্ণনা শুনতেই বেশি আগ্রহি মেজর। তার জিহ্বাটা ভুবুক্ষু সাপের মতো লিকলিক করে উঠলো। মুন্নুজানের অন্যসব অপরাধের চেয়েও সবচেয়ে বড় অপরাধ হচ্ছে সে সুন্দরি। সদ্য বিবাহিতা। শরীরের সমস্ত রুপযৌবন প্রতিটা অঙ্গপ্রত্যঙ্গে ডিগবাজি খেলছে।
সেদিন রাতে চুপি চুপি মোহরআলী এসেছিলো মুন্নুজানের ঘরে। কতদিন যুদ্ধের মাঠে কেটে গেলো সময়। মুন্নুজানের জন্য মনটা কেমন করছিলো। মুন্নুজানের মনটাও অনেকদিন পর স্বামীকে কাছে পেয়ে ব্যাকুল হয়ে উঠেছে। সে রাতে মোহরআলীর যাওয়ার তাড়া থাকলেও মুন্নুজান যেতে দেয়নি। মুন্নুজানের কোলে মাথা রেখে সারারাত চাঁদের আলোয় আলোকিত আকাশ দেখেছে। কত স্বপ্ন! কত কথা! সব ভালোবাসা যেন এক রাতে উজাড় করে দিতে চেয়েছিলো। মুন্নুজানের চোখে জল। আকাশের সবগুলো তারাকে সাক্ষী রেখে মোহরআলী মুন্নুজানের চোখের জল মুছিয়ে দিয়ে বলেছিলো, বউ আর বেশিদিন নাই। বিজয় আমাদের হবেই। শুধু এই কয়টা দিন আমাকে যুদ্ধের ময়দানে থাকার অনুমতি দাও। যুদ্ধ শেষ হইয়া গেলে তোমারে ছাইড়া আর কোথাও যামু না।
মুন্নুজানের মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে বললো মোহরআলী,
‘যুদ্ধটা শেষ হইয়া গেলে আমাদের আর কোন চিন্তা থাকবে না। আমাদের একটা ছেলে হবে। তার নাম রাখবো বিজয়।’
‘মেয়ে হলে?’ প্রশ্ন করলো মুন্নুজান।
‘মেয়ে হলে রাখবো জয়িতা।’
‘কিন্তু আমার যে ভয় করে।’
‘ভয় কীসের?’
‘চারিদিকে পাকিস্তানি সৈন্যগুলার আনাগোনা। তার সাথে ঐ রজবআলী আর তার দোসররা। এই সেদিনও রজবআলী দেখে নেবে বলে শাসিয়ে গেলো। কখন কী হয় বলা যায় না।’
‘তুমি ওসব ভেবো না। আমরা প্লান করছি। খুব শীঘ্রই আমরা অপারেশনে যাবো।’
যতক্ষণ মোহরআলী মুন্নুজানের কোলে মাথা রেখে শুয়েছিলো ততক্ষণ কেবল উৎকণ্ঠা আর ভয় করছিলো। বাইরে সুনসান নীরবতা। মাঝে মাঝে রাত জাগা পাখির শব্দ নীরবতা ভেদ করে দিচ্ছিল। সেই সাথে ঝিঁ ঝিঁ পোকার শব্দ। বেড়ার ফাঁক দিয়ে চোখ কান সজাগ রেখে সবকিছু লক্ষ্য রাখছিলো মোহরআলী। যে কোনো মুহূর্তে বিপদ হতে পারে। বিপদের কোনো হাত পা নেই। আর বিপদ বলে কয়েও আসেনা। সময়টাও খুব খারাপ।
হঠাৎ করে দূরের একপাল কুকুর একসাথে ডেকে উঠলো। মুন্নুজানের কোল থেকে মাথা তুলে বললো মোহরআলী,
‘আর সময় নেই। আমি চললাম। তুমি ভালো থাইকো। সাবধানে থাকবা।’
মুন্নুজানের চোখে জল নেই। খুব দৃঢ়তার সাথে বললো-
‘যদি বাঁচি, তোমার জন্যই বাঁচবো। মরলে তোমার জন্যই মরবো। তুমি কোনো চিন্তা করবা না।’
তড়িঘড়ি করে রাইফেলটা কাঁধে নিয়ে বেরিয়ে গেলো মোহরআলী। সে নিজের ভূল বুঝতে পারলো। এটা প্রেম ভালোবাসা আর আবেগের সময় নয়। এটা যুদ্ধের সময়। আমার সংযত হওয়া উচিত ছিলো। দরজার ফাঁক দিয়ে মুন্নুজান মোহরআলীর অন্ধকারে মিলিয়ে যাওয়া দেখলো। তারপর মোহরআলীর ভাবনায় কতক্ষণ কাটলো কে জানে?
ফজরের আজানের সময় মুন্নুজানের আব্বা নামাজ পড়তে উঠলো। ফজরের নামাজের সময় উনি কাউকে ডাকেন না। নিজেই ওজু করে পাক-পবিত্র হয়ে মসজিদে গিয়ে নামাজ পড়ে আসেন। আজ আর নামাজ পড়া হয়নি। ওজু করতে বের হতে গিয়েই চোখের সামনে রজবআলী আর তার কয়েকজন সাঙ্গ-পাঙ্গকে দেখে বিস্মিত হলো। রজবআলী লম্বা সালাম দিয়ে এগিয়ে এসে বললো,
‘চাচা, ভালা আছেন? কই যাইতাছেন? হুনলাম মোহরআলী আইছে, তাই দেখা করতে আইলাম।’
কোনো কথা বললো না মুন্নুজানের বাবা রহমত। কিছু একটা ঘটতে চলেছে। ঠিকই আঁচ করতে পেরেছে। শুধু বললো,
‘মসজিদে।’
‘আইজ আর মসজিদে যাওনের কাম নাই চাচা। মেজর সা’বে আপনার মেয়ে মনুরে সালাম দিছে।’
রহমতের কিছুই বুঝতে বাকি রইলো না। এই মুহূর্তে রহমতের মতো অসহায় বাবা পৃথিবীতে আর একটাও নেই।
কতটা সময় কেটে গেলো, দিন গেলো, মাস গেলো মুন্নুজান কিছুই টের পায়নি। দিন রাতের কোনো পার্থক্য নেই। যেদিন ক্যাম্প জুড়ে টাঁ্ত-টাঁ্ত-ঠ্যাঁ্ত-ঠ্যাঁ ধুরুম্ত-ধুরুম গোলা বারুদের বিকট শব্দে সারা গ্রাম থৈ থৈ করছিলো তখন মুন্নুজানের আধমরা দেহটা নেতিয়ে থাকলেও প্রচণ্ড ঘৃণায় মিটমিট করে হাসছিলো। ক্যাম্পের যে ঘরে মুন্নুজান আছে সে ঘরে এখন কেউ নেই। সবাই গোলাবারূদ আর যুদ্ধের ময়দানে। নিজের শরীর চলছে না। কোনোরকমে পা টেনেটুনে দরজার কাছাকাছি এসে দেখলো একজন সৈন্য বন্দুক হাতে সতর্ক অবস্থায় দাঁড়িয়ে আছে।
মুন্নুজানের চিনতে কষ্ট হয়নি। গোলাগুলির কিছুক্ষণ আগেই এই লোকটা মুন্নুজানের ঘর থেকে এসেছে। কুত্তার মতো লোকটার খুব বদঅভ্যাস। বামদিকে রান্নাঘরটা চোখে পড়লো। রান্নাঘরে তিনজন মহিলার বিবস্ত্র লাশ পড়ে আছে। মুন্নুজান নিজেকে আড়াল করলো রান্নাঘরে। এককোণায় চকচকে বটিটা চোখে পড়লো। মুন্নুজানের শরীরে অদৃশ্য কাঁপন তুললো বটিটা। শক্তি সাহস দুটোই বেড়ে গেলো। তার কোনো ক্লান্তি নেই। তার কিছুই হয়নি। এখন শুধুই প্রতিশোধ।
শেষ রাতের ঠাণ্ডা বাতাসটা গায়ে লাগতেই বুঝতে পারলো এখন শীতকাল। প্রচণ্ড ঠাণ্ডা। মুন্নুজান দরদর করে ঘামছে। মোহরআলীর জন্য তাকে বাঁচতে হবে। যেভাবে হোক মুন্নুজানকে সেই বহু প্রতিক্ষিত সকালটা দেখতেই হবে। হাতে সময় নেই। যা করার এখনি করতে হবে। পরনে পেটিকোট। বুকে কিছুই নেই। রান্নাঘর থেকে হাত মোছার ময়লা গামছাটা টেনে বুকে জড়িয়ে নিলো মুন্নুজান। তবুও শরীরের অর্ধেকটা অনাবৃত।
তাতে কি যায় আসে? মুন্নুজান যে এখনও শ্বাস নিতে পারছে তাও আল্লাহর অশেষ মেহেরবানী। মুন্নুজান শক্তহাতে বটিটা তুলে নিয়ে দরজায় দাঁড়ানো সৈন্যটার ঘাড়ে দ্রুত বসিয়ে দিলো এক কোপ। সৈন্যটি ছটফট করছে। যেমনটি ছটফট করেছিলো মুন্নুজান। যেমনটি ছটফট করে মরে পড়ে আছে রান্নাঘরের তিনজন মহিলা। আরো একটা কোপ সজোরে বসিয়ে দিলো দুই উরুর মাঝখানে পুরুষাঙ্গ বরাবর।
মুন্নুজান হাসছে। পাগলের মতো হাসছে। মুন্নুজান কি পাগল হয়ে গেলো? আর এতো শক্তিই বা এলো কোথা থেকে? মুন্নুজান এখন স্বপ্ন দেখছে ‘আমাকে বাঁচতে হবে। মোহরআলীর জন্য আমাকে বাঁচতে হবে। সে নিশ্চয় যুদ্ধে আছে। ক্যাম্প ধ্বংস করে বাড়ি ফিরে নিশ্চয় আমাকে খুঁজবে। না কি মানুষটা আগেভাগে খবর পেয়ে গেছে, আমি এখানে।
আমি এই অপবিত্র শরীর নিয়ে কীভাবে তার সামনে দাঁড়াবো? সমাজের লোকজন আমাকে কী বলবে? সমাজ আমাকে কীভাবে গ্রহণ করবে? এমনিই হাজারো প্রশ্ন যতই মনের মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছে। ক্যাম্পের সেই অন্ধকার কুঠুরির বিভৎস স্মৃতিগুলো বার বার চোখের সামনে ভেসে উঠছে। সেই সাথে শরীরটা বার বার শিউড়ে উঠছিলো।
অন্ধকারে নিজেই নিজের শরীরের বিভিন্ন জায়গায় হাত বুলিয়ে দেখছে। সমস্ত শরীর ক্ষত বিক্ষত। নাহ! এই ক্ষত শুকোবার নয়। তার চেয়েও বড় ক্ষত তার মনের ভেতরটাকে আলোড়িত করছে।
একবার ভাবলো এই অবস্থায় মোহরআলীর কাছে ফিরে না যাওয়াই ভালো হবে। পা টলতে টলতে ভাবনাটা কেবল মোহরআলীকে ঘিরে ঘুরপাক খাচ্ছে। একসময় দৃঢ় বিশ্বাস জাগলো, সমাজ, সংস্কার, মানুষ যে যাই বলবে বলুক, তাতে কিছু আসে যায় না। আমি মুন্নুজান দেশের জন্য যা দেবার দিয়েছি। এখন ভাবনা শুধু মোহরআলীকে নিয়ে। মোহরআলী মুন্নুজানকে কীভাবে গ্রহণ করবে সেটাই আসল কথা। মোহরআলী যদি গ্রহণ না করে তাহলে মৃত্যুই তার একমাত্র পথ। আর যদি গ্রহণ করেও থাকে তাহলে মোহরআলী কি মুন্নুজানকে আগের মতো ভালোবাসতে পারবে? এই মুন্নুজানতো আগের সেই মুন্নুজান নয়।
প্রচণ্ড গোলাগুলির ভেতর অন্ধকারের কুয়াশা ভেদ করে মুন্নুজানের শরীরটা ধানক্ষেতের মধ্যে কতক্ষণ নেতিয়ে পড়েছিলো মুন্নুজান খেয়াল করেনি। মোহরআলীর কোলে করে যখন মুন্নুজান ঘরে ফিরছিলো তখন সবেমাত্র লাল সূর্যটা পূব আকাশে মাথা তুলে সারা পৃথিবীটাকে আলোকিত করে তুলেছিলো।