জনকল্যাণমুখী সমাজ গড়তে তরুণদের এগিয়ে আসতে হবে

মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক ড. মাহবুবুল হক
mahbubul-hq

দীর্ঘ নয় মাসের রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধে বিজয়ের স্বাদ নিচ্ছি বটে, কিন’ আমরা যারা এ প্রজন্মের তরুণ, তাদের অনেকেরই পূর্ণাঙ্গ ধারণা নেই একাত্তরে আমাদের পূর্বসূরীদের অবদান সম্পর্কে। এই যে নয় মাসের মুক্তিযুদ্ধ, তা কিন’ হুট করে শুরু হয়ে যায়নি। বরং বাঙালি জাতিকে ‘অধিকার সচেতন’ করে স্বাধীনতা সংগ্রামের পথ দেখিয়েছিলেন অগ্রসর চেতনার রাজনীতিক, বুদ্ধিজীবী ও সংস্কৃতিকর্মীরা। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধেও ছিল তাদের অনস্বীকার্য ভূমিকা।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক ড. মাহবুবুল হক, মাতৃভাষা ও সাহিত্যে অবদান রাখার জন্যে যিনি দুই বাংলায় খ্যাতিমান। কিন’ তার বিভাগের অনেক ছাত্রই জানে না, আজ যে স্বাধীন দেশে শিক্ষার মৌলিক অধিকার তারা ভোগ করছেন, তার পেছনেও অসামান্য ভূমিকা রয়েছে স্যারের।
মুক্তির চেতনায় শাণিত ড. মাহবুবুল হক স্মৃতিচারণ করে বলেন, ‘১৯৫২ সালের কথা। আমার বাবা রেলে চাকরি করতেন। রংপুরের সৈয়দপুরে বাঙালিপুর ব্যারাকে আমরা থাকতাম। আমি তখন খুব ছোট। কিন’ এটা মনে আছে, আমাদের ব্যারাকের পাশ দিয়ে ছাত্রদের মিছিল যেত, স্লোগান ছিল ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই, নুরুল আমিনের রক্ত চাই’। আমরা ছোটরাও ওইরকম প্ল্যাকার্ড বানিয়ে মিছিল করতাম। যদিও নুরুল আমিন কে, সেটা জেনেছি আরো বড় হয়ে। এরপর যখন চট্টগ্রাম কলেজিয়েট স্কুলে নবম কি দশম শ্রেণিতে পড়ছি, বার্ষিকী সম্পাদনা করে ব্যাপক প্রশংসিত হই। ’৬২ তে শরীফ কমিশনের বিরুদ্ধে স্কুলে স্কুলে ক্যাম্পেইনিং চালাতেন বামপনি’ ছাত্রনেতারা। কলেজিয়েট স্কুল থেকে লালদীঘি ময়দানে ছাত্রসমাবেশে যোগ দিয়েছিলাম। ওই সমাবেশেই প্রথম পুলিশের টিয়ারগ্যাস নিক্ষেপ দেখেছি। আমাদের স্কুলে রাজনীতি নিষিদ্ধ থাকলেও ছাত্রসমাবেশে যোগ দেওয়ার পেছনে শিক্ষকদের মৌন সমর্থন ছিল। এরপর এসএসসি পাশ করে চট্টগ্রাম কলেজে ভর্তি হই ৬৪ সালে। কলেজে তখন কোনো ছাত্র সংগঠন প্রকাশ্যে কাজ করতে পারতো না। আমি সম্মিলিত ছাত্রপ্রগতি সংঘের (ইউএসপিপি) সঙ্গে যুক্ত হয়ে সাংস্কৃতিক-বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চা শুরু করি। পরে ইউএসপিপি’র মাধ্যমে ছাত্র ইউনিয়নের সঙ্গে যুক্ত হই। ’৬৪ তে দ্বিমাসিক সাহিত্যপত্র ‘কলরোল’ সম্পাদনা করি, যেখানে একুশের প্রথম আলেখ্য উপন্যাসিকা ‘লালরঙ পলাশ’ প্রকাশিত হয়। ’৬৫ তে কজন মিলে গড়ে তুলি কলরোল ছায়ানাট্য গোষ্ঠী। ’৬৯ পর্যন্ত ‘লালরঙ পলাশ’ সহ বেশকিছু ছায়ানাট্য প্রদর্শনীর মাধ্যমে ছাত্রদের উদ্দীপ্ত করেছিলাম আমরা। ’৬৭ সালে জেলা ছাত্র ইউনিয়নের সাংস্কৃতিক সম্পাদক হই। ওই বছরই পাকিস্তান রেডিওতে রবীন্দ্র সঙ্গীত সম্প্রচার নিষিদ্ধ হয়। তখন আমার সম্পাদনায় ‘রবীকণ্ঠ’ (রবীঠাকুরের উদ্ধৃতি সংকলন) ও ‘রবীকরে কবিকণ্ঠ’ (রবীঠাকুরকে নিয়ে লেখা কবিতা সংকলন) বের হয়। এছাড়া ‘মিছিল’, ‘অন্বেষা’ ও ‘পদাতিক’ও সম্পাদনা করেছি আমি। ৬৯ সালে সরাসরি জেলা কমিটির সভাপতি হই। ওই বছরই কেন্দ্রীয় কমিটির সহ-সভাপতি হয়ে চট্টগ্রামে গণঅভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দিয়েছি। একাত্তরের শুরুতে মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক ছিলাম এবং পরে ন্যাপ-কমিউনিস্ট পার্টি-ছাত্র ইউনিয়নের গেরিলা বাহিনীর সদস্য হিসেবে ভূমিকা রাখি।’
মুক্তিযুদ্ধের প্রশিক্ষণ নিতে ভারতে যাওয়া এবং সেখানে গেরিলাদের গড়ে তোলার ক্ষেত্রে নিজের ভূমিকার কথা জানাতে ড. মাহবুবুল হক বলেন, ‘একাত্তরের ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ভাষণের পরই আমরা মুক্তিযুদ্ধের প্রস’তি হিসেবে এমইএস স্কুল মাঠে ছাত্রদের প্রশিক্ষণের ব্যবস’া করি; এরপর যখন চট্টগ্রাম শহর পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর দখলে চলে যায়, তখন বোয়ালখালী-পটিয়ায় ট্রেনিংয়ের ব্যবস’া করি আমরা। এরপর যখন কালুরঘাট পর্যন্ত দখল হয়ে যায়, আমরা আরো প্রত্যন্ত অঞ্চলে চলে যাই। আমি নিজে গিয়েছিলাম বাঁশখালীতে, পরে ছনুয়াতে। এরপর যখন শুনতে পেলাম যে আগরতলায় ন্যাপ-কমিউনিস্ট পার্টি-ছাত্র ইউনিয়নের ট্রেনিংয়ের ব্যবস’া হয়েছে, তখন ভারতে যাবার সিদ্ধান্ত নেই। ফজলুল কাদের চৌধুরীর বাহিনী রাউজান রুটটি বন্ধ করে রেখেছিল। ৩ জুন আমরা বিলনিয়া বর্ডার দিয়ে ভারতে প্রবেশ করি। ৪ জুন আমি ক্র্যাপ্ট হোস্টেলে ন্যাপ-কমিউনিস্ট পার্টি- ছাত্র ইউনিয়নের অস’ায়ী কার্যালয়ে উপসি’ত হই। এরপর আমি কর্তাবাড়ি রিক্রুটিং ক্যাম্পে ইনচার্জের দায়িত্ব পালন করি। তারপর বড়দুয়ালী ক্যাম্পে সহযোগী ইনচার্জ হই। সে ক্যাম্পে রিক্রুটিংয়ের পাশাপাশি প্রাথমিক প্রশিক্ষণ হতো। আমি যেহেতু কলেজিয়েট স্কুলের প্রাক্তন জুনিয়র ক্যাডেট ছিলাম; থ্রি নট থ্রি চালাতে জানতাম, তাই সামরিক প্রশিক্ষকদের সহযোগী হিসেবে কাজ করতাম। সেপ্টেম্বরে বাইখোড়া ট্রানজিট ক্যাম্পে ৭ দিনের একটা শর্ট ট্রেনিং নেই। অক্টোবর-নভেম্বরে আসামের তেজপুর ট্রেনিং সেন্টারে আমি ছিলাম মোটিভেশনের দায়িত্বে। ডিসেম্বরের শুরুর দিকে দায়িত্ব পালন করি গোকুলনগর ক্যাম্পে। শেল্টার, রিক্রুটিং, ট্রেনিং সমস্ত প্রক্রিয়া পরিচালনার সঙ্গে কোনো না কোনোভাবে যুক্ত থেকেছি। ডিসেম্বরের ১০ কি ১২ তারিখে আমি ত্রিপুরার সাবরুম হয়ে দেশে প্রবেশ করি। তখন অবশ্য পাকিস্তানি বাহিনী মিত্রবাহিনীর আক্রমণে পুরোপুরি কোণঠাসা।’
মুক্তিযুদ্ধের পর দেশ গড়ার যুদ্ধে নেমে পড়েন মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম এই সংগঠক। প্রথম শ্রেণিতে মাস্টার্স উত্তীর্ণ হওয়ার সুবাদে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগদানের আমন্ত্রণ পেলেও দেশগড়ার সাংগঠনিক দায়িত্ব পালনের সিদ্ধান্ত নিয়ে সুযোগ ফিরিয়ে দেন তিনি। বাংলা একাডেমির গবেষক হিসেবে মনোনয়ন পেলেও যোগ দেননি তাতে। ১৯৭৬ সালে বাবার মৃত্যুর পর পরিবারের হাল ধরতে বাধ্য হন। কিন’ এখানেই শেষ নয়।
বিজয়ের আগমুহূর্তে জাতিকে বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে পঙ্গু করে দেওয়ার লক্ষ্যে বুদ্ধিজীবীদের হত্যা করে আল-বদর বাহিনী। সে শূন্যতা পূরণে নিজেকে পুরোপুরি সঁপে দেন তিনি। কর্মজীবন শুরু করেন ’৭৮ সালে রাঙ্গুনিয়া কলেজের প্রভাষক হিসেবে। ’৮১ তে যোগ দেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় কলেজে। ’৯৮ তে যোগ দেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে।
বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের মাঝে বাঙালির অস্তিত্ব। আর তার মহান সেবক হিসেবে অবিরাম কাজ করে চলেছেন ডা. মাহবুবুল হক। বাংলা ভাষা ও ব্যাকরণ বিষয়ক বহু বই লিখে প্রশংসিত হয়েছেন; মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিকের আবশ্যিক ও সহপাঠ বাংলা বইয়েরও রচয়িতা তিনি। প্রায়োগিক বাংলা, ফোকলোর চর্চা, অনুবাদ এবং গবেষণা ও সম্পাদনা করে পরিচিতি লাভ করেছেন দেশে-বিদেশে।
ডা. মাহবুবুল হক রচিত গ্রনে’র মধ্যে উল্লেখযোগ্য- ‘আধুনিক বাংলা সাহিত্যের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস’, ‘পাঠ্যবইয়ে বাংলা বানানের নিয়ম’, ‘বাংলাভাষা : কয়েকটি প্রসঙ্গ’, ‘তিনজন আধুনিক কবি : সমর সেন, সুভাষ মুখোপাধ্যায় ও সুকান্ত ভট্টাচার্য’, ‘রবীন্দ্রসাহিত্য রবীন্দ্রভাবনা’, ‘বাংলা সাহিত্যের দিক-বিদিক’, ‘বাংলা কবিতা : রঙে ও রেখায়’, ‘বাংলার লোকসাহিত্য, সমাজ ও সংস্কৃতি’ ইত্যাদি। তার ‘মুক্তিযুদ্ধ ফোকলোর ও অন্যান্য’ গ্রনে’ মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে ৭টি গুরুত্বপূর্ণ প্রবন্ধ ঠাঁই পেয়েছে।
নিজের বিশ্ববিদ্যালয়ের বিতর্ক সংগঠন চিটাগং ইউনিভার্সিটি ডিবেটিং সোসাইটির (সিইউডিএস) সঙ্গে যুক্ত থেকে কাজ করেছেন শিক্ষার্থীদের যুক্তি ও বিজ্ঞানের পথে ধাবিত করার। তরুণদের প্রতি এ মুক্তিযুদ্ধ সংগঠকের বার্তা, ‘সবার আগে দেশকে ভালোবাসতে হবে। ভোগবাদী নয়, সেবাব্রতী হতে হবে। জনকল্যাণমুখী সমাজ গড়তে হবে।’
অনুলিখন : জুবায়ের জুয়েল

আপনার মন্তব্য লিখুন