সাক্ষাৎকার

জগতের অনেক কিছুই আমার জ্ঞানগম্যের বাইরে রয়ে গেলো : সিদ্দিক আহমেদ

সাংবাদিক ও সাহিত্যিক সিদ্দিক আহমেদ জন্ম নেন ১৯৪৬ সালের ৩১ জুলাই চট্টগ্রামের রাউজান থানাধীন গশ্চি গ্রামে। বাবা খলিলুর রহমান মাতব্বর আর মা গুলচেহের। বেড়ে উঠেছেন সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে, যাত্রাপালা, গাজির গান, পুঁথি পাঠের আসর আর কবি গানের আসর দেখতে দেখতে। পরিবারেও চলত সাহিত্য-সংস্কৃতির শুদ্ধ চর্চা। ছোটবেলা থেকেই তাই সৃজন ও মননশীল কাজের প্রতি ছিলো তাঁর গভীর ঝোঁক। কর্মজীবন শুরু করেছিলেন শিক্ষকতা দিয়ে, পাশাপাশি শুরু করেছিলেন সাংবাদিকতা। এখনো তিনি সিদ্দিক মাস্টার নামেই অধিক পরিচিত গশ্চি গ্রামে। জীবনের দীর্ঘ সময় ধরে যুক্ত ছিলেন সাংবাদিকতা পেশার সাথে। বাংলা সাহিত্যের উৎকর্ষতা সাধনে তাঁর ছিলো বিশেষ ভূমিকা। সাহিত্য চর্চা করেছেন গৌরবের সাথে। বিশ্ব সাহিত্য চর্চায় তিনি সকলের অগ্রগামী। অনুবাদের মধ্য দিয়ে সহজ করে দিয়েছেন বিশ্ব সাহিত্যের পাঠ। রচনা করেছেন নয়টি গ্রন্থ। পেয়েছেন অনেকগুলো সম্মাননা, পুরস্কার। তাঁর জীবন ও কর্মের উপর প্রকাশিত হয়েছে সম্মাননাগ্রন্থও। এছাড়াও তাঁকে নিয়ে বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে অসংখ্য প্রবন্ধ- নিবন্ধ, সাক্ষাৎকার। দীর্ঘদিন তিনি মরণব্যাধি কর্কট রোগে ভুগে গত ১২ এপ্রিল, বুধবার সন্ধ্যে ছ’টায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় চলে যান আর না ফেরার দেশে। মৃত্যুর মাত্র কয়েক মাস আগে এক সাক্ষাৎকারে তিনি তাঁর জীবনের নানা দিক নিয়ে কথা বলেছেন খোলামেলাভাবে। সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন আহমেদ মনসুর।

আহমেদ মনসুর ঃ আপনার শৈশবের কথা শুনতে চাই।
সিদ্দিক আহমেদ ঃ আমার ছেলেবেলা অন্য সবার মতই। কোন বিশেষ কিছু নেই। আমার জন্ম হয়েছিলো একটা অর্থবিত্ত পরিবারেই। আমাদের বাড়ির বেশ সুনাম ছিলো। আমার গ্রামের নাম গচ্ছি। মাতব্বর বাড়ি। দক্ষিণ রাউজানে এটা একটা বিখ্যাত বাড়ি। বাড়ির মাতব্বর যিনি ছিলেন উনি আমার জেঠা। উনাকে বাদ দিয়ে গ্রামে কোন শালিস বিচার হতো না। এমনকি দেখা গেছে যে, দক্ষিণ রাউজানে পুলিশ গিয়ে কোন আসামি গ্রেফতার করবে, আগে আমাদের বাড়িতে যেত, ভাত পানি খেত, তারপর রাত্রিযাপন করতো। আমার জেঠাকে জিজ্ঞেস করতো আসামিটাকে গ্রেফতার করবে কি না। আমার জেঠা যদি বলতো গ্রেফতার করতে, তাহলে করতো। আর যদি বলতো লোকটা তো গরিব, ওকে গ্রেফতার করলে বউ-ছেলেমেয়েরা না খেয়ে মরবে, তাহলে রাতটা আমাদের বাড়িতে কাটিয়ে পরের দিন সকালে তারা থানায় চলে যেত। এই ছিলো, আমার পরিবারের দাপট। আর আমি এই পরিবারেরই একজন সন্তান। আমার অন্য এক জেঠা কবি এজাজ ইউসুফীর নানা, চমৎকার বাঁশি বাজাতেন। আমার বাবা চমৎকার হারমোনিয়াম বাজাতেন, গাজির গান, পুঁথি পাঠ করতেন। কবি এজাজ ইউসুফীর নানা, আমার জেঠা, উনিও চমৎকার পুঁথি পাঠ করতেন। ওই সময় ওটাই ছিলো সমাজের কালচার। যাত্রাপালা, পুঁথিপাঠ, কবিগান এগুলোই ছিলো তখনকার সময়ে আমাদের সংস্কৃতির মূল অঙ্গ। আরও ছিলো বলি খেলা, ষাঁড়ের লড়াই আর কুস্তি খেলা। তাছাড়াও নাচ হতো- আমরা বলতাম ‘নাট্য পোয়ার নাচ’। আমি ছোটবেলায় এসব দেখার জন্য পাগল ছিলাম। দূর-দূরান্তে তখন যাত্রা গান হতো। ছোট ছিলাম বলে যেতে পারতাম না। তবে একটু বড় হওয়ার পর মহামুনিতে গিয়েছিলাম যাত্রাপালা দেখতে। আমরা স্কুলেও যাত্রা পালা করতাম তখন। স্বভাবতই তখন আর্থিক সংকট ছিলো। তাই স্কুলের উন্নয়নে এককালীন কেউ অনেক অর্থ দান করতে পারতো না। স্কুল ভবন তখন পাকা করার জন্য কিংবা স্কুলের সার্বিক উন্নয়নের জন্য গ্রামে যাত্রা গানের ব্যবস্থা হতো। যাত্রা পালার টিকিট বিক্রির অর্থ দিয়ে স্কুলের উন্নয়নের কাজ হতো। এগুলো মূলত তখনকার সময়ে আমাদের সংস্কৃতির অংশ ছিলো। আর আমার ঐ পরিমণ্ডলেই বেড়ে উঠা। একটা সাংস্কৃতিক আবহের মধ্যেই আমার শৈশব আর কৈশোর কেটেছে। আমি কৃষক পরিবারের সন্তান ছিলাম। বাড়ির মধ্যে প্রত্যেকের প্রতি প্রত্যেকের অনেক মায়া মমতা ছিলো তখন।
আহমেদ মনসুর ঃ আপনার শিক্ষা জীবন সম্বন্ধে একটু শুনতে চাই।
সিদ্দিক আহমেদ ঃ বাড়ির কাছেই স্কুল ছিল, গশ্চি প্রাইমারি স্কুল। ওখান থেকে এরপর ক্লাস সেভেনে চলে যাই নোয়াপাড়া স্কুলে। সেই স্কুল থেকে মেট্রিকুলেশান পাস করি ১৯৬১ সালে। ঢাকা বোর্ডের আন্ডারে লাস্ট মেট্রিকুলেশান পরীক্ষা দিয়েছিলাম আমরাই। এর পরের বছর থেকেই মেট্রিকুলেশন নাম আর ছিলো না, ঐ পরীক্ষার নাম হয়ে যায় এসএসসি। এরপরে আমি ভর্তি হলাম চট্টগ্রাম সিটি কলেজে। আমার বাবার আর্থিক অবস্থা খুব ভালো ছিলো, কিন্তু তখন হঠাৎ করেই খারাপ হয়ে গেল। তাঁর তখন কেরোসিনের ডিলারশিপ ছিলো নোয়াহাটে। এছাড়াও হেন কোন কাজ নেই, যা তিনি জানতেন না। তিনি ফার্নিচারের কাজ পারতেন। আমাদের বাড়ির সমস্ত ফার্নিচারগুলো তাঁর হাতেই তৈরি। তিনি আবার সেলাইয়ের কাজও জানতেন। ছোটবেলায় আমাদের যাবতীয় কাপড়গুলো তিনিই সেলাই করে দিতেন। বিশেষ করে বোরকা সেলাইয়ের জন্য তিনি ছিলেন বিখ্যাত। এছাড়াও তাঁর ধানের কল ছিলো। এসব নিয়ে তাঁর জীবনটা একেবারে খারাপ কাটেনি। পরে হঠাৎ তাঁর ব্যবসায়টা খারাপ হয়ে গেলো। একান্তই বাধ্য হয়ে তাই তিনি বললেন, আমাকে সিটি কলেজে নাইট সেশনে পড়তে হবে। মাত্র ১৭ বছর বয়স তখন। সবে মেট্রিকুলেশন পাশ করলাম। সিটি কলেজে নাইট সেশনে ভর্তি হলাম। বাবার ব্যবসায়ের অবস্থা ভালো না তো; তাই চাকরি করতে হবে। ঐ যে কবিরাজ বিল্ডিং এখন ভেঙে গেছে, ওখানে ছিলো ইন্টারন্যাশনাল টাইপিং সেন্টার। ওখানে আমি টাইপ শিখলাম। এরপরও চাকরি হয় না। তবে টাইপে আমার গতি ছিলো খুব ভালো। এর জন্য পুরস্কার পেয়েছিলাম। আমার হাতে পুরস্কার তুলে দিয়েছিলেন কংগ্রেসের বিখ্যাত নেত্রী নীলা সেন গুপ্তা। একটা সার্টিফিকেট দিয়েছিলেন। নাইট কলেজে পড়ে আমার লাভটা সবচেয়ে বেশি হলো, ক্লাস ছিলো রাত্রে। সারাদিন আমি ব্রিটিশ কাউন্সিল, আমেরিকান সেন্টার ওই সমস্ত জায়গায় ঘুরে ঘুরে শুধু পড়তাম। ওইটাই ছিলো প্লাস পয়েন্ট। সারাদিন নানা জায়গায় পড়ে কাটাতাম আর রাত্রে কলেজে গিয়ে টেবিল টেনিস খেলতাম, আড্ডা মারতাম। ক্লাস তেমন হতো না। বাষট্টির শিক্ষা আন্দোলন যখন শুরু হলো। বিখ্যাত সেই আন্দোলন। আমার বয়স তখন আঠারো বছর। ওই আন্দোলনের আমি ছিলাম ওয়ান অফ দ্যা পার্টিসিপেন্ট। কোর্ট বিল্ডিং এর সামনে মিলিটারির গাড়িতে ইট পাটকেলও মেরেছিলাম। পরে আমাদের টার্গেট করে ধরার জন্য পুলিশ তাড়া করে। আমরা টিআইসির অপজিটে নন্দন কাননের গলিতে ঢুকে গেলাম। পুলিশও আমাদের পেছন পেছন এই গলিতে ঢুকলো। ঐদিকে আবার ডিসির পাহাড় থেকে পুলিশ নামলো। গলির উভয় দিক থেকে পুলিশ আসতে শুরু করলে আমরা পড়ে গেলাম মহাবিপাকে। আমাদের মধ্য থেকে প্রায় বিশ চল্লিশজনকে গ্রেফতার করে ফেললো তারা। একমাত্র আমি ছাড়া আর কেউ মনে হয় ঐদিন পুলিশের হাত থেকে রক্ষা পায়নি। ওখানে বিহারী একটা পরিবারের বাসা ছিলো। আমি ওখানে উঠে যাই। ওখানে একটা নারকেল গাছ ছিলো। ছোট খাটো গড়নের ছিলাম তো, আমি ঐ গাছটার আড়ালে এমনভাবে লুকিয়ে ছিলাম, আমাকে ওরা দেখতে পেলো না। সবাইকে নিয়ে পুলিশ চলে গেলো। তারপর আমি ওখান থেকে নামলাম। বাড়ির ওরা আমাকে দেখে জিগ্যেস করেছে, উর্দুতে, তুমি কোথায় ছিলা এতক্ষণ? আমি তো উর্দু জানি না, তাই জবাব না দিয়েই চলে গেলাম। তখন দেখতে পেলে ওরা আমাকে পুলিশের হাতে ধরিয়ে দিতো। বিহারী ছিলো তো! পরে তিনদিন পর আমার বন্ধুদের ছেড়ে দেয়। ওখানে তিন/চারজন আমার ভালো বন্ধু ছিলো, সিটি কলেজের। আমি জেলে গিয়ে মালা দিয়েও বরণ করলাম একজনকে। পরে ভাবলাম যে, আহারে, আমিও যদি এরেস্ট হতাম আমাকেও তো কেউ না কেউ একটা মালা দিত। জীবনে জেলখানার স্বাদটা আর পাওয়া হল না। সিটি কলেজ থেকে কোন রকমে ইন্টারমিডিয়েট পাস করার পর পড়ালেখা আর করলাম না। সবাই আমাকে মনে করে আমি খুব স্কলার লোক, তাই না? কথাবার্তা ভালো বলতে পারি, কিছু লিখতে পারি বলেই হয়ত তেমনটা মনে করে।
আগামী সংখ্যায় সমাপ্য