ছোটবেলার বুড়ি

তাহসিন আহমেদ

আমার বয়স তখন ১২ কি ১৩ বছর। আমি প্রতিদিন একটা ডাকের জন্য অপেক্ষা করতাম। স্কুল থেকে ফিরে এসে খাওয়ার পরই বৃদ্ধা ভিক্ষুকের ডাকটা আসতো। আমি শোনার পর দৌঁড়ে গিয়ে একমুঠো চাল দিয়ে আসতাম। বৃদ্ধা মহিলাটি আমাকে দাদু বলে ডাকতেন। তার ডাকটাও ছিলো খুব আবেগমাখানো। তার গলার স্বরটা ছিলো মোলায়েম তবে ভাঙা। বৃদ্ধ বয়সে এর চেয়ে ভালো কণ্ঠ থাকে না। তিনি দরজার সামনে এসে বলতেন, ুদাদু, দাদু, কেউ বাসায় আছো?চ
আমি প্রতিবার তাকে চাল দেওয়ার সময় তিনি মাথায় হাত বুলিয়ে আদর করতেন। এটাকে অনেকে দোয়া মনে করলেও আমি আদর মনে করতাম। দোয়া হলো ঝেড়ে ফেলার জিনিস। দোয়া করে দিলাম, হলে হবে না হলে নাই। কিন’ আদর হলো আবেগ দিয়ে ভালোবাসা। পরম মমতায় মাথায় হাত বুলিয়ে দেওয়া।
অনেকদিন পেরিয়ে গেছে। সেই ছোট বয়সটা এখন আর নেই। অনেক বড় হয়ে গেছি। ছোটবেলার ছবি দেখলে নিজের কাছেই নিজের লজ্জা লাগে। অথচ, আবেগমাখা দাদু ডাকটা এখন আর শুনতে পাই না। মানুষটি কোথায় আছে? কেমন আছে? তা ও জানি না। মাঝে মাঝে এমন কিছু মানুষের কথা খুব মনে পড়ে। বলতে ইচ্ছে হয়- ‘হ্যাঁ জনাব, আপনাকে আমি খুব ভালোবাসি।’ কিন’ প্রকৃতি আমাকে এটা বলার সুযোগ দেয় না। এরা কোথায় যে হারিয়ে যায়! আর খুঁজে পাওয়া যায় না।
আমি অনেকবার তাকে খোঁজার চেষ্টা করেছিলাম। কিন’ আমি তার নাম জানি না, তার কোন ছবি আমার কাছে নেই। সে কোথায় থাকে তা ও আমি জানি না। শুধু এইটুকুই জানি যে, তার ছেলেগুলো অনেক শিক্ষিত অথচ তারা মায়ের খোঁজ রাখে না। তারা হয়তো জানে না- তাদের মা তাঁর নিজের সন্তানের কাছে অর্থহীন মানুষ হলেও সেই মানুষটিই অন্য আরো হাজারো সন্তানের কাছে প্রিয় মানুষ। আচ্ছা, প্রিয় মানুষগুলি কি এভাবেই হারিয়ে যায়?