ছোটকাগজ চন্দ্রবিন্দু শিকল ভাঙার গান

শ্রী দেব

ছোট কাগজ নিয়ে আলোচনা করতে গেলে বিভিন্ন ভাবনা মগজে এসে জড় হয়। বর্তমানে বাজারে প্রচুর ছোটকাগজের ভিড়, যার বেশির ভাগই ব্যসত্ম বাজারি উদ্দেশ্য সাধনে। এত এত ছোটকাগজের ভিড়েও কিছু কাগজ শিল্পমান বজায় রেখে, আবার কিছু কাগজ পাঠকমহলের প্রত্যাশিত কাঠামো থেকে আরও অধিক উৎরে যাচ্ছে।

আজ আলোচনা করতে যাচ্ছি তেমনই এক ছোটকাগজ কবি ও কথাসাহিত্যিক মঈন ফারম্নক সম্পাদিত ‘চন্দ্রবিন্দু’ নিয়ে।

পত্রিকাটির অক্টোবর সংখ্যা হাতে পাওয়ার আগ পর্যনত্ম অধীর আগ্রহে অপেড়্গায় ছিলাম ১০০ কবির মনোনীত তালিকায় আমার নামও ছিল বিধায়। সেই সাথে চন্দ্রবিন্দুর এ সংখ্যায় যা আছে- কবি ময়ূখ চৌধুরী’র সাড়্গাৎকার, মলয় রায়চৌধুরী’র প্রবন্ধ, জিললুর রহমানের প্রবন্ধ, আলী আফজাল খানের প্রবন্ধ ও ১০০ কবি’র কবিতাগুচ্ছ।

এই সংখ্যাটি যতটুকু তৃপ্তি যোগাবে পাঠকের মনে ততটুকুই গুরম্নত্ব বহন করে কবিদের জন্য। প্রসঙ্গত- আমরা যদি প্রথমেই দৃষ্টি দিই সম্পাদকীয়তে, দেখতে পাই একটি গুরম্নত্বপূর্ণ আলোচনা। যার শিরোনাম, ‘কে কবি, কী কবিতা!’  এ নিয়ে বহু আলোচনা করেছেন পূর্বেই বহুজন বহুভাবে। সমকালীন কবিদের আদর্শ স্বয়ং জীবনানন্দ বলেছেন ‘সকলে কবি নয়, কেউ কেউ কবি’। এই কবি কে? এমন প্রশ্ন মনে আসা স্বাভাবিক। এই সম্পর্কে

সম্পাদকীয়তে কবি মঈন ফারম্নক সুস্পষ্ট বক্তব্য রেখেছেন, যার কারণে আমাদের মত তরম্নণরা তাদের ভবিুব্য জ্ঞাত হবেন। আর হ্যাঁ, এই তরম্নণদের প্রতি তাই-তো সম্পাদকীয়তে তিনি বলেছেন, ‘নিজের ভেতরে লুকোনো নিজেকে কে দেখতে চায়?- দিন গড়ায়ে রাত গড়ায়ে আগুন লাগায় পা’য়!’

মূল অংশে এসে আমরা পাই- কবি ময়ূখ চৌধুরীর গুরম্নগম্ভীর সাড়্গাৎকার। জানতে পারি কবি, শিল্পীদের আত্মহত্যা তথা আত্মড়্গয়ের গৌরব সম্পর্কে মলয় রায়চৌধুরী’র প্রবন্ধে। বাংলা কবিতার ভবিষ্যৎ সম্পর্কে আলোচনা পাই জিললুর রহমানের প্রবন্ধে। আলী আফজাল খান তার আলোচনায় ব্যাখ্যা করেন নুনু কবিতার ভাববিশ্ব নিয়ে। যেখানে তিনি সমসাময়িক কবিতার অধুনানিত্মক ট্রেইল এপস্নাই করে পাঠকদের জন্য উপস’াপন করেছেন। এখানে পাঠক যেমন কবিতার বাইরে, কবিতা আলোচনা সম্পর্কে জানতে পারবেন তেমন একজন কবিও সমসাময়িক কবিতার গতিবিধি, কবিতা যাপন ও কবিতার ভবিষ্যৎ সম্পর্কে পর্যাপ্ত ধারণা পাবেন।

এই পত্রিকার সবচেয়ে উলেস্নখযোগ্য ও সাহসী কার্যক্রম হচ্ছে ১০০ কবির কবিতাগুচ্ছ ও তার পর্যালোচনা। কারণ এত এত কবিতার ভিড়ে ১০০ কবির কবিতা বাছাই ও বসত্মুনিষ্ঠ পর্যালোচনা কঠিন হয়ে পড়ে। কিন’ পত্রিকাটি কবিতা আহ্বানের সময় কবিতার পাশাপাশি কবিতা ভাবনাও জানতে চেয়েছেন কবিদের এবং কবিদেরই নির্বাচন করতে বলেছেন নিজেদের সেরা দশটি করে কবিতা। প্রথমে যেকোনো কবি বা পাঠকের সন্দেহ থাকলেও পত্রিকার পাতা ওল্টালে তার অবসান হয়। অবসান এই কারণেই হয়- এই প্রক্রিয়া অনুসরণ করে আসতে গিয়ে অনেকেই বাতিল হয়ে গিয়েছেন বাছাই প্রক্রিয়ার আগে, টিকে গেছেন যোগ্যরা। তারপর সম্পাদকের তীড়্গ্নচোখ দৃষ্টি রেখেছিলেন আলোচনাযোগ্যদের প্রতি। আবার ‘১০০ কবির কবিতাগুচ্ছ’ এর ভূমিকা অংশেই উলেস্নখ করা আছে- ‘আলোচক বা পর্যালোচকের আলাপচারিতা থেকে অনেক ধনাত্মক বা ঋণাত্মক আলাপ চলে আসে- যা মূলত জ্ঞান দানের মতন একটা পরিসি’তি তৈরি হয়। কবির কাজ জ্ঞান নেয়া নয়, নতুন জ্ঞান সৃজন করা।’

এই ‘ধনাত্মক বা ঋণাত্মক’ শব্দাবলীতে বোঝা যায় এই কবিতাগুচ্ছ বা ব্যবচ্ছেদ কোনো গোষ্ঠীবদ্ধ প্রয়াস নয় বরং নতুন করে বাংলা সাহিত্যে ‘চন্দ্রবিন্দু’ এক শিকল ভাঙার গান। বাংলা সাহিত্যের পথপরিক্রমায় ‘চন্দ্রবিন্দু’র এ ব্যতিক্রম ও অবিরত প্রচেষ্টা একটি ভিন্ন মাত্রার সংযোজন, আশাকরি আগামীতেও এমন প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকবে।