ছেঁড়া ভালোবাসা, বিদীর্ণ শরীর

খুরশীদ আনোয়ার

তুমি উল্টেপাল্টে দিলে, বেশ মজা হলো
এ এক উদ্ভট ক্রীড়া কৌশল তোমার
আমার বা’হাত ডানদিকে আর ডান হাত
বা’দিকে লটকে আছে।
বুড়ো আঙুলে কনিষ্ঠা
অনামিকা মূলে তর্জনীর অসি’
চামড়ায় রক্ত-জবার উল্কি

আমার পা দুটো আসমান মুখি
আর সমতটে নীরব করোটি

পাঁজর তো পাওয়াই যায়নি। অথচ
তুমি নেচে নেচে ভাঙচুর কংকালের হাড়ে
বাজাচ্ছো নিখাদ
অমরত্বের সুর লয় তাল।
তোমার ভালোগুলো আলো হয়ে ফুটে ওঠে
নক্ষত্রের ছড়াছড়ি অসীম ব্রহ্মাণ্ড জুড়ে,
পূর্ণিমার বিছানা পাতা নরোম শয্যায়
তোমার নুরানি দেহ করবাট বদলায়

আমি কার লোক, কোন ঘাস আমার
শয্যা? কোন চাদরের কোলে
আমরা ক’জন মিলবো মেলাবো
অদূরে সমুদ্র উল্টে আছে,
চোখে জল নেই
দু’চোখের শূন্য খোলে জন্ম মৃত্যু আগুন
বন্ধনের মধ্যিখানে কঠিন দেয়াল,
আমাকে ব্যবচ্ছেদ করে একশ একভাগ হলো
হে আমার উন্মাদ-ঈশ্বরী,

প্রেম-নুব্জ্য-নশ্বর দেহ,
এ মুহূর্তে তোমাকে নয়, বড় বেশি
রবীন্দ্রনাথকে মনে পড়ে,
তুমি যে ভীষণ কঠিন, ‘তাই কঠিনেরে
ভালোবাসিলাম’।

বিজন মজুমদার
মনে পড়ে শৈশব সে দিন

যেতে যেতে পথ, বৃষ্ণচূড়া দিন
মেঘ ভেঙে বৃষ্টি, বাড়ির উঠানে
আঁধার ঘনিয়ে আসে।
দৃশ্যপট পাল্টাতে দেখি
ইজেলে রাখা ক্যানভাস দ্রুত ফুরিয়ে যায়।
জমিন-ছেড়া রঙ কেবল এদিক ও দিক নাচা- নাচি
সবুজের মাঠ ঘিরে শৈশব আসে
বৃষ্টিভেজা মাঠ টেনিস বলে লাঠালাঠি
আমরা এক দঙ্গল কিশোর।

ভাবনাহীন কেমন চলে গেছে সেদিন
মায়ের বকুনি অথবা দাদার চিকন লাঠির মার
পড়ার টেবিলে অযথা মুখগুঁজে ভান করা
লুকিয়ে আকাশবাণীর রবিবাসরীয় শ্রুতি নাটক
শৈশবের সেইদিন যেন আর আসে না।

এখন কৃষ্ণচূড়ার দিন
ব্রান্ডি মেশানো বাদামী রোদ
কৃষ্ণপক্ষ বাউল রাতে কবিতার কৃষ্ণকলি
অথবা ক্যানভাসে রং আর ব্রাশের স্ট্রোকে
শৈশব শুধু এঁেক বেঁকে যায় এপ্রান্ত আর ওপ্রান্ত।

শাহীন মাহমুদ
এক দমপতির গল্প

ইচ্ছের ফোঁটাগুলো ভাঙে জানালা । এই নগরে আজ ঝরছে স্বপ্নবৃষ্টি
এই শহরে বসবাস এক অলৌকিক দমপতির। ঝুলে আছে পুরো কংক্রিট নগর
পাঁজরের সিঁদ কাঁটা রাস্তায়; ফিসফিস সরল প্রেম বলে-সব রাখা আছে টেবিলে
চুপচাপ খেয়ে চলে যাও;আজ না হয় তুমি আগন’ক আমার ঘরে।
ইচ্ছের ফোঁটাগুলো ভাঙে জানালা। মাঝরাতে ঝিমধরা বোধের জোনাক
মৃত্যুর ঠিক এক মিনিট আগে মৃদুস্বরে বলে
আসলে আমরা দমপতি ছিলাম
এক অলৌকিক দমপতি !

উৎপলকান্তি বড়ুয়া

বলেছিলে বৃষ্টি হবে

তুমিই তো আজ বলেছিলে, বৃষ্টি হবে বৃষ্টি হবে!
সৃষ্টি হবে ঝড়ের গতি মাতাল হাওয়ার অনুভবে।
ঘুঙুর পায়ে তুমুল নাচে বৈশাখী ঝড়
বলেছিলে বৃষ্টি হলে পূর্ণ হবে হৃদ-সরোবর।

বৃষ্টি এলো, ভিজছি তোমার উঠোন-গাঙে
বৈশাখী ঝড়-বৃষ্টি সুখের দু’পার ভাঙে
মনের দু’কূল ভিজছে অঝোর বৃষ্টি ধারায়
জানলো জগত, রটলো মুখে পাড়ায় পাড়ায়।

তুমি তো ঠিক বলেছিলে বৃষ্টি হলে বৃষ্টি হলে-
দু’জনার আজ সিনান হবে একই টবের একই জলে।

সাবিনা পারভীন লীনা

বিরতি কাছে আনে
বন্ধু দীপংকরকে

স্মৃতি বিস্মৃতির তীর ছুঁয়ে
নোনাজল ডিঙিয়ে ফিরে আসো
মনে জাগে দ্বিধার ঝড়
প্রকাশের কার্পণ্য কেঁপে কেঁপে ওঠে
কড়া নাড়ার শব্দ শুনি।
আধো ঘুম আধো জাগরণে
মনে পড়ে, অমূল্য কিছু শব্দের মালা-
গহীন নদীর স্রোত বেয়ে
আসুক তারা,করুক কলরব
দরজার বাইরে থাকুক কিছুকাল।
রোদে পুড়ে জলে ভিজে
শুদ্ধ হলেই ঘরে এনো তাদের,বন্ধু।

ফাউজুল কবির
সূর্যটিকে

আজকের সকাল বেলা
লাল আলোর যে সূর্যটিকে দেখলাম পুবদিকে
হাসতে হাসতে মাথা তুলছে আকাশের মাঠে …

বিকেলেই তার সাথে দেখা হয়ে গেলো
পতেঙ্গার কাছাকাছি সমুদ্রের বুকে
বাড়ি যাবে বলে
খুব ধীরে সুসে’ হাত মুখ ধুয়ে নিচ্ছে
এবং তারপর হাঁটতে হাঁটতে গামছা কাঁধে চলে গেলো
জলের ভেতরে জল খেতে খেতে
মন্ত্রমুগ্ধ জল হতে হতে জলের ওপারে আলোর সুন্দর

নাজিমুদ্দীন শ্যামল
মাঈনুদ্দিন স্যার

মাঈনুদ্দিন স্যার পূর্বে তৈল শোধনাগার স্কুলে
মাস্টারি করতেন। তিনি আমাদের বাংলা
পড়াতেন; ইংরেজি, গণিত কিংবা অন্য বিষয়ও
তিনি পড়াতেন সুন্দর করে। অত্যন্ত সুন্দর
পোশাকে তিনি স্কুলে আসতেন। আমাদের
ছড়া কবিতা নামতা- এসব শেখাতেন।

আমাদের পরে যারা স্কুলে পড়েছেন,
মাঈনুদ্দিন স্যার তাঁদেরও পড়াতেন।
তিনি স্কাউট করতেন। আমাদের
নীতি- নৈতিকতা শেখাতেন। তিনি
সততার কথা বলতেন অবিরাম।
অসাধারণ যাদুতে গল্প বলে আমাদের
সম্মোহিত করতেন। তিনি আমাকে
ও আমার সহোদরদের স্নেহ করতেন।

মাঈনুদ্দিন স্যারের বয়স হয়েছে।
তিনি অবসরে গেছেন। তাঁর সতত
সততার স্নেহ সম্মোহন যাদুর বাক্সের মতোন,
আমাদের আচ্ছন্ন করে আছে আজীবন।

আজিজ কাজল
ছবি

বাতাসে ভাসছে নদী ও মাঝি-ভাই
অমসৃণ সোনালু মাছের ছবি;
এ অসহনীয় মেহ রোদ নকশাপত্রের
ভাঁজ তোমার ছবি-গানেও ছড়িয়ে পড়েছে

পুরনো অভিশাপ, কৌম গন্ধের পলি
নাকে লাগে; দু’চোখের শরমিন্দা
আঙুলে-তাই পঙ্কিলতার ঘা ধরে
বসে আছি-

তোমার প্রযুক্তি-বর্ণমালার তুমুল গলায়
কর্কষ্য রোদ; কবে আসবে?
এই শ্যামল পৃথিবীর ধ্যানে,
রোদেল প্রীতি-ডোর ভরিয়ে দিতে।

কাজী শাহরিয়ার
ক্রিসেন্তিমাম

তোমার যুগল ডাগরআঁখির
রোদ ঝরা ভোর কার্নিশে
অহর্নিশি ক্রিসেন্তিমাম ফোটে,

কুসমী রঙা নীলের পরি
চাহন তবুও শাদার ছড়ি
জল ঝর্ণার ছাপ দিয়েছি মোটে।

মুক্তো বিছান কালচে তিলে
শীতল নোয়ান অতল ঝিলে
ছল জলোছাপ অধীর লোনা,

মোন মানে না মোনা
তোমার জন্যে নতুন করে
নতুন দিনে নতুন ফসল বোনা।

সাইয়্যিদ মঞ্জু
মরীচিকার আয়না

মরিচার ক্রন্দন আঙিনার অলস কোদালের বুকে
দু’চোখের কর্নিয়া যেন দৃষ্টিহীন কঠিন পাথর
যান্ত্রিক পুতুলের নাচন-যেমন নাচায়
বুক ভরা যত স্বপ্ন-আশা আবছায়ায়
তবুও স্বপ্ন দেখি সমুুদ্র পাড়ের অবুঝ নোনা মানুষ।

লুঠ হয়ে যায় পিতার বাড়ি, মরীচিকার রঙিন আয়নায়
কয়লা পোড়ার ধোঁয়ার নেশায় লুঠ হয়ে যায় মাতার বাড়ি
কর্পোরেট পুঁজির তলায় তোমার-আমার সবার বাড়ি
অবাক চোখে চেয়ে দেখি, নিরব বোকা দর্শক।

জানি না কোথায় ঘুমাব কোথায় আমার ঘর।

সবুজ আহমেদ কক্স
ডিজিটাল যুগে এসে দেখি

ডিজিটাল যুগে এসে সেই প্রেম আর নেই
অহর্নিশি এখন যান্ত্রিক যন্ত্রণায় কাতরাই
পবিত্র প্রেম নেই
প্রকৃত ভালোবাসা নেই
পেয়ে হারানোর ব্যথা
না পাবার যন্ত্রণা মগজে বারংবার চক্কর দেয়।

ঢাকায় ফাঁকা নেই কিছু
জ্যামে আর ঘামে ছুটাছুটি…
আছে ওভারব্রিজ, ফ্লাইওভার তবুও মানুষ আটকা
মোড়ে মোড়ে টকির পর্দায় সুন্দরী নাচে গায় রে পটকা।

ডিজিটাল যুগে এসে দেখি
পার্কে আর হয় না চিত্তবিনোদন
টোকাই, বাটপারের দখলে, নব নব আয়োজন
শিশু পার্কে শিশু নেই বন্দি ফ্ল্যাটে ফ্ল্যাটে…….

সাথী দাশ
মানুষেরা ফানুস হয়

মাঝে-মধ্যে দেখি রাতের আকাশে ফানুস উড়ছে অনেক অনেক;
চোখে দেখা আকাশে ফানুসগুলো যে ধীরে-ধীরলয়ে তারা হয়ে যায়।
এলোমেলো হাওয়ায় অনেক ফানুস আবার জ্বলে ওঠে পুড়ে পুড়ে
ক্রমাগত নেমে এসে নিঃশেষ হয়ে পড়ে মাটির উষ্ণটানে। অজান্তে অস্বস্তি;
কোথাও কার কিছু ক্ষতি হলো বুঝি মানুষ ফানুসের আনন্দাগুনে।

পরিপূর্ণ মানুষের দৃষ্টি দিয়ে দেখো মানুষের সাথেই মানুষের
স্বার্থগত বিরোধ, বিভেদ-বৈরিতা চলেই আসছে পরম্পরায়। তবুও
মানুষেরা প্রবাদ জানে, মানুষের প্রতি বিশ্বাস হারানো সে একরকম
পাপের সামিল। সত্যি নাকি মিথ্যে সেটাতো কখনো যাচাই হয়নি।

প্রবাদের হাত ধরে মানুষেরা হাঁটে, সামনে এগোয়। কারণটা সহজ,
প্রবাদ-প্রবচনে কেউ কেউ এখন বাংলা ও বাঙালির ঐতিহ্য খোঁজে।

জিন্নাহ চৌধুরী
কোচিং সেন্টার

তুমি এসে দরোজায় কড়া নাড়ো
নতুন তুমির মাঝে,
বারবার তোমাকেই খুঁজে বেড়াই
নতুন তোমার কাছে।
এরকম বোকামি কিন’ আমার
এখনো আছে …
ভালোবাসা পেয়ে মরে গেলে তুমি
ভালো আশাতে বেঁচে।

ফারহানা আনন্দময়ী
চিবুক

পৃথিবীর ডাক পারো না ফেরাতে…
শংখচিলও যতটা পারে আকাশকে,
রোদ্দুর কিংবা সমুদ্দুরকে।
দূরযাত্রার হুইসেল শোনে মেয়েটাও,
তার ডানার উড়ানের সাধ্য কী তোমাকে উড়াবে
মেঘের সাথে পাল্লা দিয়ে ?
ভাসাতেও পারে না ঢেউয়ের চূড়ায়,
ডোবাতে পারে শুধু ডুবে যাওয়া ডুবো চরে।
যেটুকু হারায়, যেটুকু হারাই হারাই…
কিছুমাত্র ক্ষতি নেই তাতে।
বিশ্বাস করো, তার প্রাপ্তি পুরোটাই।

ক্লান্ত ভ্রমণ শেষে কবিতার খাতা জুড়ে বসে থাকা
কালো মেয়ের চিবুকেই এসে জাগে
তোমার আয়ুস্মান হবার নিবিড় বাসনা।
চিবুকের চিকন আলোতেই
তোমার সর্বনেশে শেষরাতগুলো
হয়ে উঠতে চায় প্রিয়তম ভোর।