ছায়া-পাখি

আখতারুল ইসলাম
55

গ্রামের নাম পাখিপুর। ছায়া হাঁটতে হাঁটতে একদিন পাখিপুর গ্রামে এসে পড়ে। নানা ধরনের পাখি থাকে এ পাখিপুর গ্রামে। দূর থেকে একটা শালিক এসে ছায়াকে বলল, ছায়া তুমি কেন এসেছো এখানে আমি জানি, ছায়া বলল মানে?
মানে হল তুমি আনমনা হাঁটতে হাঁটতে ভুল করে এ গ্রামে চলে এসেছো, তাই না?
ছায়া ভাবতে থাকে, তাই তো! শালিকের কথায় অবাক হয়, সত্যি তো!
হ্যাঁ শালিক তুমি ঠিক বলেছো? কিন’ তুমি আমার নাম জানলে কীভাবে?
জানি, জানি! আমরা সব জানি?
আমরা মানে?
বোকা মেয়ে আমরা বুঝলে না!
আমি, ময়না, টিয়ে, মাছরাঙা, হাঁড়িচাচা, শ্যামা, বক, দোয়েল, কোয়েল, সবাই…
ও আচ্ছা, শোন শালিক, আমাকে বোকা বলবে না, আমি তোমাদের সবার নাম জানি, কিন’ জানতাম না তোমরা আমার নাম জানো? অন্য পাখিরা কোথায়?
ইশ্কুলে।
ইশ্কুলে মানে?
ছায়া, তুমি জানো এ গ্রামটার নাম পাখিপুর। আর গ্রামের শেষে! তালতলায় পাখিদের ইশকুল!
ছায়া তো আরো অবাক! পাখিদের ইশকুল? জীবনের এই প্রথম সে শুনলো পাখিদের ইশকুল আছে?
আচ্ছা! শালিক! তোমাদের ইশকুলে কি পড়ানো হয়? আমাকে নিয়ে যাবে?
শোন ছায়া নিতে পারবো কিনা জানি না?
তবে শোন ওখানে প্রতিদিন পালা করে দু’জন টিচার আসে।
কোথা থেকে?
আমাদের গ্রামটা পাখিপুর ছিল না, ছিল না এখানে পাখিদের ইশ্কুল! একদিন পড়ন্ত বিকেলে আকাশ থেকে ফ্লায়িং সসারের মত একটি যান উড়ে এসে বসল এখানে, যান থেকে নামলো অনেকগুলো পাখি। কিন’ আমরা তো অবাক পাখিগুলো এদেশে! এ পৃথিবীর না! অনেকটা বাজ পাখি বা চিলের মত! অদ্ভুত প্রকৃতির। যেদিন প্রথম আসে! আমরা তো সবাই ভয়ে জড়োসড়ো। কারো মুখে কথা নেই! নেই সাড়াশব্দ! বুক ধুক ধুক করছে! আর রক্ষা নেই! ওদের ডানার ঝাপটায়, বিশাল আকৃতি বর্শা ফলার মতো ঠোঁটে চু মেরে মারতে বেশি সময় লাগবে না।
হঠাৎ বক-সারস বলল সবাই পালাও! এখানে আর থাকা যাবে না। এখানে হিংস্র আগন’করা এসেছে! এরা মানুষের চেয়ে ভয়ঙ্কর। যেই আমরা উড়তে যাবো! ওরা কি এক অদৃশ্য ক্ষমতায় বাতাসের গতি রোধ করে। এক ধরনের জল ছিটিয়ে দিল! সাথে সাথে আমাদের ওড়া বন্ধ হয়ে গেল। বাধ্য হয়ে ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে ওদের সামনে বসে থাকি!
ওরা! বলল! তোমাদের ভয় নেই!…
শালিক থামে।
ছায়া বলল, তারপর….
শালিকের চোখে পানি! কাঁদো কাঁদো সুরে বলল, জানো ছায়া ভয়ে আমার মা অজ্ঞান হয়ে পরে। জীবন বিপন্ন হবে ভেবে কেউ এগিয়ে আসলো না। আমার মা মারা যায়।
ছায়া বলল! ইশ্! খুব দুঃখজনক! ঠিক আছে কেঁদো না শালিক!
চোখের পানি মুছতে মুছতে শালিক বলল! মা মারা যাওয়াতে আমাদের দু ভাই বোনের দায়িত্ব ওই চিল পাখিরা নিল! খুব আদর করে আমাকে আর পিকু কে!
পিকু কে!
আমার বোন!
ও আচ্ছা! তুমি পড়তে যাওনি! হ্যাঁ আমরা সকালের ব্যাচে পড়েছি! এখন পড়ছে যারা সকালে পড়তে পারেনি তারা।
আচ্ছা এই পাখিদের স্কুলে যে পড়ায় তার নাম কি?
ওই চিল পাখিটি! যার নাম এখানো আমরা কেউ জানি না। যিনি এটা পরিচালনা করেন। কিন’ তার অধীনে চারজন টিচার- সকালে পড়ায়, টিনটিন ও টুটিন আর বিকেলে মানে এ সময় পড়ায়, বনি ও বনটি।
ছায়া বলল, ওরা কী শেখায় তোমাদের।
অনেক কিছু!
আমরা যে জীব! আমরা যে পাখি! আমাদের যে জীবন আছে তা আমরা জানতাম না! তারা শিখিয়েছে! বলছে, এটা পাখিপুর! ইশকুলের নাম দিয়েছে পাখিদের ইশ্কুল!
জানো ছায়া? টুটিন! খুব ভালো টিচার!
যে আমাদের জীবন ধারণ, কথা বলা, ধ্বংস থেকে রক্ষা, পৃথিবীর বাইরে গ্রহ-নক্ষত্র, সম্পর্কে বলেছে!
বলেছে! মানুষ পাখিকে শুধু নিজের প্রয়োজনে ব্যবহার করে! শিকার করে, মাংস খায়। কিন’ এদের ভবিষ্যৎ ও রক্ষণাবেক্ষণে কেউ এগিয়ে আসে না।
আরো বলল! ভারতে সলিম আলী নামে একজন পক্ষী বিশারদ ছিলেন।
যিনি পাখি বন্ধু নামে পরিচিত। তিনি পাখিদের নিয়ে অনেক কাজ করেছেন, আরো অনেক বিজ্ঞানীও ইদানিং পাখিদের নিয়ে কাজ করছে।
কিন’ পৃথিবীর বেশির ভাগ মানুষ পাখি শিকার করে শখের বশে। ‘কারো সখ কারো জীবন নাশ’ এটা হতে পারে না।
ছায়া বলল, সত্যিই তো!
টুটিন শেখায় শিকার থেকে আত্মরক্ষার কৌশল। অন্তত এক কি.মি দূর থেকে বোঝা যাবে। কোন প্রাণী বা মানুষ কোন পাখিকে হত্যার উদ্দেশ্যে শিকার করবে। এক ধরনের ঘ্রাণ ছড়িয়ে পড়বে তো বাতাসে ইথারের মাধ্যমে আমাদের কানে সংকেত পাঠানোর সাথে সাথে তা বুঝে ব্যবস’া নিতে পারবো।
ছায়া বলল, ঠিক আছে চল, আমি একটু তোমাদের ইশকুল দেখবো! বলতে বলতে একটা সাদা সারস উড়ে এসে শালিক ও ছায়া সামান্য অদূরে দাঁড়ালো!
সারস বলল, ছায়া কেমন আছ?
ছায়া কথা না বাড়িয়ে বলল ভালো, ওর বুঝতে বাকি রইল না এরা সবাই তার নাম জানে।
শালিক, সারসকে উদ্দেশ্য করে বলল।
ছায়া নাকি আমাদের ইশকুল দেখবে!
সারস বলল! অসম্ভব!
আজ ওখানে ডা. টিও গ্রেন কাজ করছে। আমাদের বিভিন্ন অসুখ বিসুখ রোগ নিয়ে। ওনি আমাদের সম্মানিত টিচার টুটিনের বন্ধু! ও একজন সাইকোলজিস্ট!
পাখিদের মন, মানসিকতাসহ ইচ্ছা অনিচ্ছার ওপর গবেষণা করবে।
তবে হ্যাঁ ছায়া একটু ধৈর্য ধর! কাজ শেষ পর্যায়ে যেতে পারবে হয়তো। আমি এসেছি তুমি যাওয়ার জন্য ভীষণ ব্যস্ত হচ্ছো তাই! ওখানে গেলে সবার মনোযোগ তোমার প্রতি থাকবে, পড়ানো ও গবেষণায় বাধা সৃষ্টি হবে।
ছায়া বলল, ঠিক আছে, আজ থাক! আমি না হয় আরেকদিন আসব।
সারস বলল না না, তোমাকে তোমার বাবা মা আসতে দেবে না। আর তুমি এখানকার কথা কাউকে বললে, আমাদের ক্ষতি হবে।
না না, আমি কাউকে বলব না,
শালিক বলল, দাঁড়াও আমি দেখি! এই বলতে ফুড়-ত করে উড়ে গিয়ে ঠিক তিন মিনিট পরে ফিরে আসে, সারস ও ছায়া কি যেন বলছিল।
শালিক, বলল, হ্যাঁ ছায়া-টুটিন স্যার বলেছে, তোমাকে নিয়ে যেতে।
ছায়ার চোখে মুখে অজানা এক কৌতূহল হাঁটতে শুরু করে ধীরে ধীরে শালিক ও সারসের সাথে।
অপূর্ব সুন্দর পাখিপুর গ্রাম, গাছ আর গাছ! বিচিত্র সব গাছ, আম, জাম, পেয়ারা, জলপাই, আমড়া হতে শুরু করে তালগাছ পর্যন্ত আছে! সাথে অশোক, অর্জন, বাসক, নিমসহ নানান ঔষধি গাছ! অদ্ভুত সব ফুলের গাছ সূর্যমুখী, কামিনী, জুঁই, গোলাপ, টগরসহ অনেক গাছ, কোথাও বিভিন্ন লতা- গুল্ম, অদ্ভুত! খুব সুন্দর, সরু আঁকাবাঁকা, রাস্তার ধারে বিচিত্র সব ঘাস, দূর্বা, থানকুনি ইত্যাদি।
সবই যেন এই পাখিপুরে একে অপরের আত্মীয়। গাছপালাগুলো সুন্দর সতেজ।
বাঁমে মোড় ঘুরতে সারস বলল এই দেখ আমরা এসে পড়েছি!
ছায়া দেখল, চতুর্দিকে গাছ পালায় ঘেরা মধ্যখানে এক ফালি সবুজ ঘাসে পাতানো এক চিলতে উঠানের মত সব পাখিরা সারি সারি ভাবে বসে আছে। টুটিন ও ডা. টিও গ্রেন বিচিত্র কথা ও বিচিত্র সব তথ্য দিচ্ছে! ছায়াকে দেখতে সবাই চোখ বড় বড় করে ছায়ার দিকে তাকিয়ে আছে। ছায়া হঠাৎ এতগুলো পাখির রাজ্যে এসে কেমন যেন বিচলিত হয়ে পড়ে। ডা. টিও গ্রেন ও টুনিন বলল, স্বাগতম ছায়া!
ছায়া দেখে তো অবাক এরা ছোট ডাইনোসরের মত, টিভিতে জুরাসিক পার্কসহ যে কটা ডাইনোসরের ছবি দেখছে, আর বইয়ে যতগুলো ছবি দেখছে ছায়া ধরে নিয়েছে এরা পৃথিবীর আদি প্রাণী ডাইনোসরদের একটা প্রজাতি, ডায়াসনিক।
টুটিন বলল, পাখিদের ইশকূলে আমাদের নতুন মেহমান ছায়া; ছায়া তুমি কেমন আছ!
ভালো
জানতাম তুমি আসবে,
ছায়া ভাবছে, সবাই শুধু বলে জানতাম, জানি, এরা কি সব কিছু জানে? এরা কি সবজান্তা?
টুটিন বলল, তুমি এখন ভাবছো, আমরা সব জানি কেমন করে।
ছায়া তো অবাক! ওরা মনের কথাও বোঝে অদ্ভুত তো, ওদের কাছে কি মাইন্ডরিডার যন্ত্র আছে। যে মনের কথা বোঝে। ইশ্ আমি যদি জানতাম কত ভালো হতো।
মা কখন বকা দেবে, বাবা কী কী বলবে। ভাইয়া অকারণে শুধু আমার সাথে ঝগড়া করবে। তখন সে অনুযায়ী কাজ করতে পারতাম। ইশকূলের স্যার ম্যাডামেরা কী বলবে। কী পড়ায়, কী পরীক্ষায় আসবে, তাহলে আমি ফার্স্ট হতে পারতাম, বাবাতো বলেই দিয়েছে! এবার ফার্স্ট না হলে খবর আছে!
টুটিন বলল, এতো ভেবো না ছায়া! তুমি সব পারবে। তখন বলল কী জানতে, কী দেখতে এলে।
ছায়া বলল, আমি সব শুনেছি শালিক আমাকে সব বলেছে, আমি তোমাদের দেখে মুগ্ধ!
তোমরা কত ভালো! আর কত কিছু জানো।
ডা. টিও গ্রেন বলল! ধন্যবাদ ছায়া! তুমিও ভালো।
ছায়া বলল, টিচার টুটিন! আপনারা কোথায় থাকেন? কোথায় আমাদের বাড়ি ঘর!
পাতার ফাঁকে, দূরের আকাশ দেখিয়ে বলল, ঐ আকাশের উপরে, লক্ষ কোটি কি.মি. দূরের একটা গ্রহ নাম, জুওনাং, আমরা সে গ্রহে থাকি।
ছায়া বলল, আমি যাবো, তোমাদের সাথে।
ডা. টিও গ্রেন না, তুমি যেতে পারবে না।
কারণ, তোমাদের বা মানুষের শরীর ওখানে বেঁচে থাকার উপযোগী না।
কেন!
টুটিন! বলল, কারণ শরীর কোষ, গঠন প্রকৃতি ঐ পরিবেশে অভিযোজিত না। আমরা অনেক পরীক্ষা নিরীক্ষা করেছি!
ছায়া বলল, এই পাখিরা!
না! যেখানে মানুষের পক্ষে সম্ভব না! সেখানে পাখি! প্রশ্নই আসে না।
তোমাদের শরীর কি লোহা, পিতল দিয়ে তৈরি যে জায়গাতে থাকতে পারো।
ডা. টিও গ্রেন বলল, না, লোহা, পিতলও গলে যায় প্রচণ্ড তাপে, তোমাকে বুঝতে হবে, পৃথিবীতে সব প্রাণীর গঠন প্রকৃতিও এক না। যেমন- মানুষ, বাঘ, ভালুক, সিংহ, হরিণ, হাতি, বাঁদর, তিমি, মাছ বিভিন্ন পাখি, সাপ, ব্যাঙ, কচ্ছপ, কীট পতঙ্গ। আর সবাই সব কিছু সমান গ্রহণ করতে পারে না। ছায়া বলল, ঠিক আছে বুঝলাম, টুটিন বলল, তুমি অনেক বুদ্ধিমান!
ছায়া বলল, আচ্ছা আমিও কি পাখিদের ইশকুলে পড়তে পাড়বো?
একথা শুনে পাখিরা সবাই কিচির মিচিল করে ওঠে। কেউ বলে হ্যাঁ, কেউ বলে না। কেউ বলে ওরা মানুষ! ওরা আমাদের ক্ষতি করে, বনভূমি ধ্বংস করে গাছপালা কেটে আমাদের বসবাসের, খাদ্য স’ান নষ্ট করছে। আমরা কিভাবে বাঁচবো তা চিন্তা করেন না। ও পড়লে এই পাখিপুর গ্রাম আর আমাদের ইশকূল ধ্বংস হয়ে যাবে। কেউ কেউ বলল হ্যাঁ!
ডা. টিও গ্রেন বলল, সবাই থাম্! মুহূর্তে সবাই চুপ হয়ে গেলো।
বলল আমি যতটুকু পৃথিবীতে ঘুরেছি। যতটুকু দেখেছি! সব মানুষ খারাপ না। অনেকে এসব করছে। কিন’ ছায়া এসব করবে না। টুটিন বলল, হ্যাঁ! ছায়া খুশি হলেও ময়না, টিয়ে, বক এতে খুশি হতে পারে না।
ছায়া বলল, আমি সময় পেলে চলে আসবো। এই পাখিপুর গ্রামে, আর আমিও পড়বো পাখিদের ইশকুলে। নিত্য, নতুন-অজানা গ্রহ, নক্ষত্র সম্পর্কে জানতে পারবো। আমিও পাখি হবো, পাখিদের মতো উড়তে পাড়বো। কোনো পাখিকে মারবো না, সবাইকে সচেতন করবো। কেউ পাখি মারবে না। শোন পাখিরা আমি তোমাদের বন্ধু! তোমারা আমার বন্ধু। সবাই ছায়াকে মানুষ হলেও বন্ধু মেনে নেয়। ছায়া সবাইকে শুভেচ্ছা দিয়ে বাড়ির উদ্দেশে হাঁটতে থাকে।