চৌধুরী জহুরুল হক

ভূঁইয়া ইকবাল

চৌধুরী জহুরুল হককে প্রথম দেখি এখন থেকে ৫২/৫৩ বছর আগে, ঢাকায় একটি শিশু-কিশোর সাহিত্য পত্রিকার অফিসে। তখনই আলাপ-পরিচয় হয়। আমি তখন স্কুলে ক্লাস নাইন-টেনে ছাত্র। তিনি সম্ভবত চট্টগ্রাম কলেজে সদ্য ভর্তি হয়েছেন প্রথম বর্ষে।
হাসিখুশি, আমুদে, সরলপ্রাণ জহুরুল হকের সঙ্গে প্রথম আলাপেই তাঁর ব্যক্তিত্বের মাধুর্যে ও সরলতায় আকৃষ্ট হই। প্রথম পরিচয়েই তিনি সবাইকে আপন করে নিতেন।
প্রায় এক দশক পরে ১৯৭৩ সালে আমি কর্মসূত্রে চট্টগ্রামে এলে আবার তাঁর সঙ্গে প্রায় নিয়মিত দেখাসাক্ষাতের সুযোগ হয়। তিনি তখন চট্টগ্রাম কলেজের প্রভাষক। ওই কলেজেই উচ্চ মাধ্যমিক ও সম্মান শ্রেণির ছাত্র ছিলেন। কলেজেও ছাত্র শিক্ষক সকলের প্রিয়জন ছিলেন। কলেজ বার্ষিকী ইংগিত, সাত-সতেরো (তিন সংখ্যা) ইত্যাদি লিটল ম্যাগজিন সম্পাদনা করেন।
কলেজের শিক্ষক আবদার রশীদ, আলাউদ্দিন আল-আজাদ, মমতাজউদ্দীন আহমদ, জাহাঙ্গীর তারেক ও মনিরুজ্জামান প্রমুখ সাহিত্যিক – শিক্ষকের প্রিয় ছাত্ররূপে তাঁদের ঘনিষ্ঠ সান্নিধ্যে এসেছিলেন। সকল শিক্ষক ও শিক্ষক প্রতিম বয়োজ্যেষ্ঠদের প্রতি তাঁর শ্রদ্ধা ও আনুগত্য ছিলো প্রশ্নাতীত। কলেজে সিনিয়র ছাত্র মনসুর মুসা, আহমদ কবির, আবুল কাসেম সন্দ্বীপ প্রমুখ সাহিত্যমনা ছাত্রদেরও প্রিয় বন্ধু হয়ে ওঠেন। সম্ভবত কলেজে ছাত্র থাকার সময়েই ছোট ছোট আকারে রঙ্গ-ব্যঙ্গ-হাসির গল্প লেখা শুরু করেন। বন্ধু ও শিক্ষকদের একই ধরনের রচনা নিয়ে সম্পাদনা করেন “চোঙ্গা গল্প”। বেশ কয়েক বছর ‘চোঙ্গা-গল্প’ সাহিত্য আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছেন।
ব্যক্তিগত জীবনেও সদাহাস্য এই সাহিত্য-সংস্কৃতিপ্রাণ মানুষটি চট্টগ্রামের সাহিত্য – সংস্কৃতি চর্চার ধারার সঙ্গে যুক্ত থেকেছেন। কোনো রাজনৈতিক দলের প্রতি তাঁর অন্ধ আনুগত্য দেখিনি। ফলে সব দলের মানুষের কাছেই তিনি প্রিয় ব্যক্তিত্ব ছিলেন।
১৯৭৬ এ চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দেন। সেখানেও তিনি ‘বর্ণবাদ’ থেকে নিজেকে মুক্ত রাখতে পেয়েছেন। ছাত্রছাত্রী ও শিক্ষক সহকর্মী প্রায় সকলের সঙ্গেই তাঁর প্রীতির সম্পর্ক ছিলো।
ছাত্রছাত্রী ও সহকর্মীদের এবং সহকর্মীদের ছেলেমেয়েদের সাহিত্যচর্চায় তিনি উৎসাহ দিতেন। এককালীন ব্যাংক কর্মকর্তা, এখন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ইফতেখারউদ্দিন চৌধুরীকে তিনি উৎসাহ দিয়েছেন পেশা পরিবর্তন করে শিক্ষক হতে।
নিজের বিভাগ ছাড়াও চারুকলা; ইংরেজি ও অন্যান্য বিভাগের সহকর্মীদের সঙ্গেও তাঁর স্বভাব সুলভ বন্ধুতার সম্পর্ক অটুট ছিল আমৃত্যু।
সাহিত্যের নানা আঙ্গিক নিয়ে পরীক্ষা-নীরিক্ষা করেছেন। বেতার নাটক লিখতেন। একাঙ্কিকা রচনায় বিশেষ ঝোঁক ছিল। অন্যদের গল্পের নাট্যরূপ দিয়েছেন। গান লিখেছেন অসংখ্য। সেসব গান বেতারে সমাদৃত হয়। শিশুসাহিত্য রচনা করেছেন।
শেষ দিকে আমাদের আগ্রহে তিনি গবেষণায়ও ঝুঁকেছেন। শতবর্ষের প্রাচীন প্রথম বাংলা কাব্যনাটক ‘একশৃঙ্গ নাটক’ সম্পাদনা করেছেন (১৯৯২)। মুনীর চৌধুরী ও আবু হেনা মোস্তফা কামালের অগ্রন্থিত গল্প উদ্ধার করেছেন জীর্ণ সাময়িকপত্রের ছিন্নপত্র থেকে। উপযুক্ত ভূমিকা-সমেত সেসব প্রকাশ করেছেন।
মনে পড়ছে, আমরা কুমিল্লা ও সিলেটে মৌখিক পরীক্ষা নিতে গিয়েছিলাম এক সঙ্গে। ট্রেনে, সার্কিট হাউসে, হোটেলে হাসির গল্প করে সবাইকে মাতিয়ে রাখতেন। কুমিল্লা রামমালা গ্রন্থাগার, সিলেটে কেন্দ্রীয় মুসলিম সাহিত্য সংসদের পাঠাগার থেকে দুষ্প্রাপ্য পত্রিকা থেকে গবেষণার উপকরণ সংগ্রহ করেছেন। তাঁর বাবার কাছে লালদীঘিতে সিটি কর্পোরেশন পাবলিক লাইব্রেবির দুষ্প্রাপ্য সাময়িকপত্র সন্ধানে আনন্দ পেতেন। ‘রচনা প্রবচন’ লেখেন ও প্রকাশ করেন (২০০২)।
সাহিত্যের আঙ্গিক নিয়ে নীরিক্ষার কথা বলেছি। তিনি “আত্মসাক্ষাৎকার” প্রচলনের প্রয়াস পেয়েছিলেন। তাঁর উদ্ভাবিত যতিচিহ্ন বিষয়ক প্রস্তাব সাহিত্য মহলে জনপ্রিয় না-হলেও তিনি দমে যাননি।
‘চোঙ্গাগল্প’ আন্দোলনের পথিকৃৎরূপে তিনি সাহিত্যমহলে সমাদৃত হয়েছেন।
তাঁর ভালোমানুষীর জন্যে তাঁকে মূল্য দিতে হয়নি এমন নয়। নীতির প্রশ্নেও তিনি দিলেন আপোষহীন। স্বার্থবুদ্ধি ছিল না একেবারেই।
তিনি ২০০৮ এর ৩ জানুয়ারি ভোরে হৃদরোগে আক্রান্ত হন। হাসপাতালে নেওয়ার পথেই মারা যান।

আপনার মন্তব্য লিখুন