চোখ নেই, তবু তিনি কার্পেন্টার

কামরুন নাহার সানজিদা
রাঙামাটিতে নিজের আসবাব তৈরির দোকানে কাজ করছেন মন্টু দে-সুপ্রভাত
রাঙামাটিতে নিজের আসবাব তৈরির দোকানে কাজ করছেন মন্টু দে-সুপ্রভাত

বয়স যখন ৫-৬ বছর, তখনই বসন্ত রোগে চোখ হারান মন্টু দে। একই পরিবারের একসাথে পাঁচ জন বসন্তে আক্রান্ত হন। তিনজন প্রাণ হারান এই রোগে। মন্টু দে আর তার চাচাতো ভাই বেঁচে গেলেও ভাইয়ের একটি চোখ নষ্ট হয়ে যায়। আর তিনি দুটি চোখেরই দৃষ্টি হারিয়ে ফেলেন।
সেই ছোটবেলায় চোখ হারালে কী হবে, চলাফেরায় আর কাজকর্মে কোনোদিকে এতটুকু খুঁত নেই তার। মন্টু দে থাকেন রাঙামাটির শহরে। তবলছড়ির এলাকার বন্ধু যিশু টিলার এ বাসিন্দাকে চেনেন না এমন কেউ নেই। তার বাড়ির সামনে দিয়ে যখনই কেউ আসা যাওয়া করে, তার দিকে একবার তাকাবেই।
রাঙামাটিতে রাস্তার পাশে বাড়িগুলোর দুই এক তলা থাকে নিচে। এমনই একটি বাড়িতে মন্টু দে তার ছেলেপুলে নিয়ে থাকেন। রাস্তার পাশে লাগোয়া বাড়িটির নিচের তলায় বাসা, আর উপরে আসবাব তৈরির দোকান। সেখানে কাজ চলে সারাদিন। মন্টু দে’র ছেলের এই দোকানে তিনি নিজেও একজন কার্পেন্টার। যখনই দেখা যায়, হয় কাঠের দরজা তৈরি করছেন, মেশিন দিয়ে কাঠ সমান করছেন এমন দৃশ্যই চোখে পড়ে সবার।
দৃষ্টিশক্তিহীন এই মানুষটির সাথে কথা বলার সময় তার বোঁজা চোখ দুটিই দেখতে হয়। তার পরিবার ও দোকানের কর্মচারীদের সাথে কথা বলে জানা গেলো, ঘর পরিষ্কার করা, ভাত রান্না থেকে শুরু করে ঘরের প্রতিটি কাজকর্ম করেন নিখুঁতভাবে।
‘ছোটবেলায় এক ঘরে যখন আমরা পাঁচজন বসন্ত রোগে পড়লাম, তার মধ্যে তিনজন মারা গেলো। আমার চাচাতো ভাইয়ের একটা চোখ নষ্ট হয়ে গেলো। তাই আমাকে বাঁচাতে বাবা অনেক চেষ্টা করলো। সহায়-সম্পত্তি বেঁচে ঝাড়-ফুঁক করালো। সেকালে বসন্তের চিকিৎসা ছিলো না। বেঁচে তো গেলাম, কিন্তু আমার দুইটি চোখই চলে গেলো।’ বললেন মন্টু দে।
জানালেন, প্রথম প্রথম যখন চোখে দেখতে পেতেন না, বাবা-মা সব ধরনের সাহায্য করতেন। বাবা দেবেন্দ্র রাজ দে ও মা প্রমীলা বালা দে মারা যাওয়ার পর নিজে নিজে চলার জন্য সব শিখে নেন মন্টু দে। মন্টু দে’র নিজ গ্রামের বাড়ি চট্টগ্রামের পটিয়া উপজেলার সদরে। তখন চাষবাসের কাজ করতেন। ১৯৮২ সালে চলে যান রাঙামাটি শহরে। বিয়ের পর ছেলের জন্মের ৯-১০ মাস বয়সে স্ত্রীকেও হারান তিনি। কিন্তু দ্বিতীয় বিয়ে না করে একাই লালন-পালন করেছেন ছেলেকে।
ছেলে বড় হয়ে আসবাবের দোকান দিলে বসে থাকেননি তিনি। দোকানের এক কর্মচারী পারভেজ জানায়, ‘ওনার ছেলে ফার্নিচারের দোকান দেয়ার পর থেবে কর্মচারীদের কাজে সাহায্য করতেন তিনি। কাজও শিখে ফেলেছেন। এখন নিজে নিজেই কাঠমিস্ত্রীর কাজ করতে পারেন।’ বলতে বলতে মন্টু দে উঠে দাঁড়িয়ে কার্পেন্টারের কাজ খানিকটা করেও দেখান।
৭২ বছর বয়সের এই দৃষ্টিশক্তিহীন মানুষটি অনেকের কাছেই বিস্ময়।