‘চেতনাবাজ’দের প্রতিহত করুন

লীনা পারভীন

সবখানে চলছে ‘চেতনাবাজ’দের দৌরাত্ম্য। এই ‘চেতনার খেলা’ আগেও ছিল। আমাদের রাজনীতির ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যাবে সব শাসনামলেই রাজনীতির ক্ষমতাকে আশ্রয় করে কিছু ‘ ‘চেতনাবাজ’দের দাপট। কখনও সেই ‘চেতনাবাজ’দের শক্তি এতটাই বেশি হয়ে পড়ে যে প্রকৃত রাজনীতি ও দেশপ্রেম সেখানে মার খায়।
প্রশ্ন আসে, প্রকৃত রাজনীতি বলতে কী বুঝায়? অতি সাধারণ ভাষায় যদি বলি তাহলে রাজনীতি হচ্ছে একটি রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক ও সামাজিক ব্যবস্থার প্রতি মানুষের ক্রিয়া এবং প্রতিক্রিয়া। রাষ্ট্রব্যবস্থা মূলত গড়ে ওঠে বা একটি রাষ্ট্রের চরিত্র নির্ধারিত হয় তার অর্থনৈতিক ব্যবস্থার ওপর নির্ভর করে।
একটি রাষ্ট্রে বিভিন্ন ধরণের মতের প্রচলন থাকে, সেটা থাকবেই। এটাই গণতন্ত্র। তবে সে ভিন্নমত বা নানা মত যাই বলি না কেন সেটা অবশ্যই হতে হয় দেশ, জাতি ও সমাজকে কেন্দ্র করে, তাদের কল্যাণের জন্য। মূল রাষ্ট্রীয় নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক নয়। কিন্তু যদি আমি এমন রাজনৈতিক দর্শনে বিশ্বাস করি যা সরাসরি আমার রাষ্ট্র কাঠামোর সাথে সাংঘর্ষিক এবং আমার দেশ, সরকার, ব্যবস্থাকে চ্যালেঞ্জ করে, প্রতিহত করতে চায় সেই রাজনৈতিক দর্শন হয় রাষ্ট্রবিরোধী।
আমরা বর্তমানে যে রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে বসবাস করছি তার মধ্যে একদিকে যেমন বাংলাদেশপন্থী রাজনৈতিক চেতনা রয়েছে আবার অন্যদিকে এর বিরোধী চেতনাও রয়েছে প্রবলভাবে। একটি বড় গোষ্ঠী যারা চায়নি বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রটির জন্ম হোক তারা বারেবারেই চেষ্টা করে যাচ্ছে এই অপরাজনৈতিক কৌশল দিয়ে রাষ্ট্র এবং সরকারের স্বাভাবিক কার্যক্রমকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে।
বর্তমান ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ আমাদের মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী দল এ কথা সবাই জানি এবং মানি। সে হিসাবে দেশের বেশিরভাগ মানুষের আস্থা নিয়ে তারা আজকে ক্ষমতায় আছে। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য যে তাদের ভেতরে যে মানুষগুলো আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক চেতনাকে প্রকৃত অর্থে ধারণ করতে পারেনি, প্রতি পদেপদে তারাই অতি চেতনার নামে সংকট তৈরি করে যাচ্ছে। বঙ্গবন্ধু নিজেও অতি ‘চেতনাবাজ’দের অপছন্দ করতেন। তিনি কখনই কোনও তেলবাজদের প্রশ্রয় দেননি। উনি সবসময় চাইতেন আওয়ামী লীগের লোকজন রাজনীতি করবে দেশের জন্য, সাধারণ মানুষের জন্য। সাধারণ মানুষের ক্ষতি হয় এমন কোনও কাজকে তিনি ঘৃণা করতেন। তিনি তার বইয়ের এক জায়গায় বলেছেন, রাজনীতি করতে হলে নীতি থাকতে হয়। সত্য বলার সাহস থাকতে হয়। বুকে আর মুখে আরেক কথা বললে চলে না।
কিন্তু তাঁর এই কথার বাস্তবায়ন কি আমরা দেখতে পাচ্ছি তথাকথিত কিছু আওয়ামী ‘চেতনাবাজ’দের মাঝে? কিছু ঘটনা দেখলেই প্রশ্ন আসে আসলেই কি তারা বঙ্গবন্ধুর চেতনায় বিশ্বাস করে? বরিশালের এক ইউএনও এর বিরুদ্ধে যে ‘চেতনাবাজ’ মামলা করেছিলো তার দৌরাত্ম্য থামাতে শেষ পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রীকে হস্তক্ষেপ করতে হয়েছে। সমপ্রতি জাতীয় শোক দিবসকে কেন্দ্র করে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ে যে ঘটনার সৃষ্টি হলো সেটি অত্যন্ত ঘৃণ্য এবং নিন্দনীয় উদাহরণ হয়ে ইতিহাসের পাতায় লেখা থাকবে। মূলত এরা কারা? কারা বঙ্গবন্ধুর চেতনার কথা বলে আজকে একজন শিক্ষকের বিরুদ্ধে মাঠে নেমেছে? ছাত্রলীগ, আওয়ামী লীগের নাম করে সারাদেশে বঙ্গবন্ধুর সৈনিক দাবি করে যারা শোক দিবসের পবিত্রতা রক্ষায় মাঠে নেমেছে তাদের রাজনৈতিক পরিচয় নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ আছে।
আজকে দেশে আওয়ামী লীগ ব্যতিত অন্য কোনও রাজনৈতিক চেতনার লোক খুঁজে পাওয়া মুশকিল। তাহলে তো নির্বাচনে এই দলটির ১০০ ভাগ ভোটে জেতার কথা। কিন্তু পরিসংখ্যানে পাওয়া যায় তাদের ভোটের হার ৩৫/৩৬ ভাগ। সামনে নির্বাচন। আওয়ামী লীগের চেয়েও বড় আওয়ামী লীগারদের বিষয়ে তাই থাকতে হবে সাবধান। এইসব ‘চেতনাবাজ’দের বিরুদ্ধে নিতে হবে কঠিন এবং কঠোর দমন ও ঠেকানোর নীতি।
বগুড়া বা কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় নয় কেবল, যেখানেই এসব ‘চেতনাবাজ’দের নমুনা পাওয়া যাবে সেখানেই উপড়ে ফেলতে হবে তাদের। স্থাপন করতে হবে সঠিক ও প্রকৃত রাজনৈতিক চেতনা।
বঙ্গবন্ধুর চেতনাকে নিয়ে ‘চেতনাবাজি’ করার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে হবে সবাইকে। প্রকৃত আওয়ামী লীগারদের আজকে আবারও পরীক্ষা দেওয়ার সময় এসেছে। তাদের কাছে একটাই আহবান। আপনারা মাঠে নামুন। সম্মুখ লড়াইয়ে নেমে ‘চেতনাবাজ’দের চিনিয়ে দিন, ঠেকিয়ে দিন।
লেখক : সাবেক ছাত্রনেতা