চা শিল্পের অবস্থান ও আজকের চা শ্রমিক

এ এফ এম ফৌজি চৌধুরী

“চায়ে নেই মাদকতা দোষ, ইহা পানে হয় চিত্ত পরিতোষ” ব্রিটিশ আমলে এ দেশে “চা” কে জনপ্রিয় করার জন্য রেলওয়ে স্টেশনের চা স্টলে এ ধরনের স্লোগান লেখা থাকত। তাছাড়া তখন ব্রিটিশরা চায়ের অভ্যাস গড়ে তোলার জন্য বাঙালিদের বিনামূল্যে চা খাওয়ানোর ব্যবস্থা করত। ব্রিটিশরা এ দেশ ছেড়ে চলে গেছে বহু আগে; কিন্তু তাদের তৈরি করে দেয়া অভ্যাস রয়ে গেছে মানুষের মধ্যে। এক সময় শহর এলাকার মানুষ চা খেত, এখন শহর গ্রাম বলতে কিছু নেই। অভ্যাসগত কারণে চা ধনীর ড্রইংরুমে যেমন আলোচনার ঝড় তুলতে সাহায্য করে, তেমনি গরিবের কুটিরে শরীর গরম করতেও সে হাজির হয়। বলা চলে প্রতিদিনই দেশে চাপায়ীর সংখ্যা বাড়ছে এবং তা জ্যামিতিক হারে। অন্যদিকে উৎপাদন স্থির হয়ে থাকায় এবং আগের তুলনায় কমে যাওয়ায় উৎপাদন ও চাহিদার মধ্যে টানাপড়েন শুরু হয়েছে।
ব্রিটিশ চা কোম্পানীগুলি বাণিজ্যিক কৌশলে বাঙালি মস্তিষ্ক উদ্দীপ্ত করতে ভারতের আসাম এবং তৎসংলগ্ন সিলেট অঞ্চলে চা চাষ কার্যক্রম সূচনা করে ১৮২৩ সনে। ১৮৭৫ সালে সিলেটের সুরমা উপত্যকায় মালনীছড়ায় চা বাগান প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে এ দেশে চা চাষের সূত্রপাত ঘটে। পরবর্তী সময়ে মির্জাপুর, মাধবপুর,শ্রীপুর,কালিটি প্রভৃতি স্থানে চা বাগান প্রতিষ্ঠিত হয়।
বর্তমানে ১৬৭টি বাগান ৫৫ হাজার হেক্টর জমি চা চাষে সমৃদ্ধ, বরাদ্দ কিন্তু ১ লক্ষ ১৫ হাজার হেক্টর জমি। ১৪০টি রয়েছে সিলেট বিভাগে, চট্টগ্রামে রয়েছে ২২টি, দেশের উত্তর জনপদ পঞ্চগড়ে সৃজন করা হয়েছে ৫টি। এর মধ্যে বিদেশি মালিকানায় ২৮টি, পাবলিক লিমিটেড কোম্পানীর ৫৭টি, ন্যাশনাল টি কোম্পানীর ১৩টি, চা বোর্ডের অধীনে ৩টি, ব্যক্তি মালিকানায় ৬৬টি বাগান ব্যবস্থাপনায় চলমান। রাঙ্গামাটি, খাগড়াছড়ি, বান্দরবান সহ দেশের বিস্তীর্ণ এলাকাকে চা চাষে এবং শিল্পে রূপান্তর করার উপযোগিতা রয়েছে। ১৬৭টি বাগানে উৎপাদিত বাৎসরিক প্রায় ৬০ মিলিয়ন কেজি চা’র অভ্যন্তরীণ চাহিদা মিটিয়ে রপ্তানি আয় হতো। চা ছিল রপ্তানি পণ্যের দ্বিতীয় বৃহত্তম অবস্থানে। আয় হতো বাৎসরিক মোট রপ্তানি আয়ের ২০ শতাংশ। কিন্তু বর্তমানে দেশে চায়ের চাহিদা বৃদ্ধি পাওয়ায় বিদেশ থেকে চা এনে দেশের চাহিদা পূরণ করতে হচ্ছে। দেশে গত অর্থ বছরেও চা আমদানি করা হয়েছে। চায়ের উৎপাদন বেড়েছে মাত্র এক শতাংশ,অভ্যন্তরীণ চাহিদা বেড়েছে ৪ শতাংশ। বর্তমানে শ্রীমঙ্গল, সিলেট ও চট্টগ্রামে চা চাষ হয়ে থাকে। চা চাষ সমপ্রসারণের লক্ষ্যে উত্তরাঞ্চলেও চা চাষ শুরু হয়েছে। দেশে যদি চা সমপ্রসারণ ও উৎপাদন বাড়ানো না যায় তাহলে চায়ের জন্য আমাদের বিদেশ নির্ভর হয়ে পড়তে হবে।
চায়ের উৎপাদন বৃদ্ধি না পাওয়া, দেশে চায়ের চাহিদা বৃদ্ধি পাওয়া এবং গুণগত মান কমে যাওয়ার কারণে বাংলাদেশ বিশ্ব চা বাজারে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান নিতে পারছে না। চা খাতে সরকারি আর্থিক সহায়তা বৃদ্ধি, চাষযোগ্য জমির পরিমাণ বাড়ানো এবং চায়ের গড় উৎপাদনসহ চায়ের গুণগত মান বৃদ্ধি করতে না পারলে চা রফতানিতে হতাশাজনক পরিস্থিতি সৃষ্টি হতে পারে। চায়ের মান উন্নত করতে না পারলে বাংলাদেশের চা আন্তর্জাতিক বাজার হারাতে পারে।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ঘোষণা অনুযায়ী চায়ের রাজধানী শ্রীমঙ্গলে মৌলভীবাজার জেলা প্রশাসন ও টি প্লান্টার্স এন্ড ট্রেডার্স এসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের যৌথ আয়োজনে দেশের ২য় চা নিলাম কেন্দ্রের উদ্বোধন হবে ডিসেম্বরে। এটি চালু হলে এতদঞ্চলের অর্থনীতিতে নতুন মাত্রা যোগ করবে। এর ফলে সিলেটবাসীর দীর্ঘদিনের দাবি পূরণ হবে। গণতন্ত্রের মানসকন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ঘোষিত ২য় চা নিলাম কেন্দ্রের কার্যক্রম বিজয়ের মাসে শ্রীমঙ্গলে শুরু হলে তা হবে সিলেটবাসীর জন্য মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর তরফ হতে বিজয়ের মাসের উপহার।
২০০৫ সালের পর থেকে খরা ও বিরূপ আবহাওয়ার কবলে পড়ে ক্রমাগত চায়ের উৎপাদন কমতে থাকে। এ অবস্থা চলতে থাকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত। দীর্ঘ খরার অশনি সংকেত কাটিয়ে চা বাগানগুলো ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করেছে। এ বছর মৌসুমের শুরুতেই প্রচুর বৃষ্টিপাতের কারণে চা বাগানগুলো চা উৎপাদন শুরু করেছে। এর ফলে চা শিল্প আবার লাভের মুখ দেখবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
তবে এবার বিরূপ আবহাওয়ার কারণে চা-শিল্প বিপর্যয়ের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। চা উৎপাদনের এই অনুকূল মৌসুম এবং ভরা বর্ষায়ও চা গাছসমূহে রেড স্পাইডার (লাল মাকড়) ও মশার (হেলোপনটিস) আক্রমণ দেখা দিয়েছে। এর ফলে কীটনাশক ব্যবহারের পরিমাণ মাত্রাতিরিক্ত হারে বেড়েছে। এতে পরিবেশের অধিকতর ক্ষতি হচ্ছে। চায়ের উৎপাদনে এর প্রভাব পড়তে পারে।
তাছাড়া চা- বাগানসমূহে শেড ট্রি না থাকা বা ব্যাপক হারে কমে যাওয়াও উৎপাদন হ্রাসের অন্যতম কারণ। গত বছরের তুলনায় এ বছর অধিক পরিমাণে বৃষ্টি হওয়ার কারণেও ফলন কম হতে পারে। চায়ের জন্য অতিবৃষ্টি যেমন ক্ষতিকর, তেমনি কম বৃষ্টিও ক্ষতিকর। অতিবৃষ্টি ও লাল মাকড়সার কারণে এ বছর ১৫ ভাগ ফলন কম হবে বলেও আশঙ্কা করা হচ্ছে।
মৌলভীবাজার বিভিন্ন চা- বাগানের প্লান্টেশন এলাকায় চা-গাছে লাল মাকড়সা (রেড স্পাইডার) ও মশার (হেলোপেনটিস) আক্রমণ দেখা দিয়েছে। এতে করে চা গাছগুলো বিবর্ণ হয়ে পাতা কুঁকড়ে গেছে। বাগানগুলোর সেকশনের পর সেকশনে দেখা দিয়েছে এই রোগ। চা-গাছগুলো লাল হয়ে যাচ্ছে, কচি পাতাগুলোর রস খেয়ে ছিদ্র করে দিচ্ছে। এছাড়া অতিবৃষ্টি, অনাবৃষ্টি, প্রখর রোদ, কাঁচি দিয়ে চা গাছ থেকে পাতা তোলা, চা বাগানের সেকশনগুলোতে গরু ও ছাগল চরানো-এসবের কারণে চায়ের ফলন কমে যায়। বিরূপ আবহাওয়ার কারণে কীট পতঙ্গের আক্রমণ বাড়ে। আর কীট পতঙ্গ দমনের জন্য অত্যাধিক পরিমাণে প্রতিষেধক কীটনাশক প্রয়োগ করতে হয়। তবু পুরোপুরি বালাই দমন বা নিয়ন্ত্রণ করা যায় না। বরং বালাইনাশক বা কীটনাশক এসব কীট পতঙ্গের গা সহা হয়ে গেছে। এমন অবস্থায় লাল মাকড়সা, মশা ও কীট পতঙ্গ দমন করতে নিমের রস ও মেহগনির রস ব্যবহারের পরামর্শ দিয়েছেন বিভিন্ন বিশেষজ্ঞরা।
প্রতিটি চা বাগানের প্রতি একরে মোট ৬ হাজার ৭শত টি চা গাছ লাগানো হয়ে থাকে। আর এসব সৃজনকৃত জায়গায় গড়ে ৩শত থেকে সাড়ে ৩শত শেড ট্রি (ছায়াবৃক্ষ) লাগানোর কথা। অর্থাৎ প্রতি একরে ৬৫ ভাগ ছায়াবৃক্ষ থাকার কথা থাকলেও কোনো কোনো বাগানে ২০ ভাগও ছায়াবৃক্ষ নেই। এতে করে প্রচুর ফলন কম হচ্ছে এবং চায়ের মানও ভাল হচ্ছে না। যেসব বাগানে পর্যাপ্ত ছায়াবৃক্ষ রয়েছে সেসব বাগানে ভাল মানের চা উৎপাদন হচ্ছে।
চা দেশের অন্যতম প্রধান রফতানি পণ্য। কিন্তু বিগত বছরগুলোয় চীন, ভারত,শ্রীলংকা, কেনিয়া ও ইন্দোনেশিয়ার দখলে চলে গেছে আন্তর্জাতিক চায়ের বাজার। দেশের চা বাগানগুলোর বেশির ভাগই ব্রিটিশ আমলের। অধিকাংশ গাছের বয়স ৬০ থেকে ১০০ বছর। স্বাভাবিক কারণেই এগুলোর উৎপাদন কমে গেছে এবং পুরনো গাছের চায়ের গুণগত মানও খুব ভালো হওয়ার কথা নয়। এতদিন বিদেশ থেকে আমদানি করে দেশের চায়ের চাহিদা মেটানো হতো। ২০২১ সালে চায়ের উৎপাদন ১০০ মিলিয়ন কেজিতে উন্নীত করার লক্ষ্যে “স্ট্রাটেজিক ডেভেলাপমেন্ট প্লান্ট ফর টি ইন্ডাস্ট্রি অব বাংলাদেশ ভিশন-২০২১” নামে প্রকল্পের আওতায় ৫ বছর মেয়াদী একটি পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। প্রকল্পটি চায়ের সুদিন ফিরিয়ে আনতে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারবে বলে আশা করা যায়।
তবে হতাশা ও উদ্বেগের বিষয়, পাট শিল্পের মতো চা শিল্পও আজ খরা, অত্যাধিক বৃষ্টি ও দুর্দিনের মুখোমুখি। তাই এই শিল্প রক্ষার্থে এখনই যথোপযুক্ত পদক্ষেপ নেয়া অত্যাবশ্যক। অপরদিকে চা শিল্পের সাথে জড়িত লাখ লাখ শ্রমিকের কল্যাণের কথা কেউ ভাবছে না। শ্রমিক অসন্তুষ, অর্থনৈতিক সংকট, দুর্বল ব্যবস্থাপনা, বৈধ ও অবৈধ ভাবে শেড ট্রি নিধন, বিভিন্ন রকম পোকা মাকড়ের আক্রমণ, নিয়ন্ত্রণহীনভাবে কীটনাশক ব্যবহার ও পরিবেশ দূষণ, প্রতিকূল আবহাওয়া, মান্ধাতার আমলের পদ্ধতি পরিবর্তন না করা, যুগোপযোগী পরিকল্পনার অভাব, মালিক ও সরকার পক্ষের উদাসীনতা, চা প্রেমিকদের হাত থেকে বাগানের মালিকানা চলে যাওয়া, চায়ের বদলে রাবার চাষ, সর্বোপরি দেশী-বিদেশী বিভিন্ন মহলের চক্রান্তের শিকার হয়ে ধ্বংস হতে চলেছে বিপুল পরিমাণে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনকারী চা শিল্প। শ্রমিকরা ন্যায্য পারিশ্রমিক পায় না। চা বাগানের শ্রমিকরা দরিদ্র ও মজুর শ্রেণীর লোক। বাগানে কাজ করে কোনমতে খেয়ে পরে বেঁচে আছে তারা। যুগ যুগ ধরে এমন অবস্থা চললেও পরিবর্তন ঘটেনি তাদের ভাগ্যের। এ অবস্থায় “মরার উপর খাড়ার ঘা” এর মতো অগ্রহায়ণ-পৌষ-মাঘ এই তিন মাস তাদের অধিকতর আর্থিক সংকটের মধ্যে কাটাতে হয়, কারণ এ সময়ে চা বাগানে পাতা তোলার কোন কাজ হয় না।
এ সময়ে চলে চা-গাছে ট্রিমিং বা গাছের আগা অর্থাৎ ডালপালা ছাঁটাইয়ের কাজ। পরে এই ডালপালা থেকেই জায় নতুন পাতা কুঁড়ি। ছাঁটাইয়ের সময়ে শ্রমিকদের বাগানের নালা পরিস্কারকরণসহ অন্যান্য কিছু কাজে লাগানো হয়, এজন্য সামান্য অর্থ প্রণোদনাও দেয়া হয়। কিন্তু এতে তাদের আর্থিক সংকট দূর হয় না। ক্ষুধা থেকে যায় পেটে।
চা শ্রমিকরা সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত কাজ করে মজুরি পায় মাত্র ৮৫/- টাকা, ফলে সপ্তাহে ৫৯৫ টাকা দিয়ে তাদের সংসার চালাতে হয়। এ টাকা দিয়ে অনেক চা শ্রমিক পরিবারের ৮-৯জন সদস্য চলতে পারে না। বাগান কর্তৃপক্ষের সঙ্গে চুক্তি অনুযায়ী ৮৫/- টাকা মজুরি ছাড়াও তাদের জন্য বরাদ্দ অন্যান্য সুযোগ সুবিধা অনেক বাগানে তেমন একটি নেই বললেই চলে। বেশ কটি চা বাগানের শ্রমিকদের বাসস্থান, শিক্ষা ও চিকিৎসার সংকট খুবই ভয়াবহ। চা শ্রমিকের ছেলে-মেয়েরা আশংকাজনকভাবে দৃষ্টিহীনতার শিকার । এদের জন্য প্রতিটি চা বাগানে চিকিৎসা কেন্দ্র থাকার কথা থাকলেও অনেক বাগানে তা নেই। যেসব বাগানে চিকিৎসা কেন্দ্র রয়েছে, সে সব কেন্দ্রে তেমন চিকিৎসার সামগ্রী নেই। ফলে সু-চিকিৎসার অভাবে অনেক সময় চা শ্রমিকদের অকালে মৃত্যুবরণ করতে হয়। সচেতনতার অভাবে অনেক গর্ভবতী মহিলার প্রাণহাণি ঘটে।
চা বাগানে নিয়োজিত শ্রমিকদের ৯০ শতাংশেরও বেশি শ্রমিক নারী। তারা প্রায় সারা বছর সূর্যদয় থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত কাজ করেন, হয় বৃষ্টিতে ভিজে, নয়তো সূর্যের তাপে পুড়ে। তবে এই পরিশ্রমের বিনিময়ে তারা সামান্যই পেয়ে থাকেন। চা শিল্পে নিয়োজিত শ্রমিকদের কাজের পরিবেশ, কাজের শর্ত ও ব্যবস্থাবলী অধিকাংশ ক্ষেত্রে এতই অমানবিক, যার তুলনা করা যায় একমাত্র বহু যুগ আগের দাসত্ব প্রথার সঙ্গে। এ অবস্থার পরিবর্তন কেবল চা শ্রমিকদের স্বার্থেই নয়, গোটা চা শিল্পের স্বার্থে। ১৯৪৮ সালে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের অন্যতম বৃহৎ শ্রমিক সংগঠন হিসাবে বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়ন আত্মপ্রকাশ করে এবং নিবন্ধিত হয় । সে সময়ের কংগ্রেস নেতা পূর্ণেন্দু সেনগুপ্ত, নিকুঞ্জ বিহারী চৌধুরী, দুর্গেশ চন্দ্র দেব প্রমুখ বরেণ্য ব্যক্তিগণের অক্লান্ত প্রচেষ্টায় এই সংগঠন চা শ্রমিকদের একক ট্রেড ইউনিয়ন সংগঠন হিসাবে গড়ে ওঠে। স্বৈরাচারী পাক-শাসকদের রোষানলে পড়ে এই সংগঠনের কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হয় এবং বস্তুত এক সময় স্থবির হয়ে পড়ে। স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের ভিতর দিয়ে নবরূপে চা শ্রমিক ইউনিয়ন সংগঠিত হতে থাকে। দেশের সাধারণ জনগণের পাশে থেকে চা শ্রমিকরাও ব্যাপকভাবে আমাদের স্বাধীনতা আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেন। বহু চা শ্রমিক মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ ও লড়াই করে শহীদ হন। মুক্তিযুদ্ধে এ দেশের আপামর জনতার সঙ্গে চা শ্রমিকরা যে বীরত্বের ও প্রত্যায়ের দৃঢ় মনোবল দেখিয়েছিলেন তা আজও অবিস্মরণীয়। মুক্তিযুদ্ধে যে সমস্ত চা শ্রমিকেরা অংশগ্রহণ করেছিল, জীবন যুদ্ধে আজ তারা পরাজিত। কেউ তাদের খোঁজ রাখছে না। ছাত্র জনতার সাথে সেদিন চা শ্রমিকদের রক্তও একই ধারায় প্রবাহিত হয়ে আমরা পেয়েছি স্বাধীনতা।
বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ নির্বাচনী ইশতেহারে চা শ্রমিকদের ১২৫ বৎসরের ইতিহাসে প্রথম বারের মত চা শ্রমিক প্রসঙ্গ নিয়ে আসে। নির্বাচনের পর পরই প্রথম বারের মত মজুরি বোর্ড গঠন করে ন্যূনতম মজুরি ও বোনাস নির্ধারণ করেছিল। চা বাগান কর্মচারী এসোসিয়েশনের ক্ষেত্রেও অনুরূপ ব্যবস্থা নেওয়া হয়। কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয় মজুরি কমিশন সুপারিশ শ্রম আইন অনুযায়ী মেন্ডেটারি হলেও বাংলাদেশ টি এস্টেট স্টাফ এসোসিয়েশন ও বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়নের ক্ষেত্রে কর্মচারী ও শ্রমিকদের কোন উন্নতি হয়নি। যা হয়েছে তা অত্যন্ত নগণ্য।
দেশের চা বাগানের ১২ টি ভ্যালী যথা-নর্থ সিলেট ভ্যালী, জুড়ী ভ্যালী, মনু ভ্যালী,বালিশিরা উত্তরাঞ্চল, বালিশিরা পূর্বাঞ্চল, বালিশিরা পশ্চিমাঞ্চল. লস্করপুর পূর্বাঞ্চল, লস্করপুর উত্তরাঞ্চল, লস্করপুর পশ্চিমাঞ্চল, লংলা অঞ্চল, চট্টগ্রাম অঞ্চল, দলই অঞ্চলের ভোটাররা ভোটাধিকার প্রয়োগ করেন। নির্বাচনে ৯৫.৯১% ভোট প্রদান পূর্বক ভোটাররা তাদের দাবী আদায় তথা চা শিল্প ও শিল্পের কারিগর/শ্রমিক কর্মচারীদের রুটি-রুজিসহ বিভিন্ন সুযোগ আদায়ের লক্ষে দক্ষ ও প্রবীণ নেতাদের আবারও নির্বাচিত করেন। কিন্তু চা শ্রমিকদের দাবি দাওয়ার চাহিদা তেমন একটা পূরণ হয় না।
দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য সংগঠিত শ্রমশক্তি দরকার। এক্ষেত্রে শ্রমিক সংগঠনগুলোর দায়িত্ব অনেক হলেও রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা যে দল বা জোটের হাতে থাকে তাদের মর্জিতে পরিচালিত হয় ট্রেড ইউনিয়নগুলো। যতদিন এই ধারা থেকে শ্রমিক সমাজ সচেতন হয়ে বের হয়ে আসতে না পারবে, ততদিন তারা বঞ্চিত থাকবে। মাঝে তাদের নেতারাই সুবিধাভোগী থাকবে। শ্রমিকদের সুবিধা নিশ্চিত করার জন্য কঠোরভাবে শ্রম আইনের বিধি মানার জন্য সরকারকে ব্যবস্থা নিতে হবে। শ্রমিকদের বঞ্চিত রেখে অর্থনীতিতে গতিশীলতা আনা অসম্ভব। এটা সব সরকারই বুঝে এবং জানে, তারপরও গলদ কেউ দূর করতে চান না। আসলে শ্রমিক অসন্তোষের জন্য শ্রম শোষণই দায়ী। এ বিষয়ে সরকার যতোদিন নজর দেবে না, ততোদিন শ্রমিক অসন্তোষ লেগেই থাকবে। চা শিল্পে ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও মালিকদের উচিত হবে শ্রমিকদেরকে প্রতিপক্ষ না ভেবে, সহকর্মী হিসেবে দেশের স্বার্থে কাজ করে যাওয়া। চা শিল্পকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য সকলের সাহায্য প্রয়োজন। সরকার, মালিক, শ্রমিক, শীর্ষস্থানীয়দের সকলের সঙ্গে ঐক্য প্রতিষ্ঠার মধ্যে এই শিল্পকে দেশের স্বার্থে বাঁচিয়ে রাখতে হবে।

লেখক : প্রাবন্ধিক